আলোকে তিমিরে

এখন দরকার মহা ঐক্য


৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১৬

॥ মাহবুবুল হক ॥
রাষ্ট্র নতুন করে মহাসংকটে পড়েছে। রাষ্ট্র তো নেই, তবুও আমরা রাষ্ট্র রাষ্ট্র বলছি। এটা ভুল হলেও কিছু করার নেই। মানুষ নাকি অভ্যাসের দাস। অথচ মানুষের কথা ছিল আল্লাহর দাস হওয়ার। বাঙালি মুসলমান যে অনেকটা আল্লাহর দাস না হয়েই রয়েছে। সেটা সর্বজনবিদিত। এটা কত বড় দুঃখজনক বিষয় যে, আল্লাহর জায়গায় ‘অভ্যাস’ এসে আসন গেড়েছে। আমরা স্বাধীন হয়ে রাষ্ট্র পাইনি। একটি দেশ পেয়েছি। আমরা তো হরহামেশাই বলছি, আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছে। স্বাধীন হওয়ার পরপরই তো রাষ্ট্র গঠন করার জন্য কাজ করা উচিত ছিল। দুর্ভাগ্যবশত সেটা আমরা করতে পারিনি। প্রায় ৫৫ বছর হতে চলেছে, এখনো দেশ মানে একটা ভূখণ্ড নিয়েই আমরা মেতে আছি। এটি ছিল একটি দেশের একটি প্রদেশ। প্রদেশ থেকে আমরা দেশে উন্নত হয়েছি। এর বেশি কিছু আর তো নয়।
আমরা বেশিরভাগ সময় বলে থাকি; বিশেষ করে আমাদের পূর্বাঞ্চলের দেশগুলোর ব্যাপারে, যেমন— শ্রীলঙ্কা, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ব্রুনাই, কম্বোডিয়া, লাওস দেশগুলো আমাদের পরে স্বাধীনতা লাভ করলেও আমাদের চেয়ে উন্নত ও সমৃদ্ধ হয়েছে। তাদের দেশের জনগণের পারক্যাপিটা ইনকাম আমাদের চেয়ে বেশি। আসলে এই হিসাবটা পাকিস্তান আমলের। বাংলাদেশ আমলের হিসাব নয়। বাংলাদেশের পরে একটিমাত্র দেশ স্বাধীন হয়েছে, তা হলো ব্রুনাই (১৯৮৪)। ব্রুনাই তেলসমৃদ্ধ একটি দেশ, রাজতান্ত্রিক দেশ। তাদের সাথে আমাদের তুলনা করে লাভ নেই। রাজতান্ত্রিক দেশকেও এ যুগে রাষ্ট্র বলা হয়, সেটা নিয়ে অবশ্যই বিশ্ববাসীকে ভাবতে হবে।
যাহোক, আমরা তো বলি, পাকিস্তান রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হতে পারেনি। সে কারণে পাকিস্তানের মানচিত্র একরকম থাকেনি। পাকিস্তানকে তার একটি সমৃদ্ধ ভূখণ্ড হারাতে হয়েছে। পাকিস্তানের পরে উপর্যুক্ত যে দেশগুলো স্বাধীন হয়েছে, তারা কোনো না কোনোভাবে দেশকে রাষ্ট্র হিসেবে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে। এজন্যই তারা উন্নত ও সমৃদ্ধ হতে পেরেছে। আমরা ১৯৭১ সালে একটা ভূখণ্ড লাভ করেছিলাম। সেই ভূখণ্ডের ওপর রাষ্ট্রকাঠামোর ভিত আমরা রচনা করতে পারিনি। সমুদ্র থেকে কখনো কখনো দ্বীপ জন্ম লাভ করে। সেই বিচ্ছিন্ন দ্বীপটি নিয়ে মানুষ যেভাবে দ্বীপের অংশীদার হওয়ার জন্য বা অধিবাসী হওয়ার জন্য ঝগড়া-বিবাদ, মারামারি-কাটাকাটি