জামায়াতে ইসলামীর অভিযাত্রা শুরু ২৬ আগস্ট ১৯৪১

মুক্তিকামী মানুষের কাছে ইসলামী আদর্শের অবিরাম দাওয়াত চলছে


২৫ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৪

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বর্তমান বিশ্বে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বহু প্রতিষ্ঠান এবং সংগঠন রয়েছে। বিশেষ করে প্রতিটি দেশ ও জনপদে হাজারো সংগঠন, সমিতি এবং প্রতিষ্ঠান রয়েছে। যুগে যুগে উদ্যমী মানুষরাই বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য নিয়ে এসব সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেছেন। তৎকালে যুগের চাহিদা সামনে রেখে এসব সংগঠন যেমন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল, তেমনিভাবে অনেক সংগঠন প্রয়োজন ফুরিয়ে যাওয়ার পর হারিয়েও গেছে এবং কোনো কোনো সংগঠন নেতৃত্ব সংকটে বেশিদূর এগোতে পারেনি। রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর মধ্যে যেমন আদর্শিক ও বস্তুবাদী দল রয়েছে, তেমনি রয়েছে পুঁজিবাদী সংগঠন ও সমাজতান্ত্রিক সংগঠন। উল্লেখ্য, এসব সংগঠনের মধ্যে রাজনৈতিক সংগঠনগুলোই রাষ্ট্র ও সমাজে বিশেষ ভূমিকা পালন করে থাকে। আদর্শিক সংগঠনগুলোর মধ্যে মুসলিম ও অমুসলিম বিশ্বের অনেক দেশেই অনেক ইসলামী রাজনৈতিক দল ও সাধারণ সংগঠন রয়েছে। যেমন ভারতীয় উপমহাদেশে আদর্শিক সংগঠনের মধ্যে মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম পার্টি ও জামায়াতে ইসলামী। ভারতবর্ষের এসব সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জামায়াতে ইসলামী। আর এ জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল ইসলামী আদর্শের সঠিক বিশ্বাস ও চিন্তা- তথা কনসেপ্টটা ভারতের সাধারণ মানুষের সামনে তুলে ধরার পাশাপাশি সমাজ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে ইসলামকে প্রতিষ্ঠা করা। ভারতবর্ষে জামায়াতে ইসলামীর এ ‘অভিযাত্রা’ শুরু ১৯৪১ সালের ২৬ আগস্ট।
জামায়াতে ইসলামীর প্রতিষ্ঠা
অবিভক্ত ব্রিটিশ ভারতের বিশিষ্ট আলেমেদীন ও মোজদ্দেদ আল্লামা সাইয়েদ আবুল আলা মওদুদী ১৯৪১ সালের ২৬ আগষ্ট জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠা করেন। লাহোরের ইসলামিয়া পার্কে ৭৫ জন আলেমকে সাথে নিয়ে অনুষ্ঠিত এক সম্মেলনের মাধ্যমে প্রথম জামায়াতে ইসলামীর যাত্রা শুরু করেন। ঐ সম্মেলনে দলটির নাম নির্ধারণ করা থেকে শুরু করে দলের গঠনতন্ত্র অনুমোদন, মজলিসে শূরা গঠন ও দলের আমীর নির্বাচন করা হয়। দীর্ঘ আলাপ-আলোচনার পর সম্মেলনে দলটির নাম নির্ধারণ করা হয় ‘জামায়াতে ইসলামী হিন্দ’ এবং ঐ সম্মেলনেই জামায়াতে ইসলামীর একটি গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। ২৭ আগস্ট একটি গঠনমূলক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমীর নির্বাচন করা হয়। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী জামায়াতে ইসলামী হিন্দের আমীর নির্বাচিত হন। তারপর মাওলানা মওদূদী জামায়াতে ইসলামীর প্রথম মজলিসে শূরার নির্বাচন সম্পন্ন করেন। ভারতের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ১৬ জন শূরা সদস্য নির্বাচিত হন, তন্মধ্যে তৎকালীন পূর্ববঙ্গের বাকেরগঞ্জ থেকে মাওলানা আতাউল্লাহ বোখারী নির্বাচিত হয়েছিলেন।
১. মাওলানা মনযুর নোমানী, বেরেলী,
২. মাওলানা আমীন আহসান ইসলাহী, সরাইমীর।
৩. মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভী, লাক্ষেèৗ।
৪. মাওলানা জাফর, ফুলওয়ারী।
৫. নাযীরুল হক, মিরাঠী।
৬. মাওলানা মুহাম্মদ আলী কান্দালভী, শিয়ালকোট।
৭. মাওলানা আবদুল আযীয শার্কী, জলন্ধর।
৮. নসরুল্লাহ খান আযীয, লাহোর।
৯. চৌধুরী মুহাম্মদ আকবর, শিয়ালকোট।
১০. ডা. সাইয়েদ নাযীর আলী, এলাহাবাদ।
১১. মিস্ত্রী মুহাম্মদ সিদ্দীক।
১২. মাওলানা আবদুল জাব্বার গাজী।
১৩. মাওলানা আতাউল্লাহ বোখারী, বাকেরগঞ্জ।
১৪. কামরুদ্দীন খান, লাহোর।
১৫. মুহাম্মদ বিন আলী, উলুভী।
১৬. মুহাম্মদ ইউসুফ, ভূপাল।
১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী প্রতিষ্ঠার পর লাখকোটি মানুষ এ সংগঠনে যোগদান করেছেন। তাদের অনেকেই জামায়াতে ইসলামীর সহযোগী সদস্য, কর্মী ও রুকন (সদস্য) হয়েছেন। তাদের মধ্যে অনেকেই ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্ব দিয়েছেন। অনেক বিজ্ঞজন জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস, তার উদ্দেশ্য, লক্ষ্য, কর্মনীতি ও কর্মসূচি নিয়ে নিবন্ধ ও প্রবন্ধ লিখেছেন, বই লিখেছেন, পিএইচডি করেছেন। পত্রপত্রিকা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সাময়িকীতে জামায়াতে ইসলামীর পক্ষে যেমন লিখেছেন, তেমনিভাবে সমালোচনাও করেছেন। তাদেরই একজন হচ্ছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সাবেক ভারপ্রাপ্ত আমীর আব্বাস আলী খান। তিনি জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস নামে তিন খণ্ডের একটি বড় বই লিখেছেন। তার বইয়ে তিনি জামায়াতে ইসলামীর পরিচিতি থেকে শুরু করে তার গঠন ও ইতিহাস বিস্তারিতভাবে তুলে ধরেছেন।
জামায়াতে ইসলামী কী?
জামায়াতে ইসলামীর ইতিহাস ১ম খণ্ড বইয়ের প্রথম অধ্যায়ে আব্বাস আলী খান (র.) জামায়াতে ইসলামী কী, তার একটি সংক্ষিপ্ত রুপ তুলে ধরেছেন। তিনি লিখেছেন, ‘আল্লাহ তায়ালার জমিনে আল্লাহ তায়ালার পূর্ণাঙ্গ দীন ইসলাম পরিপূর্ণ রূপে কায়েম করার লক্ষ্যে আন্দোলন, চেষ্টাচরিত্র, সাধনা ও সংগ্রাম করার যে জামায়াত বা দল তাই জামায়াতে ইসলামী। অতএব জামায়াতে ইসলামী একটি পূর্ণাঙ্গ ইসলামী আন্দোলন। বাতিল মতবাদ, চিন্তাধারা ও জীবনবিধান খতম করে এবং তার অন্তঃসারশূন্যতা ও অনিষ্টকারিতা প্রতিপন্ন করে তার পরিবর্তে মানবজাতির জন্য আল্লাহর দেয়া