যানজটে স্থবির রাজধানী, দখলে ফুটপাতও

পথচারীরা চলবে কোথায়?


২০ আগস্ট ২০২৬ ০৯:৪৭

স্টাফ রিপোর্টার : যানজট ও ফুটপাত অবৈধ দখলে থাকায় রাজধানী ঢাকার মানুষের নিরাপদে চলা এখন দুর্ভোগে পরিণত হয়েছে। একদিকে গুরুত্বপূর্ণ সড়ক ও মোড়ে দীর্ঘ যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে যাত্রীদের; অন্যদিকে ফুটপাত দখল করে দোকান, হকারি, খাবারের ব্যবসা, গাড়ি মেরামত কিংবা পণ্যসামগ্রী রাখায় পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে নামতে হচ্ছে মূল সড়কে। ফলে পথচারী, যানবাহন ও অবৈধভাবে গড়ে ওঠা ব্যবসায়িক কার্যক্রম, সবকিছুর জায়গা যখন একই সড়কে, তখন তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। ঢাকার মেয়র না থাকলেও রয়েছে প্রশাসক, দুই সিটির দুই প্রশাসকের নলেজে থাকলেও এসব নিয়ে তারা সিরিয়াস নন। এসব উচ্ছেদ করে শৃঙ্খলায় ফিরিয়ে আনার দায়িত্বপ্রাপ্তরাও কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছেন না, অনেক সময় নিতে পারছেন না। কারণ ফুটপাতে অবৈধ দখল ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের নেপথ্যে ক্ষমতাসীদের হাত রয়েছে। ফলে জনগণ অসহায়ের মতো দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন।
ফুটপাত আছে, হাঁটার জায়গা নেই
রাজধানীর ফুটপাত মূলত পথচারীদের নিরাপদ চলাচলের জন্য। কিন্তু বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাতের ওপর দোকানপাট, খাবারের স্টল, পণ্যসামগ্রী, গাড়ি মেরামতের সরঞ্জাম কিংবা পার্ক করা যানবাহন রাখার কারণে পথচারীর চলাচলের জায়গা সংকুচিত হয়ে গেছে। ঢাকার দক্ষিণ বেগুনবাড়ী এলাকার একটি সড়কের ফুটপাতজুড়ে দুই শতাধিক দোকান রয়েছে। সেখানে মাছ, মাংস, ফল, সবজি, কাপড়, খাবারের দোকান, সেলুন, মোটর মেরামতের দোকানসহ বিভিন্ন ধরনের ব্যবসা গড়ে উঠেছে। একই অবস্থা নিউমার্কেট, গুলিস্তান, মৌচাকসহ প্রায় সব সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানের। ডিএমপি মার্চ মাসে এক বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, বিভিন্ন রেস্তোরাঁ, ওয়ার্কশপ ও দোকান তাদের নির্ধারিত জায়গার বাইরে ফুটপাত ও সড়ক ব্যবহার করছে। কোথাও ফুটপাতে রান্নার সরঞ্জাম, কোথাও টায়ার, আবার কোথাও আসবাব ও কাপড়সহ বিভিন্ন পণ্য রাখা হচ্ছে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব দখলের কারণে পথচারীরা সড়কে নামতে বাধ্য হচ্ছেন এবং এতে দুর্ঘটনা ও যানজটের ঝুঁকি বাড়ছে।
ফুটপাত দখলে যানজট আরও বাড়ে
ফুটপাত দখল শুধু পথচারীর হাঁটার সমস্যা নয়, ফুটপাত বন্ধ হয়ে গেলে পথচারী সড়কে নামে। আবার সড়কের পাশে দোকান, হকার, পার্কিং কিংবা পণ্য ওঠানামার কার্যক্রম থাকলে যানবাহনের চলাচলের জায়গাও কমে যায়। এভাবে একই জায়গায় একাধিক ধরনের ব্যবহার তৈরি হওয়ায় যান চলাচলের স্বাভাবিক গতি ব্যাহত হয়।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক থেকে রাজধানীতে প্রবেশের পথে ডিএমপি ট্রাফিক-ওয়ারী এলাকায় যানজটের কারণ হিসেবে সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে সংকীর্ণ সড়ক, অব্যবস্থাপনা, অবৈধ পার্কিং, ফুটপাত দখল, সড়কের ওপর বাস থামানো, অবৈধ টার্মিনাল ও হকারদের দখলের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু এসব সমস্যা কমাতে ফুটপাত দখলমুক্ত করা, অবৈধ পার্কিংয়ের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে কঠোর হচ্ছে না ট্রাফিক পুলিশ।
