এনজিও থাবায় অর্থনীতি
৭ অক্টোবর ২০২৬ ২২:০০
ক্ষুদ্রঋণ থেকে ডিজিটাল ব্যাংকিং
॥ উসমান ফারুক ॥
দেশের অর্থনীতিতে ধীরে ধীরে নিয়ন্ত্রণের থাবা বিস্তার করে চলেছে বিদেশি সহায়তাপুষ্ট একটি এনজিও (বেসরকারি প্রতিষ্ঠান)। ক্ষুদ্রঋণের অনুমোদন নিয়ে দেশের অর্থনীতিতে পা রাখা শুরু করার পর সুদভিত্তিক ব্যাংকের লাইসেন্স নিয়েছে ব্র্যাক। আর্থিক খাতে নিয়ন্ত্রণ আরও বাড়াতে ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার পর মোবাইল ফিন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বিকাশ প্রতিষ্ঠা করে। এরপর বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। কিন্তু এই সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে সাধারণ মানুষ, প্রযুক্তি বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদদের মনে তৈরি হয়েছে গভীর শঙ্কা। একদিকে সাইবার নিরাপত্তার ভয়াবহ সংকট; অন্যদিকে বিকাশের নামে প্রতারণার মহোৎসব— এ পরিস্থিতিতে ডিজিটাল ব্যাংক লাইসেন্স দেওয়া সাধারণ মানুষের জন্য আরও বড় বিপদ ডেকে আনবে। আর ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের এই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের আওতায় আনা অর্থনীতিতে এনজিও-পুঁজির একক আধিপত্য নিশ্চিত করবে। বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের নামে নেওয়া লাইসেন্স ভবিষ্যতে প্রতারণার বড় ফাঁদে পরিণত হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। যদিও প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, প্রতি দশ গ্রাহকের মধ্যে দুইজন অনলাইন প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
বিশ্লেষকরা বলছেন, যে প্রতিষ্ঠানটির সাইবার নিরাপত্তা দুর্বল। প্রতিনিয়ত বিকাশের গ্রাহকদের হিসাব থেকে অর্থ লুটের অভিযোগ জমা হচ্ছে। সেখানে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স তুলে দেওয়া মানে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠীর আর্থিক নিরাপত্তা হুমকির মধ্যে পড়বে। প্রতারিত ব্যক্তির সংখ্যা বেড়ে যাবে। সর্বস্বান্ত হয়ে যাবে সারা দেশে ছড়িয়ে থাকা প্রান্তিক আয়ের সাধারণ মানুষ।
সারা দেশে ব্র্যাকের এক কোটির বেশি গ্রাহক রয়েছে। যার পুরোটাই গ্রামের প্রান্তিক আয়ের জনগোষ্ঠী। বিশাল এই জনগোষ্ঠীকে ব্র্যাক সহজেই নিজেদের সহযোগী প্রতিষ্ঠান বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকের আওতায় নিয়ে যেতে পারবে। বিকাশের বর্তমান গ্রাহক সংখ্যা ৭ কোটির মতো। এর মধ্যে নিয়মিত লেনদেন করে সাড়ে ৪ কোটির মতো। বিশাল এই গ্রাহকের নিরাপত্তা দিতে পারছে না বিকাশ। সেখানে প্রতি সপ্তাহে লেনদেন করা ব্র্যাকের ঋণগ্রহীতাদের নিরাপত্তা কীভাবে দিতে পারবে।
বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতি কোনো একটি গোষ্ঠী বা এনজিওর নিয়ন্ত্রণে চলে যাওয়া মানেই আর্র্থিক খাত অনিরাপদ হয়ে যাওয়া। তাকে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে দেশি ও বিদেশি শক্তিও বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে ঝুঁকিতে ফেলার আশঙ্কা রয়ে যায়। বাংলাদেশ ব্যাংক ও মাইক্রোফাইন্যান্স রেগুলেটরি অথরিটির নীতিমালায় স্পষ্ট বিধান রাখা দরকার— যাতে কোনো এনজিও বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান ঋণগ্রহীতাকে তাদের নিজস্ব সহযোগী ব্যাংক, ওয়ালেট বা অ্যাপ ব্যবহারে পরোক্ষভাবেও বাধ্য করতে না পারে। দেশের আর্থিক কাঠামো এখনো ডিজিটাল ব্যাংক ও লেনদেনের জন্য উপযুক্ত না। দেশের মোট জনগোষ্ঠীর এখনো ৪০ শতাংশের বেশি ব্যাংক হিসাবই ব্যবহার করে না। অনানুষ্ঠানিক খাতনির্ভর অর্থনীতিতে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া মানে, ১৮ কোটি মানুষের সঞ্চয়কে আরো ঝুঁকিতে ফেলা। পর্যাপ্ত নিরাপত্তাকাঠামো গঠন ছাড়া ডিজিটাল ব্যাংক আমাদের জন্য নতুন সংকটের জন্ম দেবে।
ব্র্যাকের অধীনে ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকের পর ডিজিটাল ব্যাংক
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ব্র্যাক একটি ক্ষুদ্রঋণ দাতা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পথচলা শুরু করে। দারিদ্র্যবিমোচন ও গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর আর্থিক মুক্তির স্লোগান দিয়ে শুরু করে। কালের বিবর্তনে দেশ থেকে দারিদ্র্যবিমোচন না হলেও ব্র্যাক হাজার কোটি টাকার মহাজনি ব্যবসা দাঁড় করিয়ে ফেলেছে। ধীরে ধীরে বিশাল এক অর্থনৈতিক সাম্রাজ্যে রূপ নিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ব্র্যাকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় মহল থেকে আপত্তি উঠে এসেছে। সংস্থাটির বিরুদ্ধে ইসলামবিদ্বেষ বা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত করার মতো গুরুতর অভিযোগ সবসময়েই উঠে এসেছে। সুদের প্রচলন দরিদ্র্য মানুষের মধ্যে নিয়ে গিয়েছে। সুদ দিতে না পেরে একপর্যায়ে এলাকা ছাড়া মানুষের সংখ্যা অগণিত। সেই প্রতিষ্ঠানের বর্তমানে ঋণস্থিতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার ওপরে। বিশাল এই অঙ্ক চলে যাবে ডিজিটাল ব্যাংকের লেনদেনে। তাতে আর্থিক নিরাপত্তা যেমন ঝুঁকিতে পরবে, তেমনি প্রান্তিক আয়ের মানুষের কষ্টার্জিত অর্থ কেটে নিয়ে আয় বাড়বে বিকাশ ও ব্র্যাক ব্যাংকের।
দশজনে দুইজন প্রতারণার শিকার মোবাইল ব্যাংকিংয়ে
মোবাইল ব্যাংকিংয়ের লাইসেন্স দেওয়ার পর থেকেই এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর গ্রাহকদের মোবাইল হিসাব থেকে প্রতারণার মাধ্যমে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠতে থাকে। এমনকি বিকাশের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া যায় গ্রাহকের গোপন তথ্য প্রকাশ করার। তাদের সহযোগিতায় পিনকোড হাতিয়ে নিয়ে টাকা লুট করার ঘটনা অহরহ। দেশের এমএফএস হিসেবে সবচেয়ে বেশি গ্রাহক ব্র্যাকের বিকাশের।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের এক জরিপ অনুযায়ী, বাংলাদেশে এমএফএস ব্যবহারকারীদের প্রতি ১০ জনের মধ্যে প্রায় দুইজন কোনো না কোনোভাবে প্রতারণার শিকার হয়েছেন। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের গবেষণা মতে, ৬ দশমিক ৩ শতাংশ ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্টধারী ও ১৭ শতাংশ এমএফএস এজেন্ট প্রতারণার মুখোমুখি হয়েছেন। বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৫ সালের তথ্যানুযায়ী, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে এক বছরে ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনা আনুষ্ঠানিকভাবে রেকর্ড করা হয়েছে।