একমাত্র জীবনবিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনই ইসলামী আন্দোলন এবং এ আন্দোলনের পতাকাবাহী জামায়াতে ইসলামী। অন্যকথায় বাতিল মতবাদ, চিন্তাধারা ও জীবনবিধান মানবজাতির ওপর বলপূর্বক চাপিয়ে দিয়ে দুনিয়ায় ফেৎনা-ফ্যাসাদ, অবিচার, জুলুম, নিষ্পেষণ, নরহত্যা, সন্ত্রাস প্রভৃতির দ্বারা মানবজীবনকে যে দুর্বিষহ করে তোলা হয়েছে, এসবের মূলোৎপাটন করে এক নতুন সুন্দর ও সুখী মানবসমাজ গঠনের সংগ্রাম জামায়াতে ইসলামী করছে। যেখানে জাতি, ধর্ম, বর্ণ, নির্বিশেষে একটি মানুষ তার জীবনকে অর্থবহ, সুখী ও সুন্দর দেখতে পাবে।’
জামায়াতে ইসলামী শুধু একটি সংগঠন ও আন্দোলনই নয়, এটা মানুষ গড়ার একটি প্রতিষ্ঠান। আর মুসলিমরা হয়ে থাকে শ্রেষ্ঠ মানুষ। শ্রেষ্ঠ মানুষ হতে হলে জ্ঞান বিজ্ঞানে যেমন সমৃদ্ধ হতে হবে, তেমনিভাবে চিন্তা, বিশ্বাস ও মননেও যথাযথ ও সঠিক আদর্শের ছাঁচে গড়ে উঠতে হবে। তাই জামায়াতে ইসলামীর নেতৃবৃন্দ প্রথম থেকেই জামায়াতে ইসলামীর সদস্যদের চিন্তা ও চেতনÑ তথা বিশ্বাসকে সঠিকভাবে গড়ে তোলার চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাই জামায়াতে ইসলামী তার গঠনতন্ত্রের ভূমিকাতেই সৃষ্টিকর্তার একত্ববাদ, তার শ্রেষ্ঠত্ব ও গুণাবলী তুলে ধরার পাশাপাশি তার প্রেরিত রাসূল সা.-ই যে সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ও তার আদর্শই হচ্ছে অনুকরণীয় এবং মানবজীবনের ইহকালই শেষ নয়, মৃত্যুর পর তার জন্য রয়েছে এক অনন্ত জীবনÑ যেখানে তাকে পার্থির জীবনের কর্মকাণ্ডের হিসাব ও বিচার হবে, তা তুলে ধরা হয়েছে।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের ভূমিকায় বলা হয়েছে, “যেহেতু মহান আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোনো ইলাহ নাই এবং নিখিল বিশ্বের সর্বত্র আল্লাহ তায়ালার প্রবর্তিত প্রাকৃতিক আইনসমূহ একমাত্র তাহারই বিচক্ষণতা ও শ্রেষ্ঠত্বের সাক্ষ্য দান করিতেছে; যেহেতু আল্লাহ তায়ালা মানুষকে তাঁহার প্রতিনিধিত্বের জন্য পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন এবং সত্যের অনুসরণ করাকেই মানুষের দায়িত্ব ও কর্তব্য নির্ধারণ করিয়া দিয়াছেন;
যেহেতু আল্লাহ তায়ালা সত্যের নির্দেশনাসহ যুগে যুগে নবী-রাসূলগণকে প্রেরণ করিয়াছেন;
যেহেতু বিশ্বনবী মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার সর্বশেষ নবী ও রাসূল এবং আল্লাহ তায়ালার প্রেরিত আল-কুরআন ও বিশ্বনবীর সুন্নাহই হইতেছে বিশ্বমানবতার অনুসরণীয় আদর্শ;
যেহেতু ইহকালই মানবজীবনের শেষ নয়, বরং মৃত্যুর পরও রহিয়াছে মানুষের জন্য এক অনন্ত জীবনÑ যেখানে মানুষকে তাহার পার্থিব জীবনের ভালো ও মন্দ কাজের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হইবে এবং বিচারের পর জান্নাত অথবা জাহান্নাম রূপে ইহার যথাযথ ফলাফল ভোগ করিতে হইবে;