করে, আমরাও সেভাবে এই ব-দ্বীপ-রূপী ভূখণ্ডটি নিয়ে রাজনৈতিকভাবে মারামারি-কাটাকাটি করেছি। ৫৪ বছরে পাইলিং করে রাষ্ট্রীয় কাঠামোর কোনো ভিত আমরা নির্মাণ করতে পারিনি। আমাদের মূল সমস্যা এ জায়গায়। আমাদের দেশের চরাঞ্চলের যারা প্রথম অধিবাসী হয়, তারা যে মানসিকতা পোষণ করে, সেই মানসিকতাই গত ৫৪ বছরে আমরা দেখে এসেছি। বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং ধনী ও উচ্চবিত্ত মহল চর জাগ্রত হলে প্রথম সেখানে যায় এই ধরনের গডফাদাররা। এরা বলতে গেলে একেকজন রাজা। তারা প্রজা পত্তনের মতো দরিদ্র ও ভূমিহীনদের চোখের সামনে মুলা ঝুলিয়ে মূল ভূখণ্ড থেকে সেখানে নিয়ে আসে। তারপরের ইতিহাস সবার জানা আছে।
বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ক্রমাগতভাবে আমরা ওই চরের দৃশ্যই দেখছি। মাঝে ২০২৪-এর বিপ্লব কেন, কীভাবে, কোথা থেকে হলো— মহান আল্লাহই ভালো জানেন। ঘটনাটা আমাদের চোখের সামনেই ঘটল। কিন্তু এখন একেক মহল, একেক গোষ্ঠী, একেকভাবে ব্যাখ্যায় লিপ্ত। বিষয়টি পরিষ্কার করার জন্য বিরাজমান প্রতিটি ঘটনাকে বিশ্লেষণ করলে আমরা কী দেখতে পাই? আমরা দেখি যে, ৫০-৬০ জন ফটোগ্রাফার, ফেসবুক-ইউটিউবার, মিডিয়া-ক্যামেরাম্যান এবং কিছু সাংবাদিক নামের ব্যক্তি নোটানোটি করে। পরের দিন দেখা যায়, একেকটি মিডিয়া একেকরকম কথা বলছে। একেকটি সংবাদপত্র একেকরকম সংবাদ পরিবেশন করছে। এর কারণ কী? এর কারণ হলো রাষ্ট্রের কোনো অস্তিত্ব নেই। দেশ আছে, দেশে বিভিন্ন ধর্ম, বিভিন্ন মতবাদ, বিভিন্ন আদর্শ, বিভিন্ন দেশের এজেন্ট ও বিভিন্ন দেশের ষড়যন্ত্রকারী সবকিছুই আছে এবং তার সাথে আছে সংবাদপত্র ও মিডিয়া মালিকদের স্বার্থপর আধিপত্য। এভাবেই ঘটনার বহুমাত্রিক পরম্পরায় ইতিহাস তৈরি হচ্ছে। যেভাবে ইতিহাস তৈরি হয়েছে ১৯৭১ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত, যা এখন বুড়িগঙ্গায় ফেলা হচ্ছে। বেচারি বুড়িগঙ্গা তো আর এ নিয়ে প্রতিবাদ করতে পারছে না।
আশা করা গিয়েছিল, জুলুমবাজদের উৎখাত করার পর একটা ‘কমন কনসেনসাস’ গড়ে উঠবে। কারণ শুধু বিরোধী রাজনৈতিক দলের নেতা ও কর্মীরা নৃশংসভাবে অত্যাচার ও জুলুমের শিকার হয়নি। সাধারণ জনগণও ফ্যাসিবাদী সরকার, সরকারি দলের গডফাদার এবং নেতাকর্মীদের দ্বারা দেশময় জুলুম-নির্যাতনের সম্মুখীন হয়েছে। বিপ্লবের সময় শুধু মহানগর, শহর, বন্দরে যুদ্ধ হয়নি, যুদ্ধ হয়েছে দেশময়। একদিকে আধুনিক অস্ত্রশস্ত্র আর অপরদিকে নারায়ে তাকবীরসহ নানা দাবির সংক্ষুব্ধ উচ্চারণ। সেখান থেকে উঠে আসা চূড়ান্ত সফল একটি বিপ্লব আবার চরের মানসিকতায় হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে। গণচাপে ক্ষমতাসীন দল ৩৬ জুলাইয়ের মিউজিয়াম উদ্বোধন না করে পারেনি। কিন্তু এর ভেতরে রক্ষিত মূল ও মৌলিক ছবিগুলো ক্ষমতাসীন সরকার সরিয়ে ফেলেছে। যে সম্পর্কে উদ্বোধনের দিনে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান ড. মুহাম্মদ ইউনূস খুব সুন্দর করে বলেছিলেন, ‘আমরা যখন হারিয়ে যাব, দিশা পাওয়ার জন্য এখানেই আবার ফিরে আসব।’ গণভোটে যারা হ্যাঁতে ভোট দিতে বলল, তারাই আবার গণভোটের ফলাফলকে গলাটিপে মারার উদ্ধত প্রয়াসে লিপ্ত। দেড় বছর ধরে অন্তর্বর্তী সরকার শত শত কোটি টাকা খরচ করে রাষ্ট্র নির্মাণের জন্য সংস্কারের নামে যে মাল-মসলা সংগ্রহ করল বা আমদানি করল, সেসবের প্রতি এই অপরিণামদর্শী সরকারের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। কারণ তারা দেশটিকে রাষ্ট্র বানাতে চায়নি। তারা চরের মালিক হতে চায়। আমাদের দেশের তথাকথিত চরের মালিক একজন কমিউনিস্ট নেতা মোহাম্মদ তোয়াহা জীবন সায়াহ্নে পল্টন ময়দানে বিরাট সভার আয়োজন করে আসমানের দিকে দু’হাত তুলে বলেছিলেন, হে আল্লাহ! পরওয়ারদিগার আদর্শের নামে, মতবাদের নামে যত অন্যায় করেছি, হে দয়াময়! আজ আমি জনগণের সামনে আপনার কাছে ‘তওবা-ইস্তেগফার’ করছি। আর আমি আমার অতীত রাজনীতিতে ফিরে যাব না। আমাকে আপনি ক্ষমা করে দিন। উপস্থিত শ্রোতামণ্ডলীর উদ্দেশে তিনি বলেছিলেন, আপনারাও আমাকে দয়া করে ক্ষমা করে দিন। ক্ষমা না করলে মহান আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করবে না।
এদিকে আশ্বর্যজনকভাবে লক্ষ করছি, বিএনপি প্রধান দেশে ফিরে এসে বলেছিলেন, ‘আই হ্যাব এ প্ল্যান’। সেই সরকারপ্রধান চলছেন একভাবে, আর গোটা দল চলছে আরো দু’ভাগে। কারো সাথে কারো কোনো ‘মিল-মহব্বত’ নেই। লক্ষ করা গেছে যে, বিরোধীদলের বিরুদ্ধে ‘গুপ্ত’, ‘গুপ্ত’ বলে সমালোচনা করলেও পরের দিকে সংসদে বিরোধীদলের প্রশংসনীয় ও উদ্দীপনাময় আচরণ দেখে বিস্মিত হয়েছেন এবং ক্রমে ক্রমে উপলব্ধি করেছেন, সংসদে এই ধরনের গণতান্ত্রিক মননের সংসদ সদস্য থাকলে গণতন্ত্রের পক্ষে অগ্রসর হওয়া কঠিন হবে না। বিরোধীদল শুরু থেকেই বলে এসেছে, আমরা বিরোধিতার জন্য বিরোধিতা করব না। কিন্তু সরকার যদি দেশ, জাতি, রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে অন্যায়ভাবে দাঁড়ায়, তাহলে প্রথমে আমরা প্রতিবাদ করব, ভুল ধরিয়ে দেব। যদি