মাইন্ড গেমের অপকৌশলে ভারত ও আ’লীগ
১৯ আগস্ট ২০২৬ ২১:৪৩
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
রাজনীতি এক মহৎ দায়িত্ব, তবে পিচ্ছিল ও কণ্টকাকীর্ণ এক জগৎ। রাজনীতি মূলত একটি শ্রেষ্ঠ কাজ ও সেবাব্রত। তবে এর মহত্ত নির্ভর করে রাজনীতিবিদদের উদ্দেশ্য এবং কর্মকাণ্ডের ওপর। গ্রিক দার্শনিক এরিস্টটল রাজনীতিকে সর্বশ্রেষ্ঠ বিজ্ঞান এবং মানবকল্যাণের মাধ্যম হিসেবে অভিহিত করেছেন। রাজনীতি ও রাজনীতিকরা দেশ ও জনগণের যেমন ব্যাপক ও বৃহদাকারে সেবা করতে পারেন; অপরদিকে উনাদের ভুল ও লোভের কারণে দেশ ও জাতি ধ্বংসও হয়ে যেতে পারে। বিশ্বে অনেক উদাহরণ আছে রাজনীতিবিদদের ভুলের কারণে অনেক দেশ ও জাতি তাদের স্বাধীনতা হারিয়েছে এবং ধ্বংস হয়ে গেছে। তার জ¦লন্ত উদাহরণ হচ্ছে সিকিম, লেন্দুপ দর্জি নামক এক কুলাঙ্গার রাজনীতিকের কারণে দেশটি আজ পরাধীন ও ভারতের অঙ্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে। দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মিয়ানমার, মধ্যপ্রাচ্যের ইরাক, সিরিয়া ও ইয়েমেন, পূর্ব ইউরোপের আলবেনিয়া, আফ্রিকা মহাদেশের সুদান, জিম্বাবুয়ে, কঙ্গো, সোমালিয়া, মালি ও নাইজার, দক্ষিণ আমেরিকার পেরু, বলিভিয়া ও ইকুয়েডরসহ অনেক দেশ রাজনীতিকদের ভুল নীতি ও সিদ্ধান্তের কারণে চরম অর্থনৈতিক সংকট থেকে শুরু করে রাজনৈতিক সংকটে পতিত হয়েছে। তেমনিভাবে ফ্যাসিস্ট হাসিনার মতো এক নিচুমানের রাজনীতিকের জন্য বাংলাদেশের মতো একটি বৃহৎ জনশক্তির সম্ভাবনাময় দেশ সংকটে নিমজ্জিত।
রাজনৈতিক ভুল ও পরিণতি
কোনো রাজনীতিকের এক ভুলের কারণে এ পথ থেকে একবার ছিটকে পড়লে সফলতার নাগাল পাওয়া কঠিন। তখন শুধুই ব্যর্থতার গ্লানি বয়ে বেড়াতে হয়। তারপরও রাজনীতিবিদ ও রাজনৈতিক দলগুলো বিভিন্ন কলাকৌশলে রাজনীতির মূল ট্র্যাকে ফিরে আসার চেষ্টা করে থাকে। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনা এখন তাই করার চেষ্টা করছেন। শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নিকষ অন্ধকার। কিন্তু তারপরও বিভিন্ন কৌশলে ফের রাজনীতিতে ফিরতে চাচ্ছে। এ লক্ষ্যে আওয়ামী লীগের অন্যতম কৌশল হচ্ছে মাইন্ড গেম। বর্তমানে দেশের জনসংখ্যার অধিকাংশই আওয়ামী লীগবিরোধী। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম তথা জেন-জিরা তো কট্টর হাসিনা ও আওয়ামীবিরোধী। তাই বিভিন্নভাবে বিশেষ করে সোশ্যাল মিডিয়া ও আওয়ামী ফ্যাসিস্ট সাংবাদিকদের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য ও খবর প্রকাশ এবং প্রচার করে জনগণের মনস্তাত্ত্বিক একটা পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছে। বর্তমানে আওয়ামী লীগের জন্য রাজনৈতিক প্রতিবন্ধকতা হচ্ছে- প্রথমত, আইনি ও সাংবিধানিক নিষেধাজ্ঞা। তার চেয়েও বড় সংকট হচ্ছে দলটির প্রতি সাধারণ জনগণের তীব্র জনরোষ ও ইমেজ সংকট। যার কারণে দলটি নির্বাচনী রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়েছে। অপরদিকে আওয়ামী লীগের প্রতি আন্তজাতিক সমর্থনও হ্রাস পেয়েছে। শেখ হাসিনাসহ দলের কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মামলা ও বিচার, নেতৃত্বের শূন্যতাসহ দল এখন ভাঙনের মুখে। বিভিন্নমুখী এসব সংকট কাটিয়ে উঠতে আওয়ামী লীগ এক নতুন মাইন্ড গেম কৌশল নিয়েছে। আর এ মাইন্ড কৌশলকে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করে যাচ্ছে ভারতের বিজেপি সরকার।
