বাংলাদেশের স্থিতিশীলতা বিনষ্টের গভীর ষড়যন্ত্রে ভারতীয় গণমাধ্যম
৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ০৯:৫৬
॥ জামশেদ মেহদী ॥
ভারত ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সংঘটিত জুলাই বিপ্লব কোনো অবস্থাতেই মেনে নিতে পারেনি। বস্তুত তারা বাংলাদেশের কোনো ঘটনাকেই মেনে নিতে পারে না, যদি কোনো ঘটনা ভারতের জিও পলিটিকস ও সেভেন সিস্টার্সের নিরাপত্তার অনুকূল না হয়। ভারত মনে করে, বাংলাদেশে আওয়ামী লীগ এবং তাদের নেতা শেখ মুজিব ও শেখ হাসিনা তাদের স্বার্থের বরকন্দাজ। তাই তারা মুজিব সরকারের উৎখাতকে মেনে নিতে পারেনি। সেজন্যই মুজিব সরকারের উৎখাতের পর কাদের সিদ্দিকী যখন বাংলাদেশের অত্যন্ত ক্ষুদ্র একটি গোষ্ঠীকে নিয়ে ভারত যান এবং তাদের ভাষায় মুজিব হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার জন্য ভারতের সাহায্য চান, তখন ভারত তাদের সাদরে গ্রহণ করে। কাদের সিদ্দিকীর ঐ দলে সদ্য সাবেক প্রেসিডেন্ট সাহাবুদ্দিন চুপ্পুও ছিলেন। কিন্তু বাংলাদেশের জনগণ এবং তৎকালীন জিয়াউর রহমান সরকার কাদের সিদ্দিকীর কতিপয় সশস্ত্র ব্যক্তির সীমান্তে উৎপাতকে দৃঢ়ভাবে মোকাবিলা করেন তখন ওরা ভারতেই পাালিয়ে যায়। তারপর দীর্ঘ কয়েক বছর তারা ভারতেই থাকে। এদিকে মুজিব-উত্তর জিয়া এবং খালেদা জিয়ার সরকারকে ভারত মানতে পারেনি। আসলে বিজেপি এবং কংগ্রেস উভয় দলের কাছেই ভারতের গৃহপালিত বাংলাদেশি দল হলো আওয়ামী লীগ এবং শেখ পরিবার।
২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পর শেখ মুজিবের কন্যা শেখ হাসিনা আক্ষরিক অর্থেই ভারতের বাংলাদেশি গৃহপালিত দল হিসেবে ভারতের সেবা করে গেছে। তাই জুলাই বিপ্লবের পর তারা ড. ইউনূসের সরকারকে যেমন মেনে নিতে পারেনি, তেমনি এখন পর্যন্ত যা দেখা যাচ্ছে, সেসব ঘটনা দেখে মনে হয় যে, তারা তারেক রহমানের বিএনপি সরকারকেও মেনে নিতে পারেনি।
ভারত নিজেকে বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশ বলে মনে করে। কিন্তু বাংলাদেশের জুলাই বিপ্লবটি যে ছিলো ১৮ কোটি মানুষের বিপ্লব বা অভ্যুত্থান, সেটি তারা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তাই তারা মনের ঝাল মেটানোর জন্য যখন যা মনে হচ্ছে, তাই তারা বলে যাচ্ছে। আমি নিচে একের পর এক কতগুলো ঘটনা বলবো, যেগুলোয় দেখা যাবে যে ১৮ কোটি মানুষের বিপ্লবকে ভারত কখনো মার্কিন সিআইয়ের ষড়যন্ত্র, কখনো পাকিস্তানের আইএসআইয়ের পরিকল্পনা বলে অপবাদ দিচ্ছে। আবার কখনো বলছে, এটি জনগণের কোনো আন্দোলন ছিলো না, এর পেছনে ছিলো আল-কায়েদার কালো হাত। এতেও সন্তুষ্ট হতে না পেরে তারা এই বিপ্লবের পেছনে আবিষ্কার করছে পাকিস্তানের লস্করে তৈয়্যেবার চক্রান্ত। সবচেয়ে অবাক ব্যাপার হলো, এই ধরনের সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও গাঁজাখুরি প্রোপাগান্ডায় শরিক হয়েছে টাইমস অব ইন্ডিয়া এবং ইন্ডিয়া টুডের মতো বহুল প্রচারিত গণমাধ্যম।