উচ্ছেদ হয়, আবার দখল ফিরে আসে
রাজধানীর ফুটপাত ও সড়ক দখলমুক্ত করতে বিভিন্ন সময়ে অভিযান হয়েছে। চলতি বছরের এপ্রিলের শুরুতেও ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ একাধিক অভিযানে ফুটপাত ও সড়কের অবৈধ দখল উচ্ছেদ, মালামাল জব্দ, জরিমানা ও কারাদণ্ডের ব্যবস্থা নেয়। ১ এপ্রিলের অভিযানে ১ লাখ ৯২ হাজার টাকা জরিমানা এবং ২৩ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। পরদিনের আরেক অভিযানে ২ লাখ ৬১ হাজার টাকা জরিমানা ও ৫১ জনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়।
কিন্তু উচ্ছেদ অভিযান শেষ হলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। এপ্রিল মাসে গুলিস্তানে হকার উচ্ছেদের পর কয়েক দিন ফুটপাত ও সড়কের অংশ তুলনামূলকভাবে ফাঁকা হয়ে যান চলাচলে গতি বাড়ে। কিন্তু পরবর্তী সময়ে জায়গায় আবার হকার বসার পাশাপাশি অবৈধ পার্কিংও হচ্ছে। ফলে অগেরই অবস্থায় ফিরেছে।
যানজট কমাতে প্রযুক্তির ব্যবহার
রাজধানীর যানজট মোকাবিলায় ট্রাফিক ব্যবস্থাপনায়ও পরিবর্তনের উদ্যোগ চলছে। ডিএমপি বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় সিসি ক্যামেরা ও এআই প্রযুক্তি ব্যবহার করে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘন শনাক্ত করছে। লাল বাতি অমান্য, স্টপলাইন অতিক্রম, উল্টো পথে চলা, অবৈধ পার্কিং, লেন আটকে রাখা এবং যত্রতত্র গাড়ি থামিয়ে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে ভিডিওভিত্তিক মামলা করার ব্যবস্থা চালু হয়েছে।
মে মাসে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, ঢাকার ৩০টি মোড়ে নতুন এআই ক্যামেরা বসানো হয়েছে এবং আগের থাকা আরও ৮০টি ক্যামেরাকে এআই ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে ক্যামেরার সংখ্যা ৫০০ করার পরিকল্পনার কথাও জানিয়েছে ট্রাফিক বিভাগ।
স্থায়ী সমাধান কোথায়?
রাজধানীর যানজট ও ফুটপাত দখল, দুটি সমস্যাকে আলাদা করে দেখার সুযোগ ক্রমেই কমছে। ফুটপাত দখল পথচারীকে সড়কে নামায়; সড়কের ওপর ব্যবসা ও পার্কিং যান চলাচলের জায়গা কমায়; অনিয়ন্ত্রিত যানবাহন ও যত্রতত্র থামানো আরও চাপ তৈরি করে। ফলে একটি সমস্যা অন্যটিকে বাড়িয়ে দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব সমস্যা সমাধানে প্রথমত, ফুটপাতকে পথচারীর জন্য বাধ্যতামূলকভাবে উন্মুক্ত রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, হকারদের জন্য নির্দিষ্ট ও বাস্তবসম্মত বিকল্প জায়গা নিশ্চিত করতে হবে- যাতে উচ্ছেদের পর তারা আবার সড়ক ও ফুটপাতে ফিরে না আসেন। তৃতীয়ত, ফুটপাত দখলের সঙ্গে যদি কোনো ধরনের অবৈধ অর্থ আদায় বা প্রভাবশালী চক্র জড়িত থাকে, তা তদন্ত করে ব্যবস্থা নিতে হবে। চতুর্থত, অবৈধ পার্কিং, যত্রতত্র বাস থামানো, সড়কে পণ্য ওঠানামা ও অনুমোদনহীন বাস কাউন্টারের বিরুদ্ধে নিয়মিত ব্যবস্থা নিতে হবে। পঞ্চমত, সিগন্যাল ব্যবস্থাপনা, এআই ক্যামেরা ও ডিজিটাল ট্রাফিক প্রসিকিউশনের মতো প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের নিয়মিত তদারকি যুক্ত করতে হবে।