অর্থনীতিতে ভুল পথে সরকার
১ অক্টোবর ২০২৬ ১০:০৯
নীতি ব্যর্থতায় বাড়ছে সরকারের ঋণ
॥ উসমান ফারুক ॥
রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় থাকলেও গত সাত মাসে অর্থনীতির পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি সরকার। শুধু জ্বালানি তেলের দাম বাড়ালেও ব্যবসায়ী সিন্ডিকেট দেড় হাজার টাকার গ্যাস সিলিন্ডার এখন বিক্রি করছে দুই হাজার ২০০ টাকায়। বাস ভাড়া বেড়েছে যা, তার চেয়ে তিন থেকে চারগুণ পর্যন্ত দিতে হচ্ছে যাত্রীদের। রান্নাঘরের চুলায় এখনো গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে না। এতে বাড়ছে হোটেল থেকে আনা খাবার খরচ। অন্যদিকে যারা হোটেল থেকে আনতে পারছে না, তারা সস্তার ভাজাপোড়া খেয়ে দিন পার করছে। সারা দেশের সঙ্গে খোদ রাজধানীতেও চলছে বিদ্যুতের লোডশেডিং। ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোর গবেষণায় বেরিয়ে এসেছে, শিল্পের পাশাপাশি সেবা খাতেও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের চাকার গতি কমছে। পর্যাপ্ত রিজার্ভ থাকার পরও ডলারের বিপরীতে টাকার মান কমছেই। এটি প্রমাণ করে অর্থনীতির ব্যবস্থাপনা ও নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ভুল পথে হাঁটছে সরকার। ভুল নীতির কারণেই সরকারি ঋণের পরিমাণ বেড়ে যাচ্ছে টাকার সংকটে। ভুলের জন্যই গত দুই বছর পর সেবা খাতের সূচক কমেছে। ব্যাংকিং খাতও ধুঁকছে তারল্য সংকট। তিন সরকারি ব্যাংক চলছে ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছাড়া। অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের সংকটের এখনো কোনো সমাধান করতে পারেনি সরকার। প্রায় দুই মাস হতে চললেও সরকার মাসভিত্তিক রাজস্ব আদায়ের তথ্য প্রকাশ করতে পারেনি। এর কোনো ব্যাখ্যাও সরকার দেয়নি এখনো। আমদানি খরচ বাড়লেও রপ্তানি সেভাবে বাড়ছে না। বাণিজ্য ঘাটতি আরো বেড়েছে। এভাবে সাত মাস বয়স পেরিয়ে গেলেও আর্থিক খাতের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারেনি এখনো সরকার। ভুলে ভরা সিদ্ধান্তে ক্রমেই বেসামাল হয়ে উঠছে ১৮ কোটি মানুষের অর্থনীতির বাজার।
বিশ্লেষকরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তথ্য সরকার নিয়ন্ত্রণ করতে পারলেও আন্তর্জাতিক কোনো বিষয় চেপে রাখা যায় না। বাণিজ্য ঘাটতি বেড়ে যাওয়া, রপ্তানি কমে যাওয়া ও শিল্পের উৎপাদন কমে যাওয়া প্রমাণ করে অর্থনীতি এখনো চালানো হচ্ছে ভুল নীতিতে। এক লাফে প্রতি লিটারে ২০ টাকা তেলের দাম বাড়ানো অর্থনীতিকে মূল্যস্ফীতির চরম ঝুঁকিতে ফেলে দিয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকও বলছে, চলতি অর্থবছরের মধ্যে মূল্যস্ফীতি সাড়ে ৭ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্যমাত্রা সরকারের নেওয়া জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানোয় সম্ভব হবে না।
সরকারকে আরো বাস্তবমুখী, উদার ও সততার সঙ্গে নীতিনির্ধারণের পরামর্শ দিয়ে তারা বলছেন, দেশজ ও জাতীয় উভয় ধরনের সঞ্চয়ের পরিমাণ সামান্য বেড়েছে। তবে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সরকারি দাবির সঙ্গে সেই অনুপাতে দেশজ ও জাতীয় সঞ্চয়ের হার বাড়েনি, উল্টো ধারাবাহিকভাবে কমেছে। সার্বিকভাবে সঞ্চয় বাড়েনি। মানুষ সঞ্চয় ভেঙে খাচ্ছে। প্রতি মাসেই কমছে সঞ্চয়পত্রে বিনিয়োগের পরিমাণ। অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড কমে যাওয়ার সঙ্গে