পঞ্চগড়ে ১৫শ’ বছরে প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ভিতরগড় ‘মহারাজার দীঘি’
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৮
আসাদুজ্জামান আসাদ, পঞ্চগড় : দেশের সর্ব উত্তরের জেলা পঞ্চগড়। জেলা শহর থেকে প্রায় ১৬ কিলোমিটার উত্তর-পূর্ব কোণে অমর খানা ইউনিয়ন ভারতের সীমান্তঘেঁষা এলাকায় ১৫শ’ বছরের প্রাচীন ঐতিহ্যবাহী ‘ভিতর মহারাজার দীঘি’। ‘মহারাজার দীঘি’টি দারুণ মনোরম, মনোমুগ্ধ পরিবেশে অবস্থিত। ঐতিহ্যবাহী এই দীঘি উপভোগ করার জন্য বরাবরেই পর্যটকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মহারাজার দীঘি পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় হতে পারে। সৃষ্টি হতে পারে অনেকের কর্মসংস্থান।
মহারাজার দীঘির আয়তন প্রায় ৫৪ একর এ জমির ওপর সুপরিচিতভাবে মহারাজার দীঘি অবস্থিত। দীঘির আয়তন পাড়সহ উত্তর-দক্ষিণে ৮শ’ গজ, এবং পূর্ব ও পাশ্চিমে ৪শ’ গজ। পাড়ের উচ্চতা প্রায় ২০ ফুট। খরা মৌসুমে পানির গভীরতা প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট। বর্ষা মৌসুমে পানির গভীরতা আরো অনেকগুণ বৃদ্ধি পেয়ে থাকে।
ইতিহাস ও স্থানীয় পরিবেশবিদদের ভাষ্যমতে, ২৫ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে জলেশ্বর রাজার ভিতরগড় দুর্গ নগরী সীমানা ছিল। এটি ছিল রাজার রাজধানী। কাম বুরুঞ্জীতে রাজা জলেশ্বরকে বলা হয়েছে পৃথু রাজা। মহারাজার দীঘি থেকে প্রায় ১৩৫ মিটার দূরে পৃথু রাজার বাড়ি ছিল বলে ধারণা করা হয়ে থাকে। ভিতরগড় দুর্গ নগরীর বাইরের আবেষ্টনীর উত্তরাংশে, উত্তর-পশ্চিমাংশে এবং উত্তর পূর্বাংশ বর্তমান পড়শি রাষ্ট ভারতের জলপাইগুড়ি জেলা। ধারণা করা হয় যে, ষষ্ঠ শতকের শেষে কিংবা সপ্তম শতকের শুরুতে ভিতরগড় একটি স্বাধীন রাজ্য হিসাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।
প্রাচীন বাণিজ্য সড়ক ও নদী পথের ওপর অবস্থিত হওয়ায় ভিতরগড় এলাকার অধিবাসীরা সম্ভবত নেপাল, সিকিম, ভুটান, আসাম, তিব্বত, কোচবিহার, চীন, বিহার এবং পশ্চিম ও দক্ষিণ বাংলার সঙ্গে বাণিজ্যিক ও সংস্কৃতিক যোগাযোগ বজায় রেখেছিল। রাজ্যের পরিচালনার সময় ভিতরগড়ে পৃথু রাজা নির্মাণ করেছিলেন রাজ প্রসাদের মন্দির এবং খনন করেন একটি বিশাল দীঘি, যা মহারাজার দীঘি নামে পরিচিতি। সময়ের ব্যবধানে পৃথু রাজা কিচক নামের অসাধু ও নিম্ন বর্ণের জনগোষ্ঠীর দ্বারা আক্রান্ত হলে নিজের পবিত্রতা ও মর্যাদা রক্ষায় পরিবার পরিজনসহ মহারাজার দীঘির পানিতে আত্মহত্যা করেন। তার রক্ষী বাহিনী তাকে অনুস্মরণ করে। যার কারণে পৃথু রাজার রাজত্বের অবসান ঘটে।
মহারাজার দীঘির ইট বাধানো ঘাট ছিল ১০টি। ঘাট ও ঘাটের উভয় পাশে ইট ও মাটি দিয়ে নির্মিত ছিল। সুউচ্চ পাড়। সবুজ ডাল পালাযুক্ত গাছ গাছালি। বিরাজমান ছিল মনোরম নৈসর্গিক এক দৃশ্য। সুদীর্ঘ ২৫ বর্গকিলোমিটার জায়গাজুড়ে বিরাজমান ঐতিহাসিক ভিতরগড় দুর্গ নগরীর দৃশ্যমান স্থাপনার অধিকাংশই কালের আর্বতন-বিবর্তনে হারিয়ে যেতে বসেছে। তবে এখনো টিকে রয়েছে ঐতিহাসিক মহারাজার দীঘি। বিশাল এই দীঘি দেখতে প্রতিদিনই সেখানে হাজির হোন অসংখ্যক পর্যটক, ভ্রমণ পিয়াসি, অধ্যাপক, সাংবাদিক, ছাত্র-ছাত্রীসহ অসংখ্য সাধারণ মানুষজন।
দীঘির চার পাশে সবুজ চা পাতায় ভরা বাগান। ভারতের সীমানা সংলগ্ন কোলাহলমুক্ত পরিবেশ, সবুজ গাছের নিবিড় ছায়া সবাইকে দারুণভাবে মুগ্ধ করে। প্রতি বছর শীতের মৌসুুমে বিভিন্ন এলাকা থেকে পঞ্চগড়- তেতুঁলিয়ায় ছুটে আসে হাজারো পর্যটক। এ সব পর্যটকের বেশিরভাগই মহারাজার দৃষ্টি নন্দন দীঘি না দেখে ফিরে আসেন না। দীঘির পাড়ে বসে প্রকৃতিক সেন্দৈর্য্য ও বিস্তীর্ণ স্বচ্ছ পানির ঢেউ আর নানা প্রজাতির পাখির কুজনে মোহিত হোন পর্যটকরা। দীঘির চার পাশে দৃষ্টিনন্দন সুউচ্চ প্রশস্ত পাড়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলেন। কেউবা নৌকায় চড়ে ঘুরে বেড়ান দীঘির স্বচ্ছ পানিতে। শীত মৌসুমে দীঘির সবুজ গাছ গাছালি ঘেরা মহারাজার দীঘিতে ছুটে আসে অতিথি পাখি। অতিথি পাখির কল কাকলিতে দীঘির পাড়ে তৈরি করে মনোমুগ্ধকর এক অনাবিল পরিবেশ। দীঘির সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলেছে প্রবেশ পথের দুইটি সিড়ি। প্রতি বছর ১ বৈশাখে দীঘির পাড়ে মেলা বসে। মেলার সভা-সমাবেশ, সৌন্দর্য উপভোগে হাজির হয় সব বয়সের সাধারণ মানুষ। ভিতরগড় মহারাজার দীঘির চত্বর জুড়ে যদি পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা যায় তাহলে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় বৃদ্ধি হতো। স্থানীয়দেরও অর্থনৈতিক চাকা চাঙা হতো কর্মসংস্থান বৃদ্ধির মাধ্যমে।
পঞ্চগড় শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার দূরের এই দীঘিটি দেখতে স্বল্প ভাড়ায় রিকশা, কার, মাইক্রো, মোটরসাইকেল ও বাসে করে যাওয়া আসা করা যেতে পারে। মহারাজার দীঘির পাশে ছোট একটি বাজার আছে। সেখানে স্বল্পমূল্যে ভাত, চা ও নাস্তা করে যেতে পারে। রাত্রিযাপনের জন্য পঞ্চগড় শহরে এসি-নন এসি আবাসিক হোটেল রয়েছে।
এলাকার সচেতন মানুষ মনে করেন, এখানে পর্যটক কেন্দ্র গড়ে তুললে প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ ঘুরতে আসত। প্রাচীন এতিহ্যবাহী মহারাজার দীঘির ইতিহাস ও ঐতিহ্য জানতে পারবে। মহারাজার দীঘিকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে প্রশাসনের সুদৃষ্টি চান স্থানীয়রা। পর্যটক কেন্দ্র গড়ার ব্যাপারে পঞ্চগড় জেলা প্রশাসক মোসাম্মাৎ শুকরিয়া পারভীন বলেন, ভিতরগড় মহারাজার দিঘি একটি ঐতিহাসিক দিঘি। এ দীঘির চত্বরে পর্যটক কেন্দ্র গড়ে ওঠার প্রচুর সম্ভাবনা রয়েছে। এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানো হবে।
ভিতরগড় এলাকার বাসিন্দা লিয়াকত আলী বলেন, পপ্রত বছর বৈশাখ মাসে মহারাজার দিঘির পাড়ে একদিন ব্যাপী একটি বৈশাখী মেলা বসে। মেলায় প্রচুর পরিমাণ লোকজনের সমাবেশ ঘটে। নানারকম খেলনাসহ প্রয়োজনীয় জিনিস পত্র বেচা কেনা হয়ে থাকে। যদি পর্যটক কেন্দ্র গড়ে ওঠে, তাহলে এখানে একটা বাণিজ্যিক কেন্দ্র গড়ে উঠবে। বিভিন্ন শ্রেণি ও পেশার মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।