প্রতিটি ঘটনায় একজন সাধারণ গ্রাহক গড়ে ৯ হাজারের বেশি টাকা খুইয়েছেন। ক্ষতির পরিমাণ সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকা থেকে ২৫ হাজার টাকা বা তার বেশি। একজন এমএফএস এজেন্টের ক্ষেত্রে গড়ে ক্ষতির পরিমাণ ১৮ হাজারের বেশি টাকা। বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে রেকর্ড হওয়া ৮১ হাজার ৪২৩টি প্রতারণার ঘটনায় মোট ৯২ কোটি ৬০ লাখ টাকার প্রতারণা হয়। এর মধ্যে প্রায় ৮৯.৩ শতাংশ বা ৮২ কোটি ৭২ লাখ টাকা উদ্ধার করা যায়নি। আর্থিক অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থার মাধ্যমে এ পর্যন্ত মোট প্রায় ২১ হাজার কোটি টাকা লোপাট হয়েছে গ্রাহকদের।
সর্বশেষ বহুজাতিক স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকের ৫৪ জন গ্রাহকের ক্রেডিট কার্ড থেকে লাখ লাখ টাকা বিকাশে স্থানান্তর করে তুলে নেয় একটি সংঘবদ্ধ চক্র। তারপর থেকে বিকাশ সেবা বন্ধ করে দেয় ব্যাংকটি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যাংকিং অ্যান্ড ইন্স্যুরেন্স বিভাগের চেয়ারম্যান শহীদুল ইসলাম জাহিদ বলেন, সরাসরি না থাকলেও ব্র্যাকের একটি প্রচ্ছন্ন নিয়ন্ত্রণ থাকবে বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংকর ওপর। কারণ বিকাশের সিংহভাগ বিনিয়োগ ব্র্যাক ব্যাংকের। আবার ব্র্যাক ব্যাংক হচ্ছে ব্র্যাকের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান। এখন সরকারের কাজ হচ্ছে, এখানে সুশাসন ঠিক রাখা। নিয়ন্ত্রক সংস্থাকেও সেই নিরাপদ পরিবেশ দিতে হবে।
পাওয়া যায় না অর্থ ফেরত
ব্যাংক হিসাবে অর্থ জমা ভুল হলে বা কোনো কারণে সংখ্যা ভুল করে জমা দেওয়ার পর তার সমাধান মেলে। প্রকৃত হিসাবধারীর হিসাবে বা জমাকারী অর্থ ফেরত পান। কিন্তু বিকাশ নম্বরে ভুল হলে বা কোনোভাবে স্ক্যামারের কবলে পড়ে অর্থ চলে গেলে তা ফেরত পাওয়ার নজির নেই বললেই চলে। বড় অঙ্কের অর্থ ও প্রভাবশালী কেউ হলে তা ফেরত পাওয়া যায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়েই ১ থেকে ১০ বা ২০ হাজার টাকার অর্থ নিয়ে নেয় ব্যক্তি হিসাব থেকে। এ পরিমাণ অর্থ ফেরত পাওয়ার দৌড়ঝাঁপের কষ্টে এক পর্যায়ে হাল ছেড়ে দেন ব্যক্তি গ্রাহকরা।
রাজধানীর যাত্রাবাড়ীর সুমন মিয়ার বিকাশ নম্বর থেকে রাতের বেলা হঠাৎ করেই দুই হাজার টাকা করে পরপর চার হাজার টাকা চলে যায়। সকালে ঘুম থেকে উঠে টের পান তিনি। বাটন ফোন থেকে এ টাকা চলে যায়। মোবাইলে টাকা চলে গেছে তাকে ফোন দিলে তিনি ঠিকানা দেন কেরানীগঞ্জ। কিন্তু টাকা ফেরত দিতে অস্বীকার করেন। একপর্যায়ে হুমকি দিয়ে বলেন, পারলে এসে টাকা নিয়ে যান।
বিষয়টি জানাতে যাত্রাবাড়ী থানায় গিয়েছিলেন তিনি। সেখান থেকে বলা হয়, সাধারণ ডায়েরি কেরানীগঞ্জ থানায় করতে হবে। যেহেতু ব্যক্তি কেরাণীগঞ্জে থাকেন। সেদিনই ঢাকার বুড়িগঙ্গা নদীর ওপারে কেরানীগঞ্জ থানায় যান সুমন মিয়া। সেই থানায় সবকিছু শুনে তাকে জানানো হয়, সাধারণ ডায়েরি যাত্রাবাড়ী থানায় করতে হবে। কারণ হিসেবে তাকে বলা হয়, ঘটনাস্থল তো যাত্রাবাড়ী থানা। সেখান থেকে বলে দিলে আমরা জিডি ফলোআপ করবো। জিডি যাত্রাবাড়ী থানায় করে আসেন।
