হাম-ডেঙ্গুর সংক্রমণে দেশজুড়ে শঙ্কা-উদ্বেগ
১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১৯:৫৭
একদিনে ১৬ মৃত্যু, হাসপাতালে নতুন ভর্তি ২ হাজার ৯১০
স্টাফ রিপোর্টার : দেশে যেন একইসঙ্গে দুই দিক থেকে আঘাত হানছে হাম ও ডেঙ্গু। একদিকে মশাবাহিত ডেঙ্গুতে প্রতিদিন নতুন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হচ্ছেন; অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসছে বিপুলসংখ্যক শিশু। ফলে হাসপাতালে বাড়ছে রোগীর চাপ। চিকিৎসা ব্যয়ে দিশেহারা দরিদ্র পরিবার, রোগীর সেবার পাশাপাশি হাসপাতালে সিট না পাওয়াসহ নানা ভোগান্তির মধ্যে প্রতিদিনই মৃত্যুর আতঙ্কে থাকতে হচ্ছে স্বজন ও অভিভাবকদের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের গত ১৪ সেপ্টেম্বরের সর্বশেষ তথ্য পরিস্থিতির ভয়াবহতারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। গত ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু ও হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ২ হাজার ৯১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। একই সময়ে মারা গেছেন ১৬ জন। এর মধ্যে ডেঙ্গুতে আটজন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আট শিশু মারা গেছে। একদিনে এই মৃত্যু ও বিপুলসংখ্যক হাসপাতালে ভর্তির ঘটনা দেখিয়ে দিচ্ছে— সংক্রমণের চাপ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো এলাকার সমস্যা নয়; এটি স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য বড় ধরনের জাতীয় চ্যালেঞ্জে পরিণত হচ্ছে।
হাসপাতালে বাড়ছে চাপ
গত ১৩ সেপ্টেম্বর রোববার সকাল ৮টা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৭৩৩ জন। চলতি বছর এখন পর্যন্ত ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ৫৩ হাজার ৫৭০ জন এবং মারা গেছেন ১৫৭ জন। ডেঙ্গু রোগী সবচেয়ে বেশি ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগের সিটি করপোরেশনের বাইরের এলাকায়— ৩৮৮ জন। খুলনা বিভাগে ৩০২ জন। বরিশাল ও চট্টগ্রামে ১৯১ জন করে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে ১৭০ জন এবং ঢাকা দক্ষিণে ১৪৩ জন ভর্তি হয়েছেন। দেশের অন্যান্য বিভাগেও নতুন রোগী শনাক্ত হচ্ছে।
অর্থাৎ ডেঙ্গুর চাপ শুধু রাজধানীর হাসপাতালগুলোয় সীমাবদ্ধ নেই। বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ের হাসপাতালগুলোয়ও প্রতিদিন নতুন রোগীর চাপ তৈরি হচ্ছে। হাসপাতালে রোগীর চাপের কারণে চিকিৎসক ও নার্সের ওপর কাজের চাপ, পরীক্ষা-নিরীক্ষার প্রয়োজন, ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জামের চাহিদা এবং জরুরি বিভাগে রোগীর অপেক্ষার সময়ও বেড়েছে।
শিশুদের নিয়ে উদ্বেগ
হাম পরিস্থিতির সবচেয়ে ভয়াবহ দিক হলো শিশুদের মৃত্যু। ১৩ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর সকাল ৮টা পর্যন্ত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে মারা যাওয়া আটজনই শিশু। ১৫ মার্চ থেকে ১৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ১ হাজার ৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে ৯৩০ জনের মৃত্যু হয়েছে হামের উপসর্গে এবং নিশ্চিত হামে মারা গেছে ১০০ জন। একই সময়ে হাম ও এর উপসর্গে মোট রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭২ হাজার ২৭০ জন। নিশ্চিত হাম রোগীর সংখ্যা ২০ হাজার ১২৪। আর হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ লাখ ৫২ হাজার ১১৭ জন। এ পরিস্থিতিকে একটি বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
ভোগান্তিতে পরিবার
একটি শিশু জ্বরে আক্রান্ত হলে পরিবারকে প্রথমে চিকিৎসকের কাছে যেতে হয়। এরপর পরীক্ষা, ওষুধ, প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি— প্রতিটি ধাপে বাড়ে সময় ও অর্থের চাপ। গুরুতর হলে শিশুর সঙ্গে হাসপাতালে থাকতে গিয়ে পরিবারের একজন বা একাধিক সদস্যকে কাজ থেকে বিরত থাকতে হয়। ডেঙ্গুর ক্ষেত্রেও একই চিত্র। জ্বর কমলেও রোগীর শারীরিক অবস্থা পর্যবেক্ষণ, রক্তের বিভিন্ন পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ফলোআপের প্রয়োজন হতে পারে। জটিলতা দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়।
হাসপাতালেই কি নতুন ঝুঁকি?
হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় হাসপাতালে রোগীর ভিড় বাড়লে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণ একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। বিশেষ করে একই জায়গায় অনেক শিশু, স্বজন ও স্বাস্থ্যকর্মীর উপস্থিতি থাকলে সংক্রমণ প্রতিরোধে বাড়তি সতর্কতা প্রয়োজন। অন্যদিকে ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে হাসপাতালের আশপাশে মশার উপস্থিতি থাকলে রোগের বাহক নিয়ন্ত্রণের বিষয়টি সামনে আসে। তাই শুধু রোগী ভর্তি করে চিকিৎসা দিলেই সংকটের সমাধান হবে না; হাসপাতাল ও এর আশপাশের পরিবেশকেও নিরাপদ রাখতে হবে।
সামনে ঝুঁকি আরও কোথায়?
সবচেয়ে বড় আশঙ্কা হলো, হাম ও ডেঙ্গু যদি একই সময়ে উচ্চমাত্রায় চলতে থাকে, তাহলে স্বাস্থ্যব্যবস্থার ওপর দ্বৈত চাপ আরও বাড়তে পারে। একদিকে প্রতিদিন ডেঙ্গু রোগী বাড়ছে; অন্যদিকে হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে আসা শিশুদের সংখ্যাও কমছে না। ফলে হাসপাতালগুলোর শয্যা, জনবল ও জরুরি চিকিৎসাসেবার সক্ষমতা বড় পরীক্ষার মুখে পড়ছে।
হাসপাতালের বাইরেও লড়াই করতে হবে
ডেঙ্গুর ক্ষেত্রে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস ও আক্রান্ত এলাকাগুলোয় কার্যকর মশকনিয়ন্ত্রণ জরুরি। হামের ক্ষেত্রে শিশুদের টিকাদান, দ্রুত শনাক্তকরণ এবং সংক্রমিত রোগীর যথাযথ ব্যবস্থাপনা গুরুত্বপূর্ণ। এগুলো হাসপাতালের বাইরের কাজ। এসব করলে রোগী কমবে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে থাকবে।