কাজ না হয়, তাহলে আমরা প্রতিহত করব। সংসদে বিরোধীদলের নেতা বারবার এই কথামালা উচ্চারণ করেছেন। বলতে দ্বিধা নেই, সরকারি দলের স্পিকার ও ডেপুটি স্পিকার যথাক্রমে মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম ও ব্যারিস্টার কায়সার কামাল সংসদ পরিচালনা করতে গিয়ে ‘কমফোর্ট ফিল’ করেছেন। স্বস্তি প্রকাশ করেছেন এবং দুজনই খোলামেলাভাবে বলেছেন, এর পূর্বের কোনো আমলেই সংসদ এত শৃঙ্খলার পরিচয় দিতে পারেনি। তারা বিরোধীদলের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন এবং তাদের বিশেষভাবে সাহায্য করায় বিরোধীদলের সংসদ সদস্যদের অভিনন্দন জানিয়েছেন। সংসদের ভেতরে শুধু নয়, বাইরেও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে, সংবাদপত্র ও মিডিয়ায় বারবার এসেছে যে, দুজন স্পিকারই গণতন্ত্রের বিষয়ে আশাবাদী হয়ে উঠেছেন। স্পিকারদের কথামালা দেশ-বিদেশে বিপুলভাবে ছড়িয়ে পড়েছে। এতে দেশ-বিদেশে প্রশংসাসহ মানুষের আশাবাদ উচ্চকিত হয়েছে। মোটামুটিভাবে সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে একটা সমন্বয়ের শান্তিপূর্ণ ভাব বা আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
এসব প্রত্যক্ষ করে ভারত থেকে ক্রমাগতভাবে উসকানি শুরু করা হলো এই বলে যে, বাংলাদেশের এখনকার প্রধান দুই দল প্রায় বিশ বছর একত্রে রাজনীতি করেছে। এখন তারা আবার সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে। ‘এমনকি শোনা যাচ্ছে বিরোধীদল থেকেও তারা মন্ত্রী সংগ্রহ করবে।’ অর্থাৎ বাংলাদেশ রাষ্ট্র গঠনের ব্যাপারে কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করুক, সংসদ সুন্দরভাবে চলুক, সরকার ও বিরোধীদলের মধ্যে শান্তিপূর্ণ সহাবস্থান সৃষ্টি হোক— ভারত যা কখনো চায়নি, এখনো তা চায় না। এ কারণে তারা তাদের দেশে মুসলিম নির্যাতন, মসজিদ-মাদরাসা ভাঙা, মুসলিম নারী ও কিশোরীদের ওপর অত্যাচার-অবিচার বাড়ানোসহ রাষ্ট্রীয়, সরকারি ও সরকারি দলের নেতাকর্মীদের ওপেন জেনারেল লাইসেন্স দিচ্ছে, যেকোনোভাবে হোক ভারতে মুসলিম জনসংখ্যা কমাতে হবে। অপরদিকে বাংলাদেশ থেকে পালিয়ে আসা পরাজিত সরকারের প্রধানকে নিয়ে নানা ষড়যন্ত্র করছে। তাদের সহায়তায় ফ্যাসিবাদী শক্তি আবার বাংলাদেশে পুনঃস্থাপিত হবে— এ বিষয়ে তারা মোটামুটি একটা সময়ও বেঁধে দিয়েছে।