এভাবে হয়রানি হয়ে তিনি হাল ছেড়ে দেন টাকা উদ্ধারের। বিকাশ কর্তৃপক্ষের সঙ্গে যোগাযোগ করেও কোনো লাভ হয়নি। দুই বছর হলেও তার চার হাজার টাকা ফেরত পাননি সুমন মিয়া। শুধু ব্যক্তি না এজেন্টরাও প্রতারিত হয়ে আসছেন।
সায়দাবাদ এলাকার শহীদ ফারুক সড়কে কনফেকশনারি ব্যবসার সঙ্গে বাড়তি লাভের আশায় বিকাশের এজেন্ট হন আবু কাওছার। এজেন্ট হওয়ার পর প্রথম দিনেই তার মোবাইলে কল দিয়ে বিকাশ ডিলারের পরিচয় দেয় এক ব্যক্তি। আবু কাওছারের পিতা, মাতা ও জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর সেই ব্যক্তিই বলে দেন। এতে আবু কাওছারের বিশ্বাস হয় নতুন এজেন্ট হওয়ায় ডিলারের পক্ষ থেকে তথ্য যাচাই করা হচ্ছে হয়তো। এরপরই ঘটে অঘটন। একটি বার্তা পাঠিয়ে বলা হয়, ওটিপি নম্বর বলেন। সেই ওটিপি নম্বর বলার পরপরই এজেন্ট হিসাব থেকে ৫০ হাজার টাকা চলে যায়। সেই টাকা উদ্ধারে ডিলার, থানায় জিডি ও বিকাশের প্রধান কার্যালয়ে গিয়েও কোনো সমাধান পাননি তিনি। ব্যবসা শুরু করার আগেই ৫০ হাজার টাকা নাই হয়ে যায় তার।
রাজধানীর কাজলার পুরোনো এক বিকাশ এজেন্ট সিয়াম শাহাদাত। তার দোকানের কর্মচারী বিকাশে টাকা পাঠানোর সময়ে একটি সংখ্যা ভুল করে ২৫ হাজার টাকা পাঠান। পরবর্তীতে তা অভিযোগ আকারে জানালেও এখনো টাকা ফেরত পাননি তিনি। এভাবে দৈনিক শত শত প্রতারণার ঘটনা ঘটলেই ১০ শতাংশ ব্যক্তি ও এজেন্ট অর্থ ফেরত পান না বলে গবেষণায় উঠে এসেছে।
ঋণের ফাঁদে সর্বস্বান্ত হবে মানুষ
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সচেতন নয়। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ বা অশিক্ষিত ব্যক্তি স্মার্টফোন ব্যবহার করতে গিয়ে ভুল করে একটি লিংকে ক্লিক করলেই তার সারা জীবনের সঞ্চয় মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন একটি পরিবেশে, যেখানে সাইবার পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্তি সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যথেষ্ট নয়, সেখানে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সেবা দেওয়ার লাইসেন্স দেওয়া মানে হলো প্রতারণার দুয়ার আরও চওড়া করে খুলে দেওয়া।
এতে সাধারণ মানুষ যেমন প্রতারিত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়বে, তেমনি তারা একটি ‘ডেট ট্র্যাপ’ বা ঋণের ফাঁদে আটকে যাওয়ার শঙ্কাও তৈরি হবে। ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে অ্যালগরিদম ব্যবহার করে খুব সহজেই ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের উচ্চসুদে তাৎক্ষণিক ঋণ দেওয়া হবে। গ্রামীণ দরিদ্র মানুষ, যারা আর্থিক সাক্ষরতায় পিছিয়ে, তারা এই ঋণের ফাঁদে পা দিলে তাদের সর্বস্বান্ত হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি।
বর্তমানে বিকাশে প্রতারণার শিকার হলে গ্রাহকরা পুলিশের সাইবার ইউনিটে গিয়েও কোনো প্রতিকার পান না। টাকা উদ্ধারের হার নগণ্য। এখন যদি ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে এসে হ্যাকিং, সার্ভার ডাউন বা প্রযুক্তিগত ত্রুটির কারণে মানুষের টাকা আটকে যায় বা চুরি হয়ে যায়, তবে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে যাবার মতো কোনো নিয়ন্ত্রক সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ নেই। ব্র্যাক নিজেই হবে গ্রাহক, আবার নিজেই হবে বিচারক।
