নতুন খোলসের শোষকশ্রেণির কবলে তরুণরা
১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৩৭
॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
‘আমার সোনার বাংলায় বৈষম্যের ঠাঁই নাই’; ‘কোটা না মেধা, মেধা মেধা’— এই স্লোগানগুলো ইতিহাসের সাক্ষী। কিন্তু চব্বিশের জুলাই বিপ্লবোত্তর বাংলাদেশে নতুন করে শাহবাগে এমন ধ্বনি তুলতে হবে, তা হয়তো কল্পনায়ও ছিল না তরুণ-তরুণীদের। প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলনে নামতে হয়েছে তরুণ তরুণীদের, নতুন করে ধ্বনিত হচ্ছে স্লোগান। দৃশ্যত খোলস বদলে জাতির ঘাড়ে চেপে বসেছে শোষকদল, যারা নাগরিকদের অধিকার ক্ষুণ্ন করছে এবং রাষ্ট্র ও প্রজন্মের সম্ভাবনাকে ধ্বংস করে ফেলছে।
দেশের শিক্ষা খাতের গুরুত্বপূর্ণ এ স্তরটিতে মেধাবীদের নিয়োগ নিশ্চিত করা যখন সবচেয়ে বেশি জরুরি, তখন দলীয় লেজুড়বৃত্তির জন্য ভেরিফিকেশনের নামে মেধাবী তরুণদের নিয়োগবঞ্চিত করার অভিযোগ উঠছে। কিংবা নিয়োগ বাণিজ্য করে মেধাবীদের দূরে রেখে শিক্ষা খাতকে ধ্বংস করার নতুন পাঁয়তারা করা হচ্ছে। এমন প্রশ্নও তুলছেন বোদ্ধামহলের অনেকে। অতীতে নিয়োগ বাণিজ্য, পরীক্ষায় অনিয়ম যে হয়েছে, সে অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত মানুষ এমন উদ্বেগ প্রকাশ করছে। পুরোনো ফ্রেমে নতুন করে তরুণরা বঞ্চনার শিকার হবে কিনা— নতুন করে এ বিষয়টি সামনে আসছে।
সম্প্রতি সহকারী শিক্ষক নিয়োগ পরীক্ষায় মোট ১৪ হাজার ৩৮৪ জন প্রার্থী চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হন। তবে ভেরিফিকেশনের পরে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত অনেক প্রার্থী এখনো নিয়োগপত্র না পাওয়ায় হতাশা বেড়েছে। ফলে তারা আন্দোলন ও প্রতিবাদ করতে রাজপথে নেমেছেন।
তথ্যমতে, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ ২০২৫-এর ভেরিফিকেশনে দেশের ৬১ জেলায় মোট ২ হাজারের বেশি প্রার্থী বাদ পড়েছেন। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সুনামগঞ্জে ১২০ জন, দিনাজপুরে ১১৪ জন, যশোরে ১০৬ জন, কুমিল্লায় ১০২ জন এবং ভোলায় ৮৪ জন। আর বিভাগভিত্তিক হিসাবে রংপুর বিভাগে সবচেয়ে বেশি ৫০৪ জন বাদ পড়েছেন। এরপর খুলনা বিভাগে ৪২০ জন, চট্টগ্রামে ৩১২ জন, ঢাকায় ২৬৮ জন, সিলেটে ২৬০ জন, রাজশাহীতে ২৫৫ জন, বরিশালে ২৫২ জন এবং ময়মনসিংহে ১১৪ জন।
নিয়োগ নিয়ে সরকারের নীতি ও কার্যক্রমকে দুর্নীতি, নিয়োগ বাণিজ্য ও দুরভিসন্ধিমূলক বলে অভিযোগ তুলতে শুরু করেছে নানা মহল ও রাজনৈতিক দলগুলো। উদ্বেগ প্রকাশ এবং নিন্দাও জানাচ্ছে মহলগুলো। প্রাথমিকের শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে দুরভিসন্ধিমূলক পদক্ষেপের নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য রাজনৈতিক দল। জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার সম্প্রতি এক ব্রিফিংয়ে অভিযোগ করে বলেন, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিয়োগ পরীক্ষায় দেশের ইতিহাস, অনুশীলন ও নজিরকে উপেক্ষা করে ভেরিফিকেশনের নামে একশ্রেণিকে নিয়োগপত্র দেয়া হচ্ছে না। বেছে বেছে যুবদল, ছাত্রদল যারা করেছে তাদের নিয়োগ দেয়া হচ্ছে। নিয়োগ প্রক্রিয়ায় এসবের উদ্দেশ্য হচ্ছে- আগামী নির্বাচনে পোলিং ও প্রিসাইডিং হিসেবে বেছে বেছে বিএনপির লোকদের নিয়োগ দেয়া হবে। এই খারাপ মনোভাব থেকে এসব করা হচ্ছে। সরকারের এমন নীতির বিরুদ্ধে শাহবাগে আন্দোলনরত নিয়োগবঞ্চিত সমস্ত শিক্ষিত নারী-পুরুষ তাদের অধিকার আদায়ে আহাজারির কথাও তুলে ধরেন তিনি।
এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় দলীয়করণ ও তরুণ-তরুণীদের বঞ্চিত করার সরকারের এমন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টির আহ্বায়ক ও বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম। তিনি বলেন, প্রাথমিক শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অন্যায়ভাবে একজনকে বাদ দিলেও তার পক্ষে লড়বেন তারা। বাদ দেওয়া প্রত্যেককে চাকরিতে নিয়োগ দিতে হবে। যদি তাদের কোনো সন্ত্রাসী বা রাষ্ট্রবিরোধী কর্মকাণ্ড না থাকে, তাহলে নিয়োগ দিতে হবে। সম্প্রতি দলের কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে এমন দাবি জানায় দলটি।
এদিকে নিয়োগ প্রক্রিয়া নিয়ে সরকারের দলীয়করণ ও ভেরিফিকেশনের নামে মেধাবীদের বাদ দেয়ার প্রতিবাদে এবং অধিকার প্রতিষ্ঠায় আন্দোলনে নেমেছে নিয়োগবঞ্চিতরা। গত ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার সকালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সামনে জড়ো হন নিয়োগবঞ্চিত প্রার্থীরা। পরে বেলা ১১টার দিকে মিছিল নিয়ে শাহবাগ মোড়ে গিয়ে অবস্থান কর্মসূচি শুরু করেন তারা। নিয়োগপত্র হাতে না পাওয়া পর্যন্ত তারা সেখানে অবস্থান করবেন বলে ঘোষণা দেন। সাত মাস বয়সী শিশুকে নিয়ে আন্দোলনে অংশ নেয়া মিতু জানান, চূড়ান্তভাবে সুপারিশপ্রাপ্ত হওয়ার পরও কেন নিয়োগপত্র দেওয়া হয়নি, সে বিষয়ে তিনি এখনো কোনো কারণ জানতে পারেননি। তিনি বলেন, প্রচণ্ড গরমের মধ্যে ছোট সন্তানকে নিয়ে ঢাকায় আসা কষ্টকর হলেও ন্যায্য অধিকার আদায়ের জন্যই এই কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছেন।
প্রাথমিকে সহকারী শিক্ষক নিয়োগ নিয়ে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগ, আন্দোলন, সমালোচনা এবং হযবরল অবস্থার মধ্যে গত ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার সচিবালয়ে বিশ্ব শিক্ষক দিবস-২০২৬ উপলক্ষে আয়োজিত জাতীয় স্টিয়ারিং কমিটির সভায় শিক্ষা এবং প্রাথমিক ও গণশিক্ষামন্ত্রী ড. আ ন ম এহছানুল হক মিলন জানান, উত্তীর্ণ প্রার্থীদের ভেরিফিকেশন ও তথ্য যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া আগামী ১ অক্টোবর পর্যন্ত চলবে। এরপরও কেউ নিয়োগপত্র না পেলে তা পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দ্রুত সমাধান করা হবে।
সংবিধান অনুযায়ী কোনো নাগরিক ফৌজদারি অপরাধে দণ্ডিত না হলে এবং রাষ্ট্রদ্রোহী কোনো প্রমাণ না থাকলে এবং বিদেশি নাগরিক না হলে প্রজাতন্ত্রের চাকরি করার ক্ষেত্রে কোনো বাধা নেই। কিন্তু সহকারী শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে ভেরিফিকেশনের নামে কোনো অপরাধের প্রমাণ বা অভিযোগ না থাকা সত্ত্বেও অনেককে নিয়োগপত্র দেয়া হয়নি বা কারণ ব্যাখ্যা করা হয়নি। এটি এক ধরনের দুরভিসন্ধিমূলক এবং একটি চক্রকে নিয়োগ বাণিজ্য করার সুযোগ দেয়ার শামিল। কারণ ভেরিফিকেশনে নেতিবাচক প্রতিবেদন থেকে রেহাই দিতে প্রার্থীদের কাছ থেকে সরকার দলীয় স্থানীয় প্রভাবশালী নেতা ও প্রশাসনের একটি অংশ টাকা-পয়সা হাতিয়ে নেয়ার সুযোগ পাবে, যার নজির অতীতে ছিল।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, সরকারি চাকরিতে নিয়োগের সাধারণ নিয়ম হলো, কোনো প্রার্থীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা থাকলে এবং অপরাধে জড়ানোর তথ্য থাকলে তাকে নিয়োগের জন্য অনুপযুক্ত বিবেচনা করা যায়; কিন্তু বাস্তবে যাচাইয়ের নামে প্রার্থী বা তার পরিবারের সদস্য ও আত্মীয়স্বজনের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা খোঁজা হয় এবং তা দেখে নিয়োগের বিষয়ে ইতিবাচক বা নেতিবাচক মন্তব্য করা হয়। কিন্তু এই চর্চাতেও গলদ আছে। কারণ অপরাধের জন্য দণ্ডিত না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো নাগরিক চাকরিতে যোগদানের জন্য যোগ্য বলে বিবেচিত হবেন। কিন্তু দণ্ডিত হওয়ার আগেই তাকে চাকরিতে যোগদান থেকে বিরত রাখা হলে তা সংবিধান প্রদত্ত অধিকারের লঙ্ঘন। আর এটি আওয়ামী লীগ আমলে বেশি চর্চিত, সেটি চব্বিশের জুলাই বিপ্লব পরবর্তী সরকার ধরে রাখা সমীচীন নয়।