‘তোমারই নাম আওয়ামী লীগ’ পরিণতি ভাঙন ধ্বংস আর বিনাশ


৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১০:১৫

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
দেশের স্বাধীনতা অর্জনের কথিত দাবিদার আওয়ামী লীগ আজ নিষিদ্ধ। অবশ্য সরাসরি নিষিদ্ধ বলা যাচ্ছে না, কার্যক্রম নিষিদ্ধ। ফ্যাসিস্ট হিটলার ও মুসোলিনির উত্তরসূরি আওয়ামী লীগের রাজনীতি নিষিদ্ধ থাকারই কথা, কারণ হিটলার ও মুসোলিনির দল জার্মানি ও ইতালিতে নিষিদ্ধই আছে। হিটলারের কারণে ইউরোপের পরাশক্তি জার্মানি যেমন বিভক্ত হয়ে পড়েছিল, তেমনিভাবে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের কারণেই মুসলিমদের পরাশক্তি পাকিস্তান ভাগ হয়। তারপর শেখ মুজিব কন্যা শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগের কারণেই বাংলাদেশ প্রায় ধ্বংসপ্রাপ্ত। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত হচ্ছে, আওয়ামী লীগের কাজই হচ্ছে ভাঙন, ধ্বংস আর বিনাশ। বাংলাদেশে আ’লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে তখন দেশের রাজনীতি অর্থনীতি থেকে শুরু করে রাষ্ট্র, সরকার, বিচার ব্যবস্থা ও আইনসভা হয় ধ্বংস হয়েছে, নয়তো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যার পরিণতিতে একসময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম যেমন দেশে নিষিদ্ধ, তেমনিভাবে দেশের বাইরেও চলছে না। ভারতের মদদে ও সহযোগিতায় গঠিত আওয়ামী লীগ আজ দিল্লিতেও তাদের কোনো তৎপরতা চালাতে পারছে না। অপরদিকে আওয়ামী লীগের কারণে আজকে ভারতও প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশের সাথে স্বাভাবিক সম্পর্কটাও গড়তে পারছে না। তাই বিশিষ্ট কলামিস্ট ও রাজনীতিবিদ খোন্দকার আবদুল হামিদ বলেছিলেন, ভণ্ড ‘তোমারই নাম আওয়ামী লীগ’।
আ’লীগ মানেই ধ্বংস ও বিনাশ
আওয়ামী লীগ যখনই ক্ষমতায় এসেছে, তখনই রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্বংসসাধন করেছে। ১৯৭৫ সালে সব রাজনৈতিক দল নিষিদ্ধ করে বাকশাল কায়েম করে। চারটি সংবাদপত্র বাদে সব পত্রিকা বন্ধ করে দেয়া হয়। আ’লীগের বিগত প্রায় ১৬ বছরের শাসনামলে (২০০৯-২০২৪) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি দেশের বিভিন্ন গণমাধ্যম, অর্থনীতিবিদ ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা চিহ্নিত করেছেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর দলটির অপশাসন ও অপকর্মের প্রাতিষ্ঠানিক এবং কাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতির চিত্র ব্যাপকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে।
রাজনৈতিক ও গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ধ্বংসসাধন
২০০৯ সালেও একটি বিতর্কিত নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতায় এসে আ’লীগ জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নির্বাচন ব্যবস্থাকে ধ্বংস করে দেয়। ২০১৪, ২০১৮ এবং ২০২৪ সালের বিতর্কিত ও একতরফা নির্বাচনের মাধ্যমে দেশের মানুষের স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার অধিকার কেড়ে নেওয়া হয়। এককথায় সাধারণ জনগণের ভোটাধিকার হরণ করা হয়।
বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর চরম দমন-পীড়ন চালিয়ে কার্যত একদলীয় শাসন বা কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থা কায়েম করা হয়। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নেতাদের অন্যায়ভাবে ফাঁসি দিয়ে হত্যা করা হয়। আলেম-ওলামার ওপর নির্যাতন চালিয়ে অনেককে হত্যা করা হয়।
অতীতের মতো আ’লীগ এবারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা রোধ করে। কথিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন পরবর্তীতে যা সাইবার নিরাপত্তা আইন নামে করা হয়, সে আইন ব্যবহার করে সাংবাদিক, লেখক ও সাধারণ নাগরিকদের কণ্ঠরোধ করা হয় এবং গণমাধ্যমের স্বাধীনতা চরমভাবে ক্ষুণ্ন করা হয়।
মানবাধিকার লঙ্ঘন ও জানমালের ক্ষতি
আইনপ্রয়োগকারী সংস্থাকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক বিরোধী ও ভিন্নমতাবলম্বীদের গুম, খুন এবং ‘ক্রসফায়ার’-এর সংস্কৃতি তৈরি করা হয়। হাজার হাজার মানুষকে গুম করে ক্রসফায়ারে খুন করা হয়। ভিন্নমতাবলম্বীদের বেআইনিভাবে আটকে রেখে বছরের পর বছর অমানবিক নির্যাতন করার জন্য গোপন বন্দিশালা বা ‘আয়নাঘর’ তৈরি করা হয়েছিল।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস ও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা হরণ
রাষ্ট্রীয় ও সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ করে তথা পুলিশ, প্রশাসন, দুর্নীতি দমন কমিশন নির্বাচন কমিশনকে সম্পূর্ণ দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে এদের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নষ্ট করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে নির্বাহী বিভাগের অধীনে এনে রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যার ফলে সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়।
অর্থনৈতিক ব্যবস্থার ক্ষতি ও লুটপাট
বিপুল পরিমাণ অর্থ পাচার করেছে ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। সরকারি ও বেসরকারি যোগসাজশে ব্যাংক খাত ও বিভিন্ন মেগা প্রজেক্ট থেকে লাখ কোটি টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স প্রদান, বেনামি ঋণ এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের প্রশ্রয় দেওয়ায় দেশের ব্যাংকিং ব্যবস্থা ধসের মুখে পড়ে। দেশের অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ রেকর্ড মাত্রায় বৃদ্ধি পায়, যা দেশের অর্থনীতিকে দীর্ঘমেয়াদি ঝুঁকিতে ফেলেছে।
সামাজিক ও শিক্ষাব্যবস্থার বিপর্যয়
ছাত্রলীগ ও দলীয় ক্যাডারদের মাধ্যমে দেশের পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজগুলোয় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর নির্যাতন, সিট বাণিজ্য এবং টেন্ডারবাজির রাজত্ব কায়েম করা হয়েছিল। সরকারি চাকরি ও নিয়োগ পরীক্ষায় ব্যাপক অনিয়ম, ঘুষ বাণিজ্য এবং প্রশ্ন ফাঁসের মাধ্যমে যোগ্য ও মেধাবী চাকরিপ্রার্থীদের বঞ্চিত করা হয়।
জুলাই-আগস্ট ২০২৪-এর গণহত্যা
কোটা সংস্কার আন্দোলন ও পরবর্তীতে সরকার পতনের আন্দোলন দমাতে গিয়ে ছাত্র-জনতার ওপর নির্বিচারে গুলি চালিয়ে হাজারেরও বেশি মানুষকে হত্যা এবং হাজার হাজার মানুষকে পঙ্গু করা হয়।
আ’লীগের দীর্ঘ ১৬ বছরের অপশাসনে বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও শাসনতান্ত্রিক ভিত্তি এবং রাষ্ট্রীয় নৈতিকতার অপূরণীয় ক্ষতি কোনো কোনো ক্ষেত্রে ধ্বংস হয়েছে।
দিল্লিতে আ’লীগের কারণে সেমিনার করতে পারেনি এফসিসি
আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত বক্তাদের নিয়ে দিল্লিতে আয়োজিত একটি আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার অনুমতি দেয়নি দিল্লি। দিল্লি পুলিশ এই অনুমতি দিতে অস্বীকার করেছে। আয়োজকদের তারা জানিয়েছে, কিছু বিতর্কের জন্য এই আলোচনা সভার অনুমতি দেওয়া হচ্ছে না। গত ২৯ আগস্ট শনিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে রাত সাড়ে ৮টা পর্যন্ত এ অনুষ্ঠান হওয়ার কথা ছিল। অনুষ্ঠান যাতে নির্বিঘ্নে হতে পারে, সেজন্য প্রয়োজনীয় নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে দিল্লি পুলিশকে অনুরোধ জানানো হয়েছিল।
এই আন্তর্জাতিক আলোচনা সভার আয়োজক ছিল নয়াদিল্লির বিতর্কিত প্রতিষ্ঠান ফরেন করেসপনডেন্টস ক্লাব (এফসিসি)। আলোচ্য বিষয় ছিল, ‘ইউরোপ অ্যান্ড এশিয়া: ফ্রম ডায়ালগ টু আ পার্টনারশিপ’। এফসিসি এ অনুষ্ঠান আয়োজন করেছিল বেলজিয়ামভিত্তিক সংগঠন ‘হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশন’-এর সঙ্গে যৌথভাবে।
নয়াদিল্লি থেকে এক সিনিয়র রিপোর্টারের মন্তব্য হচ্ছে, অনুষ্ঠান বাতিল নিয়ে সরকারিভাবে কিছু বলা না হলেও ধারণা করা হচ্ছে, অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত ব্যক্তিরা থাকার কারণে দিল্লি পুলিশ অনুমতি দেয়নি। ৫ আগস্ট এই ক্লাবেই বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভার্চুয়াল উপস্থিতি এবং বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে মন্তব্যের পর দুই দেশের সম্পর্কে টানাপড়েন তৈরি হয়েছিল। বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই ঘটনার প্রতিবাদই শুধু জানানো হয়নি, এ ধরনের ‘অবাঞ্ছিত প্ররোচনা’ বন্ধের নিশ্চয়তার দাবিও জানানো হয়েছিল। শেখ হাসিনার প্রত্যর্পণের দাবিও নতুন করে ও জোরালোভাবে জানানো হয়েছিল। এরপর বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সম্ভাব্য ভারত সফরও পিছিয়ে যায়। ওয়াকিবহাল মহল মনে করছে, নতুনভাবে আর কোনো বিতর্ক যাতে সৃষ্টি না হয়, সম্ভবত সেই কারণে শনিবারের আলোচনা সভার অনুমতি দেওয়া হয়নি।
ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় হাসিনা-বিতর্ক নিয়ে একাধিকবার বলেছে, ওই মঞ্চ থেকে যা কিছু বলা হয়েছে, তার সঙ্গে সরকারের কোনো লেনাদেনা নেই। ওই বক্তব্য ভারত সরকারের মনোভাবও নয়।
এফসিসিতে শনিবারের আলোচনা সভায় উপস্থিত থাকার কথা ছিল বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক সেলিম মাহমুদ। তিনি ছাড়াও আমন্ত্রিত ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা ও বাংলাদেশি-আমেরিকান বিজ্ঞানী নুরান নবী। তারা ছাড়া অন্য বক্তাদের মধ্যে আমন্ত্রিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ভারতের সাবেক হাইকমিশনার বীণা সিক্রি, রোহিঙ্গা আন্দোলন অধিকারকর্মী রবি আলম, ইউনাইটেড ডিপ্লোমেটিক কাউন্সিলের সভাপতি আসিফ ইকবাল, হ্যান্ড ইন হ্যান্ড ফাউন্ডেশনের সাধারণ সম্পাদক গোলাম জিলানিসহ অন্যরা।
