গণভোটের ম্যান্ডেট পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান ১১ দলীয় ঐক্যের
২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ২০:২৮
২০ সেপ্টেম্বর রোববার দুপুর ১২টায় ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের সঞ্চালনায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শীর্ষনেতা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এ অবস্থান তুলে ধরেন।
জুলাই জাতীয় সনদে গৃহীত সাংবিধানিক সংস্কার এবং গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের পরিবর্তে জাতীয় সংসদে বিশেষ কমিটি গঠন করে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগকে প্রত্যাখ্যান করেছে ১১ দলীয় ঐক্য।
২০ সেপ্টেম্বর রোববার দুপুর ১২টায় ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক এবং জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদের সঞ্চালনায় জাতীয় প্রেসক্লাব মিলনায়তনে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে ১১ দলীয় ঐক্যের অন্যতম শীর্ষনেতা, বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার এ অবস্থান তুলে ধরেন।
উপস্থিত ছিলেন এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী; বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের মহাসচিব মাওলানা জালালুদ্দীন আহমদ; বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার, লেবার পার্টির চেয়ারম্যান ডা. মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, জাগপার সহ-সভাপতি ও মুখপাত্র ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান, খেলাফত মজলিসের নায়েবে আমীর মাওলানা মাহবুবুল হক, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব এডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা; বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “আমরা জুলাই জাতীয় সনদের ভিত্তিতে সাংবিধানিক সংস্কারের পক্ষে। আমরা গণভোটে জনগণের দেওয়া রায় বাস্তবায়নের পক্ষে। জনগণের সার্বভৌম ও গাঠনিক ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষার পক্ষে। কিন্তু সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে গণভোটে অনুমোদিত সংস্কার প্রক্রিয়ার বিকল্প তৈরির উদ্যোগ আমরা গ্রহণযোগ্য মনে করি না।”
তিনি বলেন, একই তফসিলে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট অনুষ্ঠিত হয়েছে। গণভোটে জনগণের সামনে জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের সুনির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও কাঠামোর বিষয়ে মতামত চাওয়া হয়েছিল। জনগণ শুধু বিচ্ছিন্ন কিছু সংস্কারের পক্ষে মত দেয়নি; বরং সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের একটি নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া ও প্রতিষ্ঠানকে অনুমোদন দিয়েছে।
১১ দলীয় ঐক্যের আহ্বায়ক বলেন, “জনগণের ভোটে যে সাংবিধানিক ম্যান্ডেট দেওয়া হয়েছে, সেটিকে পাশ কাটিয়ে কোনো বিকল্প প্রক্রিয়াকে জনগণের রায়ের সমতুল্য হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। জনগণের ভোট কোনো রাজনৈতিক দলের সুবিধা-অসুবিধা কিংবা সংখ্যাগরিষ্ঠতা-সংখ্যালঘিষ্ঠতার ভিত্তিতে গ্রহণ বা বর্জনের বিষয় নয়। জনগণের রায়ের প্রতি সম্মান দেখানোই গণতন্ত্রের মৌলিক দাবি।”
তিনি বলেন, জাতীয় সংসদ একটি সংবিধানসৃষ্ট প্রতিষ্ঠান। অন্যদিকে সাংবিধানিক সংস্কারের জন্য জনগণের প্রত্যক্ষ অনুমোদনের ভিত্তিতে যে সংস্কার প্রক্রিয়া নির্ধারিত হয়েছে, তার ক্ষমতার উৎস জনগণের সরাসরি ভোট। তাই সংসদ সদস্য হিসেবে প্রাপ্ত ক্ষমতা এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে জনগণের গণভোটের মাধ্যমে অর্পিত ক্ষমতা এক নয়।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “একই ব্যক্তিরা সংসদ সদস্য এবং সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হতে পারেন। কিন্তু দুটি প্রতিষ্ঠানের আইনগত পরিচয়, ক্ষমতার উৎস ও দায়িত্ব এক নয়। সংসদ সদস্য হিসেবে একজন প্রতিনিধি সংসদের অর্পিত ক্ষমতা প্রয়োগ করেন। আর সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে তিনি জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার ভিত্তিতে নির্ধারিত সংস্কার ম্যান্ডেট বাস্তবায়নের দায়িত্ব পালন করেন।”
তিনি আরও বলেন, সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষেত্রে সংসদের সংশোধনী ক্ষমতা সীমাহীন নয়। বাংলাদেশের সর্বোচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংরক্ষণের নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, সংসদে প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলেই সংবিধানের মৌলিক কাঠামো পরিবর্তনের ক্ষমতা সৃষ্টি হয় না।
“প্রশ্ন শুধু সংসদে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে কি না, তা নয়। মৌলিক প্রশ্ন হলো- যে ক্ষমতা প্রয়োগ করা হচ্ছে, সেই ক্ষমতার উৎস কী এবং জনগণ কোন প্রক্রিয়ায় সেই ম্যান্ডেট দিয়েছেন,” বলেন তিনি।
