ক্লায়েন্টেলিজম আক্রান্ত রাজনীতি


১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:১৯

রাষ্ট্র মেরামতে ভাঙতে হবে এ দুষ্টচক্র

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
‘রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসিলেন’— এই উক্তির নিউ ভার্সন টক অব দ্য মান্থ— ‘শা… উদ্দিনের পুলিশ আসেন সন্ত্রাসীরা চলিয়া যাইবার পর।’ গত সেপ্টেম্বর মাসের শেষ সপ্তাহে রাজধানী ঢাকার বুকে; এমন কি স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের (প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে নিষিদ্ধ ঘোষণায় মাননীয় বর্জন করা হলো!) আসন সেনানিবাস এলাকায় বিশ্বখ্যাত ইউটিউবারের স্টুডিওতে হিন্দি মারদাঙ্গা অ্যাকশন মুভির কায়দায় হামলা এবং বুলডোজার চালিয়ে বিদেশি সাহায্যে পরিচালিত হাসপাতাল, হাউজিং প্রজেক্ট গুঁড়িয়ে দেয়ার ঘটনা দেখার পর জনগণের মুখ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম উচ্চারণ অযোগ্য এমন হাজারো অস্মরণীয় বাণীতে সয়লাব। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকপুত্র অপ্রতিম হত্যা, প্রকাশ্যে রাজপথে দিনে-দুপুরে ছিনতাই, খুন, চাঁদাবাজি, দখলবাজি এবং অপ্রতিরোধ্য কিশোর গ্যাংয়ের তাণ্ডবে অতিষ্ঠ মানুষের প্রশ্ন— ‘দেশে সরকার ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আছে কি?’ ‘কোথায় হারিয়ে গেছে জুলাই চেতনার সৈনিকরা।’ ‘বিরোধীদল কেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ চায় না।’
বিএনপি সরকারকে যারা ক্ষমতায় বসিয়েছেন, তারাও আতঙ্কিত। বিশেষ করে যাদের মনে আছে সন্ত্রাসী ইমদুকাণ্ডের ৪৪ দিন পরের ঘটনা, তারা আরো বেশি আতঙ্কিত। কারণ কী?
ইমদুকাণ্ডের ৪৪ দিন পর বিএনপি সরকারের পতন
১৯৮২ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মিন্টো রোডে তৎকালীন বিএনপি সরকারের যুব প্রতিমন্ত্রী আবুল কাশেমের সরকারি বাসভবন থেকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল কুখ্যাত সন্ত্রাসী ইমদাদুল হক ইমদু (যিনি লোকমুখে ‘ইন্দু’ নামেও পরিচিত)-কে। সন্ত্রাসী ইমদু (ইন্দু) গ্রেপ্তারের ঠিক ৪৪ দিন পর বিচারপতি আব্দুস সাত্তার সরকারের পতন হয়। তৎকালীন সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদ বিএনপি সরকারের শাসনে আইনশৃঙ্খলার চরম অবনতি ও দুর্নীতির অজুহাত তুলে চাপ সৃষ্টি করতে থাকেন। এর ৪৪ দিন পর ১৯৮২ সালের ২৪ মার্চ একটি রক্তপাতহীন সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে এরশাদ ক্ষমতা দখল করেন এবং বিএনপির বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের নেতৃত্বাধীন সরকারের পতন ঘটে। ১৯৮২ সালের চেয়েও দেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং বিএনপির নেতৃত্ব এখন দুর্বল বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। কারণ প্রেসিডেন্ট বিচারপতি আব্দুস সাত্তারের (১৯০৬-১৯৮৫) ছিলো বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। তিনি ছিলেন শীর্ষস্থানীয় রাষ্ট্রনায়ক, আইনবিদ এবং রাজনীতিবিদ। ব্রিটিশ ভারত, পূর্ব পাকিস্তান এবং স্বাধীন বাংলাদেশ— তিনটি ঐতিহাসিক অধ্যায়েই তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক দায়িত্ব পালন করেছেন। ১৯৩৯ সালে তিনি কলকাতা করপোরেশনের কাউন্সিলর নিযুক্ত হন এবং ১৯৪৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানের মুখ্য নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৫৫ সালে তিনি পাকিস্তানের গণপরিষদের সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৫৬ সালে তিনি পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং ১৯৫৭ সালে শিক্ষামন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬৯ সালে পাকিস্তানের প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পান। তার অধীনেই ১৯৭০ সালের পাকিস্তানের সেই ঐতিহাসিক প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। ১৯৭৫ সালে বিচারপতি আবু সাদাত মোহাম্মদ সায়েমের বিশেষ সহকারী হিসেবে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পান। পরবর্তীতে ১৯৭৭ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান তাকে বাংলাদেশের উপরাষ্ট্রপতি নিযুক্ত করেছিলেন। এমন একজন দক্ষ রাজনীতিবিদও ক্লায়েন্টেলিজম আক্রান্ত বিএনপিকে রক্ষা করতে পারেননি। এখন সময় আরো কঠিন, নেতৃত্ব কেমন অভিজ্ঞ, তা কারো অজানা নয়।
সময় আরো কঠিন
সময় আরো কঠিন কারণ তখন গণহত্যার দায়ে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মতো কোনো অপশক্তির এত গভীর ষড়যন্ত্র ছিলো না। তারপরও বিএনপি ক্ষমতা ধরে রাখতে পারেনি। কারণ দুর্নীতি, দলীয়করণ সন্ত্রাসীদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার ঘটনায় জনগণের সমর্থনের পারদ এতটাই নিচে নেমে গিয়েছিলো যে, জনগণ অসাংবিধানিক সরকার ক্ষমতায় দখল করলেও রাস্তায় নামেনি। সেনাপ্রধান লেফটেন্যান্ট জেনারেল এইচ এম এরশাদের ক্ষমতা দখলে সাময়িক স্বস্তি পেয়েছিলো। তেমন স্বস্তিদাতারা এখনো বসে নেই। তারা সুযোগের অপেক্ষায় আছেন।
কিন্তু তাদের ভয় একটাই, তা হলো— নিয়মতান্ত্রিক রাজনীতিতে বিশ্বাসী শক্তিশালী বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এবং এর নেতৃত্বাধীন তরুণ জুলাইযোদ্ধাদের সংগঠন এনসিপিসহ ১১ দলীয় ঐক্য। এ সত্য উপলব্ধি করেই ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি বিএনপি সরকারকে ধরার আগে টার্গেট করেছে— এই দেশপ্রেমিক ফ্যাসিস্টবিরোধী শক্তিকে। মিডিয়া ট্রায়ালের মাধ্যমে জামায়াতে ইসলামী ও ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষনেতাদের চরিত্র হননের জন্য মিলিয়ন মিলিয়ন রুপি খরচ করছে। এই ভ্যানগার্ড না ভেঙে অসাংবিধানিক কোনো অপশক্তি অবৈধভাবে ক্ষমতা দখল করলে জনগণ রাজপথে নেমে প্রতিহত করবে। আবার জুলাইয়ের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টি হবে। এ ভয়ের কারণেই ষড়যন্ত্রকারী অপশক্তি সময় গুনছে।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, জুলাই বিপ্লবের চেতনার আলোকে ক্লায়েন্টেলিজমের রাজনৈতিক রোগ থেকে বের হয়ে আসতে হবে। জন্মের আগে থেকেই বাংলাদেশ এ রোগে আক্রান্ত। এছাড়া ১৯৬০-৭০ দশক থেকে এশিয়া ও আফ্রিকার অনেক দেশ পেছনে হাঁটতে শুরু করে ক্লায়েন্টেলিজমকে প্রশ্রয় দেয়ায়। কিন্তু বাংলাদেশের রাজনীতিবিদদের অনেকেই তা নির্ণয় করতে ব্যর্থ। তাই রোগ নির্ণয় না করেই চলছে চিকিৎসা। বলা হচ্ছে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ওষুধ দিবো কোথা’। ব্যথার কারণ নির্ণয় না করে ওষুধ সেবন করলে যেমন হার্ট ও কিডনি নষ্ট হয়ে রোগীর মৃত্যু হয়। এদেশের অবস্থাও তাই। সমাজবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী নামের ডাক্তারও রোগীর ইচ্ছেমতো ওষুধ লিখে দিচ্ছেন, তারা রোগ নির্ণয় করার প্রয়োজন অনুভব করছেন না। কারণ তারা ও রাজনীতিবিদ উভয়ই আক্রান্ত। সুচিকিৎসার দায়িত্ব পালনকারী সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের বড় অংশও মুক্ত নন। তাই তারাও রোগ নির্ণয় করার প্রয়োজন অনুভব করছেন না। এ প্রতিবেদনের পরিধি দীর্ঘ হওয়ার আশঙ্কায় কে কীভাবে এ দায়িত্ব পালন করবেন, সেদিকে আলোকপাত করা হলো না।