চেক রিপাবলিকের রাজনীতিবিদ ওন্দ্রেজ দোস্তাল ও জার্মান রাজনীতিবিদ পিটার ফারেনহোল্টজেরও সেমিনারে উপস্থিত থাকার কথা ছিল। আলোচনা সভার একটা অংশ ছিল প্রশ্নোত্তর পর্ব। সেখানে বাংলাদেশ পরিস্থিতি নিয়ে কেউ কোনোরকম বিরূপ মন্তব্য করুক, সেটা সম্ভবত দিল্লি পুলিশ চায়নি।
শনিবারই দিল্লি পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ওই অনুষ্ঠানের অনুমতি দেওয়া যাচ্ছে না। আবেদনপত্রে হাতে লিখে বলা হয়, অনুমতি না দেওয়ার কারণ ‘কিছু বিতর্ক’। এফসিসির সভাপতি ওয়াইল আওয়াদ গণমাধ্যমকে বলেন, অনুষ্ঠানটা ছিল পার্টনারশিপ ও উন্নয়ন-সংক্রান্ত। তিনি বলেন, ‘এটা ছিল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক আলোচনা। আমি নিশ্চিত নই, দিল্লি পুলিশ কেন অনুমতি দিল না।’ তবে দিল্লি পুলিশ তো অনুমতি না দেয়ার সিদ্ধান্তটা নিজেরা নেয়নি, এটা অবশ্য ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের সিগন্যাল নিয়েই করেছে বলেই বিশ্লেষকদের অভিমত।
সংশ্লিষ্ট কূটনৈতিক সূত্রের মতে, শনিবারের আলোচনা সভা বন্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশকে এটাও বোঝানোর চেষ্টা করা হয়েছে যে, সম্পর্কের খাতিরে কোনোরকম অহেতুক বিতর্ক ভারত আর চায় না। বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়নে ভারত যে আন্তরিক, এই সিদ্ধান্ত তার একটি প্রমাণ বলে মনে করছে ওয়াকিবহাল মহল।
হিটলারের নাৎসি পার্টি নিষিদ্ধই রয়েছে
বাংলাদেশই নয়, বিশ্বের অনেক উন্নত গণতান্ত্রিক দেশেও স্বৈরাচারী ও ফ্যাসিস্ট কর্মকাণ্ডের কারণে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের কার্যক্রম নিষিদ্ধের পর দলও আজীবনের জন্য নিষিদ্ধ রয়েছে। যেমন জার্মানিতে হিটলারের নাৎসি পার্টি ও ইতালিতে ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি এখনো নিষিদ্ধ।
জার্মানির স্বৈরশাসক অ্যাডলফ হিটলারের রাজনৈতিক দলের নাম নাৎসি পার্টি (Nazi Party)। এর পূর্ণ বা আসল নাম ছিল ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি (National Socialist German Workers’ Party বা NSDAP)। ১৯১৯ সালে জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি হিসেবে এটি গঠিত হয় এবং ১৯২০ সালে নাম পরিবর্তন করে নাৎসি পার্টি রাখা হয়। ১৯২১ সাল থেকে হিটলার এই দলের সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী বা প্রধান নেতা হন। ১৯৩৩ থেকে ১৯৪৫ সাল প্রায় ১৩ বছর এটি জার্মানির ক্ষমতায় ছিল।
অ্যাডলফ হিটলারের নাৎসি পার্টি (NSDAP) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির পরাজয়ের পর ১৯৪৫ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে চিরতরে নিষিদ্ধ ও ভেঙে দেওয়া হয়েছে। বর্তমান বিশ্বে বা জার্মানিতে এই দলের কোনো আইনগত অস্তিত্ব বা কার্যক্রম নেই।
আইনগত নিষেধাজ্ঞা
১৯৪৫ সালে মিত্রশক্তি জার্মানিকে পরাজিত করার পর নুরেমবার্গ ট্রায়াল ও মিত্রদের ডিন্যাসিফিকেশন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নাৎসি পার্টিকে অবৈধ ঘোষণা করা হয়। জার্মানির বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী নাৎসি প্রতীক, প্রোপাগান্ডা এবং দলীয় আদর্শ প্রচার সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ।
