খুলেছে সুন্দরবনের দুয়ার স্বস্তির সঙ্গে দস্যু-আতঙ্ক
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:২১
আবু সাইদ বিশ্বাস, সাতক্ষীরা : তিন মাস ধরে বন্ধ সুন্দরবন। নদী-খালে নৌকা নেই, জাল ফেলেননি জেলেরা। বনের ভেতর মানুষের আনাগোনা ছিল না। এই বিরতিতে একদিকে প্রকৃতি পেয়েছে স্বস্তি; অন্যদিকে সুন্দরবন নির্ভর হাজারো পরিবারের ঘরে বেড়েছে অভাব ও ঋণের চাপ। গত ১ সেপ্টেম্বর মঙ্গলবার সেই অপেক্ষার অবসান হয়েছে, খুলছে সুন্দরবনের দুয়ার।
মাছ ও কাঁকড়া আহরণের আশায় আবারও সুন্দরবনের নদী-খালে নৌকা নামাবেন উপকূলের জেলে-বাওয়ালিরা। খুলে দেওয়া হচ্ছে পর্যটনকেন্দ্রগুলোও। ফলে দীর্ঘ তিন মাস পর সুন্দরবন সংলগ্ন সাতক্ষীরা, খুলনা ও বাগেরহাটের জনপদে ফিরেছে কর্মচাঞ্চল্য।
তবে বনে ফেরার আনন্দের পাশাপাশি জেলে-বাওয়ালিদের মনে রয়েছে আতঙ্ক। তিন মাস আয় বন্ধ থাকায় অনেক পরিবারকে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে দাদন নিতে হয়েছে। কেউ নিয়েছেন এনজিও ঋণ। বন খুললেও এবার ভালো মাছ-কাঁকড়া পাওয়া যাবে কি না, সেই অনিশ্চয়তার সঙ্গে আছে বনদস্যু ও চাঁদাবাজির ভয়।
গত ৩১ আগস্ট সোমবার শ্যামনগরের বুড়িগোয়ালিনী, মুন্সীগঞ্জ ও গাবুরা এলাকার বিভিন্ন ঘাট ঘুরে দেখা যায়, বনে ফেরার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত জেলে-বাওয়ালিরা। দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকা নৌকায় দেওয়া হচ্ছে আলকাতরা। কোথাও চলছে মেরামত, কোথাও জাল সেলাই। ইঞ্জিন পরীক্ষা, দড়ি, বরফ রাখার পাত্র ও মাছ ধরার অন্যান্য সরঞ্জামও প্রস্তুত করছেন জেলেরা। বুড়িগোয়ালিনীর জেলে মাসুম বিল্লাহর পরিবারে সদস্য ছয়জন। সুন্দরবন বন্ধ থাকায় গত তিন মাস সংসার চালাতে তাকে এনজিও থেকে ঋণ নিতে হয়েছে। এলাকায় বিকল্প কাজের সুযোগও তেমন নেই।
মাসুম বিল্লাহ বলেন, সুন্দরবন বন্ধ থাকলে তার ঘরে চুলা জ্বালানো কঠিন হয়ে পড়ে। অভাবের কারণে নিষেধাজ্ঞার সময় গোপনে বনে যাওয়ার কথাও ভেবেছিলেন। কিন্তু বনদস্যুর ভয় এবং ধরা পড়ার আশঙ্কায় শেষ পর্যন্ত যাননি। তার ভাষায়, ‘এখন বন খোলার খবরে মনে হচ্ছে বুকে নতুন শ্বাস ফিরে পেয়েছি।’ একই এলাকার জেলে সাইদুর রহমান বলেন, তিন মাস ধারদেনা করে সংসার চালাতে হয়েছে। এখন বনে গিয়ে মাছ-কাঁকড়া ধরে আয় করে সেই ঋণ শোধ করাই তাদের প্রধান লক্ষ্য।’
মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণীর প্রজনন সুরক্ষায় গত ১ জুন থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালি, মৌয়াল ও পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ ছিল। একই সময়ে বন্ধ ছিল সব ধরনের বনজ সম্পদ আহরণ।
বন বিভাগ বলছে, তিন মাসের এই বিরতিতে সুন্দরবনের প্রাণ-প্রকৃতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। বিভিন্ন নদী ও খালে মাছের উপস্থিতি বেড়েছে। সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন ও ছইলাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্বও বেড়েছে। মানুষের আনাগোনা কম থাকায় বাঘ, হরিণ, কুমির, বানর, বন্য শূকর ও লাল কাঁকড়াসহ বন্যপ্রাণীর স্বাভাবিক বিচরণ বেড়েছে।
ট্রলার মালিক সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হালিম বলেন, নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রায় দেড় থেকে দুই হাজার ট্রলার শ্রমিক গত তিন মাস কার্যত বেকার ছিলেন। পর্যটকদের প্রবেশ শুরু হলে তাদের কর্মসংস্থানও আবার চালু হবে। সুন্দরবনের পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ১৪টি পর্যটনকেন্দ্র রয়েছে। প্রতি বছর এসব কেন্দ্রে কয়েক লাখ পর্যটক ভ্রমণে আসেন। পাশাপাশি বন বিভাগের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি দিয়ে প্রায় ৫০ হাজার বনজীবী বছরের বিভিন্ন সময়ে সুন্দরবন থেকে মাছ, গোলপাতা ও মধুসহ বিভিন্ন বনজ সম্পদ আহরণ করেন।
বন খুললেও ইচ্ছেমতো সুন্দরবনে প্রবেশের সুযোগ থাকছে না। জেলে-বাওয়ালি ও অন্যান্য বননির্ভর মানুষকে বৈধ পাস ও পারমিট নিয়ে নির্ধারিত নিয়ম মেনে বনে প্রবেশ করতে হবে। সংরক্ষিত এলাকা ও অভয়ারণ্যে সাধারণভাবে ইচ্ছেমতো প্রবেশ করা যাবে না।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনের পশ্চিম বিভাগের খুলনা ও সাতক্ষীরা রেঞ্জের জন্য এবার প্রায় ছয় হাজার নৌযানকে বোট লাইসেন্স সার্টিফিকেট (বিএলসি) দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। একইসঙ্গে বন ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় নজরদারি জোরদারের প্রস্তুতিও নেওয়া হয়েছে।
সুন্দরবনের সাতক্ষীরা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মশিউর রহমান বলেন, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্যে জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত সুন্দরবনে সব ধরনের সম্পদ আহরণ ও পর্যটকদের প্রবেশ বন্ধ রাখা হয়েছিল।
সুন্দরবনের দুয়ার খুলছে, তাই উপকূলে ফিরেছে জীবিকার আশা। এখন প্রশ্ন এই বনের সম্পদ কি জেলেদের ঘরে স্বস্তি ফেরাবে, নাকি নতুন করে তাদের সামনে দাঁড়াবে ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা?