আলোকে তিমিরে

আমার দেখা প্রিয় স্বদেশ


২৫ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৭

॥ মাহবুবুল হক ॥
ব্রিটিশরা ভারতীয় মুসলমানকে কেরানী বানাতে চেয়েছিল। তা তারা করতে পেরেছে। পাকিস্তানিরা পাকিস্তানিদের কী বানাতে চেয়েছিল, তা এখনো পরিষ্কার নয়। তবে কেন্দ্রীয় সরকার পশ্চিম পাকিস্তানের মানুষকে কী বানাতে চেয়েছিল, তা পরিষ্কারভাবে কোথাও উল্লেখ না থাকলেও সেখানকার শিক্ষাব্যবস্থা ও কারিকুলাম থেকে কিছুটা হলেও আঁচ করা যায়।
খেলনা বন্দুক নিয়ে খেলাধুলা করা পশ্চিম পাকিস্তানের সকল প্রদেশে সর্বকালে সর্বসময়ে বিদ্যমান ছিল। সেটি ঐ এলাকার একটি প্রধান বৈশিষ্ট্য এবং স্বাতন্ত্র্য। আমাদের দেশের শিশুরা এখনো ছোটকালে খেলনা বন্দুক দেখে না (আরবান লাইফের কথা আলাদা)। শিক্ষার্থী হোক, স্কুল ‘সো ত্যার’ না হোক, আমাদের শিশুদের খেলাধুলা কী? মূলত শিশুদের খেলাধুলা ছিল, এখনো মৌলিকভাবে যা আছে, তা হলো, দাঁড়িয়াবান্দা, হা-ডু-ডু, কানামাছি, সাঁতার, কাদাখেলা, দৌড়ঝাঁপ, সাইকেল রেস, দৌড় প্রতিযোগিতা, কুস্তিখেলা এবং কিছু খেলা আছে ছেলেমেয়ে নিয়ে পারিবারিক, যেমন লুডু, কেরমবোর্ড, দাবা, ব্যাডমিন্টন, ফুটবল (নিকট অতীতেও প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে জাম্বুরা দিয়ে শুরু হতো), ক্রিকেট, হকি, ভলিবল ইত্যাদি।
মেয়েদের খেলা শুরু হতো পুতুল পুতুল খেলা দিয়ে। কখনো মাটির, কখনো কাপড়ের পুতুলের, ছোট ছোট হাঁড়িপাতিল নিয়ে পারিবারিক খেলা, বনভোজনও। আমাদের খেলাধুলাগুলো হলো অনেকটাই প্রাচীন। লৌকিক জীবনে গড়ে ওঠা। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ শাসনামলে প্রবর্তিত হওয়া (প্রাইমারি ও হাইস্কুল সূত্রে)। সেসব আবার আমাদের মাদরাসায় ছিল না। মাদরাসায় ছিল কুস্তি, সাঁতার, দৌড়, হা-ডু-ডু ইত্যাদি (এখন অবশ্য মাদরাসায় আধুনিক সকল খেলাধুলা ঢুকে পড়েছে)।
আমাদের খেলাধুলার ওপর যদি আলোকপাত করি, তাহলে দেখা যাবে প্রায় সবগুলো প্রাকৃতিক, আঞ্চলিক এবং পারিবারিক জীবনঘনিষ্ঠ। সেইসাথে প্রতিবেশ ও সমাজঘনিষ্ঠ। আমাদের খেলাধুলার মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি-কাটাকাটি, ঝগড়া-বিবাদ কিছু নেই। অধিকাংশই আনন্দ এবং প্রীতি-মমতা-বন্ধুত্ব-ভ্রাতৃত্ব-ভালোবাসা-মানবিক সম্পর্ক ইত্যাদি আবহে সমুজ্জ্বল। খেলার শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত উদারতা, মহত্ত, হালকা দুষ্টামি, হৈচৈ, চিল্লা-চিল্লি ও হাসি-খুশিতে ভরা। সমস্ত খেলার মধ্যে ‘হারি-জিতি নাহি লাজ’। এমন মোহময় পরিবেশ দুনিয়ার আর কোনো দেশে রয়েছে কিনা, আমাদের জানা নেই।
কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানের খেলাধুলার মধ্যে বীরত্ব, অহংকার, ইগো, অভিমান, প্রতিযোগিতা, শক্তি প্রদর্শন, মেজাজ প্রদর্শন ইত্যাদিতে ভরা। বন্দুক ওদের জীবনের সঙ্গী। এজন্য শিশুকাল থেকে তারা বন্দুক চালনা শেখে। কৈশোরকাল থেকে শিক্ষার্থীরা ‘চানমারিতে’ যায়। তাদের শেখানো হয় ‘ক্রাশ ইন্ডিয়া’। ইন্ডিয়া কো খতম কর। শয়তান নয়, ইন্ডিয়াই যেন প্রধান শত্রু। শিশুশ্রেণি থেকে তাদের চিন্তার মধ্যে, স্বপ্নের মধ্যে, সিলেবাসের মধ্যে, কারিকুলামের মধ্যে ভারতকে ধ্বংস করার বিষয়টিকে বিশেষভাবে প্রাধান্য দেয়া ছিল- এখনো আছে কিনা, জানি না। থাকার তো কথা, কারণ যুদ্ধ তো ইন্ডিয়ার সাথে চলছেই।