মূল দলটির অস্তিত্ব না থাকলেও, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ও জার্মানিতে কিছু উগ্র ডানপন্থী বা ‘নব্য-নাৎসি’ ছোট ও বিচ্ছিন্ন গোষ্ঠীর উপস্থিতি রয়েছে। জার্মানির অভ্যন্তরীণ গোয়েন্দা সংস্থা নিয়মিতভাবে এই ধরনের উগ্র চরমপন্থীদের নজরদারি ও দমন করে থাকে।
হিটলারের পৈতৃক বাড়িসহ নাৎসি আমলের বিভিন্ন নিদর্শন বা স্থাপনা নিয়ে জার্মান সরকার অত্যন্ত সতর্কতামূলক ও আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করে থাকে, যাতে সেগুলো নব্য-নাৎসিদের তীর্থস্থান বা প্রচারের মাধ্যম হতে না পারে।
মুসোলিনির পার্টিও পুনর্গঠন করা সম্পূর্ণ অবৈধ
ইতালির স্বৈরশাসক বেনিতো মুসোলিনির রাজনৈতিক পার্টির নাম ছিল ন্যাশনাল ফ্যাসিস্ট পার্টি (Partito Nazionale Fascista PNF)। বর্তমানে মুসোলিনির পার্টিটি সম্পূর্ণ বিলুপ্ত ও নিষিদ্ধ। ১৯৪৩ সালে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন মুসোলিনির পতনের পর এই পার্টিটি সম্পূর্ণরূপে ভেঙে দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ১৯৪৮ সালে প্রণীত ইতালির সংবিধানে মুসোলিনির ফ্যাসিস্ট পার্টিকে পুনর্গঠন বা পুনরায় চালু করা আইনগতভাবে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়।
১৯৪৩ সালে অক্ষশক্তির সমর্থনে উত্তর ইতালিতে মুসোলিনি যখন একটি পুতুল সরকার (ইতালীয় সামাজিক প্রজাতন্ত্র) গঠন করেন, তখন তিনি রিপাবলিকান ফ্যাসিস্ট পার্টি নামে দলটিকে পুনরুজ্জীবিত করার চেষ্টা করেছিলেন। তবে ১৯৪৫ সালে অক্ষশক্তির পরাজয় এবং মুসোলিনির মৃত্যুর পর এটিও চিরতরে বিলুপ্ত হয়ে যায়।
মূল পার্টিটি আইনত নিষিদ্ধ হলেও, যুদ্ধ-পরবর্তী সময়ে ইতালিতে ‘ইতালিয়ান সোশ্যাল মুভমেন্ট’ (MSI)-এর মতো কিছু নব্য-ফ্যাসিবাদী (Neo-Fascist) বা অতি-ডানপন্থী রাজনৈতিক দলের উদ্ভব ঘটে।
ইতালির বর্তমান ক্ষমতাসীন দল ব্রাদার্স অব ইতালির আদর্শিক শিকড় সেই যুদ্ধ-পরবর্তী নব্য-ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের সাথে যুক্ত বলে মনে করা হয়। তবে দলটির বর্তমান প্রধান এবং ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বারবার স্পষ্ট করেছেন যে, তারা উগ্র ফ্যাসিবাদকে অতীতে ফেলে এসেছেন এবং গণতান্ত্রিক মূল্যবোধে বিশ্বাসী। মুসোলিনির মূল পার্টিটির বর্তমানে কোনো অস্তিত্ব নেই এবং ইতালিতে এটি পুনর্গঠন করা সম্পূর্ণ অবৈধ।
হিটলার ও মুসোলিনির উত্তরসূরি ফ্যাসিস্ট হাসিনা
ইতিহাসে ইতালিতে বেনিতো মুসোলিনি এবং জার্মানিতে অ্যাডলফ হিটলার ছিলেন সবচেয়ে পরিচিত ফ্যাসিস্ট নেতা। এদিকে দক্ষিণ এশিয়ার দেশে বাংলাদেশে ফ্যাসিস্ট নেতা ছিলেন শেখ মুজিবুর রহমান ও তারই যোগ্য উত্তরসূরি শেখ হাসিনা।
ইতালীয় শব্দ ‘ফ্যাসো’ (Fascio) থেকে ফ্যাসিস্ট শব্দের উৎপত্তি, যার আক্ষরিক অর্থ হলো এক বান্ডেল কাঠ বা রড। প্রাচীন রোমে ঐক্যের প্রতীক হিসেবে এটি ব্যবহার করা হতো একটি মাত্র লাঠি সহজে ভাঙা গেলেও এক বান্ডেল লাঠি একসাথে ভাঙা যায় না।
১৯১৯ সালে ইতালির একনায়ক বেনিতো মুসোলিনি এই প্রতীক ও নাম ব্যবহার করে রাজনৈতিক আন্দোলন শুরু করেন।
