সন্তান লালন-পালনে পিতা-মাতার প্রতি মুহাম্মদ সা.-এর ছয়টি শিক্ষা


৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:২৬

॥ আবু জায়েদ আনসারী ॥
ইসলামে পারিবারিক সম্পর্কের ওপর ব্যাপক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। আধুনিক সমাজেও পরিবারকে দেখা হয় বিশ্বস্ত ও কার্যকর সমাজের ভিত্তি হিসেবে। এটি বলতে দ্বিধা নেই যে, পারিবারিক ব্যবস্থা ভেঙে পড়লে সমাজের কাঠামোই দুর্বল হয়ে যাবে। শিশুরা পারিবারিক পরিবেশের মধ্য দিয়েই ইসলামের মূল্যবোধ এবং নীতি-নৈতিকতার সাথে পরিচিত হয় এবং নিজের জীবনে মানিয়ে নিতে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। এর মাধ্যমে তারা বড় হয়ে কেবল মুসলিম হিসেবে নিজেকে পরিচিত করে না, বরং আল্লাহর অনুগত বান্দা ও ভালো মানুষ হিসেবেও পৃথিবীতে অবদান রাখে।
অভিভাবকত্ব সবসময়ই চ্যালেঞ্জিং, কিন্তু এই পরিবর্তনশীল এবং অনিশ্চিত সময়ে এ দায়িত্ব পালন আরও বেশি চ্যালেঞ্জিং হয়ে পড়েছে। এ সময়ে আগামী প্রজন্মের মুসলিম শিশুদের কীভাবে লালন-পালন এবং শিক্ষিত করা যায় তা নিয়ে বাবা-মায়েদের উদ্বেগের শেষ নাই, উদ্বিগ্ন হওয়াটাই স্বাভাবিক। আমাদের শিশুরা বড় হওয়ার সাথে সাথে নানা আধুনিক চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হচ্ছে। এজন্য আমাদের শিশুরা যাতে বাস্তব জীবনের জটিলতা এবং কঠিন পরিস্থিতি সামলিয়ে সঠিকভাবে লক্ষ্যপানে অগ্রসর হতে পারে, সেজন্য এই সময়ে তাদের পাশে থাকাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। অভিভাবক হিসেবে আমরা যেন অবশ্যই তাদের পাশে থাকি। চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে সন্তানদের গড়ে তোলার জন্য বাবা-মায়ের এই দায়িত্ব পালনের দিকনির্দেশনা পাওয়া যায় আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মদ সা.-এর জীবনীতে। তাঁর জীবনী হচ্ছে আমাদের জন্য নিখুঁত আদর্শ ও দিকনির্দেশনা, অসংখ্য হাদিসে যা উঠে এসেছে।
নবী কারীম সা. সর্বদা তাঁর জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে মানবিক আচরণের একটি চমৎকার উদাহরণ ছিলেন, যা আজও স্বীকৃত এবং কিয়ামত পর্যন্ত তা জারি থাকবে। সন্তান লালন-পালনের ক্ষেত্রে পিতা হিসেবেও কোনো ব্যতিক্রম ছিল না তাঁর জীবনীতে। বিভিন্ন হাদিসে বর্ণিত নবীর সা. কথা ও কাজের বর্ণনা থেকে আমরা অমূল্য সেই জ্ঞানই পাই, যা আমাদের তাঁর মহৎ আচরণ অনুকরণ করতে সাহায্য করতে পারে। পিতা-মাতা হিসেবে অভিভাবকত্বের বিষয়ে একটি হাদিস আমাদের জীবনে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ এবং অর্থবহ। এই হাদিস থেকে আমরা অভিভাবকত্বের অনেক শিক্ষা গ্রহণ করতে পারি।