বাংলাদেশের মানুষ অত্যন্ত ধৈর্যশীল। প্রথম স্বাধীনতা লাভের পূর্বে ও পরে ভারতের যে সরকারই থাকুক, নানা উছিলায় গত প্রায় একশত বছর যাবত ভারতের মুসলমানদের ওপর ক্রমাগতভাবে মুসলিম নিধন, নির্মূল, তাদের মসজিদ-মাদরাসা, এতিমখানাসহ নানা স্থাপত্য তারা ভাঙচুর করেই আসছে। জনসম্মুখে শুধু বাবরি মসজিদের কথা নানাভাবে এসেছে। তবে এ কথা সত্য, এর কোনো মানবতাধ্বংসী প্রতিক্রিয়া কখনো বাংলাদেশে তেমনভাবে লক্ষ করা যায়নি। প্রতিবাদ যে হয়নি, তা নয়। বাংলাদেশের মুসলিমরা সেবার দারুণভাবে দুঃখ ও কষ্ট অনুভব করেছে। কিন্তু এখানকার সনাতন ধর্মের লোকদের ওপর ৬০ দশকের সামান্য ব্যতিক্রম ছাড়া বড় কোনো ম্যাসাকার হয়নি। কারণটা ঐতিহাসিক। সনাতন ধর্মের ধনী, উচ্চবিত্ত ও উচ্চ মধ্যবিত্তের অধিকাংশ মানুষ ধীরে ধীরে (এ দেশে কিছু সহায়-সম্পদ রেখে) ভারতে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেছিল। যারা তাদের ‘দেশমাতৃকা’ ছাড়েনি, তাদের অধিকাংশই ছিল মধ্যবিত্ত থেকে হতদরিদ্র। সনাতন ধর্মের এই দরিদ্র শ্রেণির সাথে মুসলিম জাতির কোনো বিরোধ বা বিদ্বেষ এদেশে ছিল না। কারণ সমাজে এদের প্রচুর প্রয়োজন ছিল। এদের মধ্যে ছিল ডোম, মেথর, ঝাড়ুদার, মালি, নাপিত, ধোপা, জেলে, কামার-কুমার, তাঁতি, কাঠমিস্ত্রি, সব ধরনের কারিগর, কৃষক-কৃষানি, খাদ্য উৎপাদনকারী যেমন— মিষ্টি, দই, ছানা, ঘি, মাখন, মুড়ি, চিড়া, মোয়া, খই, বাদাম, মুড়কি, বাতাসা, কদমা ইত্যাদির কারিগর, কাঠ ও বাঁশ-বেতপণ্যের কারিগর, মসলার দোকান, বানিয়ার দোকান (ঔষধি গাছ ও এর বিভিন্ন সামগ্রী বিক্রেতা), পরিবহন (গরুর গাড়ি, মহিষের গাড়ি, নৌকা, মালবাহী নৌকা), কেরানী, হিসাবরক্ষক, গাড়ির ড্রাইভার, গহনার কারিগর, গ্রাম্য ডাক্তার, আয়ুর্বেদ, কবিরাজ, শিক্ষক, গায়ক, বাদক, সুরকার, গীতিকার, কবিগান, নাটক, সিনেমা, মঞ্চনাটক, পালানাটক, যাত্রাপালা (অর্থাৎ বাংলার সংস্কৃতি ধারক-বাহক ছিল তারাই)।
উপর্যুক্ত বহুমাত্রিক শ্রমিক ও কর্মীগণ, পারিবারিক ও সামাজিক কর্মীগণ যদি এদেশ ছেড়ে প্রতিবেশী দেশে চলে যেত, তাহলে এদেশের মুসলিম সমাজ সুস্থভাবে জীবনযাপনই করতে পারত না। তদানীন্তন মুসলিম সম্প্রদায় থেকে শুরু করে ৮০-এর দশক পর্যন্ত উপরোক্ত কর্মী বাহিনীকে নিজেদের একান্ত প্রয়োজনে শুধু প্রটেক্ট নয়, সার্বিকভাবে সংরক্ষণ করেছে এদেশের মুসলিম সমাজ।