অপরদিকে ৪০-এর দশকে সামান্য সাম্প্রদায়িক গোলযোগ ছাড়া আমরা কখনো কারো সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হইনি। পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তানের সাথে ইন্ডিয়ার যুদ্ধ সংঘটিত হলেও, সেই যুদ্ধ মাত্র ১৭ দিন চলেছে (১৯৬৫ সালের ৬ সেপ্টেম্বর থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর)। সেই যুদ্ধেও পূর্ব পাকিস্তানকে জড়িত হতে হয়নি। বেঙ্গল রেজিমেন্টের পূর্ব পাকিস্তানিরা পশ্চিম পাকিস্তানের খেমকারান সেক্টরে বিজয় লাভ করলেও পূর্ব পাকিস্তানের কোনো সীমান্তে যুদ্ধ হয়নি। আমরা যুদ্ধ করেছি ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে, সেই যুদ্ধ আমরা ইন্ডিয়ার বিরুদ্ধে করিনি। করেছি পাকিস্তানের সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে। আমরা পাকিস্তান থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশকে বাংলাদেশ নামে পরিপূর্ণ স্বাধীন দেশ ঘোষণা করার পর পাকিস্তান সেনাবাহিনী আমাদের স্বাধীনতাকে ধ্বংস করার জন্য এবং আমাদের দেশটিকে পূর্বের মতো দখলে রাখার জন্য আমাদের দেশ-জাতি ও রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। আমাদের দেশবাসী সেই যুদ্ধকে প্রতিহত করে।
তখনকার সময় আমাদের সিলেবাস বা কারিকুলামে যুদ্ধ শেখানো হয়নি। আমাদের শেখানো হয়েছে যা আমরা পূর্বেই উল্লেখ করেছি। খেলাধুলার মধ্যেই একটি জাতির মন-মনন-চিন্তা-ভাবনা-স্বপ্ন-কল্পনা পরিস্ফুট হয়। শুরুতেই উল্লেখ করেছি, আমাদের খেলাধুলার মধ্যে হিংসা-বিদ্বেষ, মারামারি-কাটাকাটি, ঝগড়াঝাঁটি এসব ছিল না। সুতরাং আমাদের জীবনপ্রবাহে যুদ্ধ-বিগ্রহ একদমই ছিল না। তারপর আমরা এক দেশের মানুষ হয়ে (মুসলিম হয়ে) একে অপরের বিরুদ্ধে লড়াই করবো, যুদ্ধ করবো- এমন কোনো স্বপ্নও আমরা কোনোদিন দেখিনি। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও আমাদের যুদ্ধে লিপ্ত হতে বাধ্য হয়েছি। ছোটকাল থেকে বন্দুক চালানো না জানলেও বন্দুকযুদ্ধ করেছি। সেটা ছিল এক অলৌকিক ব্যাপার। সিলেবাসে না থাকলেও যুদ্ধের বিষয়ে ব্যাপকভাবে পড়াশোনা না করলেও পরিপূর্ণ ৯ মাস আমরা (আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা যুদ্ধ করে জয়লাভ করেছি)। পাকিস্তান বাংলাদেশে পরাজিত হলেও ভারতকে বারবার পরাজিত ও পরাভূত করেছে। পাকিস্তান যেমন ভারতকে শত্রু দেশ হিসেবে গণ্য করে আবার ভারতও পাকিস্তানকে তাদের বড় শত্রু বলে পরিগণিত করে। সুতরাং তাদের শিক্ষা সিলেবাস ও কারিকুলামে যুদ্ধের দামামা সবসময় বাজতেই থাকবে। শত্রু যেহেতু চিহ্নিত এবং নিকটতম প্রতিবেশী, সুতরাং প্রজন্মকে বা শিক্ষার্থীদের শিশুকাল থেকেই যুদ্ধ শেখানো অনিবার্য হয়ে থাকবে। এ থেকে ভারত ও পাকিস্তানের কোনো মুক্তি নেই। যুদ্ধ করেই তাদের বাঁচতে হবে এবং ধ্বংস হতে হবে।