কর্মসংস্থানও বাড়ছে না। উল্টো কর্মসংস্থানের পুরোনো চিত্র আরো সংকুচিত হচ্ছে ধীরে ধীরে। শিক্ষিত বেকারের মিছিল দেখছে বাংলাদেশ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ প্রকাশিত ‘জাতীয় হিসাব পরিসংখ্যান’ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদনের তথ্যানুযায়ী, জাতীয় সঞ্চয়ের পাশাপাশি জিডিপিতে বিনিয়োগের হারও ধারাবাহিকভাবে কমেছে। তার বিপরীতে বেড়েছে ভোগ ব্যয়। এভাবে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক পরিসংখ্যান ও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা তার ভুল প্রমাণ করেছে। গত সাত মাসে বাংলাদেশের অর্থনীতি এক অদ্ভুত দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে পার হয়েছে। একদিকে সরকার সামষ্টিক স্থিতিশীলতা আনার চেষ্টার কথা বলছে, অন্যদিকে বাজারে দ্রব্যমূল্য, ডলারের চাহিদা এবং বিনিয়োগের অভাবে চলমান অস্থিরতা বেড়েই চলছে সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে।
অর্থনীতির এই দায় ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের লুটপাটের ফল। গত অন্তর্বর্তী সরকার অর্থনীতির দীর্ঘমেয়াদি সেই ক্ষত একটু একটু সারতে শুরু করলেও বিএনপি সরকার তার ধারাবাহিকতা রক্ষা করেনি। তাতেই অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ এখনো সরকারের হাতে যায়নি। উল্টো জ্বালানি তেলসহ রপ্তানিও গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় সরকারের ভুল নীতির খেসারত দিতে হচ্ছে দেশের বিশালসংখ্যক জনগোষ্ঠীকে।
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, গত ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে জাতীয় সঞ্চয়ের হার ছিল ২৯ দশমিক ৯৫ শতাংশ। আর সর্বশেষ ২০২৫-২৬ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবে সেই হার কমে নেমে এসেছে ২৬ দশমিক ৯৩ শতাংশে। অর্থাৎ তিন অর্থবছরের ব্যবধানে জাতীয় সঞ্চয় প্রায় ৩ শতাংশীয় পয়েন্ট কমে গেছে। অন্যদিকে ২০২২-২৩ অর্থবছরে জিডিপির অনুপাতে দেশজ সঞ্চয়ের হার ছিল ২৫ দশমিক ৭৬ শতাংশ, যা ২০২৫-২৬ অর্থবছরে কমে ২১ দশমিক ৩৮ শতাংশে নেমেছে। সেই হিসাবে তিন বছরের ব্যবধানে দেশজ সঞ্চয় কমেছে ৪ দশমিক ৩৮ শতাংশীয় পয়েন্ট।
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের চাপ বেড়েছে। ফলে আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে বলে মনে করেন বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, জিডিপির তুলনায় সঞ্চয়ের হার কমে যাওয়ার মানে হলো বিনিয়োগের জন্য মূলধনও কমে যাওয়া। আর বিনিয়োগ কম হলে তার প্রভাব পড়ে কর্মসংস্থান ও মানুষের আয়ে। আবার জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে তাতে বৈদেশিক বা অভ্যন্তরীণ ঋণের ওপর নির্ভরতা বেড়ে যেতে পারে। এ কারণে অর্থনীতির টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য জিডিপির বিপরীতে সঞ্চয় ও বিনিয়োগের একটি তুলনামূলক উচ্চহার রক্ষা করা আবশ্যক। এটি সামনে অর্থনীতির জন্য আরো বড় একটি চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াতে যাচ্ছে।
মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার মূল্যবৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচের চাপ বেড়েছে। ফলে আয় এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য রাখতে গিয়ে ভোক্তাদের সঞ্চয়ের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থা রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) চেয়ারম্যান এম এ রাজ্জাক বলেন, জাতীয় সঞ্চয়ের হার কমার অন্যতম প্রধান কারণ দীর্ঘমেয়াদে বিদ্যমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি। মূল্যস্ফীতির কারণে মানুষের আয়ের বড় অংশই ভোগে (পণ্য ও সেবার পেছনে ব্যয়) ব্যয় হয়ে যাচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রার খরচ মিটিয়ে সঞ্চয়ের সক্ষমতা কমে গেছে।
নেতিবাচক প্রভাব বিনিয়োগে
বিবিএসের তথ্যানুযায়ী, ছয় বছর আগে জিডিপিতে মোট বিনিয়োগের হার ছিল ৩১ শতাংশের ওপরে। বর্তমানে তা কমে ২৮ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ সময় বেসরকারি ও সরকারি বিনিয়োগ উভয়ই কমেছে। এম এ রাজ্জাক বলেন, জাতীয় সঞ্চয় কমে গেলে তা বিনিয়োগ কমিয়ে দেয়। কারণ সঞ্চয় কমে যাওয়ার ফলে ব্যাংক ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানের তহবিল কমে আসে। এটি দেশের সার্বিক বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণকে বাধাগ্রস্ত করে।
বিদ্যমান সংকট কাটিয়ে অর্থনীতিতে ইতিবাচক ধারা ফেরাতে উৎপাদনশীলতা বাড়ানো, আন্তর্জাতিক বা বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) আকর্ষণ করা, রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানগুলোর লোকসান কমিয়ে আনার পরামর্শ দিয়েছেন সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান। তিনি বলেন, এর সঙ্গে সরকারি পর্যায়ে অপ্রয়োজনীয় খরচ কমিয়ে আর্থিক খাতের প্রতি জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করতে হবে।
সরকারি পরিসংখ্যানের খেলাও ঢেকে রাখতে পারছে না মূল্যস্ফীতি
মূল্যস্ফীতি হলো অর্থনীতির থার্মোমিটার বা জনগণের আর্থিক অবস্থার প্রকৃত চিত্র। এটা বুঝিয়ে দেয় দেশের জনগণ কোন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। গত সাত মাসে সরকার দাবি করেছে যে, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসছে। কিন্তু পরিসংখ্যান ও বাজার দরের মধ্যে যে ফারাক, তা সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতাকে ধ্বংস করছে। ২০২৪ সালের মাঝামাঝি সময়ে দেশে গড় মূল্যস্ফীতি ছিল ১০-১১ শতাংশের ঘরে। খাদ্য মূল্যস্ফীতি ছিল সাড়ে ১০ শতাংশের ওপরে। তখন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য পেঁয়াজ, রসুন, ভোজ্যতেল এবং মধ্যবিত্তের পুষ্টির প্রধান উৎস ডিমের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের নানা উদ্যোগে ডিমের হালি ৪০ টাকায় থাকলেও এখন তা ৫২-৫৫ টাকায় উঠেছে।
বাংলাদেশ ব্যুরো অব স্ট্যাটিস্টিকসের (বিবিএস) তথ্যানুযায়ী, ২০২৬ সালের আগস্ট-সেপ্টেম্বর নাগাদ গড় মূল্যস্ফীতি কিছুটা কমে ৮ দশমিক ৮০ থেকে ৯ দশমিক ২০ শতাংশের ঘরে নেমে এসেছে। কিন্তু খাদ্য মূল্যস্ফীতি এখনো সাড়ে ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থান করছে। কাগজে-কলমে মূল্যস্ফীতি ১-২ শতাংশ কমলেও বাজারের চিত্র বলছে আলাদা চিত্র। সরকারি তথ্য ও উদ্যোগে বাজারে তার প্রভাব পড়েনি। এর প্রধান কারণ হলো সিন্ডিকেট প্রভাব এবং আমদানিকৃত মূল্যস্ফীতি।
