ওয়েটব্লু পদ্ধতি চালু না থাকায় রংপুরসহ দেশের চামড়াশিল্পে ধস


৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:১৯

মোহাম্মদ নুরুজ্জামান, রংপুর : ওয়েটব্লু চালু না থাকায় রংপুরসহ দেশে প্রাণীর চামড়াশিল্পে ধস নেমেছে। এর ফলে দীর্ঘদিনের বাপ-দাদার এই প্রাচীন ব্যবসা ছেড়ে অনেকেই ভিন্ন পেশার ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন। কেউবা ঋণে জর্জরিত হয়ে বেকার হয়ে পড়েছেন। রংপুর নগরীর শতবর্ষী চামড়া ব্যবসার কেন্দ্র শাপলা চত্বর চামড়াপট্টি এখন ভিন্ন নামে নানা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছে। এর মধ্যে অটোরিকশা ও এর যন্ত্রাংশ এবং আসবাবপত্র ব্যবসা প্রাধান্য পেয়েছে। এর পরিণতিতে রংপুরের ঐতিহ্যবাহী শাপলা চত্বর চামড়াপট্টি এলাকায় পেশাদার চামড়া ব্যবসায়ীরা এ ব্যবসা থেকে অনেকেই নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন। সরেজমিন ঐ এলাকা ঘুরে পেশাদার চামড়া ব্যবসায়ীদের সাথে কথা বলে জানা গেছে নানা দুঃখের ইতিকথা।
রংপুর অঞ্চলের চামড়াশিল্পের ধ্বংসের কারণ উল্লেখ করে কয়েকজন চামড়া ব্যবসায়ী জানান, ১৯৯০ সাল নাগাদ সরকার চামড়াশিল্পে ওয়েটব্লু বন্ধ করে দেয়ার পর থেকেই এই শিল্পে ধস নামতে শুরু করেছে। তারা জানান, রংপুর অঞ্চলের প্রাণীর চামড়া পণ্য ভৌগোলিক এবং আবহাওয়াজনিত অঞ্চলের কারণেই এর ঘনত্ব বেশি থাকায় এসব খুবই উন্নত মানের হয়। এর ফলে এখানকার প্রাণীর চামড়ার চাহিদা প্রচুর। ওয়েটব্লু প্রাণীর চামড়াপণ্য এক সপ্তাহের মধ্যে বিদেশে রপ্তানি করা যায়। এর ফলে ব্যবসায়ীরা খুব অল্প সময়েরে মধ্যে তাদের পুঁজি ফিরে পায়। পাশাপাশি চামড়া সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে ব্যবহৃত শত শত কোটি টাকার রাসায়নিকসামগ্রী আমদানির জন্য বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হয়। তবে ওয়েটব্লু বন্ধ করে দেয়ার পর থেকেই এই শিল্পে ক্রমান্বয়ে ধস নামতে শুরু করে। একশ্রেণির ট্যানারি ব্যবসায়ী তাদের ট্যানারির জায়গা ভাড়া দিয়ে ক্রাষ্ট পদ্ধতিতে চামড়া বিদেশে রপ্তানি করছে।
তারা ভিত সন্ত্রস্তভাবে অভিযোগ করেন, চামড়াশিল্পের সাথে জড়িত অনেক ট্যানারি ব্যবসায়ী প্রকৃত ব্যবসায়ী নয়। তারা প্রভাবশালী মহলের ছত্রছায়ায় দেশের গোটা চামড়া ব্যসাকে দীর্ঘদিন ধরে অবৈধভাবে নিয়ন্ত্রণ করছে। বিভিন্ন সময়ে সরকারের দেয়া প্রণোদনা, ব্যাংক ঋণ তারাই নিয়ন্ত্রণ করছে। সাধারণ ব্যাসায়ীরা এর ধারে কাছেও ভেড়ার সুযোগ পায় না। ঐ অসাধু ট্যানারি ব্যবসায়ী চক্র ট্যানারি চামড়া ব্যবসার নামে বিভিন্ন বাণিজ্যিক ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে সেসব টাকা চামড়াশিল্পে ব্যবহার না করে ভিন্ন খাতে ব্যবসা এবং ব্যবহার করে থাকে বলে তারা অভিযোগ করেন।
ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, ট্যানারি ব্যবসায়ীরা ইচ্ছেমাফিক অধিক মূল্যে ট্যানারি ভাড়া দিয়ে লাগামহীন মুনাফা করছে। উদাহরণ হিসেবে তারা জানান, সারা বছর যে চামড়া প্রতি পিস সংরক্ষণে ৫০ টাকা ভাড়া নিয়ে থাকে। কুরবানির মৌসুমে ঐ চামড়া প্রতি পিস ১৮০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত ভাড়া নিয়ে থাকে। ওয়েটব্লু চালু না করায় ১০ গুণ বেশি দামে প্রাণীর চামড়া ক্রাস্ট করে রপ্তানি করতে হচ্ছে। এছাড়া ঐ ট্যানারি ব্যবসায়ী চক্র চামড়াশিল্পে চামড়া সংরক্ষণ এবং প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে ব্যবহৃত শত শত কোটি টাকার শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার রাসায়নিক সামগ্রী আমদানির সুযোগ নিয়ে মধ্যস্বত্বভোগী হিসেবে চড়া দামে সেসব ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের নিকট বিক্রি করে অধিক মুনাফা করছে। একই সাথে বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার করছে। পাশাপাশি সারাদেশের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কেননা সারা দেশের কটেজ পার্টি বা ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ীদের সংগৃহীত প্রাণীর চামড়াই তারা রপ্তানি করে থাকে। এই ব্যবসায়ীরা সারা দেশের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারক হিসেবে ব্যবসায়ীদের সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকে। তাদের দাবি সারা দেশের ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী এবং রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীদেরও অবাধে শতভাগ শুল্কমুক্ত সুবিধার রাসায়নিক সামগ্রী অবাধে আমদানির সুযোগ করে দিতে হবে। এ ব্যাপারে সরকারের উচ্চ মহলের নিবিড় তদন্ত এবং নজরদারি রাখার দাবি জানান রংপুরের ভুক্তভোগী ক্ষতিগ্রস্ত চামড়া ব্যবসায়ীরা। সেই সাথে চামড়াশিল্পে ওয়েটব্লু চালু করা হলে পুনরায় এই শিল্পের হারানো গৌরব ফিরে আসবে বলে চামড়া ব্যবসায়ীরা আশা করেন।
রংপুর জেলা প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, এ বছর জেলায় প্রায় আড়াই লাখ গরু, মহিষ এবং ছাগল কুরবানি দেয়া হয়েছে। এসব কুরবানির প্রাণীর চামড়া গুটিকতক ব্যবসায়ীর মধ্যেই পানির দরে কেনাবেচা সীমাবদ্ধ ছিল। সরকারের বেঁধে দেয়া প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত গরুর চামড়া ৬২ টাকা আর ছাগলের চামড়া ৩০ টাকা নির্ধারণ করলেও, এই দামে কেউ চামড়া ক্রয় করেনি। বরং প্রতি পিস গরুর চামড়া ২০০ থেকে ৩০০ টাকায় এবং ছাগলের চামড়া বিনামূল্যে দিতে হয়েছে। এসব দেখারও যেন কেউ ছিল না। ফলে ধরা খেয়েছে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দরিদ্র অসহয় মানুষ আর মাদরাসা ও এতিমখানার প্রত্যাশিত সুবিধাভোগীরা। সিন্ডিকেটের কাছে মার খেয়েছে গরিবের হক। গেল কুরবানির মৌসুমের তরুণ উদ্যোক্ত রাশেদুজ্জামান সিন্ডিকেটের ফাঁদে লোকসান গুনেছেন ৮৫ হাজার টাকা। এমন নির্দয় ফাঁদে পড়ে অনেকেই এ ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন।