এছাড়া প্রতারণার ধরনও পাল্টে যাবে। আগে শুধু লেনদেনের টাকা চুরি হতো, এখন ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে মানুষের ঋণের ইতিহাস, ক্রেডিট স্কোর এবং সঞ্চয়কে টার্গেট করে অত্যন্ত জটিল সাইবার হামলা ও প্রতারণার ঘটনা ঘটবে। সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব এই প্রতারণাকে আরও সহজ করে দেবে।
শক্তিশালী হচ্ছে এনজিও
পরবর্তীতে ২০০১ সালে ব্র্যাক ব্যাংক প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প খাতে প্রবেশ করে প্রতিষ্ঠানটি। ২০১১ সালে ব্র্যাক ব্যাংকের সাবসিডিয়ারি বা সহায়ক প্রতিষ্ঠান হিসেবে চালু হয় বিকাশ, যা খুব দ্রুতই বাংলাদেশের মোবাইল আর্থিক সেবার বাজারে একক প্রাধান্য বা মনোপলি প্রতিষ্ঠা করে। আজ ব্র্যাক শুধু একটি উন্নয়ন সংস্থা নয়; এটি এমন এক বিশাল অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি— যার হাত পৌঁছে গেছে ক্ষুদ্রঋণ, বাণিজ্যিক ব্যাংক, মোবাইল ব্যাংকিং, বিশ্ববিদ্যালয়, খুচরা বিপণন (আড়ং), চা বাগান এবং বীজ ও কৃষি ব্যবসায়।
ব্র্যাকের যাত্রা শুরু হয়েছিল দারিদ্র্যবিমোচনের মহৎ উদ্দেশ্যে। কিন্তু আজ যখন তারা দেশের আর্থিক খাতের এককেন্দ্রিক শক্তিতে পরিণত হচ্ছে, তখন তাদের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা এবং সন্দেহ উপলক্ষ্য দুটিই প্রকট হয়ে উঠেছে। একদিকে ধর্মীয় ও সামাজিক মহলের আপত্তি ও বিতর্ক, অন্যদিকে সাইবার প্রতারণার ভয়াবহতা— এই দুইয়ের মিলিত চাপে ব্র্যাক-বিকাশের ডিজিটাল ব্যাংকিং যাত্রা একটি সংকটের জন্ম দিতে পারে। সাইবার নিরাপত্তাকে গুরুত্ব না দিয়ে, সাধারণ মানুষের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাবকে পুঁজি করে ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স দেওয়া মানে হলো প্রতারণার এক বিশাল বাজার তৈরি করে দেওয়া। আর ক্ষুদ্রঋণ গ্রহীতাদের এই ইকোসিস্টেমে আটকে ফেলা মানে হলো অর্থনীতিতে একটি এনজিও-কর্পোরেট সাম্রাজ্যের একক আধিপত্য চূড়ান্ত করা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের এক কর্মকর্তা বলেন, আর্থিক অন্তর্ভুক্তি এবং প্রযুক্তির ব্যবহার অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু তা হতে হবে নিরাপদ, স্বচ্ছ এবং গ্রাহকবান্ধব। সাধারণ মানুষের সারা জীবনের সঞ্চয় এবং তাদের আর্থিক নিরাপত্তা কোনো করপোরেট গ্রুপের পরীক্ষা-নিরীক্ষার বিষয় হতে পারে না।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে যে, অর্থনীতির চাকা ঘুরলেও তা সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা চুরি করে নয়, বরং তাদের নিরাপত্তা ও অধিকার রক্ষা করেই এগিয়ে যাবে। অন্যথায় প্রযুক্তির এই অগ্রযাত্রা সাধারণ মানুষের জন্য হয়ে উঠবে এক ভয়াবহ আতঙ্কের নাম। সাধারণত এনজিওগুলোর মূল কাজ হওয়া উচিত অলাভজনক সামাজিক সেবা প্রদান। কিন্তু বাংলাদেশে ব্র্যাকের মতো বড় এনজিওগুলো ধীরে ধীরে একটি শক্তিশালী আর্থিক কনগ্লোমারেট বা বাণিজ্যিক জোটে পরিণত হয়েছে।
প্রযুক্তিবিদ সামছুজ্জোহা বলেন, দেশের ডিজিটাল লেনদেনের পরিসর যতটুকু বেড়েছে তা এখনো পুরোটা নিরাপদ না। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, মানুষ এখনো এতটা সচেতন হয়ে ওঠেনি। আর যারা সচেতন, তারাও প্রতারিত হচ্ছেন। তাদের মোবাইল হ্যাক হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো গ্রাহকের দায় বলে দায়িত্ব এড়িয়ে চলছে। এটা প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হচ্ছে সার্ভার ও গ্রাহককে নিরাপত্তা দেওয়া।