গত সাত মাসে নিত্যপণ্যের দাম কমেনি, বরং পাইকারি বাজার থেকে খুচরা বাজারে আসতে আসতে দাম ২০-৩০ শতাংশ বেড়েছে। সরকারিভাবে ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের (টিসিবি) মাধ্যমে ভর্তর্ুুকি মূল্যে পণ্য বিক্রি করা হলেও, তা বাজারের মোট চাহিদার ৫-৭ শতাংশের বেশি মেটাতে পারছে না। ফলে সরকারি নির্দেশনা বাজারের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারছে না। মধ্যবিত্তের ক্রয়ক্ষমতা গত সাত মাসে আরও ১৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে, যা প্রমাণ করে যে মূল্যস্ফীতি সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই।
আমদানি, রপ্তানি ও ডলার সংকটের সমীকরণ মিলছে না
একটি দেশের অর্থনীতির মেরুদণ্ড হলো তার বৈদেশিক বাণিজ্য ও রিজার্ভ। গত সাত মাসে এই খাতে সরকারের নিয়ন্ত্রণের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা চোখে পড়ে। আগের অবস্থা: ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরে রপ্তানি আয় কিছুটা হলেও প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছিল; বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতে। ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে সেপ্টেম্বর (চলতি অর্থবছরের প্রথম তিন মাস) পর্যন্ত রপ্তানি আয়ের প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.৫ থেকে ৩.৫ শতাংশের মধ্যে রয়েছে। বিশ্ববাজারে তৈরি পোশাকের চাহিদা সামান্য কমে গেলেও অন্যান্য দেশের তুলনায় বাংলাদেশের রপ্তানি কমেছে সবচেয়ে বেশি।
সরকার রপ্তানি বান্ধব নীতিমালার কথা বললেও, ব্যাংকিং খাতে এলসি খোলার জটিলতা এবং ডলার সংকট রপ্তানিকারকদের পিঠ দেয়ালে ঠেকিয়ে দিয়েছে। আমদানি দায় বেড়ে যাওয়ায় ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রতিনিয়তই কমছে। রেমিট্যান্স ও রিজার্ভ স্বস্তিতে থাকলেও রপ্তানি না বাড়লে রিজার্ভ ধরে রাখা কঠিন হয়ে দাঁড়াবে। আমদানি বিল পরিশোধের জন্য দেশের হাতে বর্তমানে মাত্র ৩ মাসের কিছু বেশি সময়ের রিজার্ভ রয়েছে। সরকারিভাবে ডলারের দাম ১২০-১২২ টাকার মধ্যে রাখা হলেও, খোলাবাজারে ডলারের দাম ১২৮-১৩০ টাকা। এই দ্বৈত বিনিময় হার প্রমাণ করে যে, বৈদেশিক মুদ্রার বাজার ও বিনিময় হার সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই। প্রবাসী আয় মাসে ২ দশমিক ২ থেকে ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের ঘরে থাকলেও, তার একটি বড় অংশ চলে যাচ্ছে আমদানিকৃত জ্বালানি ও শিল্পের কাঁচামাল পরিশোধে।
গত সাত মাসে মার্কিন ডলারের বিপরীতে টাকার মান প্রায় ৪-৫ শতাংশ অবমূল্যায়ন হয়েছে। সরকারিভাবে স্লো-ক্রলিং পেগ পদ্ধতিতে টাকার মান সমন্বয় করা হলেও, বাজারে ডলারের চাহিদা মেটাতে ব্যাংকগুলো হিমশিম খাচ্ছে। ফলে আমদানিকারকরা বাধ্য হয়ে হচ্ছেন খোলাবাজার থেকে ডলার কিনতে, যা পণ্যের দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঋণ নিচ্ছেন না ব্যবসায়ীরা
বাংলাদেশ ব্যাংক নীতি সুদহার ১০ শতাংশের আশপাশে স্থির রেখেছে মুদ্রাস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের জন্য। কিন্তু ব্যাংকগুলো আমানতের ওপর সুদ দিচ্ছে ৯-১০ শতাংশ এবং ঋণের ওপর সুদ নিচ্ছে ১৩-১৫ শতাংশ। আগের সময়ে যেখানে ব্যাংকগুলো ঋণ বিতরণে আগ্রহী ছিল, গত সাত মাসে ব্যাংকিং খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি মাত্র ৬-৭ শতাংশে নেমে এসেছে। এর কারণ হলো ব্যাংকগুলোর নিজস্ব তারল্য সংকট এবং খেলাপি ঋণের বোঝা। সরকার চাইলেই যে ব্যাংকিং খাতকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না, তার প্রমাণ হলো তা সাত মাসে বেশ কয়েকটি বেসরকারি ব্যাংকে রিজার্ভ সংকট দেখা দেওয়া, যা সাধারণ আমানতকারীদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি করেছে। সর্বশেষ গত আগস্ট মাসে বেসরকারি খাতের ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি হয় ৪ দশমিক ৭৫ শতাংশ।
অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে শ্রমিক ও কর্মচারীদের ক্রয়ক্ষমতা থাকা জরুরি। কিন্তু গত সাত মাসে মজুরি ও কর্মসংস্থানের চিত্র অত্যন্ত নাজুক। তৈরি পোশাক শ্রমিকদের সর্বনিম্ন মজুরি ১২ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল কিছুদিন আগে। কিন্তু ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর নাগাদ মূল্যস্ফীতির কারণে এই ১২ হাজার ৫০০ টাকার ক্রয়ক্ষমতা ২০২৩ সালের ৮ হাজার টাকার সমতুল্যে নেমে এসেছে। অন্যদিকে সরকারি ও বেসরকারি খাতের মধ্যবিত্ত চাকরিজীবীদের বেতন গত সাত মাসে একই স্থানে থাকলেও, তাদের আয়করের চাপ এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণ। সরকারি কর্মচারীদের বেতন দ্বিগুণ করলেও বেসরকারি খাতে মজুরি বাড়ানোর সুযোগ দেখা যাচ্ছে না অর্থনীতিতে।
তথ্য বলছে, দেশে তৈরি পোশাক খাত ছাড়া অন্য কোনো খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। গত সাত মাসে আইটি, ব্যাংকিং এবং করপোরেট খাতে নতুন নিয়োগ প্রায় শূন্যের কোটায়। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো মেধা পাচার। ২০২৬ সালের মার্চ থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত উচ্চশিক্ষা এবং উন্নত জীবনের আশায় দেশ ছেড়েছে রেকর্ডসংখ্যক তরুণ ও দক্ষ জনশক্তি। সরকার কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বললেও, বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ না থাকায় দেশীয় উদ্যোক্তারাও নতুন কারখানা বা প্রতিষ্ঠান খুলছেন না। ফলে বেকারত্বের হার; বিশেষ করে যুবসমাজের মধ্যে, ১০-১২ শতাংশের ঘরে স্থিতিশীল থাকছে, যা সরকারি নিয়ন্ত্রণের বাইরে একটি সামাজিক ও অর্থনৈতিক বোমা।
দুর্নীতি : রূপ বদলেছে, কিন্তু নিয়ন্ত্রণে আসেনি
অর্থনীতির সুস্থতার জন্য সুশাসন ও দুর্নীতি দমন অপরিহার্য। গত সাত মাসে দুর্নীতির চিত্র নিয়ে সরকারি দাবি এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বিশাল ফারাক। সরকার দাবি করছে যে দুর্নীতির বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি নেওয়া হয়েছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং বিশেষ ট্রাইব্যুনাল বেশ কয়েকটি বড় মামলা দায়ের করেছে। কিছু নিম্ন ও মধ্যম পর্যায়ের দুর্নীতিবাজ ধরা পড়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো— দুর্নীতি কি আদৌ কমেছে? উত্তর হলো না। দুর্নীতির রূপ কেবল বদলেছে। একইভাবে গত সাত মাসে ব্যাংকিং খাতে বড় অঙ্কের ঋণ খেলাপি হওয়ার ঘটনা কমেনি। বরং রাজনৈতিক প্রভাবশালী কিছু মহল ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে তা বিদেশে পাচার করছে বা আবাসন খাতে বিনিয়োগ করছে। এই উচ্চপর্যায়ের দুর্নীতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। এখনো সরকার এ বিষয়ে কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি। অন্যদিকে কাস্টমস বন্ড, আমদানি শুল্ক ফাঁকি এবং ভুয়া রপ্তানি প্রণোদনা নেওয়ার ঘটনা গত সাত মাসে বেড়েছে। এটি একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে হয়, যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস বা সক্ষমতা প্রশাসনের নেই। রাজধানী ঢাকা এবং অন্যান্য মহানগরে জমি দখল, নদী দখল এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই বড় বড় প্রকল্প অনুমোদনের ঘটনা প্রমাণ করে যে, প্রভাবশালী মহল আইনকে তোয়াক্কা করছে না।