রংপুর নগরীর শতবর্ষী চামড়া ব্যবসা কেন্দ্র শাপলা চত্বর চামড়াপট্টিতে একসময় ছোট-বড় শতাধিক ব্যবসায়ী এ চামড়া ব্যবসায় নিয়োজিত ছিল। ব্যবসার ভয়াবহ বির্পযয়ে এখন ৫/৬ জনে নেমে এসেছে। এখানে বর্তমানে ৩/৪টি গুদামে চামড়ার ব্যবসা ছাড়া প্রায় ৩০/৩৫টি দোকানের মধ্যে অটোরিকশা ও এর যন্ত্রাংশ এবং আসবাবপত্র ব্যবসায় গড়ে উঠেছে। মৌসুম এলেই কিছু চামড়া ব্যবসায়ীর আগমন ঘটে।
কথা হলো রংপুর চামড়া ব্যসায়ী সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ আফজাল হোসেনের সাথে। তিনি দুঃখ করে জানান, রংপুরের বাজারে কুরবানির ঈদের মৌসুুমে গরু-ছাগল মিলে ৩০ থেকে ৩৫ হাজার এবং জেলার ৮ উপজেলায় অন্তঃত ২ লাখের বেশি প্রাণীর চামড়া আমদানি হয়ে থাকে। এছাড়া সারা বছর গোটা জেলায় প্রায় ১০ থেকে ১২ লাখ প্রাণীর চামড়া আমদানি হয়। তবে চামড়ার দাম না থাকায় অনেকে মনের কষ্টে সেসব মূল্যবান সম্পদ মাটিতে পুঁতে রেখেছে। এর সাথে আর এক বিপর্যয় ছিল ল্যাম্পিং ডিজিজ যুক্ত প্রাণীর চামড়া যার ঘনত্ব কম। এবারে অন্তত ৪০ শতাংশ চামড়া এই মানের পাওয়া গেছে। ফলে দাম ছিল খুবই কম। বাজারের নিম্নমানের গবাদিপশু খাদ্যের কারণে এ রোগে আক্রান্তের শঙ্কা বেশি থাকে। তিনি জানান, রংপুর অঞ্চলের প্রাণীর চামড়াজাতপণ্য ভৌগোলিক এবং আবহাওয়ার কারণেই এর ঘনত্ব বেশি থাকায় এসব চামড়া খুবই উন্নতমানের হয়। দামও বেশ ভালো পাওয়া যায়।
শাপলা চত্বর চামড়াপট্টি এলাকার ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী মোখলেছুর রহমান জানান, এবারের কুরবানির মৌসুমে প্রায় ১২শ’ চামড়া ক্রয় করেছেন, তবে দাম না পাওয়ায় লোকসান গুনতে হয়েছে। হাতেগোনা কয়েকজন বাপ-দাদার এই ব্যবসা ধরে রেখেছে। হাতগুটিয়ে বসে থাকা কয়েকজন ক্ষুদ্র চামড়া ব্যবসায়ী অভিযোগ করেন, ঢাকার ট্যানারি মালিকরা সিন্ডিকেট করে বছরের পর বছর ধরে টাকা বকেয়া রেখে তাদের পথে বসিয়ে দিয়েছেন। এখন হাতেগোনা ১০/১২ জন জড়িত আছেন। একই এলাকার একসময়ের প্রতিষ্ঠিত চামড়া ব্যবসায়ী মাহবুবার রহমান বেলাল জানান, ওয়েটব্লুসহ স্থানীয়ভাবে চামড়া সংরক্ষণের অত্যাধুনিক ব্যবস্থা না থাকায় এবারে তিনি তার ব্যবসার গুদামে দরজাই খোলেননি। তবে কুরবানির ঈদের মৌসুমে কিছু গরু ছাগলের চামড়া ক্রয় করেছেন। ইতোমধ্যে ব্যবসার গতি পরিবর্তন করে তিনি অটোরিকশার ব্যবসা শুরু করেছেন। চামড়া ব্যবসায়ীদের দাবি দেশে সিন্ডিকেটমুক্ত ব্যাপকভাবে ওয়েটব্লু, ক্রাস্ট এবং ফিনিশিং লেদার প্রসেস চালু করা সম্ভব হলে চামড়া শিল্পের দুর্ভোগ লাঘব হবে। এর মাধ্যমে চামড়ার জুতা, স্যান্ডেল, সুটকেস উৎপাদন করা হলে একদিকে শত শত কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় হবে। অপরদিকে দেশীয় শিল্প সমৃদ্ধ হবে। এছাড়া এই শিল্পকে বাঁচাতে হলে ব্যবসায়ীদের বকেয়া টাকা আদায়ের ব্যবস্থা করার পাশাপাশি সরকারিভাবে লাগসই নীতিমালা প্রণয়ন করে সিন্ডিকেটমুক্ত যুগোপযোগী চামড়াশিল্প ব্যবস্থাপনা গড়ে তুলতে হবে। এ লক্ষ্যে জাতীয় চামড়া বোর্ড গঠন করার বিষয়ে গুরুত্বারোপ করেন ব্যবসায়ীরা।