ফ্যাসিস্টদের সাথে পুনর্মিলনের দুঃস্বপ্ন

দেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা


৭ অক্টোবর ২০২৬ ২২:১০

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
ফ্যাসিস্টদের সাথে পুনর্মিলনের দুঃস্বপ্ন দেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা- বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের আয়োজনকে কেন্দ্র করে এমন প্রশ্ন তুলেছেন পর্যবেক্ষকরা। গত ৩ অক্টোবর শনিবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের উদ্বোধনের মধ্য দিয়ে রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজের (সিজিএস) উদ্যোগে আন্তর্জাতিক ভূরাজনৈতিক সম্মেলন ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন (BOBC) ২০২৬’ শুরু হয়। গত ৩ অক্টোবর থেকে তিন দিনব্যাপী চলা এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনের এবারের মূল প্রতিপাদ্য ছিল— ‘Fragments, Frontiers & Futures: Navigating Power, Technology and Trust in a World Re-written’ এককথায় Reconciliation (পুনর্মিলন)। তথ্যপ্রযুক্তির এ যুগে বিশ্বাস ও আস্থার সম্পর্ক নতুন করে লিখে পথচলার ওপর জোর দেয়ার কথা বলা হয়েছে। ২০২৪-এর ৫ আগস্ট বিপ্লবের পর এবারের এ আয়োজন ১৫তম। সম্পর্কের পুনর্মিলন বলতে কোন দিকে ইঙ্গিত করছেন, তা সরাসরি উল্লেখ করা না হলেও, প্যানেল বক্তাদের আলোচনায় পরিষ্কার হয়েছে।
জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামাল বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো ধরনের রাজনৈতিক পুনর্মিলনের সুযোগ নেই। দলটির নেতাদের রাজনৈতিকভাবে কী হবে, সেটি আলাদা বিষয়; তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ব্যবহার করে যারা জনগণের ওপর সহিংসতা চালিয়েছে, তাদের অবশ্যই বিচারব্যবস্থার আওতায় আনতে হবে। তিনি ৫ অক্টোবর ‘বে অব বেঙ্গল কনভারসেশন ২০২৬’-এর সমাপনী দিনের একটি অধিবেশনে বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
কায়সার কামাল বলেন, আওয়ামী লীগ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ও অঙ্গ সংগঠন ব্যবহার করে জনগণের বিরুদ্ধে সহিংসতা চালিয়েছে। এসব ঘটনায় জড়িতদের বিচার করতে হবে। তবে এই বিচার শুধু শাস্তি দেওয়ার জন্য নয়; ভবিষ্যতে যেন কেউ আবার বাংলাদেশে এমন কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সাহস না পায়, সেজন্য একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করাও এর উদ্দেশ্য।
কায়সার কামাল বলেন, যেসব ব্যক্তি বিদেশে অবস্থান করছেন, তারা কোনো অনুশোচনা প্রকাশ করছেন না। তাদেরও বিচারের আওতায় আনতে হবে। রাজনৈতিক পুনর্মিলনের নামে তাদের দায়মুক্তির সুযোগ দেওয়া উচিত নয়।
শেষ দিনের সেশনে অংশগ্রহণ করেন সাউথ এশিয়া স্টাডিজ সেন্টার ইউনিভার্সিটি অব রাজস্থান ভারতের প্রফেসর কারোরি সিং, নিউএজ পত্রিকার সম্পাদক নুরুল কবীর, দক্ষিণ আফ্রিকার উইটস ইউনিভার্সিটির গবেষক মাদালিৎসো জিলিলো ফিরি এবং কলম্বিয়ার সেন্টার ফর পিস এন্ড কনফ্লিক্ট স্টাডিজের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর নিকি সিঙ্গার।
বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশ থেকে সাড়ে ৮ শতেরও বেশি প্রতিনিধি এই সম্মেলনে সশরীরে ও ভার্চুয়ালি অংশ নেন। তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হলেন— সার্বিয়ার সাবেক রাষ্ট্রপতি বোফিস তাদিচ, মালির সাবেক প্রধানমন্ত্রী মুসা মারা। সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক জিল্লুর রহমান সম্মেলনে সভাপতিত্ব করেন। কী নোট উপস্থাপন করেন বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী হুমায়ুন কবির।
কূটনৈতিকদের মধ্যে বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূত মাইকেল মিলার, বাংলাদেশে নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক, মন্টিনিগ্রোর সংসদ সদস্য স্টোজোভিক, ইস্তাম্বুল মেট্রোপলিটন মিউনিসিপ্যালিটির মেয়রের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক উপদেষ্টা মুস্তফা ওসমান তুরান। বৈশ্বিক গবেষক, সামরিক ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য উপস্থাপন করেন ভারতের বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এম জে আকবর, ভারতীয় সেনাবাহিনীর সাবেক কমান্ডার অরুণ কুমার সাহনি, জর্জ টাউন ইউনিভার্সিটির অধ্যাপক ক্যারল ক্রিস্টিন ফেয়ার, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ ও সিপিডির ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাবিষয়ক প্যানেলিস্ট রেহান আসিফ আসাদ, ইউনেস্কোর (UNESCO) প্রতিনিধি সুসান ভাইজ, ব্র্যাক বিজনেস স্কুলের সহযোগী অধ্যাপক (জলবায়ু ও সমুদ্র সেশনের সঞ্চালক) ড. সেবাস্টিয়ান গ্রোহ, সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব দ্য ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম, প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান, সিজিএস নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী, জিয়াউর রহমান ফাউন্ডেশনের ভাইস প্রেসিডেন্ট ডা. জুবাইদা রহমান প্রমুখ।
কায়সার কামাল বলেন, গত দেড় দশকে বাংলাদেশে বিচারব্যবস্থা কর্তৃত্ববাদী সরকারের প্রভাবের মধ্যে ছিল। বর্তমানে জনগণের সরকার ক্ষমতায় থাকায় বিচারব্যবস্থা ধীরে ধীরে উন্নতির দিকে যাচ্ছে। ভবিষ্যতে দেশে একটি ন্যায়সংগত ও স্বাধীন বিচারব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
ডেপুটি স্পিকার আরও বলেন, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাকে টেকসই করতে শক্তিশালী ও স্বাধীন প্রতিষ্ঠান প্রয়োজন। সরকারের বৈধতা ও জনআস্থানির্ভর করে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আইনের শাসনের ওপর। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহারকারীদের জবাবদিহির আওতায় আনার পাশাপাশি বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত রাখতে হবে।
ব্যারিস্টার কায়সার কামাল বলেন, রাষ্ট্রীয় সহিংসতা সৃষ্টিকারীদের আইনি পরিণতি থেকে আড়াল করার প্রচেষ্টার কারণেই বিশ্বব্যাপী জাতীয় পুনর্মিলন প্রক্রিয়া ব্যর্থ হচ্ছে। আমাদের বিচারিক এবং রাজনৈতিক কাঠামোসমূহকে নতুন করে গড়ে তুলতে হবে— যাতে নিশ্চিত করা যায় যে এসব কাঠামো শাসকগোষ্ঠীর পরিবর্তে সাধারণ নাগরিকের সেবায় নিয়োজিত থাকবে। এসব প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা প্রয়োজন বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
তিনি বলেন, বাংলাদেশে ৫ আগস্ট বা তার পূর্ববর্তী সময়ের দিনগুলোয় যা ঘটেছিলো, তা কেবল সরকার পরিবর্তনের ঘটনা ছিল না; বরং তা ছিল আমাদের রাজনৈতিক কাঠামোর এক মৌলিক পুনঃসংজ্ঞায়ন। এ সময় নাগরিকরা আইনের শাসনকে উপেক্ষা করা এবং নাগরিক স্বাধীনতা দমন করা শাসনব্যবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল। জনগণ লড়াই করেছিল গণতান্ত্রিক মর্যাদা ও মৌলিক অধিকার পুনরুদ্ধারের জন্য। তারা নজির স্থাপন করতে চেয়েছিল— যাতে বাংলাদেশে আর কেউ কোনোদিন স্বৈরাচারী শাসনব্যবস্থা কায়েম করার দুঃসাহস না দেখায়।
দীনেশ ত্রিবেদী বলেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক সম্পূর্ণ স্বাধীন এবং তা অন্য কোনো তৃতীয় দেশের সম্পর্কের ওপর নির্ভরশীল নয়। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পরিস্থিতিতে শেখ হাসিনাকে ভারতের মাটি ও অবতরণের সুযোগ দেওয়া ছাড়া নয়াদিল্লির সামনে বিকল্প কোনো পথ ছিল না। এটি ভারতের পুরোনো বন্ধুপ্রতিম নীতির অংশ ছিল। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রত্যর্পণের বিষয়টি একটি নির্দিষ্ট আইনি ও বিচারিক আদালতের অধীন। দুই দেশেরই গণতান্ত্রিক কাঠামোর প্রতি শ্রদ্ধা রেখে আইনি পথ অনুসরণ করা উচিত।
মাহফুজ আনাম বলেন, বাংলাদেশে আমরা স্বৈরাচার ও একনায়কতন্ত্র পতন ঘটাতে পারদর্শী হলেও একটি টেকসই গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান গঠনে ধারাবাহিকভাবে ব্যর্থতার পরিচয় দিয়ে আসছি।
মতিউর রহমান বলেন, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ও সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এখনো চ্যালেঞ্জের মুখে। অবাধ তথ্যপ্রবাহ ও নিরপেক্ষ সাংবাদিকতা নিশ্চিত করাই একটি স্বৈরাচার মুক্ত রাষ্ট্রের প্রধান শর্ত।
মোহাম্মদ নাশিদ বলেন, জলবায়ু পরিবর্তন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি এবং বঙ্গোপসাগরীয় দেশগুলোর জন্য চরম পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক হুমকির বিষয়ে আন্তর্জাতিক ঐক্যের আহ্বান জানান।
ভারতের সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী ও সাংবাদিক এম জে আকবর, ভারত মহাসাগর ও বঙ্গোপসাগর অঞ্চলে ভূরাজনৈতিক প্রতিযোগিতা সম্পর্কে সতর্ক করে বলেন, ভৌগোলিক নিরাপত্তা রক্ষায় সমন্বিত সংলাপ জরুরি।
এত বড় আয়োজনে দেশের প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং তার নেতৃত্বে গঠিত ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কোনো প্যানেল আলোচক কিংবা অতিথির উপস্থিতি লক্ষ করা যায়নি। তাদের কোনো প্রতিনিধি ছিল কি না, না থাকলে কেন তাদের ডাকা হয়নি, জানার জন্য সিজিএসের টেলিফোন নম্বরে ফোন করে কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও কেন্দ্রীয় সাহিত্য সংস্কৃতি সম্পাদক এডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ বলেন, আমার জানা মতে আমাদের কাউকে আমন্ত্রণ জানানো হয়নি। তারা বঙ্গোপসাগর অঞ্চল তথা বিশ্ব বদলে দেয়ার এবং জন্য পুনর্মিলনের জন্য এ সংলাপের আয়োজন করেছিলো অথচ দেশের প্রধান বিরোধীদলের সবর উপস্থিতি (আমার জানা মতে) ছাড়া, এটি দুঃখজনক। তাদের উদ্দেশে আমাদের বক্তব্য, পৃথিবীর কোনো দেশে ফ্যাসিস্ট ও গণহত্যাকারী দল বা গোষ্ঠীর সাথে পুনর্মিলনের ঘটনা নেই। যেমন— জার্মানি, ইতালিসহ অনেক দেশের উদাহরণই আছে। বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ বর্তমানে নিষিদ্ধ। ফ্যাসিজম কায়েম এবং গণহত্যার দায়ে বিচার চলছে। বিচার এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। ফ্যাসিজমকে পৃথিবীর কোনো গণতান্ত্রিক দেশ বা শক্তি সহ্য করে না। বাংলাদেশের তরুণ, যাদের প্রায় ২ হাজার সাথী-সঙ্গী, ভাই, বন্ধু জীবনের বিনিময়ে এ দেশ থেকে ফ্যাসিজমকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করছে। তারা যেকোনো মূল্যে ফ্যাসিস্টদের পুনর্মিলন বা ফিরিয়ে আনা ঠেকাবে। এতে কোনো সন্দেহ নেই। আমাদের বক্তব্য স্পষ্ট যারা এমন ফ্যাসিস্টদের সাথে পুনর্মিলনের দুঃস্বপ্ন দেখছে, তারা আসলে দেশকে অস্থিতিশীল করার নীলনকশা আঁকছে। এদের ব্যাপারে সরকার, বিরোধীদলসহ দেশের সকল ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তির ঐক্যের বিকল্প নেই।’