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন ও জুলাই সনদের আলোকে চিকিৎসা চললে আস্তে আস্তে স্থিতিশীলতা আসার সম্ভাবনা আছে। দেশের রাজনীতি ক্লায়েন্টেলিজমমুক্ত হবে। জনগণের কল্যাণের রাজনীতি ন্যায়-ইনসাফের রাজনীতি, যাকে রাষ্ট্রবিজ্ঞানীরা জনকল্যাণবাদ বলেন, তা ফিরে আসবে। ন্যায় ও ইনসাফের স্বপ্নের বাংলাদেশ গড়া সম্ভব হবে। জনগণের কল্যাণের রাজনীতির ব্যাখ্যা প্রয়োজন নেই। কিন্তু ক্লায়েন্টেলিজম (মক্কেলতন্ত্র) সম্পর্কে একটু আলোপাত করা দরকার। কারণ তবেই পরিষ্কার হবে রাজনীতি বিশ্লেষকরা কেন মনে করেছেন দেশের রাজনীতি এ রোগে আক্রান্ত এবং এর নিরাময় ছাড়া খুন, গুম, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দখলবাজি, স্বজনপ্রীতি, ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হবে না।
ক্লায়েন্টেলিজম কী
ক্লায়েন্টেলিজম হলো প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতি। সহজ বাংলায় বলা যায়, পৃষ্ঠপোষকতামূলক রাজনীতি। মানে, তুমি আমাকে ক্ষমতায় বসাবে, আমি আমার ক্ষমতার বলে তোমাকে তোমার চাহিদামতো সুবিধা দেবো। ধারণাটির মূল ভিত্তি প্রাচীন রোমান সাম্রাজ্যে গড়ে উঠেছে বলে ইতিহাসবিদরা মনে করেন। তবে আধুনিক রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও নৃবিজ্ঞানের প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনায় এটি ১৯৬০ ও ১৯৭০-এর দশকে প্রথম ব্যাপকভাবে ব্যবহার শুরু হয়।
নৃবিজ্ঞানী ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী জেমস সি. স্কট (James C. Scott) ১৯৭২ সালে তাঁর বিখ্যাত গবেষণাপত্র ‘Patron-Client Politics and Political Change in Southeast Asia’-এ দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার রাজনীতি বিশ্লেষণের মাধ্যমে ক্লায়েন্টেলিজম বা প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট ব্যাপকভাবে পরিচিত করান। রাষ্ট্রবিজ্ঞানে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার ক্ষেত্রে তাকে অন্যতম প্রধান পথপ্রদর্শক মনে করা হয়। তার গবেষণায় উল্লেখিত এমন রাজনীতির ৫টি বৈশিষ্ট্য হলো— ‘১. পারস্পরিক অসম আদান-প্রদান (Reciprocity and Inequality) : এই রাজনৈতিক কাঠামোর মূলে থাকে সমাজ বা রাজনীতির একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি, পৃষ্ঠপোষক (Patron) এবং তার চেয়ে আর্থসামাজিকভাবে দুর্বল অনুগামী, ক্লাইন্ট বা মক্কেল (Client)। পেট্রন তার ক্ষমতা ও সম্পদের জোরে ক্লাইন্টকে নিরাপত্তা, চাকরি, আইনি বা আর্থিক সুবিধা দেন। এর বিনিময়ে ক্লাইন্ট তার পেট্রনকে রাজনৈতিক আনুগত্য, মিছিলে অংশগ্রহণ এবং ভোটের নিশ্চয়তা দেয়। ২. ব্যক্তিগত ও মুখোমুখি যোগাযোগ (Face-to-Face and Personal Ties) : এই অঞ্চলের রাজনীতি কোনো মতাদর্শ বা প্রাতিষ্ঠানিক নিয়মের চেয়ে ব্যক্তিগত সম্পর্কের ওপর বেশি নির্ভর করে গড়ে ওঠে। গ্রামীণ বা স্থানীয় সমাজব্যবস্থায় এই যোগাযোগগুলো অত্যন্ত নিবিড় এবং প্রায়ই এটি আত্মীয়তার সম্পর্কের মতো কাজ করে। ৩. প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতা ও ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা (Weak Institutions) : এসব সমাজে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো (যেমন— পুলিশ, প্রশাসন বা বিচার বিভাগ) নিরপেক্ষভাবে কাজ করতে পারে না। সাধারণ মানুষ নিজেদের অধিকার আদায়ের জন্য আইনের চেয়ে একজন শক্তিশালী ‘তদবিরকারী’ বা রাজনৈতিক নেতার ওপর বেশি ভরসা করে। ৪. দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা (Role of Brokers) : রাজনীতিতে মূল প্যাট্রন এবং তৃণমূলের ক্লায়েন্টদের সংযোগ ঘটাতে একদল মধ্যস্থতাকারী বা ‘ব্রোকার’ (যেমন— স্থানীয় টাউট, ছাত্রনেতা বা প্রভাবশালী মাতব্বর) তৈরি হয়। তারা ওপর মহল থেকে সুযোগ-সুবিধা এনে নিচে বণ্টন করে এবং নিজেদের অবস্থান শক্ত করে। ৫. উপনিবেশবাদ ও সামাজিক পরিবর্তন (Impact of Colonization and Modernization) : আধুনিকায়ন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের ফলে ঐতিহ্যবাহী এই প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট বন্ধন অনেক সময় ভেঙে যায় বা বাণিজ্যিক রূপ নেয়। তখন এটি কেবলই ভোটের কেনাবেচা এবং বৈষয়িক স্বার্থের রাজনীতিতে (Clientelism) রূপান্তর লাভ করে।’
এ প্রক্রিয়ায় ক্ষমতাসীন দল খুনি, সন্ত্রাসী, দখলবাজ, দুর্নীতিবাজ, ঘুষখোর, মাদক কারবারি, নারী-শিশু পাচারকারীদের মধুচক্র ও নিরাপদ ছাতায় পরিণত হয়। দেশটা আর জনগণের থাকে না। দেশটা চলে যায় রাজনীতির বেপারিদের হাতে। তারা জনগণকে তাদের অনুগত দাস এবং দেশটাকে বাপের তালুক মনে করে নিজেদের স্বার্থে রাষ্ট্র ও সরকারকে ব্যবহার করে রাষ্ট্রকে পরিণত করেন নিপীড়নের হাতিয়ারে। সমাজবিজ্ঞানীরা মনে করেন, দেশে চলমান নৈরাজ্য দূর করতে হলে সবার আগে ক্লায়েন্টেলিজম অর্থাৎ প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতিকে ঝেঁটিয়ে বিদায় করতে হবে।
সমাধান কোন পথে
রাজনীতিবিদদের প্যাট্রন-ক্লায়েন্ট রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। কিন্তু তারা তো আক্রান্ত। আক্রান্ত রোগী তো রোগের চিকিৎসা করতে পারেন না। তাই চিকিৎসকদের এগিয়ে আসতে হবে। সমাজবিজ্ঞানী, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা দলান্ধ না হয়ে রাজনৈতিক নেতা; বিশেষ করে ক্ষমতাসীনদের চোখ খুলে দিতে হবে। তবেই রোগমুক্তি সম্ভব। তারা সাহসী না হলে রোগী ৪৪ দিন পর ইন্তেকাল না করলেও, সন্দেহ নেই চিররোগা হয়েই থাকবে। যার শেষ পরিণতি হবে খুবই করুণ। তাই এ ব্যবস্থা ভাঙাতেই হবে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী অধ্যাপক ড. রওনক জাহান মনে করেন, ‘এই ব্যবস্থা ভাঙতে হলে মেধাভিত্তিক ও জবাবদিহিমূলক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা জরুরি। দলীয় অনুগত্যের ভিত্তিতে সুযোগ-সুবিধা বণ্টন বন্ধ করে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে, যেন নাগরিকরা অধিকার হিসেবে তাদের প্রাপ্য পায়, কোনো নেতার দাক্ষিণ্য হিসেবে নয়।’
রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, অপরাধীদের রাজনৈতিক প্রশ্রয় ও দায়মুক্তি বন্ধ করতে হবে। পুলিশ বাহিনীকে রাজনৈতিক প্রভাব মুক্ত করতে হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন ও নির্বাচন কমিশনকে স্বাধীন এবং ভোটারদের সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। ভোটাররা যেন তাৎক্ষণিক সুবিধার বদলে দীর্ঘমেয়াদি নীতিকে প্রাধান্য দেওয়ার মানসিক শক্তি অর্জন করতে পারেন; রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে তেমন কর্মসূচি নিতে হবে। সরকারি চাকরিজীবীরা রাষ্ট্রের নাগরিকদের কর্মচারী কোনো দল বা সরকারের দাস নয়— এই সত্য নিশ্চিত করতে হবে। ক্ষমতার ভারসাম্য, বিচার বিভাগ ও মিডিয়ার স্বাধীনতায় আপস করা চলবে না। সরকারি দল সংখ্যাগরিষ্ঠতার জোরে বিরোধীদলের কণ্ঠরোধ করতে পারে সংবিধানের এমন ফ্যাসিবাদী ধারাগুলোর সংশোধন করতে হবে। সরকারের মতো শক্তিশালী ব্যবস্থার অন্যায়-অনিয়মের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সব কালো আইন বাতিল করতে হবে। তবেই দুর্বৃত্তয়ানমুক্ত হবে রাজনীতি। সত্যিকার অর্থে রাষ্ট্র হবে জনগণের। মাফিয়ারা ভয়ে মুখ লুকাবে। পূরণ হবে ন্যায় ও ইনসাফের বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন।