একনজরে ‘রাসূল-জীবন’
৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:৪৩
॥ মাহবুবুল হক ॥
ভাদ্র মাস। এ মাস সম্পর্কে তোমাদের নিশ্চয়ই ধারণা আছে। এ মাসে প্রচুর গরম পড়ে। গাছের কাঁচা তাল তীব্র গরমের কারণে পেকে টইটম্বুর হয়ে যায়। এজন্য আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে এই মাসটিকে বলা হয়, তালপাকা মাস। তোমাদের মতো যখন ছোট ছিলাম, তখন একদিকে যেমন উত্তরবঙ্গে ছিলাম; আবার অপরদিকে ছিলাম দক্ষিণবঙ্গেও। আব্বাজান তখন চাকরি করতেন ঠাকুরগাঁওয়ে। বোনের বাড়ি ছিল নোয়াখালীতে। তালটা তাড়াতাড়ি বেশি পাকতো ঠাকুরগাঁওয়ে। কারণ সেখানে গরমটাও পড়তো সহ্যসীমার বাইরে। নোয়াখালীতে ভাদ্র মাসে গরম পড়লেও বঙ্গোপসাগরের প্রভাবে মাঝে মাঝে অল্প-স্বল্প বৃষ্টি হতো। সত্যি কথা বলতে কী, তোমাদের মতো বয়সে তালের পিঠা খাওয়ার চেয়ে তালের শাঁস খেতে আমাদের বেশি ভালো লাগতো। গরমের মধ্যে তালের শাঁস যখন গলা দিয়ে নিচে নামতো, তখন দারুণ আনন্দ লাগতো। আবার নোয়াখালী ছিল তালের পিঠার দেশ। এ সময় কারো বাড়িতে দাওয়াত থাকলে তালের পিঠা দিয়ে বিসমিল্লাহ করতে হতো। যা হোক, স্মৃতি থেকে কিছু কথা তোমাদের জানালাম।
১০টা বেজে গেছে, তান্না-মান্না, নয়ন-চয়ন, সুবোধ-ফটিক সবাই এসে গেছে। কারো হাতে পানির বোতল, কারো হাতে ড্রিংসের বোতল। তাও আবার দেশি। ফিলিস্তিনের যুদ্ধের পর কেউ এখন আর বাইরের ড্রিংস তেমন খাচ্ছে না। দাদুভাইয়ের পায়ে ব্যথা। থেরাপি নেয়ার সময় পাচ্ছেন না। আরিজ ও আমিরা তাকে দু’পাশ থেকে ধরে ধরে মিটিংরুমের দিকে নিয়ে আসছে। সবাই দাঁড়িয়ে গেল।
দাদুভাই : আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। বাহ বাহ বাহ। সবাই দেখি সময়মতো এসে গেছে।
আমিরা : এখন তো তুমি খালি দেরি করো। অন্য কেউ আর দেরি করে না। ফাইন না করলে তোমার শায়েস্তা হবে না।
আজ দেরি করার কারণে তোমাকে ফাইন করা হলো ১০০ টাকা। এই ১০০ টাকা দিয়ে আমরা কাগুজি লেবু কিনবো। আসরে বসে আজ আমরা লেবুর শরবত খাবো। ধীরে ধীরে আমরা ড্রিংস খাওয়া স্টপ করব।
আরিজ : মাস্টারি করার আর জায়গা পাও না, না। আজ সকালেই তো বুবুমণি বলছিল, কাগুজি লেবু আনতে। বাজার থেকে বড় বড় ঠাউস ঠাউস কী লেবু আনে ওরা, একদম ভালো লাগে না।
দাদুভাই : আচ্চা দাদুরা, তোমরা যে আমাকে দেখে দাঁড়িয়ে গেলে, এটা কিন্তু আমাদের বিশ্বনবী নিষেধ করেছেন। কারণ কি জান, স্বাস্থ্যসহ নানা কারণে হঠাৎ করে দাঁড়ানোটা সবার জন্য সহজ নয়। তাছাড়া তিনি মানুষে মানুষে কোনো ভেদাভেদ পছন্দ করেননি। ঠিক আছে তোমরা সবাই বসে যাও। এ কথাটি মনে রেখ, এই নাও আমিরা, আমার ফাইনের ১০০ টাকা। তুমি দশ গ্লাস লেবুর শরবতের ব্যবস্থা কর।
আরিজ : দাদুভাই অনেকটা সময় চলে গেল! আজ তুমি কোন বিষয়ের ওপর কথা বলবে?