একটা কথা এখানে বলতে ভুলে গেছি, ১৯৬৫ সালে আমরা পূর্ববাংলা বা পূর্ব পাকিস্তানবাসী ভারতের সঙ্গে সরাসরি যুদ্ধ না করলেও পাকিস্তানি হিসেবে ভারত এবং ভারতীয়রা আমাদের বন্ধু ছিল না, অবশ্যই শত্রু ছিল। কারণ আমরা তখন ছিলাম পাকিস্তানি। আমরা ভারতের সাথে যুদ্ধ করার জন্য সর্বোচ্চ প্রস্তুতিতে ছিলাম (শতকরা শতভাগ)। যুদ্ধের মাসটি পূর্ব পাকিস্তানে সকল স্কুল-কলেজ, মাদরাসা, বিশ্ববিদ্যালয় তথা সমস্ত শিক্ষালয় ও শিক্ষায়তনে শিক্ষা প্রদান ও গ্রহণ বন্ধ ছিল। শিক্ষার্থীদের নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানে নিয়মিতভাবে উপস্থিত হতে হতো। শিক্ষকদেরও নিয়মিতভাবে আসতে হতো। কারো কোনো ছুটি ছিল না। সেনাবাহিনী, পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেডের অফিসার ও কর্মচারীগণ শিক্ষালয়গুলোয় আসতেন এবং যুদ্ধকালীন সময় নাগরিকদের জান ও মাল রক্ষার জন্য যা যা করার, সেসব ট্রেনিং তারা শিক্ষার্থীদের প্রদান করতেন। শিক্ষায়তনগুলোয় আর্টিফিশিয়াল চানমারি স্থাপন করা হয়েছিল। যারা সম্মুখযুদ্ধে লড়ার বিষয়ে ট্রেনিং গ্রহণের সম্মতি প্রদান করতো, তাদের শুধু বন্দুক বা রাইফেল চালনার শিক্ষা প্রদান করা হতো না; বরং যুদ্ধের ময়দানে যুদ্ধ করার জন্য প্রতিটি সৈনিককে যেসব ট্রেনিং দেয়া হতো, তাই সংক্ষিপ্তভাবে শিক্ষার্থীদেরও প্রদান করা হতো। যারা ট্রেঞ্চ খননের কাজ করার জন্য তালিকাভুক্ত হতো, তাদের সংক্ষিপ্তভাবে সেই প্রশিক্ষণ প্রদান করা হতো। যারা জনগণের জান ও মাল রক্ষার জন্য ফায়ার ব্রিগেড ট্রেনিং গ্রহণের মনোস্থির করতো, তাদেরও নিষ্ঠার সাথে সেই ট্রেনিং প্রদান করা হতো। ‘ব্ল্যাকআউট’ হলে কী পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়, সেসব ট্রেনিং ও বাস্তবে তা রূপদান করার রিহার্সেল দিতো। প্রশাসন ও সেনাবাহিনী প্রদান করতো। এর সাথে হতাহত হওয়া এবং হতাহতদের জন্য অ্যাম্বুলেন্সসহ হাসপাতালগুলোয় অথবা তাঁবুর নিচে ইমার্জেন্সি হাসপাতাল তৈরি করার ট্রেনিং ও রিহার্সেল দেয়া হতো। ভারতের সৈন্যদের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের সৈন্যবাহিনীর আর্টিফিশিয়াল যুদ্ধের মহড়াও সৃষ্টি করা হতো। সুতরাং সরাসরি বাস্তব যুদ্ধে লিপ্ত না হলেও ১৯৬৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত আমরা শারীরিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবে যুদ্ধে লিপ্ত ছিলাম। (বলাইবাহুল্য আমি তখন দিনাজপুর সুরেন্দ্রনাথ কলেজের ২য় বর্ষের ছাত্র ছিলাম এবং ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন ট্রেনিং গ্রহণ করেছিলাম)।
এখন আসুন শিক্ষা প্রসঙ্গে প্রবেশ করি। তখনই আমাদের বিভিন্নভাবে জানানো হয়েছিল যে, দেশ রক্ষার জন্য, দেশের স্বাধীনতা রক্ষার জন্য প্রতিটি স্বাধীন দেশের শিক্ষার্থীকে কিছু না কিছু সামরিক ট্রেনিং দরকার। কখন বন্ধু-প্রতিবেশী শত্রু হয়ে যাবে, তা তো বলা যায় না। ভারত এ এলাকায় যুদ্ধ লাগায়নি। তাই বলে ভবিষ্যতে লাগাবে না- এমন তো কোনো কথা নেই। সবসময় পাকিস্তানের এক অংশে যুদ্ধ হবে অপর অংশে হবে না, এটা তো বাস্তবসম্মত চিন্তা