যেহেতু আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন করিয়া জাহান্নামের আযাব হইতে নাজাত এবং জান্নাতের অনন্ত সুখ ও অনাবিল শারি লাভের মধ্যেই মানবজীবনের প্রকৃত সাফল্য নিহিত;
যেহেতু বাংলাদেশের জনগণ ও মুক্তিযোদ্ধাদের বীরত্বপূর্ণ সংগ্রামের মধ্য দিয়া বাংলাদেশ বিশ্বের মানচিত্রে স্বাধীন-সার্বভৌম জাতি-রাষ্ট্রের মর্যাদা লাভ করিয়াছে;
সেহেতু এই সকল মৌলিক বিশ্বাস ও চেতনার ভিত্তিতে শোষণমুক্ত ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ গঠনের মহান উদ্দেশ্যে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর এই গঠনতন্ত্র প্রণীত ও প্রবর্তিত হইল।”
জামায়াতে ইসলামীর গঠনতন্ত্রের প্রথম অধ্যায়ের ঈমান ও আকিদা সংক্রান্ত দ্বিতীয় ধারায় বলা হয়েছে, কুরআন এবং সহীহ হাদীসে নির্দেশিত ঈমান ও আকিদাই জামায়াতে ইসলামীর অনুসারীগণ পোষণ করিয়া থাকেন। যাহার মূল কথা হইলো- ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ’ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত কোনো ইলাহ নাই, মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার রাসূল।
ব্যাখ্যা : (ক) এই ঈমান ও আকিদার প্রথমাংশ অর্থাৎ আল্লাহ তায়ালার একমাত্র ইলাহ হওয়া এবং আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অন্য কাহারও ইলাহ না হওয়ার অর্থ এই যে, আকাশমণ্ডল ও পৃথিবীর মধ্যে যাহা কিছু আছে সেই সবকিছুর সৃষ্টিকর্তা, প্রতিপালক, মা’বুদ এবং প্রাকৃতিক ও বিধিগত সার্বভৌম সত্তা হইতেছেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা। এই সবের কোনো এক দিক দিয়াও কেহই তাঁহার সহিত শরীক নাই।
এই মৌলিক সত্য কথাটি জানিয়া ও মানিয়া লইলে নিম্নলিখিত বিষয়গুলি অনিবার্যরূপে গ্রহণ করিতে হয় :
১. মানুষ আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহাকেও নিজের পৃষ্ঠপোষক, কার্যসম্পাদনকারী, প্রয়োজন পূরণকারী, বিপদ দূরকারী, ফরিয়াদ শ্রবণ ও গ্রহণকারী এবং সাহায্যদাতা ও রক্ষাকর্তা মনে করিবে না। কেননা তিনি ব্যতীত আর কাহারও নিকট কোনো ক্ষমতা নাই।
২. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহাকেও কল্যাণকারী মনে করিবে না, কাহারও সম্পর্কে অন্তরে ভীতি অনুভব করিবে না, কাহারও ওপর নির্ভর করিবে না, কাহারও প্রতি কোনো আশা পোষণ করিবে না এবং এই কথা বিশ্বাস করিবে না যে, আল্লাহ তায়ালার অনুমোদন ব্যতীত কাহারও ওপর কোনো বিপদ-মুসিবত আপতিত হইতে পারে। কেননা সকল প্রকার ক্ষমতা ও ইখতিয়ার একমাত্র আল্লাহ তায়ালারই।
৩. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহারও নিকট দোয়া বা প্রার্থনা করিবে না, কাহারও নিকট আশ্রয় খুঁজিবে না, কাহাকেও সাহায্যের জন্য ডাকিবে না এবং আল্লাহ তায়ালার ব্যবস্থাপনায় কাহাকেও এতখানি প্রভাবশালী বা শক্তিমান মনে করিবে না যে, তাহার সুপারিশে আল্লাহ তায়ালা ফায়সালা পরিবর্তন করিতে বাধ্য। কেননা তাঁহার রাজ্যে সকলেই ক্ষমতাহীন প্রজা মাত্র।
