ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ

হরমুজ ঘিরে অচলাবস্থা, তবু চলছে সমঝোতার চেষ্টা


১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৩৭

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল কর্তৃক ইরানের ওপর চাপিয়ে দেওয়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধের সমাধান কীভাবে হবে, তা কেউই নিশ্চিত নন। তবে উভয়পক্ষের মিত্ররা কূটনৈতিক প্রচেষ্টা ঠিকই অব্যাহত রেখেছেন, যাবে সমঝোতার পথ বের হয়। গত কয়েকদিনে পরিস্থিতির উত্তেজনা বেড়েছে। অন্যদিকে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে আলোচনাও নতুন করে গতিও পেয়েছে। মূল বিরোধের কেন্দ্রে রয়েছে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি, যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ও অবরোধ এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ হরমুজ প্রণালী পুনরায় স্বাভাবিক করা। তবে এখনো কোনো চূড়ান্ত যুদ্ধবিরতি বা সমঝোতায় পৌঁছানো যায়নি।
ইরানের সাত দিনের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান : গত ২৬ সেপ্টেম্বর শনিবার ইরান যুক্তরাষ্ট্রের কাছে সাত দিনের একটি প্রস্তাব দেয়। এতে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ হলে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং এরপর বিস্তৃত যুদ্ধবিরতি ও সমঝোতার আলোচনা শুরুর কথা বলা হয়। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি জানান, কাতারের মধ্যস্থতায় প্রস্তাবটি যুক্তরাষ্ট্রের কাছে পৌঁছানো হয়েছে। প্রস্তাবের সঙ্গে হরমুজ পুনরায় চালু করা, আঞ্চলিক সংঘাত থামানো এবং পরবর্তী পর্যায়ে পারমাণবিক কর্মসূচিসহ অন্যান্য বিষয়ে আলোচনার পথ খোলার বিষয়টি যুক্ত ছিল। তবে একই দিন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেন। তিনি বলেন, ইরানের প্রস্তাব গ্রহণযোগ্য নয়। ফলে ওই সময় সরাসরি সমঝোতার সম্ভাবনা আবারও অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
আলোচনার দরজা আবার খোলার ইঙ্গিত
প্রস্তাব প্রত্যাখ্যানের পরও গত ২৭ সেপ্টেম্বর রোববার ট্রাম্প জানান, চলতি সপ্তাহেই ইরানের সঙ্গে আবার আলোচনা হতে পারে। কাতারসহ আঞ্চলিক মধ্যস্থতাকারীরা দুই পক্ষের মধ্যে যোগাযোগ অব্যাহত রাখে। ইরানের পক্ষ থেকেও জানানো হয়, কূটনৈতিক সমাধানের পথ বন্ধ হয়নি। অর্থাৎ প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান হলেও পরোক্ষ যোগাযোগ পুরোপুরি থেমে যায়নি।
মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে নতুন আলোচনা
গত ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা সরাসরি বৈঠকের পরিবর্তে আলাদাভাবে মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে আলোচনা করেন। রয়টর্স জানায়, নতুন উদ্যোগে ইরানের আগের সাত দিনের প্রস্তাব সংশোধিত আকারে আলোচনার ভিত্তি হতে পারে। কাতার এক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করছে। একই সময়ে এপি জানায়, সম্ভাব্য সমঝোতার কাঠামোয় প্রথম পর্যায়ে হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধ শিথিল করার বিষয় থাকতে পারে। এর বিনিময়ে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে বাস্তব পদক্ষেপ; বিশেষ করে আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের সুযোগ দেওয়ার মতো শর্ত নিয়ে আলোচনা চলছে। তবে দুই পক্ষের মধ্যে কে আগে কী পদক্ষেপ নেবে এবং পারমাণবিক বিষয়ে সময়সীমা কী হবে— এ নিয়ে বড় মতপার্থক্য রয়েছে। গত ২৮ সেপ্টেম্বর সোমবার ট্রাম্পও বলেন, মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে মার্কিন কর্মকর্তাদের যোগাযোগ হয়েছে এবং তিনি সংঘাতের দ্রুত অবসান চান। তবে তার বক্তব্যে আলোচনার পাশাপাশি সামরিক চাপ অব্যাহত রাখার অবস্থানও স্পষ্ট।