মাইন্ড গেম কী
মাইন্ড গেম একটি ইংরেজি শব্দ। Mind Game-এর বাংলা অর্থ মনের খেলা। মূলত এমন এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক চাল বা কৌশলকে বোঝায়, যেখানে একজন ব্যক্তি অন্য কোনো ব্যক্তিকে নিজের স্বার্থে প্রভাবিত, বিভ্রান্ত, ভয় দেখানো বা নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করে। কোনো কোনো সময় একটি গ্রুপ বা দল আর একটি গ্রুপ বা দলের ওপরও এ মনস্তাত্ত্বিক কৌশলকে ব্যবহার করে থাকে। রাজনৈতিক ময়দানেও এ মাইন্ড গেমের লড়াই চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে।
সহজ কথায়, এটি সরাসরি কোনো শারীরিক বা প্রকাশ্য লড়াই নয়, বরং বুদ্ধিমত্তা ও মানসিক চাল খাটিয়ে অপরপক্ষের ওপর মানসিক আধিপত্য বিস্তার করার একটি গোপন চেষ্টা। তবে প্রেক্ষাপট অনুযায়ী, এর সংজ্ঞা দুটি ভিন্ন অর্থে ব্যবহৃত হয়, নেতিবাচক বা মনস্তাত্ত্বিক কৌশল (Psychological Manipulation) ব্যক্তিগত সম্পর্ক, কর্মক্ষেত্র বা প্রতিযোগিতার ক্ষেত্রে কেউ যখন নিজের সুবিধা হাসিলের জন্য অন্যের অনুভূতি ও চিন্তাভাবনা নিয়ে খেলা করে।
রাজনীতিতে মাইন্ড গেম কৌশল
অনাদিকাল থেকেই রাজনৈতিক ময়দানে এ মাইন্ড গেমের লড়াই চলছে। মাইন্ড গেমে যে দল এগিয়ে থাকে, সেই দলই ময়দানে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকে। রাজনীতিতে মাইন্ড গেম হলো এমন এক মনস্তাত্ত্বিক কৌশল, যার মাধ্যমে কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতা সরাসরি শক্তি বা যুক্তি ব্যবহার না করে জনগণ এবং প্রতিপক্ষের চিন্তাভাবনা, আবেগ ও আচরণকে পরোক্ষভাবে নিয়ন্ত্রণ বা ম্যানিপুলেট করেন। এর মূল লক্ষ্য হলো প্রতিপক্ষকে মানসিকভাবে দুর্বল করা এবং জনমতকে নিজের পক্ষে আনা।
আধুনিক বিশ্বে রাজনীতিবিদরা তাদের পক্ষে জনমত গঠন ও ক্ষমতা দখল করতে মনস্তাত্ত্বিক বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে থাকেন। রাজনৈতিক দলগুলো খুবই সুকৌশলে বিভিন্ন টুলস ব্যবহার করে জনমতকে নিয়ন্ত্রণে আনে।
গ্যাসলাইটিং (Gaslighting) : সত্যকে এমনভাবে বিকৃত করা- যাতে প্রতিপক্ষ বা জনগণ তাদের নিজস্ব স্মৃতি ভুলে যায় বা সিদ্ধান্ত নিয়ে সন্দেহের মধ্যে পড়ে। এভাবে প্রতিপক্ষ ও সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করা হয়ে থাকে।
ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি (Fear Mongering) : সমাজে কোনো কাল্পনিক বা অতিরঞ্জিত তথ্য ও খবর ছড়িয়ে দিয়ে নিজেদের একমাত্র ‘ত্রাতা’ হিসেবে উপস্থাপন করা। যেমনটা করা হয়েছিল ১৯৬০-এর দশকে শেখ মুজিবকে নিয়ে।
বয়ান পরিবর্তন (Narrative Shifting) : চিন্তা বিশ্বাস দর্শন ও আদর্শকে নিজেদের মতো করে উপস্থাপন ও ব্যাখা করে পরিবর্তন করা। যেমন মুসলিমদের তাদের নিজস্ব চিন্তা ও বিশ্বাস পরিবর্তন করে নতুন একটি জাতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, যেমন বাংলা এ ভুখণ্ডে মুসলিমদের বাঙালি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।