৪. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত আর কাহারও সম্মুখে মাথা নত করিবে না এবং কাহারও উদ্দেশ্যে মানত মানিবে না। কেননা এক আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত ইবাদাত (দাসত্ব, আনুগত্য ও উপাসনা) পাইবার অধিকারী আর কেহই নাই।
৫. আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অপর কাহাকেও বাদশাহ, রাজাধিরাজ ও সার্বভৌম ক্ষমতার মালিক মানিয়া লইবে না, কাহাকেও নিজস্বভাবে আদেশ ও নিষেধ করিবার অধিকারী মনে করিবে না, কেননা স্বীয় সমগ্র রাজ্যের নিরঙ্কুশ মালিকানা ও সৃষ্টিলোকের সার্বভৌমত্বের অধিকার আল্লাহ তায়ালা ব্যতীত অপর কাহারও নাই।
উপরোক্ত ঈমান ও আকিদা অনুযায়ী নিম্নলিখিত বিষয়গুলিও মানিয়া লওয়া আবশ্যক-
১. মানুষ স্বীয় স্বাধীন ইচ্ছা ও আযাদী কুরবানি করিবে, নফসের ইচ্ছাÑ বাসনার দাসত্ব পরিত্যাগ করিবে এবং যে আল্লাহ তায়ালাকে ইলাহ মানিয়া লইয়াছে একনিষ্ঠভাবে একমাত্র তাঁহারই বান্দাহ ও দাস হইয়া জীবনযাপন করিবে।
২. নিজেকে কোনো কিছুরই স্বাধীন ইচ্ছাসম্পন্ন মালিক মনে করিবে না বরং স্বীয় জীবন, অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ, মানসিক ও দৈহিক শক্তি তথা সবকিছুকে আল্লাহ তায়ালার মালিকানাধীন ও তাঁহার নিকট হইতে প্রাপ্ত আমানত মনে করিবে।
৩. নিজেকে আল্লাহ তায়ালার নিকট দায়ী ও জবাবদিহি করিতে বাধ্য মনে করিবে, শক্তি-সামর্থ্যের ব্যবহার এবং স্বীয় আচরণ ও ক্ষমতা প্রয়োগে সব সময় সত্যের প্রতি লক্ষ্য রাখিবে যে, পরকালে আল্লাহ তায়ালার সম্মুখে এই সব বিষয়ের হিসাব অবশ্যই দিতে হইবে।
৪. আল্লাহ তায়ালার যাহা পছন্দ তাহাকেই নিজের পছন্দ এবং যাহা তাঁহার অপছন্দ তাহাকেই নিজের অপছন্দ রূপে গ্রহণ করিবে।
৫. আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি ও তাঁহার নৈকট্য লাভকেই নিজের যাবতীয় চেষ্টা সাধনার চূড়ান্ত লক্ষ্য এবং নিজের সমগ্র তৎপরতার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে গ্রহণ করিবে।
৬. স্বীয় নৈতিক চরিত্র, আচার-ব্যবহার এবং সামাজিক, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড, এককথায় জীবনের সর্ববিষয়ে কেবল আল্লাহ তায়ালার বিধানকেই একমাত্র হিদায়াত হিসেবে মানিয়া লইবে এবং আল্লাহ তায়ালার দেওয়া শরীয়াতের বিপরীত যাবতীয় নিয়মনীতি ও পন্থা-পদ্ধতিকে প্রত্যাখ্যান করিবে।
ব্যাখ্যা : (খ) এই ঈমান ও আকিদার দ্বিতীয় অংশ- হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তায়ালার রাসূল হওয়ার অর্থ এই যে, বিশ্বের একমাত্র বাদশাহ আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হইতে বিশ্বের সকল মানুষের প্রতি সর্বশেষ নবী মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর মাধ্যমে একমাত্র নির্ভুল হিদায়াত ও আইন-বিধান প্রেরিত হইয়াছে এবং এই হিদায়াত ও আইনÑ বিধান অনুযায়ী কাজ করিয়া পূর্ণাঙ্গ বাস্তব নমুনা কায়েম করিবার জন্যই মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে নিযুক্ত করা হইয়াছে।