আলোচনার চেষ্টা চলছে, কিন্তু মূল বিরোধ অমীমাংসিত
গত ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি কাতারের মধ্যস্থতাকারীদের সঙ্গে নিউইয়র্কে বৈঠক করেন। আলোচনায় হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেওয়া এবং যুদ্ধ বন্ধের সম্ভাব্য কাঠামো নিয়ে কথা হয়। ইরান ওয়াশিংটনের চূড়ান্ত অবস্থানের অপেক্ষায় রয়েছে বলে জানানো হয়।
অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান হলো— চূড়ান্ত কোনো সমঝোতার আগে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির বিষয়ে সমাধান প্রয়োজন। যুক্তরাষ্ট্রের কর্মকর্তারা ইরানের কাছ থেকে পারমাণবিক কর্মসূচিতে বাস্তব ছাড় এবং আন্তর্জাতিক পরিদর্শনের সুযোগ চান। ইরান আলোচনায় প্রস্তুত থাকার কথা বললেও চাপ বা জবরদস্তির মাধ্যমে কোনো চুক্তি মেনে নেওয়া হবে না বলে জানিয়েছে। একই দিনে ট্রাম্প আবারও জানান, ইরানকে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার বা অন্য কোনো সুবিধা দেওয়ার বিষয়ে তার পক্ষ থেকে কোনো প্রস্তাব দেওয়া হয়নি।
হরমুজ প্রণালীর পরিস্থিতি
বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী এখনো সংঘাতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্র। সাম্প্রতিক দিনগুলোয় ওই পথে জাহাজ চলাচল উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। রয়টর্সের তথ্যানুযায়ী, এক সপ্তাহের আগের ৩১টি জাহাজের তুলনায় সর্বশেষ সপ্তাহান্তে মাত্র পাঁচটি পণ্যবাহী জাহাজ হরমুজ অতিক্রম করে এবং পরের দিন কোনো জাহাজ নিবন্ধিত হয়নি। বিভিন্ন ট্যাংকারে হামলার খবরের পর জাহাজ চলাচলে এই ধীরগতি দেখা যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তায় কিছু জাহাজ ও তেলবাহী ট্যাংকার হরমুজ অতিক্রম করছে। ফলে প্রণালী পুরোপুরি অচল না হলেও স্বাভাবিক আন্তর্জাতিক নৌ-বাণিজ্য এখনো ফিরেনি। এ অবস্থার সরাসরি প্রভাব পড়ছে বিশ্ববাজারের জ্বালানি সরবরাহ ও তেলের দামে। গত ২৯ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০৬ ডলারের ওপরে ওঠে।
সমঝোতা কতদূর?
বর্তমান পরিস্থিতিকে পূর্ণাঙ্গ শান্তিচুক্তির পর্যায় বলা যাচ্ছে না। বরং দুই পক্ষের মধ্যে মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে পরোক্ষ আলোচনা পুনরায় সক্রিয় হয়েছে। আলোচনার সম্ভাব্য কাঠামোয় হরমুজ প্রণালী খুলে দেওয়া, যুদ্ধবিরতি বা সংঘাত কমানো, মার্কিন অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞা এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি— এই বিষয়গুলো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হয়ে আছে। সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত প্রশ্ন হলো, পারমাণবিক বিষয়ে ইরান কতটা ছাড় দেবে এবং তার বিনিময়ে যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের নিষেধাজ্ঞা বা অবরোধ শিথিল করবে। পাশাপাশি হরমুজ আগে খুলবে, নাকি পারমাণবিক বিষয়ে আগে সমঝোতা হবে— এ নিয়েও দুই পক্ষের অবস্থান এক নয়। ফলে আলোচনার পথ খোলা থাকলেও চূড়ান্ত সমঝোতার জন্য এখনো গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি বাধা রয়েই গেছে।