২০২৪ সালে বিপ্লবের অব্যবহিত পর যেসব ভারতীয় গণমাধ্যম বাংলাদেশের জনগণের বিপ্লবের বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, সেগুলোর মধ্যে ছিলো— এনডিটিভি, জি-নিউজ, রিপাবলিক টিভি, হিন্দুস্তান টাইমস, ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, ইন্ডিয়া টুডে, আজ তকসহ অন্যান্য গণমাধ্যম।
ড. ইউনূসের আমলের প্রথম দিকে তারা যেসব ডাহা মিথ্যা খবর ছড়ায়, সেগুলোর মধ্যে ছিলো— বাংলাদেশে নিষিদ্ধ জঙ্গি সংগঠনসমূহের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া হয়েছে, বাংলাদেশে পাকিস্তান থেকে জাহাজভর্তি অস্ত্র আসছে ইত্যাদি। তবে ঐ সময় তারা তাদের Mal propaganda’র হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছিলো তাদের মিথ্যাচারের কারখানায় উৎপাদিত হিন্দু নির্যাতনের অলীক কাহিনী।
২০২৬ সালে ভারতীয় গণমাধ্যমের অপপ্রচার আরো বেগবান হয়। ভারতীয় রাজনৈতিক-মিডিয়া Discourse-এ এমন বক্তব্য আসে যে, বাংলাদেশের সরকারের পতন স্বতঃস্ফূর্ত ছাত্র-জনতার আন্দোলনের ফল নয়। এটি যুক্তরাষ্ট্র বা পশ্চিমা গোয়েন্দা সংস্থার পরিকল্পিত Regime-Change বা ‘Colour Revolution’। পরে বিভিন্ন ভারতীয় ভাষ্যকার ও গণমাধ্যমে আলোচিত হয়। Dhaka Tribune-I-ও ২ সেপ্টেম্বর ২০২৪-এ লিখেছিলো যে, শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পরপরই ভারতীয় Discourse-G US-orchestrated ‘Colour Revolution’ তত্ত্বটি ছড়িয়ে পড়ে।
এটি শুধু ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের বানানো দাবি ছিল না। শেখ হাসিনার পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় নিজেও ৬ আগস্ট ২০২৪-এ ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ABP News-কে বলেন, তার বিশ্বাস, ISI আন্দোলনের সঙ্গে জড়িত। তার যুক্তি ছিলো, পুলিশের ওপর সশস্ত্র হামলায় ব্যবহৃত অস্ত্র ছাত্রদের কাছে থাকার কথা নয়। সেগুলো জামায়াত-শিবিরের কাছে ছিলো এবং ‘কেউ’ তাদের অস্ত্র দিয়েছে। এরপর ভারতীয় মিডিয়ার বিভিন্ন রিপোর্টে এই বক্তব্য ব্যাপকভাবে প্রচারিত হয়।
হাসিনা পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় যখন এ ধরনের মনগড়া এবং বিকৃত ন্যারেটিভ প্রচার করতে শুরু করেন, তখন তা বিশ্বাসযোগ্যতা সম্পূর্ণ হারিয়ে ফেলে। সুতরাং এসব ডাহা ভিত্তিহীন ন্যারেটিভকে গ্রহণযোগ্য করার জন্য তারা নতুন নতুন বয়ান ছাড়তে শুরু করে। এগুলোর একটি হলো, শেখ হাসিনার পতনের পর বাংলাদেশ ভারতের বন্ধু রাষ্ট্র থেকে পাকিস্তান অভিমুখী রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে।