দাদুভাই : আজ তোমাদের এখন ইন্টারভিউ নেব। আমার মনে যে বিষয়টি ঝুলছে, যে সেটা বলতে পারবে, তাকে আজকেই নগদ একটা পুরস্কার দেয়া হবে।
সবাই একটু হইচই করে হাততালি দেয়। বিষয়ের তো আর শেষ নেই। আরিজের নেতৃত্বে একে একে সবাই কয়েক সেকেন্ড করে দুই মিনিট সময়ের মধ্যে তাদের টুকরো কথা শেষ করে। এবার রেজাল্টের পালা।
দাদুভাই : তোমরা এত বোকা, আমি বুঝতে পারিনি। আরে আমি তো এখানে ঢুকেই ‘কোশ্চেন আউট’ করে দিয়েছি। (সবাই এদিক-ওদিক তাকায়)। তিনি আবারো বলেন, কেন রাসূলের কথা বললাম না! রাসূলের কথা মনে করতে করতেই কিন্তু তোমাদের এখানে প্রবেশ করলাম। এখন রবিউল আউয়াল মাস। এ মাসেই আমাদের পেয়ারা রাসূলের এ দুনিয়ায় আবির্ভাব ও ওফাত। তান্না মেধাবী। সে ঠিকই ধরতে পেরেছে। তার ফ্যামিলিতে নিশ্চয়ই ধর্মের চর্চা আছে। তোমরা হাততালি দিয়ে তান্নাকে অভিনন্দন জানাও। শুভ কামনা প্রকাশ কর। আর আরিজ, তান্নাকে আমার কাছে নিয়ে আস। (আরিজ তান্নাকে ধরে নিয়ে এলো)। দাদুভাই সবার সাথে একবার করে কোলাকুলি করলেন এবং পকেটে হাত দিয়ে একটা বড় নোট বের করে তান্নার হাতে দিলেন। সবাই আবার উচ্ছ্বাসের ঢেউ তোলে।
দাদুভাই : তোমরা তো একটু বড় হয়েছ। রাসূল সা. সম্পর্কে তোমরা অবশ্যই কিছু জান। তবুও কথা যখন আমাকে বলতেই হবে, তখন বলছি। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহর পরে নবী ও রাসূলদের স্থান। তারপর মহান আল্লাহর নাজিল করা বিভিন্ন ধর্মগ্রন্থ ও তার বাণী লেখা কিছু কাগজপত্র। গ্রন্থগুলো আল্লাহর আরশে তৈরি হয়নি। সেগুলো তার আদেশ ও নিষেধ। সেগুলো অহির মাধ্যমে ও ফেরেশতা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে রাসূলদের কাছে এসেছে। তাঁরাও এগুলো গ্রন্থের মাধ্যমে সংরক্ষিত করতে পারেনি। সংরক্ষণ করেছেন চামড়ায়, পাথরে, কাঠে, কাপড়ে, হাতে তৈরি কাগজে। কুরআনের ক্ষেত্রে আমাদের তৃতীয় খলিফা একে গ্রন্থরূপে সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা করেছেন। এসো সবাই মিলে আমরা তাঁর জন্য মনে মনে বিশেষ দোয়া করি। ইসমাইল (আ.)-এর পর মক্কা-মদিনাসহ আরব দেশে প্রায় তিন হাজার বছর কোনো নবী বা রাসূলের আবির্ভাব হয়নি। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে মক্কা নগরে রাসূলের আবির্ভাব ঘটেছে। কিন্তু তিনি শিশুকাল থেকে নবী বা রাসূল ছিলেন না। তিনি একজন সর্বোত্তম মানুষ হিসেবে ওই এলাকায় বেড়ে উঠেছেন। সামাজিক সংঘ ‘হিলফুল ফুজুল’ প্রতিষ্ঠা করেছেন। রাখালের কাজ করেছেন। দেশে-বিদেশে ব্যবসা-বাণিজ্য করেছেন। বিয়ে-শাদী করেছেন। কিন্তু সমাজের অবনতি, অসঙ্গতি, লুটপাট, ডাকাতি, চুরি, জোরদবরদস্তি, আধিপত্য, অত্যাচার, জুলুম-নির্যাতন, মানুষে মানুষে প্রভেদ-বিভেদ, নারী নির্যাতন, নারী হত্যা, নারী-শিশু হত্যা এককথায় জালেম বনাম মজলুমের সংঘাত চলছিল। মুহাম্মদ সা. এই বিষয়গুলো নিয়ে ধ্যানে চলে গেলেন। অনেকদিন ধ্যান-অবস্থার পর হেরাগুহায় মহান আল্লাহ তায়ালা জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে অহি পাঠিয়ে তাঁকে নবী ও রাসূল হিসেবে অভিবাদন জানালেন। তিনি হলেন মানবজাতির জন্য শেষ নবী ও রাসূল। তখন তাঁর বয়স ৪০ বছর। অর্থাৎ ৬১০ খ্রিস্টাব্দে তিনি নবী ও রাসূল হলেন। এরপর মহান আল্লাহ আসমান থেকে জিবরাইল (আ.)-এর মাধ্যমে বাণী পাঠাতে থাকেন, সে অনুযায়ী মুহাম্মদ সা. সমাজ পরিবর্তনের কাজ করতে লাগলেন।
প্রথমে তিনি আল্লাহর বাণী ছড়িয়ে দিতে লাগলেন নিজের আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে। তারপর পাড়া-পড়শির মধ্যে। আরো পরে আশপাশ এলাকায়।
আরিজ : দাদুভাই। তুমি পরিবর্তন বলতে কী বুঝিয়েছ?