দরিদ্র মুসলিমদের একমাত্র কাজ ছিল কৃষি, কৃষিপণ্য ও মৎস্য চাষ। কিন্তু বরাবর ভারত সরকার বলে এসেছে যে, এদেশে হিন্দু নারীদের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, হিন্দু সম্প্রদায়কে জোর করে মুসলিম করা হচ্ছে। সম্পূর্ণ অসত্য কথা বলেছে যে, প্রতি বছর এত হাজার হিন্দু সম্প্রদায় ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে। এতে তাদের আর্থিক ও সামাজিক ক্ষেত্রে বৈষম্যসহ নানা বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হচ্ছে। এখনো এসব এলজাম তীব্রভাবে চলছে। ভারত সরকার নানারকম ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হচ্ছে। মোটাদাগে যা হলো নিকৃষ্ট ভূরাজনীতি। তারা সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করছে, বাংলাদেশে আর আধিপত্য বজায় রাখা যাবে না। আধিপত্যবাদের মৃত্যু হয়েছে। ভারতকে এখন টিকে থাকতে হলে ‘সম্প্রসারণবাদে’র দিকে অগ্রসর হতে হবে। অর্থাৎ কাল্পনিক নয়, বাস্তবে পূর্ববাংলা ও পশ্চিমবাংলা মিলিয়ে একটা ‘বাংলা রাজ্য’ সৃষ্টি করতে হবে। সম্ভবত এ কারণেই তারা পশ্চিমবাংলার নাম রেখেছে বাংলা। এ কারণে অতীতের মতো গোপনে গোপনে নয়, এখন তারা সরাসরি বলছে। ভারতের সর্বশ্রেণির বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সাহিত্যিক, মিডিয়াব্যক্তিত্ব, রাজনীতিবিদ সবার দ্বারা বলাচ্ছে বাংলাদেশকে দখলে আনতে হবে।
এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশ সরকারকে শুধু অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে মাথা ঘামানো ঠিক হবে না। ‘জরুরি অবস্থা’ ঘোষণা করে দেশ রক্ষার বিষয়ে তথা স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষার বিষয়ে দেশকে একমুখী করতে হবে। একতাবদ্ধ করতে হবে। অভ্যন্তরীণ শক্তি, সম্পদ ও সাহসকে সঞ্জীবিত করতে হবে। ভূরাজনীতির হা-ডু-ডু খেলা (মনে হয়) শেষ হয়ে গেছে। দাঁড়িয়াবান্ধা ও মেয়েদের লুকোচুরি খেলা তো ২০২৪-এর বিপ্লবেই খতম হয়ে গেছে।
জাতীয় নিরাপত্তার জন্যই বিশেষভাবে জরুরি অবস্থার প্রয়োজন। একদিকে দল-মত-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে জাতিকে সিসাঢালা প্রাচীরের মতো তার সীমান্ত পাহারা দিতে হবে। অপরদিকে বহিঃশত্রুর আক্রমণ থেকে দেশ ও জাতিকে রক্ষা করতে হবে। দেশের প্রথম সরকার লালবাহিনী, রক্ষিবাহিনী ইত্যাদি করে এবং সর্বশেষ বাকশাল করে অভ্যন্তরে যাই কিছু করুক (নিশ্চয়ই সেসব ছিল অমানবিক, অনৈতিক ও নিষ্ঠুর-নৃশংস অগণতান্ত্রিক উন্মাদনা), তবে তথ্যাভিজ্ঞ মহলের সুচিন্তিত অভিমত ছিল, সেসব প্রত্যক্ষ করে প্রতিবেশী ভারত সাময়িকভাবে হলেও বাংলাদেশ দখল-সংক্রান্ত তাদের উদ্দীপনা দমন করেছিল। পরবর্তীতে সামরিক-বেসামরিক সকল হত্যাযজ্ঞ সূক্ষ্ম ও সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করে, ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠা করে, ১৭ বছর তারা সহাবস্থানের মাধ্যমে বাংলাদেশকে ব্যাপকভাবে লুটপাট করেছিল। সেটা ছিল নীরব, নিশ্চুপ পরকীয়া লুটপাট।
