কাগজে-কলমে নগরীর অংশ হলেও সুবিধাবঞ্চিত নতুন এলাকার বাসিন্দারা
৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১২:৩৯
মিনাজুল ইসলাম মিজান, বগুড়া : ১৮৭৬ সালের ১ জুলাই ব্রিটিশ আমলে প্রতিষ্ঠিত বগুড়া পৌরসভা বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের অন্যতম প্রাচীন, ঐতিহ্যবাহী এবং সর্ববৃহৎ স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান ছিল। ঐতিহাসিক করতোয়া নদীর দুই তীরে গড়ে ওঠা এই নগরীটি উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবেও পরিচিত। ১.২৫ বর্গমাইল আয়তন এবং মাত্র ৭,০০০ জনসংখ্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই পৌরসভাটি দীর্ঘ দেড়শ বছরে এক বিশাল মহানগরে পরিণত হয়েছে। ১৯৮১ সালের ১ আগস্ট এটি ‘ক’ শ্রেণির পৌরসভায় উন্নীত হয় এবং পরবর্তীতে ২০০৬ সালে এর সীমানা ব্যাপকভাবে প্রসারিত করা হয়। বিলুপ্তির পূর্ব পর্যন্ত এই পৌরসভার মোট আয়তন ছিল ৬৯.৫৬ বর্গকিলোমিটার এবং এটিই ছিল বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় আয়তনের পৌরসভা।
প্রশাসনিক কাজের সুবিধার্থে দীর্ঘকাল ধরে পৌরসভাটি ২১টি ওয়ার্ডে বিভক্ত ছিল। ২০২২ সালের সর্বশেষ জনশুমারি অনুযায়ী, এই পৌর এলাকার মোট জনসংখ্যা প্রায় ৪,৮৬,০১৬ জন এবং এখানে হোল্ডিং সংখ্যা রয়েছে ৯৩,৩৫১টি। ভৌগোলিক ও ঐতিহাসিকভাবে এই অঞ্চলটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি প্রাচীন পুণ্ড্রবর্ধনের রাজধানী মহাস্থানগড়ের প্রবেশদ্বার। অর্থনৈতিকভাবেও এই নগরী অত্যন্ত সমৃদ্ধ। বিশেষ করে কৃষি যন্ত্রপাতি প্রস্তুত শিল্প, লাল মরিচ এবং বিশ্বখ্যাত ‘বগুড়ার দই’ উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবে এই পৌর এলাকাটি দেশ-বিদেশে সমাদৃত।
বিশাল জনসংখ্যা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা এবং ক্রমবর্ধমান নাগরিক চাহিদার বিষয়টি বিবেচনা করে দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সম্প্রতি ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে এক ঐতিহাসিক সরকারি ঘোষণার মাধ্যমে ১৫০ বছরের পুরনো বগুড়া পৌরসভাকে বিলুপ্ত করা হয়। একইসাথে একে দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন অর্থাৎ ‘বগুড়া সিটি করপোরেশন’ হিসেবে উন্নীতকরণের আনুষ্ঠানিক গেজেট প্রকাশ করা হয়। পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে এই রূপান্তর উত্তরবঙ্গের সামগ্রিক নগর অবকাঠামো, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং নাগরিক জীবনযাত্রার মানোন্নয়নে এক নতুন যুগের সূচনা করেছে।
দীর্ঘদিনের উন্নয়ন বৈষম্য দূর করে বগুড়াকে একটি আধুনিক, পরিচ্ছন্ন, পরিকল্পিত ও নাগরিকবান্ধব মহানগর হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে নবাগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের ২০২৬-২০২৭ অর্থ বছরের জন্য ১,৪১৭ কোটি ৪৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৯৭ টাকা বাজেট ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্প ও সহায়তার জন্য প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে।
বগুড়া শহর থেকে প্রায় ১৩-১৫ কিলোমিটার উত্তরে করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত বাংলাদেশের প্রাচীনতম নগরী (পণ্ড্রগর)। এখানে মৌর্য, গুপ্ত ও পাল আমলের বহু নিদর্শন এখানে পাওয়া গেছে। এর মধ্যে গোবিন্দ ভিটা, শাহ সুলতান বলখীর মাহিসওয়ার র. মাজার, মহাস্থান জাদুঘর, বেহুলার বাসর ঘর উল্লেখযোগ্য। বগুড়ার ঐতিহাসিক আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠ জেলা শহরের কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত একটি অত্যন্ত পরিচিত ও ঐতিহ্যবাহী জনসমাগমস্থল। এখানে স্থানীয় খেলাধুলা, বড় রাজনৈতিক সমাবেশ, সামাজিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন মেলা আয়োজনের জন্য এই মাঠটি বহু বছর ধরে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। বগুড়ার ইতিহাস ও সংস্কৃতির সাথে মাঠটি গভীরভাবে মিশে আছে।
বগুড়া হচ্ছে বাংলাদেশের উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার এবং অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক ও শিল্প শহর। ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এই অঞ্চলটি যোগাযোগের দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় সরকার এবং বিভিন্ন নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে বগুড়ার অবকাঠামোগত ব্যাপক আধুনিকীকরণ ও মেগা প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সড়ক যোগাযোগ, রেল যোগাযোগ, আকাশপথ, আন্তর্জাতিকমানের বিমানবন্দর স্থাপন।
বগুড়া পৌরসভা থেকে উন্নীত হয়ে সদ্য গঠিত সিটি করপোরেশন ৬০০ কোটি টাকার প্রাথমিক উন্নয়ন পরিকল্পনা নিয়ে তাদের কার্যক্রম এগিয়ে নিচ্ছে। প্রধান উন্নয়ন ও পরিকল্পনা কার্যক্রমগুলো হলো— জলাবদ্ধতা নিরসন, অবকাঠামো উন্নয়ন, ওয়াসা গঠন, যানজট ও নিরাপত্তা, নাগরিক সেবা।
১৩তম এ সিটি করপোরেশন গঠনের পর নাগরিকদের অভিযোগ দিনে দিনে বাড়ছে। এ সিটি করপোরেশনের বর্ধিত এলাকায় নাগরিক সুবিধা বাড়েনি, বেড়েছে শুধু করহার— এমন অভিযোগ বাসিন্দাদের। তবে বর্ধিতকরণের কাজটি পৌরসভা থাকাবস্থায় ২০০৬ সালে করা হয়। সেসময় ১৪ বর্গকিলোমিটার থেকে বাড়িয়ে প্রায় ৭০ বর্গকিলোমিটার করা হয় পৌরসভার আয়তন, যা এখন সিটি করপোরোশন এলাকা হিসেবে গণ্য। বর্ধিত এলাকাগুলো কাগজে-কলমে শহরের অংশ হলেও বাস্তবে এলাকাগুলোর বড় অংশ এখনো নগর সুবিধা থেকে বঞ্চিত। এসব এলাকার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- সদর ও শাজাহানপুর উপজেলার দুটি ইউনিয়ন এবং ছয়টি ইউনিয়নের অংশ যুক্ত করে ১২ থেকে বাড়িয়ে ২১টি ওয়ার্ড করা এলাকা।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৭০ বর্গকিলোমিটারের মধ্যে প্রায় ৫৬ বর্গকিলোমিটার এলাকায় কার্যকর ড্রেনেজ ব্যবস্থা নেই। মোট সড়কের ২৫ শতাংশ এখনো কাঁচা। অন্তত ৫৫ শতাংশ এলাকায় নেই সড়কবাতি। নগরবাসীর প্রত্যাশা নির্বাচিত প্রতিনিধিরা নবগঠিত এ নগরীর দায়িত্বভার নিলে হয়তো সমস্যাগুলোর সমাধান দ্রুতই হবে। সিটি করপোরেশেন গঠনের পর প্রথম নগরপিতা কে হবেন তা নিয়েও সর্বমহলে আলোচনা চলছে।
দেশের ১৩তম সিটি করপোরেশন বগুড়ার (বসিক) প্রথম সাধারণ নির্বাচনে কারা মেয়র প্রার্থী হচ্ছেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক দল ও সর্বস্তরের মানুষের মধ্যে এরই মাঝে জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। এখনো নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা না হলেও সম্ভাব্য প্রার্থীরা প্রাক-প্রচারণা শুরু করেছেন। এক্ষেত্রে বিএনপি কারো নাম ঘোষণা না দিলেও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে বর্তমান প্রশাসক ও জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি এমআর ইসলামকে মনে করা হচ্ছে।
অপরদিকে প্রধান বিরোধীদল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী প্রার্থী হিসেবে মহানগরী সেক্রেটারি ও বগুড়া সরকারি আজিজুল হক কলেজ ছাত্র সংসদের (আকসু) সাবেক জিএস আ.স.ম আব্দুল মালেককে চূড়ান্ত করেছে। এছাড়া আর কোনো সম্ভাব্য প্রার্থীর নাম এখনো আলোচনায় নেই। তবে ২১টি সাধারণ ওয়ার্ড ও ৭টি সংরক্ষিত ওয়ার্ডের সম্ভাব্য কাউন্সিলর প্রার্থীরা নানা সামাজিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে প্রাক-প্রচারণা চালাচ্ছেন। সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী বগুড়া সিটি করপোরেশনের মোট ভোটার সংখ্যা তিন লাখের বেশি।
জুয়েলারি ব্যবসায়ী আবুল কালাম আজাদ বলেন, বগুড়া পৌরসভা থেকে সিটি করপোরেশনে উন্নীত হওয়ায় এই অঞ্চলের অবকাঠামোগত উন্নয়ন দ্রুত গতিতে হবে। এর ফলে বগুড়াকে কেন্দ্র করে পুরো উত্তরাঞ্চলের বাণিজ্যের প্রসার ঘটবে। শিল্প কারখানার স্থাপন হলে এ অঞ্চলের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশাল ভিত গড়ে উঠবে।
বগুড়াকে সিটি করপোরেশন ঘোষণা করার পড় থেকে রিকশা বা ব্যাটারিচালিত রিকশাচালকদের প্রধান ভয় হলো, তাদের প্রধান সড়কগুলো থেকে উচ্ছেদ করা হতে পারে। তবে সরকারের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, সিটি করপোরেশন ও পৌরসভার অধীনে ই-রিকশাকে নিবন্ধনের আওতায় আনার যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, তাকে তারা স্বাগত জানিয়েছেন। তারা চান কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী বা দালালের হয়রানি ছাড়া সরাসরি যেন চালকরা এই নিবন্ধন বা লাইসেন্স সুবিধা পান।
বগুড়া মহানগর জামায়াতের সেক্রেটারি আ.স.ম আব্দুল মালেক বলেন, দীর্ঘদিন বগুড়া উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিলো। নবগঠিত বগুড়া সিটি করপোরেশনের মাধ্যমে মানুষ তাদের সেবা এবার যথাযথভাবে পাবে।
বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন বলেন, শহরের সবচেয়ে বড় সমস্যা এখন যানজট ও জলাবদ্ধতা। এ দুটি সমস্যাকে সামনে রেখে প্রথম পর্যায়ে ড্রেনেজ ব্যবস্থার উন্নয়ন, ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এবং ফুটপাত উদ্ধার কার্যক্রম চালানো হবে।