মানবতাবাদী নজরুল
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪৬
॥ আসাদুজ্জামান খান মুকুল ॥
মানবসভ্যতার রন্ধ্রে রন্ধ্রে যখন জমে ওঠে স্থবিরতা, সমাজ দংশিত হয় বৈষম্যের বিষে, মানুষের চিন্তা-চেতনা যায় অনিশ্চয়তার গহ্বরে, ঠিক তখনই ইতিহাসে আবির্ভাব ঘটে এমন কিছু ব্যতিক্রমী সত্তার— যারা সময়ের প্রয়োজন মেটাতে সবকিছুকে ভেঙে গড়ে তোলেন নতুনভাবে। স্থান করে নেন মানুষের হৃদয়ে। আর অন্ধকারে নিমজ্জিত মানুষের ভেতরে ছড়িয়ে দেন নতুন ভোরের আলো। কাজী নজরুল ইসলাম তেমনি এক দুর্দম কবি। তিনি কেবল কবিতায় নয়, চিন্তা-চেতনায়, দর্শনে মানুষের মাঝে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন।
তার কবিতা শব্দের খেলায় সীমাবদ্ধ নয়, ছিল তা সংগ্রামী আত্মার উন্মেষ। বিদ্রোহ ছিল তার রক্তে, প্রেম প্রবাহিত হতো প্রতিটি ধমনীতে আর মানবতার স্থান ছিল হৃদয়ের কেন্দ্রে। নজরুলের সেই বিখ্যাত ঘোষণা, ‘আমি চির-বিদ্রোহী বীর- বিশ্ব ছাড়ায়ে উঠিয়াছি একা চির-উন্নত মম শির!’
এতে বজ্রনিনাদ ও আত্মমুক্তির স্বর ধ্বনিত হয়। তিনি অন্ধকারে ভিতর থেকেই আলোর প্রকৃত মূল্য উপলব্ধি করতে পেরেছেন এবং সেই আলোই তিনি খুঁজছেন মানুষের হৃদয়ে।
নজরুলের মানবতাবাদ ও ব্যক্তি স্বাধীনতার দার্শনিক চিন্তাধারার কেন্দ্র বিন্দুতে রয়েছে মানুষ, তার অস্তিত্ব, মর্যাদা ও সম্ভাবনা। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের প্রকৃত ধর্ম হলো তার মানবতা। তাই তিনি বলেছেন, ‘গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।’
এই একটি মাত্র পঙক্তিতে অনুমেয় হয় নজরুলের মৌল দর্শনে জাত, ধর্ম, বর্ণ বা শ্রেণির ঊর্ধ্বে রয়েছে একটি স্বাধীন সত্তা মানুষ। এই মানবিক চেতনা তাকে করে তুলেছে সময়ের তুলনায় অনেক বেশি আধুনিক ও অগ্রগামী।
নজরুলের কাছে মানুষ ছিল মানুষের পরিচয়ের সবচেয়ে বড় পরিচয়। একজন মানুষ কোন ধর্মের, কোন জাতের বা কোন শ্রেণির, তা দিয়ে তার মর্যাদা নির্ধারিত হতে পারে না। মানুষের দুঃখে পাশে দাঁড়ানো, অন্যায়ের প্রতিবাদ করা এবং অসহায় মানুষের মুখে হাসি ফোটানোই তার কাছে ছিল বড় কথা। এ কারণেই তার লেখায় ধনী-গরিব, শ্রমিক-কৃষক, নারী-পুরুষ এবং নানা ধর্মের মানুষের কথা বারবার উঠে এসেছে। তিনি চেয়েছেন এমন একটি সমাজ, যেখানে কেউ অবহেলিত থাকবে না এবং কেউ অন্যের অধিকার কেড়ে নিয়ে বড় হয়ে উঠবে না।
সাম্য ও শ্রেণি নিরপেক্ষতায় নজরুলের বিশ্বাস ছিল অটল। তিনি মনে করতেন দারিদ্র্য ও শোষণ শুধু মাত্র আর্থিক সমস্যা নয়, এটি একটি গভীর নৈতিক সংকট। তাই তিনি লিখেছেন, ‘আমি সেইদিন মানবের জয়গান গাইব, যে দিন নিপীড়িত মানুষ গাইবে বিজয়ের গান।’
এই পঙক্তি সমাজতান্ত্রিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হলেও নজরুল কোনো একক মতবাদের অনুগামী ছিলেন না। তার সাম্যবাদ ছিল জীবন ঘনিষ্ঠ এক অন্তর্জাগতিক চেতনার প্রকাশ। এতে করে মানুষ শোষকের মুখোশ খুলে নিজের শক্তি আবিষ্কার করে।
কবি নজরুল মুসলমান হলেও ধর্মনিরপেক্ষতা ও আন্তঃধর্মীয় সংহতির এক উদার মননে বিশ্বাসী ছিলেন। তার লেখায় আমরা দেখি গীতা, বাইবেল, ত্রিপিটক, ও বেদের বাণীকে সমান মর্যাদায় তুলে ধরা হয়েছে। তিনি ধর্মকে দেখেছেন আত্মশুদ্ধির পথ হিসেবে। কখনোই ক্ষমতার হাতিয়ার হিসেবে নয়।
‘মোরা এক বৃন্তে দুটি কুসুম হিন্দু-মুসলমান, মুসলিম তার নয়ন-মণি, হিন্দু তাহার প্রাণ।’
এই পঙক্তিতে নজরুল শুধু সাম্প্রদায়িক বিভক্তির প্রতিবাদ করেননি, রচনা করেছেন বাঙালির নিজস্ব ধর্ম নিরপেক্ষ দৃষ্টিভঙ্গি।