নয়। পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার তাদের প্রাদেশিক সিলেবাসে যুদ্ধ শেখার জন্য, যোদ্ধা হওয়ার জন্য, দেশ রক্ষার জন্য, সিলেবাস ও কারিকুলামে যুদ্ধের প্রায় সকল কিছু শিক্ষা ও প্রশিক্ষার মধ্যে যত্নের সাথে রেখে দিয়েছে তাই নয়, বরং বাস্তবভাবে শিক্ষার্থীদের ট্রেনিং দিচ্ছে এবং যখন প্রয়োজন হচ্ছে, তখনই সেনাবাহিনীতে চাকরি প্রদান করছে। এতে পশ্চিম পাকিস্তানের বেকার সমস্যারও সমাধান হয়ে যাচ্ছে।
পাকিস্তানের আরেক প্রদেশের (পূর্ব পাকিস্তানে) শিক্ষা ও কারিকুলামে যুদ্ধ জানার, বোঝার ও উপলব্ধি করার সাবজেক্ট কেন রাখা হয়নিÑ সে প্রশ্ন শুধু ওঠেনি তাই নয়, বরং রাজনীতিবিদ মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে সরাসরি অভিযোগ উত্থাপন করেছিলেন, সরকার পূর্ব পাকিস্তানকে এবং এই প্রদেশের জনগণকে অরক্ষিত রেখেছে। নিরাপত্তা বিধানের কোনো ব্যবস্থাই কেন্দ্রীয় সরকার গ্রহণ করেনি। এই দুইজন শীর্ষস্থানীয় নেতার সাথে ডান ও মধ্যমপন্থী দলগুলোর নেতৃবৃন্দও এ বিষয়ে চরম ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করেছিলেন। কেউ কেউ এমনো বলেছেন, ভারত পূর্ব পাকিস্তান দখলের চিন্তা বা পরিকল্পনা করে অগ্রসর হলে (যে চিন্তা তাদের ৪০ দশক থেকেই আছে) পূর্ব পাকিস্তান দখল করতে কোনো অসুবিধা হতো না।
যা হোক, এসব হলো অতীতের কিচ্ছা-কাহিনী। মূল জায়গায় পৌঁছার জন্য ঝাড়-জঙ্গল সাফ করে এই পর্যন্ত এসেছি। উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে একটা বিষয় তো সূর্যের আলোর মতো পরিষ্কার হয়েছে যে, কোনো একটি জাতি বা কোনো একটি রাষ্ট্রের শিক্ষাব্যবস্থা এমনভাবে তৈরি করতে হয়, যার মাধ্যমে জাতি বা রাষ্ট্রের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা বা সাসটেইনেবল রাখা সম্ভব হয়। এটা তো হলো প্রথম বিষয়, রাষ্ট্রের প্রয়োজনে নাগরিক বা নাগরিকের প্রয়োজনে রাষ্ট্র। এর কোনোটিকেই উপেক্ষা করা যায় না। বালাকোটে সৈয়দ আহমদ বেরলভী ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করতে চেয়েছিলেন। তার অর্থ সাধারণভাবে বোঝা যায়, সেখানে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করার জন্য পর্যাপ্ত লোকবল ও জনবল ছিল। তাদের জন্যই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু দেখা গেল, ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য যে মানের, যে ধরনের, যে দৃষ্টিভঙ্গির নাগরিক বা লোকবল ও জনবল থাকার কথা, তা সেখানে অপরিহার্যভাবে ছিল না। ফলে জিহাদের ময়দান থেকে বিশ্ব মুসলিমের কাছে তিনি জিহাদ করার জন্য উপযুক্ত লোকবল ও জনবল প্রাপ্তির উদাত্ত আহ্বান জানিয়েছিলেন। তার সে আহ্বানে পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চলসহ আমাদের দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকেও জিহাদের উপযুক্ত ওলামাগণ বালাকোটে পৌঁছেছিল। কিন্তু শেষমেশ সৈয়দ আহমদ বেরলভী তার সঙ্গী-সাথীসহ শহীদ হয়েছিলেন (এটাই বিজয়)। কিন্তু রাষ্ট্র গঠন করতে পারেননি। তার অর্থ এই নয় যে, তিনি ব্যর্থ হয়েছিলেন বা পরাজিত-পরাভূত হয়েছিলেন।