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের (টিআইবি) সাম্প্রতিক জরিপেও দেখা গেছে, সেবাগ্রহীতাদের একটি বড় অংশ এখনো সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দিতে বাধ্য হচ্ছে। অর্থাৎ দুর্নীতি নির্মূল হয়নি, বরং এটি এখন আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়ে রেগুলেটরি ক্যাপচার নিয়ন্ত্রক সংস্থাকে নিজেদের কব্জায় নিয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সাধারণ মানুষ যখন রান্নাঘরের বাজেট মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে, তখন নীতিনির্ধারকদের উচিত পরিসংখ্যানের মোহ ত্যাগ করে বাস্তবমুখী পদক্ষেপ নেওয়া।
সাংবাদিক, বিশ্লেষক ও অর্থনীতিবিদরা বলছেন, অর্থনীতির বিভিন্ন খাতের পরিসংখ্যান ও বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে একটি বিষয় স্পষ্ট হয় যে, বাংলাদেশের অর্থনীতি সরকারের একক নিয়ন্ত্রণে নেই। সরকার কেবল একটি খেলোয়াড়। রেফারি বা পুরো মাঠের মালিক হিসেবে এখনো নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি। বাজারের অদৃশ্য হাত ও সিন্ডিকেট, নিত্যপণ্যের বাজার, ডলারের খোলাবাজার এবং ব্যাংকিং খাতের তারল্য সংকটের মতো বিষয়গুলো এখনো কিছু শক্তিশালী চক্রের নিয়ন্ত্রণে। সরকারি নির্দেশনা এই চক্রগুলোর কাছে অকার্যকর প্রমাণিত হচ্ছে। সরকার শুধু নীরব দর্শক হয়ে রয়েছে।
২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে দাঁড়িয়ে আমরা দেখছি, বাংলাদেশের অর্থনীতি এক কঠিন সমীকরণের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছে। সরকারের পক্ষ থেকে স্থিতিশীলতার যে চিত্র তুলে ধরা হচ্ছে, কিছু বানানো তথ্যর ওপর ভিত্তি করে, যা ফ্যাসিস্ট সরকারের মত আচরণ। কিন্তু সাধারণ মানুষের রান্নাঘর, শ্রমিকের বেতন, উদ্যোক্তার বিনিয়োগ এবং ব্যাংকের ভল্ট— এসব জায়গায় যে বাস্তবতা, তা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
চলতি অর্থবছরের শুরুর দুই মাসেই বাজেট ঘাটতি ও নতুন বেতন স্কেলের অর্থ জোগাতে সরকার ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে রেকর্ড ১৬ হাজার ৬০১ কোটি টাকা ঋণ নিয়েছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলেও বাজার সিন্ডিকেট, এনবিআরের প্রশাসনিক অদক্ষতা এবং কর ফাঁকির মতো কাঠামোগত দুর্বলতাগুলোর কারণে দুর্নীতির প্রভাব অর্থনৈতিক সূচকগুলো থেকে দূর করা সম্ভব হয়নি।
অর্থনীতি কোনো যন্ত্র নয়, যাকে সুইচ টিপে নিয়ন্ত্রণ করা যাবে। এটি একটি জীবন্ত সত্তা, যা মানুষের আস্থা, বাজারের চাহিদা এবং বিশ্বের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে। সরকারকে বুঝতে হবে যে, কঠোর প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণের চেয়ে সুশাসন, স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, সততা ও বাজারের প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনাই হলো অর্থনীতিকে সঠিক পথে আনার একমাত্র উপায়। অন্যথায় পরিসংখ্যানের গ্রাফ নিচে নামলেও সাধারণ মানুষের কষ্টের গ্রাফ ওপরের দিকেই উঠতে থাকবে। আর তখন অর্থনীতির পুরোটা যে সরকারের নিয়ন্ত্রণে নেই, তা আর লুকিয়ে রাখা যাবে না আওয়ামী লীগ সরকারের মতো।