ডিজিটাল অর্থনীতির বিস্তার করার আগে সাইবার সুরক্ষা, সাইবার আদালত ও পুলিশসহ অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে আগে। এখন গ্রাহকদের পরীক্ষা করে সক্ষমতা বাড়ানো বোকামি ছাড়া কিছুই না বলে মন্তব্য করেন তিনি।
সাইবার প্রযুক্তিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও বিশ্লেষকরা বলছেন, বিকাশ ডিজিটাল ব্যাংককে বাজারে পূর্ণাঙ্গ কার্যক্রম শুরু করতে দেওয়ার আগেই সাইবার নিরাপত্তার কঠোরতম শর্ত পূরণ, নিরপেক্ষ অডিট এবং মুক্ত প্রতিযোগিতার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। অন্যথায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তির এই রঙিন স্বপ্ন কোটি কোটি মানুষের জন্য ডিজিটাল প্রতারণার এক নিঃশব্দ ফাঁদে পরিণত হবে।
এমএফএস এবং ডিজিটাল ব্যাংকের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। এমএফএসে মানুষ কেবল টাকা পাঠায় বা নেয়। কিন্তু ডিজিটাল ব্যাংকে মানুষের সঞ্চয়ী আমানত, ফিক্সড ডিপোজিট, ঋণ এবং বিনিয়োগের সুযোগ থাকবে। অর্থাৎ সাধারণ মানুষের জমানো সারা জীবনের সঞ্চয় এখন একটি অ্যাপের ওপর নির্ভর করবে।
ব্র্যাক গ্রুপ দেশের আর্থিক খাতের একটি মেগা প্লেয়ার বা অদৃশ্য নিয়ন্ত্রক হয়ে উঠছে। সাধারণ মানুষের পকেটের টাকা, তাদের ঋণ এবং এখন তাদের ডিজিটাল লেনদেন সববকিছুর ওপর যখন একটিমাত্র প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ চলে আসে, তখন তা রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং ভোক্তাদের স্বার্থের জন্য কতটা নিরাপদ, তা নিয়ে নীতিনির্ধারকদের ভাবার সময় এসেছে।
বিকাশের মাধ্যমে অর্থ লেনদেন সহজ হলেও করুন বাস্তবতা হলো এই সুযোগে বিকাশের নামে প্রতারণার অভিযোগ আজ দেশের প্রতিটি থানায় একটি নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। ফেক কাস্টমার কেয়ার, ফিশিং লিংক, এসএমএস স্ক্যাম এবং সামাজিক প্রকৌশলের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। বিকাশের মতো একটি এমএফএস প্রতিষ্ঠান সাধারণ লেনদেনের নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হচ্ছে, তখন তাকে পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল ব্যাংক এর লাইসেন্স দেওয়া মোটেও যুক্তিযুক্ত না।
আমাদের দেশের সাধারণ মানুষ সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে বিন্দুমাত্র সচেতন নয়। গ্রামের একজন সাধারণ মানুষ বা অশিক্ষিত ব্যক্তি স্মার্টফোন ব্যবহার করতে গিয়ে ভুল করে একটি লিংকে ক্লিক করলেই তার সারা জীবনের সঞ্চয় মুহূর্তেই হাওয়ায় মিলিয়ে যাচ্ছে। এমন একটি পরিবেশে, যেখানে সাইবার পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তদন্ত সক্ষমতা এবং প্রযুক্তিগত সুরক্ষা যথেষ্ট নয়, সেখানে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের মতো ঝুঁকিপূর্ণ সেবা দেওয়ার লাইসেন্স দেওয়া মানে হলো প্রতারণার দুয়ার আরও চওড়া করে খুলে দেওয়া। আগে প্রতারণার সকল পথ বন্ধ করতে হবে। তারপর ডিজিটাল ব্যাংকের লাইসেন্স হতে পারে।