রাষ্ট্রের প্রয়োজন অনুযায়ী অর্থাৎ রাষ্ট্রের কী ধরনের নাগরিক প্রয়োজন, সেটার ওপর নির্ভর করে সাধারণত শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়। রাষ্ট্রটা যদি চারদিক থেকে শত্রু পরিবেষ্টিত অবস্থান বিরাজমান থাকে, তাহলে সেই রাষ্ট্রের জন্য প্রথম প্রয়োজন পড়ে গোটা জনগোষ্ঠীকে সামরিক গোষ্ঠীতে পরিণত করার মতো শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলা। সেটাকে আমরা বলতে পারিÑ ‘ওয়ার ওরিয়েন্টেড এডুকেশন সিস্টেম।’ অথবা টু এস্টাবলিস্ট এ মিলিটারি স্টেট। এছাড়া ঐ রাষ্ট্রের অন্য কোনো উপায় থাকার কথা নয়। কিন্তু একটি রাষ্ট্রের চারপাশে যদি উদার নৈতিক বন্ধুসুলভ রাষ্ট্রের অবস্থান থাকে, তাহলে তো আর নিজের দেশটাকে মিলিটারি স্টেট বানানোর প্রয়োজন পড়ে না। তখন যেটা প্রয়োজন পড়ে তা হলো রাষ্ট্রটি নাগরিকদের ওপর নির্ভর করতে চায়। অর্থাৎ সরকার নয়, নাগরিকরা আয় করে সরকার পরিচালনাসহ রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় সবকিছু নির্বাহ করবে। এক্ষেত্রে বাংলাদেশ নামক দেশটি উদাহরণ প্রণিধানযোগ্য।
শেখ মুজিবের আমল শেষ হবার পর থেকে বাংলাদেশের সকল সরকার জনশক্তি রফতানির ওপর নির্ভর করেছে। সরকারসমূহ আপাত ও মধ্যবর্তী পরিকল্পনায় রেখেছিলেন এখনই দেশ থেকে শ্রমিক হিসেবে ব্যাপক জনগোষ্ঠীকে বিদেশে পাঠাতে হবে। তারা ডলার-পাউন্ড-রিয়াল ইত্যাদি ধরনের মুদ্রা অর্জন করে দেশের অর্থনীতির ভিতকে সবল ও সুঠাম করবে। ১৯৭৫ সালের পর থেকে বিদেশে; বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে ব্যাপকভাবে শ্রমিক পাঠানোর উদ্যোগ গ্রহণ করে।
এই পরিকল্পনাটি একদিক থেকে সফলতা অর্জন করে; অপরদিকে দেশের মানুষকে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দাসে পরিণত করে। এখন পর্যন্ত শুধু মধ্যপ্রাচ্যেই বৈধ বা অবৈধভাবে দেড় কোটি শ্রমিক প্রবাস জীবনযাপন করছে। এই যে দেড় কোটি মানুষ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে দেশকে রক্ষা করছে বা দেশে স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব নিশ্চিত করছে তারা। অর্থাৎ তারা ও তাদের পরিবার দেশের জন্য অনেক বড় কুরবানি করেছে এবং করছে। তাদের সংসারগুলো মোটাদাগে হয়তো দরিদ্র থেকে নিম্নমধ্যবিত্ত হয়েছে এবং তার মধ্যে কিছু অংশ হয়তো জীবনবাজি রেখে মধ্যবিত্ত হয়েছে। কিন্তু জীবনমান কাক্সিক্ষত পর্যায়ে সমুন্নত করতে পারেনি।
১৯৮০ সাল থেকে একান্ত বাধ্য হয়ে এ দেশের মানুষকে রফতানিযোগ্য গার্মেন্টস তৈরি করে গত প্রায় ৫০ বছর ধরে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করতে হচ্ছে। এখন পর্যন্ত দেশের সরকারগুলো মধ্যবর্তী পরিকল্পনার মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় আমরা প্রবেশ করতে পারিনি। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনই যদি দেশের লক্ষ্য নির্ধারিত হয়ে থাকে তাহলে তো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থাকে সেভাবে সাজাতে হবে। অর্থাৎ ব্যাপকভাবে দক্ষ জনশক্তি বানানোর উপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।