‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ কুরআন-সুন্নাহবিরোধী
১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৪৪
সোনার বাংলা রিপোর্ট : বাংলাদেশ জাতীয় সংসদে গত ৬ সেপ্টেম্বর রোববার তড়িঘড়ি করে পাস হওয়া ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’-কে কুরআন-সুন্নাহবিরোধী এবং অবিলম্বে বাতিল দাবি করেছেন দেশের শীর্ষ আলেমরা।
জাতীয় মসজিদ বায়তুল মোকাররমের খতিব ও মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়ার আমীনুত তালীম মুফতি মুহাম্মাদ আব্দুল মালেক বলেছেন, পুত্রসন্তানহীন পরিবারে কন্যাসন্তানদের উত্তরাধিকার সুরক্ষা ও জীবনস্বত্ব সংরক্ষণের নামে প্রস্তাবিত ‘হেবা’ ব্যবস্থা সম্পূর্ণ শরীয়তবিরোধী। অগ্রহণযোগ্য বলে তিনি ঘোষণা করেছেন। এ প্রশ্নের জবাবে মারকাযুদ দাওয়াহ আল ইসলামিয়া থেকে শরীয়তের দলিল ও ফিকহের আলোকে এই সুনির্দিষ্ট ফতোয়ায় তিনি যেসব বিষয় তুলে ধরেছেন, তা হলো— ১. প্রস্তাবিত ব্যবস্থায় কোনো ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় নিজের সম্পত্তি কন্যাকে হেবা করলেও যদি সম্পত্তিটির ব্যবস্থাপনা, ভোগদখল ও আয় নিজের জন্য সংরক্ষণ করেন এবং মৃত্যুর পর তা কন্যার কাছে হস্তান্তর করার শর্ত জুড়ে দেন, তবে তা শরীয়তের দৃষ্টিতে গ্রহণযোগ্য নয়। প্রকৃত হেবা সম্পন্ন হওয়ার অর্থ হলো সম্পত্তি দাতার মালিকানা থেকে সম্পূর্ণ বের হয়ে গ্রহীতার মালিকানায় চলে যাওয়া। দাতা যদি নিজের জন্য আজীবন ভোগদখল বা জীবনস্বত্ব সংরক্ষণ করেন, তবে তা হেবার মূলনীতির সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে দাঁড়ায়। ২. ইসলামী উত্তরাধিকার আইনে কার কতটুকু সম্পত্তি প্রাপ্য, তা কুরআন ও সুন্নাহর মাধ্যমে সুনির্দিষ্টভাবে নির্ধারিত। সামাজিক বাস্তবতা, পারিবারিক প্রয়োজন বা অন্য কোনো যুক্তির দোহাই দিয়ে আল্লাহ তায়ালার নির্ধারিত মিরাসের বিধানে পরিবর্তন বা সংশোধনের কোনো সুযোগ নেই। ইসলামী উত্তরাধিকারের নির্ধারিত অংশ পাশ কাটানো কিংবা মৃত্যুর পর সম্পত্তির বণ্টন নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যে এ ধরনের কৌশল অবলম্বন করা সম্পূর্ণ অবৈধ। এ প্রসঙ্গে জামে তিরমিযীর (২১১৭ নম্বর) হাদিসে রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালা প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করেছেন। অতএব কোনো উত্তরাধিকারীর জন্য অসিয়ত নেই।’ তবে দাতার মৃত্যুর পর সব প্রাপ্তবয়স্ক ওয়ারিশ যদি স্বেচ্ছায় ও সম্মতির ভিত্তিতে কোনো বিষয়ে রাজি হন, তবে সেটি সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়। কারণ তখন তা মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের বিষয় থাকে না, বরং ওয়ারিশদের নিজস্ব সম্মতির বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ৩. কন্যাসন্তানদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শরীয়তসম্মত ও বৈধ পথ খোলা রয়েছে। একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় নিজের সম্পত্তি থেকে কন্যাকে হেবা বা দান করতে পারেন। তবে তা অবশ্যই শর্তহীন হতে হবে এবং হেবা কার্যকর হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সম্পত্তির মালিকানা ও প্রকৃত দখল গ্রহীতার কাছে হস্তান্তর করতে হবে। হেবা পূর্ণাঙ্গভাবে কার্যকর হওয়ার আগেই যদি দাতা মারা যান, তবে ওই হেবা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে এবং সম্পত্তিটি দাতার সাধারণ উত্তরাধিকার সম্পত্তির অন্তর্ভুক্ত হবে। অর্থাৎ জীবদ্দশায় পূর্ণ মালিকানা হস্তান্তর করে সম্পত্তি দেওয়া বৈধ হলেও, মৃত্যুর পরের উত্তরাধিকার নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তনের উদ্দেশ্যে হেবাকে মাধ্যম বানানো শরীয়তসম্মত নয়। ৪. পুত্রসন্তান না থাকলে কন্যাসন্তান ও স্ত্রীর ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এবং দূরবর্তী আত্মীয়দের সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কের টানাপড়েন নিয়ে সমাজে নানা প্রশ্ন তৈরি হতে পারে। তবে এসব সামাজিক বাস্তবতা বা মানুষের পছন্দ-অপছন্দ ইসলামী উত্তরাধিকার বিধান পরিবর্তনের ভিত্তি হতে পারে না। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে জীবদ্দশায় শর্তহীন ও শরীয়তসম্মত পন্থায় সম্পত্তি হস্তান্তর এবং অন্যান্য অনুমোদিত ব্যবস্থার মাধ্যমেই কেবল উদ্ভূত সমস্যার সমাধান খোঁজা সম্ভব।
বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মুফতি মামুনুল হক ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’ সংসদে তড়িঘড়ি করে পাস করায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, বৃদ্ধ মা-বাবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু সেই নিরাপত্তার নামে এমন কোনো বিধান করা যাবে না, যা আল্লাহ তায়ালা নির্ধারিত হেবা, অসিয়ত ও ফারায়েজের শরয়ী বিধানকে পাশ কাটানোর সুযোগ সৃষ্টি করে। জীবিত অবস্থায় হেবা এবং মৃত্যুর পর ফারায়েজ অনুযায়ী উত্তরাধিকার— দুটি পৃথক বিষয়। নতুন আইন যেন কোনো ওয়ারিশকে তার শরীয়াহ নির্ধারিত অধিকার থেকে বঞ্চিত করার হাতিয়ার না হয়, তা নিশ্চিত করতে হবে।
বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য, ইসলামী কানুন বাস্তবায়ন পরিষদের আমীর ও সম্মিলিত ওলামা-মাশায়েখ পরিষদের সভাপতি মুফতি মাওলানা আবু তাহের জিহাদী, জাতীয় ফতোয়া বোর্ডের প্রেসিডিয়াম সদস্য অধ্যক্ষ মাওলানা যাইনুল আবেদীন, বাংলাদেশ জাতীয় ফতোয়া বোর্ড ও সম্মিলিত ওলামা-মাশায়েখ পরিষদের মহাসচিব ড. মুফতি মাওলানা খলিলুর রহমান মাদানীসহ দেশের শতাধিক শীর্ষ আলেম ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি (অ্যামেন্ডমেন্ট) বিল-২০২৬’-কে ইসলামবিরোধী উল্লেখ করে বাতিলের দাবি করেছেন।
তারা মনে করেন, হাদীস ও ফিকহের অনেক ইমাম স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, ‘এ হাদীসে যে বিধান দেয়া হয়েছে, তা ইসলামী শরীয়তের মুজমা আলাইহি (ইজমাসম্মত) বিধান। এবং এ বিধান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে তাওয়াতুর সূত্রে প্রমাণিত। অর্থাৎ এটি সাধারণ কোনো সহীহ হাদীস নয়; বরং মুতাওয়াতির হাদীস, যা প্রত্যাখ্যান করা মানে কুরআনের হুকুমকে প্রত্যাখ্যান করা।’ অতএব আইনটি বাতিল করে দেশের স্বীকৃত মুফতি, ইসলামী আইনবিশেষজ্ঞ, মুসলিম পারিবারিক আইনবিশেষজ্ঞ এবং সংশ্লিষ্ট আলেমদের সমন্বয়ে এর বিস্তারিত শরীয়াহ পর্যালোচনা প্রয়োজন বলে আমরা মনে করি। সকলকে মনে রাখতে হবে, সরকার আসে, সরকার যায়, ইসলামিক বিধান নিয়ে ষড়যন্ত্র ও তামাশা করে কেউ কোনোদিন টিকে থাকতে পারে না। তাই অবিলম্বে সরকার এ কুরআনবিরোধী আইন বাতিল করতে হবে।
হেফাজতে ইসলাম বাংলাদেশের আমীর আল্লামা শাহ মুহিববুল্লাহ বাবুনগরী বলেন, ‘মুসলমানদের সম্পত্তি বণ্টন, হেবা এবং মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়টি সম্পূর্ণ শরীয়াহভিত্তিক ফারায়েজ আইনের অধীন। সম্পত্তি হস্তান্তরের নতুন কোনো পদ্ধতি বা ধারা যেন মূল ইসলামী মিরাস ও হেবার বিধানের সাথে সাংঘর্ষিক না হয়, তা নিশ্চিত করা জরুরি। সরকারের পক্ষ থেকে একে সাধারণ হস্তান্তর পদ্ধতি বলা হলেও, বাস্তব প্রয়োগে এটি যেন পবিত্র কুরআন-সুন্নাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার নীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত না করে। হেফাজত নেতা জোর দিয়ে বলেন, কোনো আইনি জটিলতা বা শরীয়তের সাথে অসঙ্গতি এড়াতে বিলটি চূড়ান্ত করার পূর্বে দেশের বরেণ্য মুফতি, ফকিহ ও ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞদের মতামত নেয়া সমীচীন। শরীয়াহ বোর্ডের পর্যালোচনার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় সংশোধন এনে এমন আইনি রূপ দেয়া হোক— যাতে পিতা-মাতার অধিকার রক্ষার পাশাপাশি সুন্নাহসম্মত হেবা ও মিরাসের বিধানও সম্পূর্ণ নিরাপদ থাকে।’