যাহারা এই পরম সত্য ও প্রকৃত বিষয়কে জানিয়া ও মানিয়া লইবেন তাহাদের কর্তব্য হইবে :
১. হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হইতে যেই হিদায়াত ও আইন-বিধান প্রামাণ্য সূত্রে পাওয়া যাইবে তাহা দ্বিধাহীন ও অকুণ্ঠচিত্তে গ্রহণ করা।
২. কোন কাজে উদ্যোগী হওয়া বা কোন নিয়ম পদ্ধতি অনুসরণ হইতে বিরত থাকিবার জন্য আল্লাহ তায়ালার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট হইতে প্রাপ্ত আদেশ ও নিষেধকেই যথেষ্ট মনে করা।
৩. আল্লাহ তায়ালার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত অপর কাহারও স্বয়ংসম্পূর্ণ নেতৃত্ব মানিয়া না লওয়া, কেননা অন্য কাহারও আনুগত্য হইতে হইবে আল্লাহ তায়ালার কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতের অধীন।
৪. জীবনের সকল ব্যাপারেই আল্লাহ তায়ালার কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সুন্নাতকে অকাট্য, প্রামাণ্য, বিশ্বস্তসূত্র ও নির্ভুল জ্ঞানের একমাত্র উৎসরূপে গণ্য করা। যেইসব ধারণা, খেয়াল, বিশ্বাস কিংবা নিয়মনীতি ও পন্থা কুরআন ও সুন্নাহর বিপরীত তাহা পরিত্যাগ করা এবং কোনো সমস্যার সমাধান প্রয়োজন হইলে তাহার জন্য হিদায়াত লাভের উদ্দেশ্যে এই উৎসের দিকেই ধাবিত হওয়া।
৫. ব্যক্তিগত ও পারিবারিক, বংশীয় ও জাতিগত, দলীয় ও সম্প্রদায়গত, আঞ্চলিক ও ভাষাগত তথা সকল প্রকার হিংসা-বিদ্বেষ ও বিভেদ হইতে মন-মগজকে মুক্ত ও পবিত্র করিয়া লওয়া এবং কাহারও ভালোবাসা বা অন্ধ ভক্তিতে এমনভাবে বন্দী না হওয়া যাহার দরুন উহা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর উপস্থাপিত সত্যের প্রতি ভালবাসা ও ভক্তির ওপর জয়ী কিংবা তাহার প্রতিদ্বন্দ্বী হইয়া দাঁড়াইতে পারে।
৬. মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর জীবন চরিত্রকে কুরআনের বাস্তব ব্যাখ্যা এবং উহাকে সকল ব্যাপারে সত্যের একমাত্র মাপকাঠি হিসেবে মানিয়া লওয়া। আল্লাহ তায়ালার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ব্যতীত আর কাহাকেও ভুলের ঊর্ধ্বে মনে না করা, কাহারও অন্ধ গোলামিতে নিমজ্জিত না হওয়া বরং প্রত্যেককেই আল্লাহ তায়ালার দেওয়া এই মাপকাঠিতে যাচাই ও পরখ করিয়া যাহার যেই মর্যাদা হইবে তাহাকে সেই মর্যাদা দেওয়া।
৭. হযরত মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নবুওয়াতের পরে কোনো ব্যক্তির এমন কোনো মর্যাদা মানিয়া না লওয়া যাহার আনুগত্য করা বা না করার ভিত্তিতে ঈমান ও কুফর সম্পর্কে ফায়সালা হইতে পারে।
উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য সম্পর্কিত ধারা-৩-এ বলা হয়েছে, ‘বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে ন্যায় ও ইনসাফভিত্তিক সমাজ প্রতিষ্ঠা করা এবং মহান আল্লাহ তায়ালার সন্তুষ্টি অর্জন।’ একজন মুসলিম হিসেবে চূড়ান্ত টার্গেট হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন আর এটাই হচ্ছে মানুষের সর্বোচ্চ অর্জন। জামায়াতে ইসলামীর সাথে যারা সম্পৃক্ত হবেন, তাদেরকে এ সর্বোচ্চ অর্জনটাই হবে চূড়ান্ত উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য।
দাওয়াত সম্পর্কিত ধারা -৫ এ বলা হয়েছে, জামায়াতের দাওয়াত নিম্নরূপ হইবেÑ
১. সাধারণভাবে সকল মানুষ ও বিশেষভাবে মুসলিমদের প্রতি জীবনের সকল ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার দাসত্ব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর আনুগত্য করিবার আহ্বান।
২. ইসলাম গ্রহণকারী ও ঈমানের দাবিদার সকল মানুষের প্রতি বাস্তব জীবনে কথা ও কাজের গরমিল পরিহার করিয়া খাঁটি ও পূর্ণ মুসলিম হওয়ার আহ্বান।
৩. সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার মাধ্যমে বাংলাদেশে নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সুবিচারপূর্ণ শাসন কায়েম করিয়া সমাজ হইতে সকল প্রকার জুলুম, শোষণ, দুর্নীতি ও অবিচারের অবসান ঘটানোর আহ্বান।
জামায়াতে ইসলামী সর্বস্তরের মানুষ ও মুসলিমদের কাছে এমন একটি দাওয়াত পেশ করছে যে দাওয়াতটি গ্রহণ করে একজন পূর্ণ মুসলিম হওয়ার পাশাপশি সংঘবদ্ধভাবে একটি আদর্শ সমাজ কায়েমে করত দুর্নীতি ও শোষনমুক্ত সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়মতান্ত্রিক পদ্ধতিতে কাজ করতে হবে।
স্থায়ী কর্মসূচি সর্ম্পকিত ধারা-৬- এ বলা হয়েছে, জামায়াতের স্থায়ী কর্মসূচি নিম্নরূপ হইবে-
১. বাংলাদেশের সকল নাগরিকের নিকট ইসলামের প্রকৃত রূপ বিশ্লেষণ করিয়া চিন্তার বিশুদ্ধিকরণ ও বিকাশ সাধনের মাধ্যমে জীবনের সর্বক্ষেত্রে ইসলামের অনুসরণ ও ইসলাম প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অনুভূতি জাগ্রত করা।
২. ইসলামকে জীবনের সর্বক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত করিবার সংগ্রামে আগ্রহী সৎ ব্যক্তিদিগকে সংগঠিত করা এবং তাহাদিগকে ইসলাম কায়েম করিবার যোগ্যতাসম্পন্ন হিসেবে গড়িয়া তুলিবার উদ্দেশ্যে প্রশিক্ষণ দান করা।
৩. ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে সামাজিক সংশোধন, নৈতিক পুনর্গঠন ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তন সাধন এবং দুস্থ মানবতার সেবা করা।
৪. নিয়মতান্ত্রিক ও গণতান্ত্রিক পন্থায় সরকার পরিবর্তন এবং সমাজের সর্বস্তরে আল্লাহভীরু, চরিত্রবান, সৎ ও যোগ্য লোকের নেতৃত্ব কায়েমের চেষ্টা করা।