ফ্যাসিস্টদের প্রধান বৈশিষ্ট্যসমূহ এক একনায়কতন্ত্র ও সর্বগ্রাসী শাসন, রাষ্ট্রে কেবল একজনের বা একটি দলের নিরঙ্কুশ ক্ষমতা থাকে। তাদের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে বিরোধীদের দমন। ভিন্নমত বা বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি কোনো সহনশীলতা থাকে না এবং কঠোরভাবে তাদের দমন করা হয়। বাকস্বাধীনতা হরণও তাদের প্রধান বৈশিষ্ট্যের একটি। গণমাধ্যম ও বাকস্বাধীনতা কেড়ে নেওয়া হয় এবং ভীতি ও সহিংসতার মাধ্যমে সমাজ নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
কার্যক্রম নিষিদ্ধই থাকছে আ’লীগের
বিগত দুই বছর যাবত বাংলাদেশে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ। প্রথমে অধ্যাদেশ জারি করে বিগত অন্তবর্তী সরকার আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। তারপর বর্তমান বিএনপি সরকার জাতীয় সংসদের বিল পাস করে আইনের মাধ্যমেই ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে। বিগত এপ্রিল মাসে জাতীয় সংসদের ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন বিল) ২০২৬’ পাসের মাধ্যমে আওয়ামী লীগের কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাখার সিদ্ধান্তটি আইনগত বৈধতা লাভ করে। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের জারি করা ‘সন্ত্রাসবিরোধী (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫’-কে স্থায়ী আইনে রূপ দিতে এই বিল আনা হয় এবং তা কোনো পরিবর্তন ছাড়াই সংসদে পাস হয়।
এই আইনের ফলে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচার সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত দলটির সকল ধরনের রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ থাকবে।
ঢাকার গুলিস্তান এলাকায় আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি বিগত দুই বছর যাবত বন্ধ, ধানমন্ডিতে দলীয় সভাপতির কার্যালয়টিও বন্ধ রয়েছে। দেশে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হয়ে গেল, কিন্তু আওয়ামী লীগ এ নির্বাচনেও অংশগ্রহণ করতে পারেনি। আগামী দিনে স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের কোনো সম্ভাবনা নেই।
দলের সভাপতিসহ কেন্দ্রীয় নেতাদের অধিকাংশই দেশের বাইরে, দেশের অভ্যন্তরে দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়টি বন্ধ, দলের কেন্দ্র থেকে শুরু করে ওয়ার্ড ও ইউনিট লেভেলে কোনো তৎপরতা নেই। দেশের বাইরে তথা ভারতে আওয়ামী লীগ কিছু তৎপরতা চালাতে চেষ্ট করছিল, সেটা করতে পারছে না। এভাবে দেশের ভেতরে ও বাইরেসহ সর্বস্তরেই আওয়ামী লীগের কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এককথায় ছোট হয়ে আসছে আওয়ামী লীগের দুনিয়া। সংকুচিত হয়ে আসছে আওয়ামী লীগ। জার্মানি ও ইতালিতে হিটলার ও মুসোলিনির পার্টি শুধু নিষিদ্ধই নয়, তাদের কোনো অস্তিত্বও নেই। তাদের পার্টির পুনগঠন কাজ করারও কোনো সুযোগ নেই। তেমনিভাবে বাংলাদেশেও ফ্যাসিস্ট দল আওয়ামী লীগের পুনগঠনের সুযোগ হবে না বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের অভিমত।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com