মিথ্যা তথ্যের পুনরাবৃত্তি (Illusion of Truth) : একটি অসত্য, মিথ্য বা অর্ধসত্য বিষয়ে দাবি বারবার প্রচার করে সেটিকে সাধারণ মানুষের কাছে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা।
ভিকটিম কার্ড খেলা (Victim Card) : নিজেদের ভুল বা অন্যায় ঢাকা দিতে নিজেদের ষড়যন্ত্রের শিকার বা মজলুম হিসেবে তুলে ধরা। বিশেষ করে সরকারের বিরুদ্ধে বলে দলের নেতাদের মজলুম নেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
বিভাজন ও শাসন (Divide and Rule) : ধর্ম, জাতি বা আদর্শের ভিত্তিতে সমাজে বিভেদ সৃষ্টি করে নিজস্ব ভোটব্যাঙ্ক নিশ্চিত করা।
ভুয়া আত্মবিশ্বাস প্রদর্শন (Bluffing) : নিজেদের দুর্বলতা লুকাতে প্রতিপক্ষের সামনে এমন ভাব করা যেন তারা অত্যন্ত শক্তিশালী অবস্থানে রয়েছে, যা প্রতিপক্ষকে চাপে ফেলে।
সহজ কথায়, রাজনীতিতে মাইন্ড গেম হলো তথ্যের মারপ্যাঁচে প্রতিপক্ষের মনস্তাত্ত্বিক প্রতিরোধ ভেঙে দেওয়ার এবং সাধারণ মানুষের আবেগকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের একটি সূক্ষ্ম খেলা। সাধারণ জনগণের বড় অংশই রাজনীতিকদের এসব সূক্ষ্ম খেলা বুঝতে তো পারে না, বরং খেলার শিকার হয়। যা এদেশের জনগণ ১৯৬০-এর দশকে শেখ মুজিব ও আওয়ামী লীগের শিকারে পরিণত হয়েছিল।
ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ ও পঞ্চাশ-ষাটের দশক
আওয়ামী লীগ সেই পঞ্চাশের দশক থেকেই মাইন্ড গেম কৌশলকে কাজে লাগিয়ে রাজনীতিতে তার প্রভাব-প্রতিপত্তি যেমন বাড়িয়েছে, তেমনি প্রতিদ্ধন্ধি রাজনৈতিক দলগুলোকে সাধারণ জনগণের কাছে অজনপ্রিয় করেছে। পঞ্চাশের দশকে আওয়ামী লীগের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলাম পার্টি, ষাটের দশকে জামায়াতে ইসলামী। তখন আওয়ামী লীগের মাইন্ড গেম ছিল, পাকিস্তানিরা বাঙালিদের অধিকার দিচ্ছে না, রাষ্ট্রের রাজস্ব খাতের অধিকাংশ ব্যয় করা হচ্ছে পশ্চিম পাকিস্তানে, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ কম ইত্যাকার মিথ্যা তথ্য প্রচার করে সাধারণ জনগণকে বিভ্রান্ত করা। অথচ পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে পাকিস্তানের রাজস্ব আয় ব্যয়ের তথ্য ও পরিসংখ্যান পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, পূর্ব পাকিস্তান তথা বর্তমান বাংলাদেশের রাজস্ব আয় ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় কম, কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানে ব্যয় করা হয়েছে তুলনামূলকভাবে বেশি। তারপরও আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব বারবার একটি মিথ্যা তথ্য প্রচার করে এটা প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছিল, পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানকে বঞ্চিত করে ঠকাচ্ছে। এভাবে প্রোপাগান্ডা করে আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব ভারতের সহযোগিতায় পাকিস্তান ভেঙেছিল। শেখ মুজিব ১৯৬২ সালে ঢাকায় ভারতীয় কূটনীতিক শশাঙ্ক শেখর ব্যানার্জির মাধ্যমে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী জওহরলাল নেহরুর কাছে একটি গোপন চিঠি পাঠিয়েছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতা-সংগ্রামে সহযোগিতা করতে। এ চিঠিতে যথাযথ সাড়া পেতে দেরি হওয়ায় ধৈর্য হারিয়ে গোপনে সীমান্ত পেরিয়ে আগরতলায় যান। সেখানে ত্রিপুরার তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলাল সিংহের সাথে বৈঠক করে ভারতের সহযোগিতার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা চান। উল্লেখ্য, নেহরুকে কূটনীতিক ব্যানার্জির মাধ্যমে চিঠি ও ত্রিপুরার মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলালের সাথে বৈঠকের বিষয়টি প্রথম আলোর ২০১৯ সালে ঈদ সংখ্যায় এক নিবন্ধে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ লিখেছেন। শেখ মুজিবের ত্রিপুরায় গমন ও মুখ্যমন্ত্রী শচীন্দ্রলালের সাথে বৈঠক নিয়ে পাকিস্তান সরকার যে মামলা করে, সেটাই তৎকালে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা হিসেবে পরিচিত হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগ পুরো ষাটের দশকে আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলাকে মিথ্যা মামলা হিসেবেই প্রচার করে এবং পত্রপত্রিকার মাধ্যমে প্রচার করে তাই প্রতিষ্ঠিত করে। বাঙালিরা আওয়ামী লীগের ঐ প্রচারণাই বিশ্বাস করতো যে, শেখ মুজিবের বিরুদ্ধে পাকিস্তান সরকার একটি মিথ্যা মামলা করেছে। অথচ পরবর্তীতে আওয়ামী লীগের এক নেতা ও জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার কর্নেল শওকত আলী এ বিষয়ে একটি বই লিখেছেন, যে বইটার নামই ছিল, ‘সত্য মামলা আগরতলা’। এটা ছিল আওয়ামী লীগ ও ভারতের মাইন্ড গেম কৌশলের একটি বড় সফলতা।
বাকশাল ও আ’লীগের মাইন্ড গেম
আওয়ামী লীগ ১৯৭৫ সালে গণতন্ত্র হত্যা করে বাকশাল কায়েম করার ঘোষণা করেছিল। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্টের রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের কারণে বাকশালকে স্থায়ী করতে পারেনি। গণতন্ত্র হত্যা ও বাকশাল কায়েমের কারণে আওয়ামী লীগারদের রাজনৈতিক ময়দানে বাকশাল বলে গালি দেয়া হতো। বাকশাল ছিল একটি একদলীয় শাসনব্যবস্থা অথচ আওয়ামী লীগ এ বাকশালের অপবাদ ঘুচিয়ে পুনরায় ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করেছিল। কিন্তু আওয়ামী লীগ তার মিত্র দেশ ভারত ও আওয়ামী সাংবাদিকদের দিয়ে মাইন্ড গেম কৌশল করে বাকশাল গালি মুছে দিয়ে ১৯৯৬ সালে পুনরায় ক্ষমতায় আসে। তারপর নতুন নতুন কৌশলে মাইন্ড গেম খেলে ২০০৯ সালে আবারও ক্ষমতায় আসে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ। ২০০৯ থেকে ২০২৩ সাল পযন্ত চলে রাষ্ট্রযন্ত্রকে ব্যবহার করে সত্যকে বিকৃত করে ইতিহাস রচনা, মিথ্যা তথ্যের পুনরাবৃত্তি করে জনগণের চিন্তা ও বিশ্বাসকে পরিবর্তন করে মিথ্যা বয়ান প্রতিষ্ঠিত করার মাইন্ড গেমের অপকৌশল।
মাইন্ড গেম ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা
এসব মিথ্যাচার করেও শেষ রক্ষা হয়নি আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিস্ট হাসিনার। গণঅভ্যুত্থানে জনরোষের মুখে ফ্যাসিস্ট হাসিনাকে গোপনে পালাতে হয়েছে ভারতে। ভারতে পালিয়ে গিয়েও আওয়ামী লীগ ও ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার মিত্র দেশ ভারতের মাইন্ড গেম কৌশলের অবসান ঘটেনি। বিশেষ করে ভারতের গণমাধ্যম একযোগে হাসিনার বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন নিয়ে বিভিন্নভাবে প্রতিবেদন প্রকাশ করছে। বাংলাদেশের একদল সাংবাদিকও মিডিয়ার মাধ্যমে জনগণের মনস্তত্ত্ব পরিবর্তনের অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। ভারত সরকারের ইন্ধনে একদল ফ্যাসিস্ট সাংবাদিক হাসিনার পলায়ন ও বিচারকে অন্যভাবে উপস্থাপন করে যাচ্ছে। তাদের অনেকেই ইনিয়ে-বিনিয়ে বলছেন, হাসিনা তো পালিয়ে যাননি, তাকে তো বাংলাদেশের সেনাবাহিনীর বিমানেই নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দেয়া হয়েছে। এখন আবার বলা হচ্ছে, হাসিনাকে যেসব অপরাধে বাংলাদেশের আদালত শাস্তি দিচ্ছেন, সেগুলো আসলেই অপরাধ কিনা, তা আইনের দৃষ্টিতে পর্যালোচনা করতে হবে। সব মিলিয়ে ভারত সরকারের অদৃশ্য নির্দেশনায় ফ্যাসিস্ট হাসিনার একটি ইতিবাচক অবস্থান তৈরি করতে দিল্লি সমর্থিত সংবাদমাধ্যম ও সাংবাদিকরা প্রাণান্তকর চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।
তবে মাইন্ড গেমের যত কৌশলই করুক না কেন, ফ্যাসিস্ট হাসিনা এখন দিল্লির যেমন দায় তথা বোঝা তেমনিভাবে আওয়ামী লীগের জন্য তদ্রুপ। কারণ হাসিনা এখন বাংলাদেশ ভারত কূটনৈতিক সর্ম্পকের জন্য সংকট তৈরি করেছে। এদিকে অস্ট্রেলিয়াভিত্তিক আন্তর্জাতিক নীতিবিষয়ক গবেষণা প্রতিষ্ঠান (থিংক ট্যাংক) লোয়ি ইনস্টিটিউটের এক বিশ্লেষণের পর্যবেক্ষণ বলা হয়েছে, হাসিনা দীর্ঘদিন ভারতের ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত হলেও সম্প্রতি তার বক্তব্য ঢাকার সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার পথে দিল্লির ‘মাথাব্যথার’ কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাকে আশ্রয় দেয়া অব্যাহত রাখলে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকারের সঙ্গে ভারতের টানাপড়েন আরো গভীর হতে পারে। একইসঙ্গে বাংলাদেশ চীনের আরো কাছে চলে যাওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
লোয়ি ইনস্টিটিউটের প্রকাশিত বিশ্লেষণটি লিখেছেন অস্ট্রেলিয়া-ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউটের ভূরাজনীতি ও নিরাপত্তাবিষয়ক জ্যেষ্ঠ নীতি ও প্রকল্প ব্যবস্থাপক গ্রেস করকোরান। তার মতে, শেখ হাসিনা দেশে ফেরার যে ঘোষণা দিয়ে আসছেন, এর প্রভাব বাংলাদেশের সীমানার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না, ভারতের জন্যও তা ব্যাপক পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
ফ্যাসিস্ট আ’লীগ ও ভারতের বর্তমান মাইন্ড গেম অপকৌশল