হযরত আনাস রা. থেকে বর্ণিত, “মানুষের মধ্যে আল্লাহর রাসূলের স্বভাব ছিল সর্বোত্তম। একদিন তিনি আমাকে একটি কাজে পাঠালেন এবং সেসময় আমি বলেছিলাম, ‘আল্লাহর কসম, আমি যাব না,’ কিন্তু আমার মনে মনে সিদ্ধান্ত ছিল যে, আল্লাহর রাসূল আমাকে যেমন আদেশ করেছেন, আমি তেমনই করব। আমি যেতে যেতে রাস্তায় কিছু শিশুকে খেলতে দেখলাম, তারপর আল্লাহর রাসূল এলেন এবং পেছন থেকে আমার ঘাড়ে হাত রাখলেন। আমি তাঁর দিকে তাকাতেই দেখলাম তিনি হাসছেন এবং বললেন, ‘উনায়স, আমি তোমাকে যেখানে যেতে বলেছিলাম, তুমি কি সেখানে গিয়েছিলে?’ আমি বললাম, ‘হে আল্লাহর রাসূল, হ্যাঁ, আমি যাচ্ছি’।”
এটি সুপ্রতিষ্ঠিত যে, নবী সা. যার সাথেই কথা বলতেন, তার সাথেই আধ্যাত্মিক ও আবেগসহ কথা বলতে পারতেন। যার সাথেই তিনি আলাপ করতেন, তিনি তার মন, হৃদয় ও আত্মাকে স্পর্শ করতেন। উল্লেখিত হাদিস থেকে আমরা ছয়টি শিক্ষা নিতে পারি। আর এসব শিক্ষা মূলত শিশুদের ওহীর উষ্ণতা, ভালোবাসা ও বিশ্বাসী হিসেবে গড়ে তোলার পথনির্দেশিকা ও উপদেশ। উপরোক্ত হাদিস থেকে অনেকগুলো শিক্ষা রয়েছে। সেগুলো তুলে ধরা হলো—
এক. শিশুদের জোর নয়, সহানুভূতি ও ধৈর্যের সাথে সম্পৃক্ত করা
সাধারণত শিশুরা পারিবারিক কাজের প্রতি বেশি আগ্রহ দেখায় না, যা সহজাত। হাদিস বর্ণনাকারী শিশু আনাস রা. সেসময় খুব ছোট ছিল। তাই যখন প্রথমবার তাকে কাজটি করতে বলা হয়, তখন সে প্রাথমিকভাবে তার অনিচ্ছা প্রকাশ করে বলে, ‘আল্লাহর শপথ, আমি যাব না।’ এই প্রতিক্রিয়া প্রতিটি শিশুর জন্যই স্বাভাবিক। যদিও এটি সন্দেহাতীতভাবে গুরুত্বপূর্ণ যে, শিশুরা বাড়ির কাজে অবদান রাখে, তবুও শিশুদের বাড়ির কাজগুলোয় জোর না করে সহানুভূতি এবং ধৈর্যের সঙ্গে সম্পৃক্ত করা গুরুত্বপূর্ণ।
দুই. গভীর সম্পর্ক শিশুদের লালন-পালনে সহায়ক
সন্তানদের সাথে পিতা-মাতার একটি স্থিতিশীল সম্পর্ক আনুগত্য ও বোঝাপড়াকে উৎসাহিত করে। যদিও আনাস রা. বিশেষভাবে কাজটি করতে চায়নি, তবুও তিনি নবীর সা. অনুরোধমতো কাজটি করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন। এটি সম্ভব হয়েছে তাদের সম্পর্কটি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসার ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠার কারণে। আমাদের নিজেদের বাড়িতেও যদি আমাদের সন্তানদের সঙ্গে গভীর ও দৃঢ় সম্পর্ক থাকে, তাহলে তারা আমাদের সিদ্ধান্তগুলো মেনে চলার সম্ভাবনা বেশি থাকবে। এজন্য প্রত্যেক অভিভাবকের উচিত হাদিসটির আমল করা।
তিন. শিশুদের কৌতূহলী মনকে বুঝতে হবে
প্রতিটি শিশু অত্যন্ত কৌতূহলী এবং সহজেই তাদের মনোযোগ অন্য দিকে চলে যায়। হযরত আনাস রা.-এর ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম নয়। যদিও আনাস রা. তাকে করতে বলা কাজটি করার জন্য মনস্থির করেছিল, রাস্তায় শিশুদের খেলতে দেখে তার মনোযোগ হারিয়ে ফেলেছিল। এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি অসংখ্যবার হয়ে থাকেন বাবা-মায়েরা। এ সময় এটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ যে, আমাদের সন্তানরা যখন এমন করে, তখন আমরা যেন হতাশ বা রাগান্বিত না হই। কারণ অভিভাবকদের অবশ্যই বুঝতে হবে শিশুরা যখন এমন করে, তখন তারা ইচ্ছাকৃতভাবে অবাধ্য হয় না— এটি তাদের স্বাভাবিক কৌতূহল এবং সীমিত মনোযোগের কারণে তারা সহজেই কোনো কাজ শেষ করতে ভুলে যেতে পারে।