২০২৪-এর স্বতঃস্ফূর্ত বেগবান জীবনবাজি রাখা রক্তাক্ত বিপ্লবের (আগ্নেয়গিরির) উত্থান দেখে এখন তারা উপলব্ধি করেছে আর গোপন প্রেম প্রেম খেলা চলবে না। ভারতকে সমৃদ্ধ করতে হলে এ ‘ব-দ্বীপ’কে চিরকালের জন্য ভারতভুক্ত করতে হবে। এছাড়া আর কোনো ‘অল্টারনেটিভ’ নেই। বাংলাদেশে এখন যে দল আছে এবং কালক্রমে ভবিষ্যতে যেসব দল ক্ষমতার আসনে বসবে, তারা কেউ গোপন প্রেম প্রেম খেলার সাহসী প্লেয়ার নয়। তারা ভীরু-কাপুরুষও নয়। তারা সচেতন। তারা জানে, জনগণের ‘হাঁটুয়া মাইর’ একটাও মাটিতে পড়বে না। সব পড়বে পিঠে, বুকে, মাথায় এবং শরীরের মধ্য প্রদেশে। ভারতের পেইড লাখ লাখ দালালও এখন ভীতসন্ত্রস্ত। তারাও ইতোমধ্যে ‘মবে’র দ্বারা আক্রান্ত হয়েছে। অসম্মানিত হয়েছে। অমর্যাদাকর পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। তারাও এখন জান ও মাল (শেষমেশ) রক্ষার জন্য দেশ-বিদেশে ছোটাছুটি করছে। আইনের আওতার বাইরে থাকার সর্বাত্মক প্রচেষ্টায় ডুব সাঁতার দিচ্ছে।
বাংলাদেশের একটাই এখন বড় সমস্যা, ‘দুধ-কলা’ দিয়ে পোষা ‘ভারতীয় প্রশাসন’। এটা ভাঙতে হবে। চুরমার করে দিতে হবে। জীবনবাজি রাখা পরীক্ষিত আমলাদের প্রশাসনে বসাতে হবে। বসাতেই হবে। বারবার তারা ভেতরে বসে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ করেছে। দিনের ভোট রাতে করেছে। অযাচিতভাবে দেশের সম্পদ ভারতের হাতে তুলে দিয়েছে। ভারতকে সাহায্য করার জন্যই গত ৫৪ বছর তাদের দেশবাসী শশব্যস্ত দেখেছে। বিভিন্ন প্রজেক্টে ওদের শত শত নিশান ওড়ে। করিডোরের নামে, বিদ্যুৎ কেন্দ্রের নামে, পোর্টের লিজের নামে, শত শত বড় বড় লরির নামে, সেভেন সিস্টারে যোগাযোগ ও মালমাল পরিবহনের নামে, বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য ও শিল্প-বাণিজ্যের নামে তাদের পতাকা আমরা এখানে উড়তে দিয়েছি।
সুতরাং দেশ, জাতি ও আগামীর রাষ্ট্রকে রক্ষা করতে হলে অন্তত তিন বছর কোয়ালিশন সরকার দরকার। বিএনপি ওয়াদা করে আবার ভুলে যাওয়ার বাহানা করে। একবার তারা বলেছিল, প্রয়োজন হলে নির্বাচনের পর আমরা সর্বদলীয় সরকার গঠন করব। এখন তো সে প্রয়োজন ভয়ঙ্করভাবে সামনে এসে গেছে। হয় কোয়ালিশন সরকার আর না হয় সর্বদলীয় সরকার বিএনপিকে গঠন করতে হবে। না হলে আল্লাহ না করুন, দেশকে রক্ষা করা যাবে না। আল্লাহ আলেম।