উচ্ছেদের পর রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলে নেয় কারা?


১ অক্টোবর ২০২৬ ০৯:৩৪

স্টাফ রিপোর্টার : রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে নিয়মিত অভিযান চালায় ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এবং ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। অভিযান চলার সময় ফুটপাত অনেকটা ফাঁকা হলেও কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই আবার বসে যায় দোকান ও হকার। ফলে সাময়িকভাবে পথচারীরা স্বস্তি পেলেও স্থায়ীভাবে কমছে না ভোগান্তি। পথচারী ও ভুক্তভোগীরা বলছেন, শুধু জীবিকার তাগিদে হকারদের ফিরে আসছেন এমনটি নয়, এর পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি, হকার সংগঠন, কথিত ‘লাইনম্যান’ এবং চাঁদা আদায়ের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। এরা ক্ষমতাসীনদের আশ্রয় ও প্রশ্রয়ে থাকেন বলেই ফুটপাত স্থায়ীভাবে দখলমুক্ত হচ্ছে না।
চলতি বছরের ১ থেকে ৫ এপ্রিল ডিএমপির আট ট্রাফিক বিভাগে একযোগে ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত অভিযান চালানো হয়। ডিএমপির তথ্যানুযায়ী, ওই অভিযানে প্রায় ১১ লাখ ৩১ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়, ৪৯ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং অবৈধ পার্কিং ও দোকানপাটের বিরুদ্ধে ১৭০টি মামলা করা হয়। কিন্তু অভিযান শেষ হওয়ার পর নিউমার্কেট, নীলক্ষেত, গুলিস্তান, সায়েন্সল্যাব ও শাহবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় আবারও হকাররা বসে গেছে। প্রশ্ন হলো— উচ্ছেদের পর তাদের আবার বসতে দেয় কারা?
খবর নিয়ে জানা যায়, গুলিস্তান, ফার্মগেট, নিউমার্কেট ও মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় উচ্ছেদের পর নতুন করে ফুটপাতে জায়গা পাওয়া হকারদের বড় অংশই আগের হকার নন। অভিযোগ ওঠে, স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, হকার নেতা, পুলিশ এবং সিটি করপোরেশনের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রভাবের মাধ্যমে পছন্দের ব্যক্তিদের জায়গা দেওয়া হচ্ছে। এমনকি বরাদ্দ পাওয়া জায়গা অন্যের কাছে ভাড়া দেওয়ার অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগ সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানে জানা যাচ্ছে।
এর আগে ২০২৪ সালের একটি অনুসন্ধানে গুলিস্তান ও মতিঝিলসহ কয়েকটি এলাকায় ফুটপাতের জায়গার বিনিময়ে দৈনিক চাঁদা আদায়ের তথ্যও উঠে আসে। ওই প্রতিবেদনে হকারদের কাছ থেকে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা, হকার সংগঠন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের টাকা নেওয়ার অভিযোগ উল্লেখ করা হয়। পরিকল্পনাবিদদের মতে, সমস্যাটি শুধু হকার উচ্ছেদে সমাধান হওয়ার নয়। দখলের পেছনে থাকা সিন্ডিকেট, চাঁদাবাজি এবং বিকল্প কর্মসংস্থানের অভাব একসঙ্গে মোকাবিলা না করলে উচ্ছেদ অভিযান বারবারই অস্থায়ী হয়ে থাকবে।
এদিকে সরকার ২০২৬ সালে ‘ঢাকা সিটি হকার ব্যবস্থাপনা নীতি’ প্রণয়ন করেছে। এতে হকারদের লাইসেন্স, নির্দিষ্ট স্থান ও নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ব্যবসা পরিচালনার ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে। ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনও নির্ধারিত স্থানে হকারদের পুনর্বাসন এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্র দেওয়ার উদ্যোগের কথা জানিয়েছে।
অর্থাৎ উচ্ছেদের পর ফুটপাত ও সড়ক দখলে ফেরে মূলত হকার ও ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা; কিন্তু তাদের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হওয়ার পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, চাঁদা আদায়কারী নেটওয়ার্ক ও দুর্বল নজরদারি দায়ী বলে মনে করছেন নাগরিকরা। চাঁদা আদায়কারী নেটওয়ার্ক শনাক্ত ও জবাবদিহির আওতায় না এলে উচ্ছেদ অভিযান চললেও পথচারীর দুর্ভোগের স্থায়ী সমাধান হবে না।