চার. শিশুরা অন্যমনস্ক হলেই রাগ করা উচিত নয়
শিশুরা কখনো অন্যমনস্ক হয়ে গেলেই পিতা-মাতার রাগ করা উচিত নয়। কারণ যখন নবী সা. দেখলেন যে আনাস রা. অন্যমনস্ক হয়ে কাজ ভুলে রাস্তায় খেলছেন, তখন তাঁর প্রতিক্রিয়াটি ছিল সুন্দর। আনাসকে খেলতে দেখে তিনি হাসলেন। কারণ নবী সা. বুঝতে পেরেছিলেন যে, এই পরিস্থিতিতে তাঁর প্রতিক্রিয়া আনাসের প্রতিক্রিয়ার ওপর প্রচণ্ড নেতিবাচক আকারে প্রভাব ফেলতে পারে। এই ঘটনা থেকে আমরা আমাদের সন্তানদের ক্ষেত্রে এমন পরিস্থিতিতে ধৈর্যধারণের শিক্ষা নিতে পারি। কারণ ইতিবাচকতা কেবল ইতিবাচকতার দিকেই নিয়ে যায় এবং এর ফলে আমাদের সন্তানরা আমাদের উপদেশ গ্রহণে আরও বেশি আগ্রহী হবে, ইনশাআল্লাহ।
পাঁচ. অপমানজনক ভাষায় শিশুদের সাথে কথা না বলা
শিশুদের সাথে কখনোই অপমানজনক বা অবমাননাকর ভাষায় কথা বলা উচিত নয় অভিভাবকদের। অনেক সময় শিশুদের হতাশার মুহূর্তে আমরা এমন শব্দ বা বাক্য ব্যবহার করে ফেলি, যা আমাদের সন্তানদের বিচলিত, নিরুৎসাহিত এবং দূরে ঠেলে দিতে পারে। যখন আনাস অন্যমনস্ক হয়ে পড়তেন, তখন নবী সা. তাঁকে ‘উনায়স’ নামে ডাকতেন। এটি ‘আনাস’ নামের একটি স্নেহপূর্ণ ও আদুরে ক্ষুদ্র রূপ, যা আনাসকে তাৎক্ষণিকভাবে আশ্বস্ত করেছিল যে, নবী সা. তার ওপর অসন্তুষ্ট বা রাগান্বিত নন।
ছয়. অনুমান নির্ভর হয়ে সন্তানদের সাথে আচরণ বা সিদ্ধান্ত নয়
কোনো বিষয়ে অনুমাননির্ভর হয়ে সন্তানদের সম্পর্কে ভুল সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেয়া উচিত নয়। আনাসকে তিরস্কার করার পরিবর্তে নবী সা. তাকে শুধু নিজের ভুলের ব্যাখ্যা দেওয়ারই নয়, বরং নিজের উদ্যোগে পরিস্থিতি সমাধানেরও সুযোগ দিয়েছিলেন। আনাসকে নিজের জন্য সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার স্বাধীনতা দেওয়া হয়েছিল এবং তিনি তাই করেছিলেন। এজন্য আমাদের সন্তানদের ক্ষেত্রেও তাৎক্ষণিক তিরস্কার করে অস্বস্তিকর পরিস্থিতি তৈরি করার পরিবর্তে আমরা বরং তাদের নিজেদের ভুল শুধরে নেওয়ার সুযোগ দিতে পারি।
ইসলামের সৌন্দর্য হলো সবচেয়ে সাধারণ কথাবার্তা বা কাজের মধ্যেও গভীর অর্থ এবং উদ্দেশ্য থাকা। এই হাদিসে প্রতিটি পিতা-মাতার জন্য অমূল্য এমনই সব জ্ঞানমুক্তা রয়েছে। যারা সন্তানদের সঠিক পথে রাখতে চায় তাদের জানতে হবে কীভাবে শিশুদের সাথে যোগাযোগ স্থাপন করতে হয়, যা তারা বুঝতে পারে এবং সম্পর্ক তৈরি করতে পারে। এই হাদিসটি ইসলামের পূর্ণাঙ্গ ও স্নেহময় পিতা-মাতার অভিভাবকত্বের দৃষ্টিভঙ্গির একটি চমৎকার উদাহরণ। কারণ হাদিসটি প্রমাণ করে যে, নবী মুহাম্মদ সা. শিশুদের মানসিক ও আবেগীয় মুহূর্তগুলো বা চাহিদাগুলো স্বাভাবিকভাবে বুঝতেন এবং সে অনুযায়ী আচরণ করতেন। যার মাধ্যমে একটি আদর্শ প্রজন্ম ও সমাজ বিনির্মাণ সম্ভব।
সূত্র : ইসলাম২১সি.কম থেকে নূর চৌধুরীর লেখা ইংরেজি নিবন্ধ অবলম্বনে।