সম্পাদকীয়

একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম


২৫ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৫

আলহামদুলিল্লাহ, সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের জন্য। শতকোটি দরূদ ও সালাম মানবতার মুক্তির জন্য একমাত্র অনুসরণীয় আদর্শ হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সা.-এর প্রতি। আজ ১২ রবিউল আউয়াল। ইতিহাসের এ সোনালি দিনটি সারা দুনিয়ার মানুষ পালন করেন হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সা.-এর আর্বিভাব ও ওফাত দিবস হিসেবে। আমরা বিশ্বাস করি, শুধু পালন নয়, হযরত মুহাম্মদ মুস্তফা সা.-এর আদর্শ ধারণ করলেই এ পৃথিবীতে বইবে জান্নাতি শান্তির নহর।
বর্তমান বিশ্ব এক চরম সামাজিক, রাজনৈতিক ও নৈতিক সংকটকাল অতিক্রম করছে। মানবজাতি আজ প্রযুক্তি ও আধুনিক সভ্যতার স্বর্ণশিখরে পৌঁছালেও শান্তি, ন্যায়বিচার ও মানবিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছে। সংঘাত, যুদ্ধ-বিগ্রহ, সাম্রাজ্যবাদী শোষণ, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য এবং নৈতিক অবক্ষয়ের দাবানলে আজ গোটা পৃথিবী বিপর্যস্ত। আধুনিক বিশ্বব্যবস্থা যখন স্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় সম্পূর্ণ অপ্রতুল প্রমাণিত হয়েছে, তখন মানবতার মুক্তি ও শান্তিময় সমাজ পুনর্গঠনে রাসূলে কারীম হযরত মুহাম্মদ সা.-এর সিরাত ও জীবনদর্শনই একমাত্র সুনির্দিষ্ট পথপ্রদর্শক। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মহানবী সা.-এর সর্বজনীন আদর্শ ও গুরুত্ব বর্ণনা করে ঘোষণা করেছেন, ‘নিশ্চয়ই তোমাদের জন্য আল্লাহর রাসূলের মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ (সূরা আল-আহযাব : ২১)। তিনি কেবল কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠী, অঞ্চল বা কালের জন্য আসেননি; বরং সমগ্র সৃষ্টিজগতের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরিত হয়েছেন। এরশাদ হয়েছে, ‘আমি আপনাকে বিশ্ববাসীর জন্য রহমতস্বরূপই প্রেরণ করেছি।’ (সূরা আল-আম্বিয়া : ১০৭)। আরব উপদ্বীপের জাহেলিয়াত তথা ঘোর অন্ধকার, অসভ্যতা ও অরাজকতায় নিমজ্জিত এক জাতিকে মাত্র দুই দশকের ব্যবধানে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ, সুসভ্য ও সুসংহত জাতিতে পরিণত করেছিলেন তিনি। তাঁর প্রবর্তিত ‘মদিনা সনদ’ ছিল মানব-ইতিহাসের সর্বপ্রথম লিখিত সংবিধান, যা বিভিন্ন ধর্ম ও গোত্রের মানুষকে একই পতাকাতলে এনে নাগরিক অধিকার, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও সামাজিক নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করেছিল।