ধর্মের নামে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরি করা নজরুল কখনো মেনে নিতে পারেননি। তার কাছে মসজিদ, মন্দির বা অন্য কোনো উপাসনালয়ের চেয়ে মানুষের জীবন ও ভালোবাসার মূল্য ছিল বড়। তাই তার সাহিত্য পড়লে দেখা যায়, তিনি কখনো ইসলামী ঐতিহ্য থেকে উপাদান নিয়েছেন, আবার কখনো হিন্দু পুরাণ ও সংস্কৃতির নানা অনুষঙ্গ ব্যবহার করেছেন। এতে কোনো বিরোধ তিনি দেখেননি। বরং তিনি মনে করেছেন, নানা পথ থাকলেও মানুষের মিলনের জায়গাটি এক। এই উদারতা আজও আমাদের সমাজের জন্য খুব প্রয়োজন।
প্রেম ও সৌন্দর্যের দর্শনেও নজরুল সীমাবদ্ধ ছিলেন না রূপ ও রোমান্টিকতায়। তার প্রেম বিস্তৃত হয়েছিল আত্মা, প্রকৃতি ও ঈশ্বর পর্যন্ত। তিনি বিশ্বাস করতেন প্রেমের আবেশ মানুষকে বৃহত্তর এক অস্তিত্বের দিকে আহ্বান জানায়। প্রেম হয়ে ওঠে আলোকবর্তিকা। ইহাই অন্ধকারকে ভেদ করে।
নজরুলের দ্রোহ শুধু রাজনৈতিক ছিল না, ছিল অস্তিত্বগত। তিনি বিদ্রোহ করেছেন মিথ্যা, ভণ্ডামি, কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে, রক্তচোষা সামন্ততন্ত্রের বিরুদ্ধে, নারীর অবমাননা বিরুদ্ধে। তার কবিতা ‘বিদ্রোহী’ শুধু একটি কবিতা নয়, এটি এক আত্মঘোষণা। মানব মুক্তির লড়াই।
এই পঙক্তি তার দর্শনের অন্যতম ভিত্তি।
নজরুলের মানবতাবাদে নারীর মর্যাদার বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। তিনি নারীকে দুর্বল বা শুধু ঘরের মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো সত্তা হিসেবে দেখেননি। তার লেখায় নারী কখনো মা, কখনো প্রেমিকা, কখনো সংগ্রামী মানুষ হিসেবে উঠে এসেছে। তিনি চেয়েছেন নারীও সমাজে পুরুষের মতো সম্মান ও অধিকার নিয়ে বাঁচুক। মানুষের মুক্তি তখনই পূর্ণ হবে, যখন নারী-পুরুষ উভয়েই সমান মর্যাদা পাবে। এই চিন্তাও তার মানবতাবাদী দর্শনের একটি বড় দিক।
নজরুল উপলব্ধি করেছিলেন, মানুষের আত্মবোধ ও চেতনার মুক্তি না হলে সমাজের মুক্তি সম্ভব নয়। তাই তিনি নিজের ভেতরেই অস্থিরতা, পাগলামি, প্রেম, প্রতিবাদ সবকিছুকেই একত্রে প্রকাশ করেছেন সাহিত্যে। এই আত্মমর্যাদাবোধের প্রকাশ আমরা পাই তার কবিতা, গান, গল্প, সঙ্গীতে; এমনকি তার নীরবতায়, অসুস্থতায়। তার বাকরুদ্ধ অবস্থাতেও চেতনার আলো ছড়িয়ে পড়ে সাহিত্যের প্রান্তরে।
নজরুল ছিলেন একজন কবি। তবে তার কবিতায় প্রবাহিত হয়েছে দার্শনিক চিন্তার নির্ঝরিণী প্রবাহ। তার লেখা জীবন, মৃত্যু, ঈশ্বর মানুষ ও বিদ্রোহ এক হয়ে তৈরি করেছে এক চিরন্তন বার্তা—
অন্ধকার কখনো চিরস্থায়ী নয়, আঁধার কেটে আলো ঠিকই ফিরে আসে। নজরুল আমাদের শেখান, কীভাবে প্রশ্ন করতে হয়, ভালোবাসতে হয়, আর কীভাবে দাঁড়াতে হয় অন্যায়কে রুখে দিতে।
আজকের সমাজেও নজরুলের মানবতাবাদী চিন্তার প্রয়োজন অনেক। মানুষের মধ্যে যখন ধর্ম, বর্ণ, অর্থ ও ক্ষমতার পার্থক্য বড় হয়ে ওঠে, তখন তার লেখা আমাদের মনে করিয়ে দেয় মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় সে মানুষ। অন্যায়ের সামনে নীরব থাকা নয়, সত্যের পক্ষে দাঁড়ানোই তার শিক্ষা। তাই নজরুল শুধু একটি সময়ের কবি নন। তার চিন্তা নতুন প্রজন্মের কাছেও সমানভাবে প্রয়োজনীয়। তার গান ও কবিতা আমাদের মনে সাহস জাগায়, অন্যের প্রতি ভালোবাসা শেখায় এবং সংকীর্ণতার বাইরে গিয়ে মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শেখায়।
সংকীর্ণতা মাথা তুলে, যেখানে মানুষের পরিচয় হয় ধর্ম, বর্ণ, জাত, শ্রেণি দ্বারা সেখানেই নজরুলের দর্শন আমাদের প্রয়োজন, আলোর মতো। কারণ তিনি শুধু বিদ্রোহ শেখাননি, কেবল প্রেম শেখাননি তিনি শিখিয়েছেন দুটিকেই একসঙ্গে ধারণ করতে। আর এই সমন্বয় থেকেই জন্ম নেয় চিরন্তন সত্যের দর্শন।