এটি শুধু গণমাধ্যমের প্রোপাগান্ডা নয়। ২০২৬ সালের ৫ আগস্ট সজীব ওয়াজেদ জয় আবারও ভারতীয় শ্রোতাদের সামনে বলেন, বাংলাদেশ ভারতের পূর্ব সীমান্তে আরেকটি পাকিস্তান (Another Pakistan) হয়ে গেছে এবং আইএসআই সেখানে প্রকাশ্যে কাজ করছে। NDTV-এর মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ টেলিভিশন তার এই বক্তব্য প্রকাশ করেছে।
আমরা ভেবে অবাক হই যে, ‘টাইমস অব ইন্ডিয়া’ বা ‘ইন্ডিয়া টুডের’ মতো নাম করা গণমাধ্যম কীভাবে মিথ্যা বলতে পারে। গত বছরের নভেম্বরে এই পত্রিকাটি শিরোনাম দিয়েছিলো, ‘Hafiz plotting India attacks using Bangladesh as Launchpad’. ঐ খবরে বলা হয়েছে যে, তাদের ভাষায় বিশ্ব সন্ত্রাসী পাকিস্তানের হাফিজ সাইদের সন্ত্রাসী সংগঠন লস্করে তৈয়্যেবা ভারতের বিরুদ্ধে নতুন ফ্রন্ট খুলতে যাচ্ছে। সেটি হলো বাংলাদেশ থেকে ভারতের অভ্যন্তরে আক্রমণ। অর্থাৎ ভারতে হামলার লঞ্চপ্যাড হিসেবে বাংলাদেশকে ব্যবহার। ঐ খবরে বলা হয় যে, হাফিজ সাইদ তার বিশ্বস্ত কয়েকজন সহচরকে বাংলাদেশে পাঠিয়েছেন। তারা ভারতে হামলা করার জন্য বাংলাদেশের যুব সম্প্রদায়কে ট্রেনিং দিচ্ছে।
তারপর অন্তত ৯ মাস পার হয়ে গেছে। হাফিজ সাইদ বা ‘লস্করে তৈয়্যেবার’ কোনো পদচিহ্নও বাংলাদেশে দেখা যায়নি। আরো অবাক ব্যাপার হলো এই যে, একই ধরনের খবর ছেপেছে ‘ইন্ডিয়া টুডে’র মতো বহুল প্রচারিত গণমাধ্যম। তাদের সংবাদের শিরোনাম হলো, ‘Hafiz Saeed opens new front against India, sends close aide to Bangladesh.’ দেখুন, কেমন সিন্ডিকেটেড নিউজ। বড় বড় দুটি পত্রিকার প্রায় একই রকম শিরোনাম। এসবের পেছনে সরকারি মদদ না থাকলে এভাবে ভারতের মতো বিশাল দেশের অসংখ্যা পত্রপত্রিকায় একই ধরনের খবর প্রায় একই সময় প্রকাশিত হতে পারে না।
সিআইএ, আইএসআই ও লস্করে তৈয়্যেবাতেই তারা ক্ষান্ত হয়নি। ভারতের শত শত সংবাদপত্র ও শত শত টেলিভিশন। কোনটি ছেড়ে কোনটির নাম বলবো? অধিকাংশ মিডিয়াতেই আরেকটি যে ঐক্যবদ্ধ প্রচারণা (Concerted propaganda) চালানো হয়, সেটি হলো, ‘জামায়াত ক্ষমতা দখল করেছে/বাংলাদেশ ইসলামপন্থী রাষ্ট্র হয়ে যাচ্ছে।’ শিরোনামে জামায়াতে ইসলামী থাকলেও খবরের ভেতরে বলা হয়েছে যে, ক্ষমতা দখল করেছে জামায়াত ও শিবির ছাড়াও হিযবুত তাহরীর, পাকিস্তান এবং অন্যান্য চরমপন্থী ইসলামী সংগঠন।
সর্বশেষ যে বিষয়টি নিয়ে ভারতের সমস্ত গণমাধ্যম এবং হিন্দুত্ববাদী সংগঠনসমূহ ঐক্যতান তুলেছে, সেটি হলো, ‘AQIS’ এর শাখা নাকি বাংলাদেশে স্থাপিত হয়েছে। ‘AQIS’ এর পূর্ণ নাম হলো, ‘Al-Qaeda in the Indian Subcontinent’. উল্লেখ্য, ২০১৪ সালে আল-কায়েদার শীর্ষনেতা আইমান আল জাওয়াহিরি এই সংগঠনটি প্রতিষ্ঠা করেন। প্রকাশিত রিপোর্টে বলা হয়েছে যে, বাংলাদেশে তারা ‘AQIS’ নামে কাজ করছে না। তারা বাংলাদেশে প্রথমে কাজ শুরু করে ‘আনসারুল ইসলাম’ নামে। পরবর্তীতে সুনির্দিষ্টভাবে বাংলাদেশে তাদের তৎপরতা বোঝানোর জন্য নামটি Blr পরিবর্তন করে রাখে ‘আনসারুল্লাহ বাংলা’।
কিছু ভারতীয় সংবাদমাধ্যম যে শিরোনাম দিয়েছে, সেটি নিম্নরূপ— ‘AQIS is attempting to exploit Bangladesh/establish cells’. কেউ কেউ এতদূরও গিয়েছেন যে, শিরোনাম দিচ্ছে, ‘Al-Qaeda has established itself in Bangladesh/Bangladesh has become an Al-Qaeda base’ প্রথম শিরোনামটির অর্থ, ‘একিউআইএস বাংলাদেশকে ব্যবহারের চেষ্টা করছে/শাখা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছে।’ দ্বিতীয় শিরোনামটির অর্থ হলো, ‘বাংলাদেশে আল-কায়েদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে/বাংলাদেশ আল কায়েদার একটি ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।’
যেহেতু জামায়াতের নাম নেওয়া হয়েছে, তাই জনগণ দাবি করছেন, ভারতের গণমাধ্যমের প্রতিনিধিরা বাংলাদেশে আসুন এবং খুঁজে খুঁজে আল-কায়েদার ঘাঁটি চিহ্নিত করুন। আর যদি না পারেন, তাহলে বাংলাদেশ ত্যাগ করার আগে এই মর্মে নাকে খত দিন যে, আগামীতে আর এমন ডাহা মিথ্যা রিপোর্ট করবো না।
রিপাবলিক ওয়ার্ল্ড দাবি করেছে যে, নাশকতামূলক তৎপরতা চালানোর জন্য বাংলাদেশ থেকে কিছু সন্ত্রাসী ভারতে অনুপ্রবেশ করেছে। তাই যদি হয়, তাহলে ভারত তাদের গ্রেফতার করে না কেন? গ্রেফতার করে তাদের সাংবাদিকদের সামনে হাজির করে না কেন?
এই ধরনের আরো অসংখ্য প্রোপাগান্ডা রয়েছে। এসব প্রোপাগান্ডার মূল সুর হলো— ১. জুলাই বিপ্লব স্বতঃস্ফূর্ত নয়। ২. এই বিপ্লবের পেছনে যুক্ত ছিলো সিআইএ, পাকিস্তানের আইএসআই এবং জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী ছাত্রশিবির।
আগেই বলেছি যে, ভারত একটি বড় রাষ্ট্র। তাদের প্রিন্ট ও ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার সংখ্যাও প্রচুর। তাদের এই ম্যাল প্রোপাগান্ডা বা উন্মাদ প্রচারণার মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের সরকারি ও বেসরকারি পর্যায় থেকে যে উদ্যোগ নেওয়ার প্রয়োজন, সেটির অভাব লক্ষ করা যায়। এসব প্রোপাগান্ডা মিথ্যার ওপর প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু তাই বলে এগুলো উদ্দেশ্যবিহীন নয়। এগুলোর অবশ্যই একটি সুদূরপ্রসারী উদ্দেশ্য রয়েছে। এসব প্রোপাগান্ডা দুরভিসন্ধিমূলক। তারা বাংলাদেশে স্থিতিশীলতা বিনষ্টের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। স্থিতিশীলতা বিনষ্টের পর বাংলাদেশের ভৌগোলিক অখণ্ডতার ওপর আঘাত হানবে বলেও ভারতের কোনো কোনো বিগ মিডিয়া হাউস আস্ফালন করছে।
Email : jamshedmehdi15@gmail.com