হাদীস শরীফে বিশ্বনবী সা.-এর সিরাতের পূর্ণাঙ্গতা ও সুমহান চরিত্রের বিশদ বিবরণ পাওয়া যায়। হযরত আয়েশা (রা.)-কে যখন তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, তিনি উত্তর দিয়েছিলেন, ‘পবিত্র কুরআনই ছিল তাঁর চরিত্র।’ (সহীহ মুসলিম)। তিনি ছিলেন ইনসাফ ও দয়ার উজ্জ্বল প্রতীক। শত্রু-মিত্র ভেদাভেদ ভুলে ক্ষমার যে অভূতপূর্ব দৃষ্টান্ত তিনি মক্কা বিজয়ের দিন স্থাপন করেছিলেন, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। ইসলামী চিন্তাবিদ ও মনীষীগণ সিরাতুন্নবীর সর্বজনীনতা নিয়ে বিশদ গবেষণা করেছেন। সাইয়েদ আবুল আ’লা মওদূদী (র.), আল্লামা শিবলী নোমানী (র.), ইমাম গাজ্জালী (র.) এবং মাওলানা আবুল হাসান আলী নদভীর (র.) মতে, রাসূলুল্লাহ সা.-এর জীবন কেবল আনুষ্ঠানিক ইবাদতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি, রাষ্ট্র পরিচালনা এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের এক পূর্ণাঙ্গ ও ভারসাম্যপূর্ণ রূপরেখা। তাঁর অর্থব্যবস্থা সমাজ থেকে শোষণ ও সুদ দূর করে জাকাতভিত্তিক সুষম বণ্টন নিশ্চিত করেছিল, যা আধুনিক অর্থনৈতিক সংকট উত্তরণেও চিরন্তন সমাধান।
মহানবী সা.-এর অভূতপূর্ব চরিত্র, রাষ্ট্রনায়কোচিত প্রজ্ঞা কেবল মুসলিম সমাজকেই অনুপ্রাণিত করেনি, বরং নিরপেক্ষ ও মুক্তবুদ্ধির পাশ্চাত্য পণ্ডিতদেরও গভীরভাবে মুগ্ধ করেছে। বিখ্যাত আইরিশ সাহিত্যিক ও প্রাবন্ধিক জর্জ বার্নার্ড শ স্পষ্ট ভাষায় স্বীকার করেছেন, ‘আমি এই অসাধারণ মানুষটিকে অধ্যয়ন করেছি এবং আমার মতে, তাঁকে মানবজাতির ত্রাণকর্তা বলাই শ্রেয়। আধুনিক বিশ্বের নেতৃত্ব যদি তাঁর মতো কোনো মানুষের হাতে ন্যস্ত হতো, তবে তিনি এমনভাবে সমস্ত সমস্যার সমাধান করতেন, যা বিশ্বকে বহুল কাক্সিক্ষত শান্তি ও সুখ এনে দিত।’ বিশ্বখ্যাত রুশ লেখক ও দার্শনিক কাউন্ট লিও তলস্তয় মহানবী সা.-এর মহান সংস্কারকে শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখেছিলেন, ‘মুহাম্মদ সা.-এর প্রবর্তিত বিধান বিশ্বের মানুষকে এক মহান সত্য ও সুশৃঙ্খল জীবনের আলো দেখিয়েছে। তিনি এমন এক ব্যক্তিত্ব, যিনি একাই মূর্খতা ও নিষ্ঠুরতার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একটি নতুন সভ্যতার জন্ম দিয়েছেন।’ প্রখ্যাত মার্কিন জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও ঐতিহাসিক মাইকেল হার্ট তাঁর আলোড়িত গ্রন্থ ‘দ্য হান্ড্রেড’-এ ইতিহাস সৃষ্টিকারী সর্বশ্রেষ্ঠ ১০০ জন ব্যক্তিত্বের তালিকায় রাসূলুল্লাহ সা.-কে শীর্ষে স্থান দিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘ধর্মীয় ও পার্থিব উভয় ক্ষেত্রে সমানভাবে চূড়ান্ত সফল ব্যক্তি হিসেবে সমগ্র ইতিহাসে মুহাম্মদ সা.-ই একমাত্র উদাহরণ।’
আজকের এই যুদ্ধবিধ্বস্ত ও কলুষিত পৃথিবীতে শান্তি এবং বৈষম্যহীন সমাজ গঠন করতে হলে সিরাতুন্নবী সা.-এর বাস্তব অনুশীলন ছাড়া অন্য কোনো বিকল্প পথ নেই। মহান ১২ রবিউল আউয়ালের এই ঐতিহাসিক ও পবিত্র ক্ষণে আসুন, আমরা শপথ করিÑ মহানবী সা.-এর সুন্নাহ, নৈতিকতা ও মানবিকতার শিক্ষা আমাদের ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়ন করব, ইনশাআল্লাহ।