জুলাই জাতীয় সনদে প্রস্তাবিত সংস্কারগুলোর মধ্যে দ্বিকক্ষবিশিষ্ট আইনসভা ও ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ, রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতার ভারসাম্য, প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ সীমিতকরণ, একই ব্যক্তির একাধিক গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকার ক্ষেত্রে বিধিনিষেধ, নির্বাচন কমিশনসহ সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোর সংস্কার, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা এবং বিকেন্দ্রীকরণসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, এসব সংস্কারের অনেকগুলো রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো, প্রতিষ্ঠানগুলোর পারস্পরিক সম্পর্ক এবং সাংবিধানিক শাসনব্যবস্থার মৌলিক কাঠামোর সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে শুধু সাধারণ সংসদীয় সংশোধনী প্রক্রিয়ার মাধ্যমে এগুলো বাস্তবায়ন করলে ভবিষ্যতে সাংবিধানিক ও আইনি জটিলতা তৈরি হতে পারে।
১১ দলীয় ঐক্যের ছয় দাবি
সংবাদ সম্মেলনে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে কয়েকটি দাবি তুলে ধরেন মিয়া গোলাম পরওয়ার। দাবিগুলো হলো-
১. গণভোটে জনগণের প্রদত্ত রায় যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে।
২. জুলাই জাতীয় সনদে অন্তর্ভুক্ত এবং গণভোটে অনুমোদিত সাংবিধানিক সংস্কারগুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।
৩. গণভোটে অনুমোদিত প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে সংসদীয় বিশেষ কমিটির মাধ্যমে মৌলিক সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়নের বর্তমান উদ্যোগ প্রত্যাহার করতে হবে।
৪. নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় শপথ গ্রহণ করিয়ে পরিষদকে কার্যকর করতে হবে।
৫. জনগণের সম্মতি ও গণভোটের ম্যান্ডেটকে পাশ কাটিয়ে সংবিধানের মৌলিক কাঠামো সংশ্লিষ্ট পরিবর্তন আনার উদ্যোগ থেকে বিরত থাকতে হবে।
৬. রাষ্ট্রীয় ও সাংবিধানিক সংস্কারকে জনগণের প্রত্যাশা, গণভোটের রায় এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে এগিয়ে নিতে হবে।
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা, জুলাই জাতীয় সনদ এবং গণভোটে প্রকাশিত জনগণের রায়- এই তিনটির প্রতি সম্মান দেখানোই বর্তমান সাংবিধানিক মতপার্থক্য নিরসনের গণতান্ত্রিক পথ।”
সংবাদ সম্মেলনে সরকারের পক্ষ থেকে সংবিধান সংস্কার পরিষদের আইনগত ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হচ্ছে বলেও উল্লেখ করেন তিনি। এ প্রসঙ্গে তিনি সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে ‘আইন’-এর সংজ্ঞার উল্লেখ করে বলেন, অধ্যাদেশ, আদেশ, বিধি, প্রবিধান, প্রজ্ঞাপন ও অন্যান্য আইনগত দলিল, যেগুলোর বাংলাদেশের আইনে কার্যকারিতা রয়েছে, সেগুলোও আইনের আওতাভুক্ত।
তিনি বলেন, “সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের জন্য ২০২৫ সালের ১৩ নভেম্বর যে আদেশ দেওয়া হয়েছে, সেটিকে আইনগত ভিত্তিহীন বলা হচ্ছে। অথচ সংবিধানের ১৫২ অনুচ্ছেদে আইনগত দলিলের যে সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে, তার আলোকে রাষ্ট্রপতির ঐ আদেশ আইনের মর্যাদা সংরক্ষণ করে- এটাই হলো সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠনের আইনি ভিত্তি।”
মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, “গণভোটের রায় বাস্তবায়নের জন্য সংবিধান সংস্কার পরিষদকে কার্যকর করার সুযোগ এখনো রয়েছে। এখনো সময় শেষ হয়ে যায়নি। সংসদ সদস্যদের সংবিধান সংস্কার পরিষদের সদস্য হিসেবে শপথ দেওয়া যায়, পরিষদের অধিবেশন ডাকা যায় এবং গণভোটের রায় অনুযায়ী প্রক্রিয়াটি কার্যকর করা যায়। আমরা আশা করি, ১১ দলীয় ঐক্যের আইনগত ও সাংবিধানিক অবস্থানের প্রতি সরকার ও সরকারি দলের বোধোদয় হবে এবং বিশেষ কমিটির মাধ্যমে সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ থেকে তারা ফিরে আসবে,” বলেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, “১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আমরা সংবিধান সংশোধনের বিশেষ কমিটির এই উদ্যোগ প্রত্যাখ্যান করছি। আমরা জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা ও গণভোটের ম্যান্ডেটের মর্যাদা রক্ষার জন্য আমাদের রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচি অব্যাহত রাখব।”
সংবাদ সম্মেলনের শেষ পর্যায়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার সাম্প্রতিক লংমার্চে গণমাধ্যম, রাজনৈতিক দল, সাধারণ মানুষ, ব্যবসায়ী ও প্রশাসনের সহযোগিতার জন্য কৃতজ্ঞতা জানান। দীর্ঘ লংমার্চের কারণে কারও ভোগান্তি হয়ে থাকলে ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে তিনি দুঃখ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, “আসুন, আমরা জনগণের রায়কে সম্মান করি, জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতার মর্যাদা রক্ষা করি এবং জুলাই জাতীয় সনদ ও গণভোটের ম্যান্ডেট অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সাংবিধানিক সংস্কার বাস্তবায়ন করি।”-
তারিখ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ খ্রি. প্রেস বিজ্ঞপ্তি