দাদুভাই : খুব ভালো বলেছ। ওই যে কিছুক্ষণ আগে বললাম, সমাজে জালেম ও মজলুমের মধ্যে লড়াই চলছিল। সেটা একটু ব্যাখ্যা করে তোমাদের বোঝানোর দরকার ছিল। এর আগে বলেছি না, প্রায় তিন হাজার বছর পর এই এলাকায় নবী ও রাসূল এসেছেন। তার অর্থ তোমরা নিশ্চয়ই বুঝেছ। আল্লাহর তরফ থেকে কোনো নবী বা রাসূল না আসায় মানুষ একদিকে যেমন আল্লাহকে ভুলে গেল, তেমনি আল্লাহর আদেশ ও নিষেধও ভুলে গেল। সৃষ্টিকর্তা মহান আল্লাহকে বাদ দিয়ে মানুষ ইবাদতের জন্য ছোট ছোট খোদা সৃষ্টি করে ফেলল। মূলত তারা হয়ে গেল মূর্তিপূজারি। মক্কার কাবাঘর ভরে উঠল শত শত ‘মাটির খোদায়’।
এ থেকেই শুরু হয়ে গেল অতীতের অন্ধকার যুগ! যে যুগের চিত্র কিছুক্ষণ আগে তোমাদের বলার চেষ্টা করেছি। আল্লাহর ঘর কাবাকে ওরা মন্দিরে রূপদান করেছিল। সেটা সহজেই তোমরা বুঝতে পারবে বলে আমার ধারণা। এখানে ধীরে ধীরে কাজ করতে করতে সত্য-মিথ্যা, আসল-নকল, ভালো-মন্দ সবকিছু বুঝতে পারল এবং রাসূলের অনুসারীরা বা সঙ্গী-সাথী গড়ে উঠল।
পরিবর্তনের ধারাটা ছিল ধীরগতির এবং শুভ পরিবর্তনকে সমাজের ধনী লোকেরা ও নেতৃস্থানীয় লোকেরা কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছিল না। তারা ভীষণভাবে মুহাম্মদ সা.সহ যারা এক আল্লাহর দিকে ধাবিত হচ্ছিল, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ শুরু করে দিল। অনেকে অত্যাচারের কারণে দেশ ছেড়ে পালিয়ে গেল।
দুশমনরা রাসূল (সা.)-কে হত্যার পরিকল্পনা করলে আল্লাহর সাহায্যে তিনি হিজরত করে নানার দেশ মদিনায় চলে গেলেন। মদিনার বাসিন্দারা তাঁকে সাদরে গ্রহণ করলেন। তাঁকে সাহায্য-সহযোগিতা করতে লাগলেন। তিনি আল্লাহর বিধান এখানে খুব দ্রুততার সাথে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগ পেয়ে গেলেন। সাথে সাথে ষড়যন্ত্র, যুদ্ধ-বিগ্রহ, বাধা-বিপত্তি চলতে থাকল। অধিকাংশ যুদ্ধে বিজয় লাভ করে তিনি আবার নিজ শহর মক্কায় ফিরে এসেছেন। মক্কার লোকেরা এবার দলে দলে ইসলাম গ্রহণ করল।
তিনি মদিনায় ফিরে গিয়ে সব ধরনের জাতি-গোষ্ঠীকে নিয়ে রাষ্ট্র গঠনের ব্যবস্থা করলেন। প্রমাণ করলেন, রাষ্ট্র ছাড়া আর মানুষকে সত্য এবং সহজ-সরল পথে টিকিয়ে রাখা যাবে না। মানুষকে আল্লাহর পথে, আখিরাতের পথে, নবী-রাসূলদের পথে, কুরআনের পথে, সত্যের পথে, শান্তির পথে, স্বস্তির পথে, মুক্তির পথে রাখার জন্য রাষ্ট্রের কোনো বিকল্প নেই। যারা আল্লাহর পথের মানুষ অর্থাৎ যারা চিরন্তন সত্যের মানুষ, ইসলামের মানুষ, তারা অসত্য পথে যারা আছে, তাদের দাওয়াত দেবে। কিন্তু এই রাষ্ট্র থেকে উচ্ছেদ করা হবে না। তারা যদি মিলেমিশে থাকতে চায় কোনো অসুবিধা হবে না। এ ধরনের অবস্থায় রেখে ৬৩২ সালে তিনি ৬৩ বছর বয়সেই ইন্তেকাল করেন। তোমাদের আগ্রহ থাকলে এ বিষয়ে আমরা আগামী সপ্তাহেও কিছু আলাপ করবো। আজানের ধ্বনির সাথে সাথে আসর শেষ হয়ে গেল।