জামায়াতে ইসলামীর যে চার দফা স্থায়ী কর্মসূচি নেয়া হয়েছে, তা খুবই সুচিন্তিত ও প্রায়োগিক। চার দফাকে যদি একসাথে বিশ্লেষণ করা হয় তখন দেখা যাবে যে একটি দফার সাথে আর একটি দফা পরস্পর পরিপূরক। যেমন প্রথম দফাটি হচ্ছে দাওয়াত ও তাবলীগ, অর্থাৎ দাওয়াতের মাধ্যমে চিন্তার পরিশুদ্ধি ও পুনগঠন, দ্বিতীয় দফাটি হচ্ছে সংগঠন ও প্রশিক্ষণ, অর্থাৎ মুক্তিকামী মানুষকে দাওয়াত দিয়ে সংগঠিত করে প্রশিক্ষণ দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনে আদর্শ নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা; তৃতীয় দফাটি হচ্ছে সমাজসেবা ও সমাজ সংস্কার এবং চতুর্থ দফাটি হচ্ছে রাষ্ট্রীয় সংস্কার ও সংশোধন। চারটি দফাকে একসাথে পর্যালোচনা করলে যে সত্যটি বের হয়ে আসে তা হচ্ছে, একদল মুক্তিকামী মানুষকে দাওয়াত দিয়ে সংগঠিত করে প্রকৃত মুসলিম হিসেবে গড়ে তোলা এবং তাদের মাধ্যমে একটি আদর্শিক তথা ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা।
চলছে অবিরাম দাওয়াতি কাজ
জামায়াতে ইসলামী ঈমান ও আকিদা সম্পর্কে যে বিশ্বাস ও চিন্তা পোষণ করে, তাই হচ্ছে ইসলামী আদর্শেরই চিন্তা ও বিশ্বাসের যথাযথ প্রতিফলন। উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যের চূড়ান্ত বিষয়টি হচ্ছে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের খুব কমই ইসলামী সংগঠন বা রাজনৈতিক সংগঠন পাওয়া যাবে, যাদের গঠনতন্ত্র, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, কর্মসূচি এতটা সুসংগঠিত ও প্রায়োগিক এবং বাস্তবসম্মত। জামায়াতে ইসলামী তার ঘোষিত ঈমান আকিদা, উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য, কর্মসূচি ও কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাসহ অনেক দেশেই ইসলামী আদর্শ প্রচার ও প্রতিষ্ঠার কাজ করে যাচ্ছে।
১৯৪১ সালে জামায়াতে ইসলামী ইসলামী আদর্শের আলোকেই আল্লাহর এ জমিনে ইসলামী আদর্শ প্রতিষ্ঠার এ অভিযাত্রা শুরু করেছে। অভিযাত্রা শব্দের অর্থ হলো কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্য বা উদ্দেশ্য সাধনের জন্য কোনো দুঃসাহসিক, কঠিন বা দীর্ঘ যাত্রা। জামায়াতে ইসলামী বিশ্বের সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য ও একমাত্র আদর্শ ইসলামকে প্রতিষ্ঠার জন্যই এ কঠিন ও দীর্ঘ যাত্রাপথে অবিচল থেকে অবিরাম গতিতে এগিয়ে চলছে। জামায়াতে ইসলামীর এ অভিযাত্রায় অনেক নেতাকে ইসলামী আদর্শকে ধারণ ও বাতিলের সাথে আপস না করায় ফাঁসির মঞ্চে গিয়ে জীবন দিতে হয়েছে। অনেক নেতাকে জেলের প্রকোষ্ঠে হত্যা করা হয়েছে। তারপরও জামায়াতে ইসলামী আল্লাহর এ জমিনে ইসলামী আদর্শের প্রচার ও প্রতিষ্ঠার জন্য অবিরাম গতিতে কাজ করে যাচ্ছে। বিশ্বমানবতার দুনিয়ায় কল্যাণ ও আখিরাতে মুক্তির লক্ষ্যে প্রতিষ্ঠিত এ জামায়াতে ইসলামী তার অভীষ্ট লক্ষ্যে একদিন পৌঁছাবে, ইনশাআল্লাহ।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com