আওয়ামী লীগ ও তার একমাত্র বন্ধুরাষ্ট্র ভারত সেই ১৯৫০-এর দশক থেকে শুরু করে বিগত সাত দশক ধরে মুসলিম ও মুসলিমদের ভূখণ্ডগুলোকে পরাধীন করতে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও ষড়যন্ত্রের যত কৌশল আছে, তা প্রয়োগ করেই চলছে। বর্তমানেও ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান, ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার পলায়ন, তার দিল্লিতে নিরাপদে অবস্থান, ঢাকায় তার বিচারকার্যক্রম ও শাস্তি প্রদান এবং বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো নিয়ে বড় ধরনের মাইন্ড গেম কৌশল করে চলছে। আর এ কাজে ভারত ও আওয়ামী লীগ গণমাধ্যম ও সামাজিক মাধ্যমের যতরকম টুলস আছে তার ব্যবহার করে চলছে। হাসিনার পলায়নকে তারা বলছেন, বাংলাদেশের প্রতিরক্ষা বাহিনী তাকে নিরাপদে ভারতে পৌঁছে দিয়েছে অর্থাৎ হাসিনা পালাইনি, দিল্লিতে হাসিনার প্রেস কনফারেন্সের বিষয়ে বলা হচ্ছে, এটার সাথে ভারত সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই। ফেরত পাঠানোর বিষয়ে ভারতের এক পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশ করা হয়েছে যে, ‘ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে ভারতের আদালত।’ দেশটির শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যম ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ভারতের উচ্চপদস্থ সরকারি কর্মকর্তাদের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, এই প্রত্যর্পণের প্রক্রিয়াটি কোনো রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সম্পন্ন হবে না। এটি পুরোপুরি আদালতের আইনি বিচারালয়ে নিষ্পত্তি হবে, যেখানে খতিয়ে দেখা হবে বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগগুলো ভারতের আইনেও অপরাধ হিসেবে গণ্য কি না।
সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে উদ্ধৃত করে বলা হয়, ‘আদালতের আইনি প্রক্রিয়ায় যা খতিয়ে দেখা হবে, তা হলো যেসব অপরাধের অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো ভারতের প্রচলিত আইনি কাঠামোয়ও অপরাধ হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ কি না।’
একটি সংবাদপত্রে একটি রিপোর্ট প্রকাশের মাধ্যমে হাসিনার ফেরত পাঠানোর বিষয়টি এখন আদালতে নিয়ে যাওয়ার ইঙ্গিত দেয়া হয়েছে। হাসিন দুই বছর আগে পালিয়ে দিল্লিতে ভারতের নিরাপদ আশ্রয়ে আছেন। কিন্তু বিগত দুই বছর ভারত সরকারও হাসিনার বিরুদ্ধে আদালতকে কিছু জানায়নি। অপরদিকে ভারতের কোনো আদালতও সুয়োমোটো হাসিনার বিষয়ে কোনো কিছু জানতে চায়নি। যখন বাংলাদেশ সরকার হাসিনাকে ফেরত পাঠানোর বিষয়ে জোরালো দাবি জানিয়ে আসছে, তখনই ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস পত্রিকা হাসিনার ফেরত পাঠানোর বিষয়টি আদালত চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে- এমন একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। এটাও ভারতের মাইন্ড গেমে একটি অপকৌশল। এভাবেই ভারত ও আওয়ামী লীগ সত্যকে বিকৃত করা, মিথ্যাকে সত্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা, মূল বা ব্যর্থতার ইস্যু থেকে জনগণের মনোযোগ সরাতে নতুন কোনো বিতর্কিত বা আবেগঘন ইস্যু সামনে আনা, নুতন বয়ান প্রচার করা, জনগণের মধ্যে ভয় ও অনিশ্চয়তা তৈরি করার মাধ্যমে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনাকে আবার প্রতিষ্ঠিত করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যেমন রাজনীতিক গোলাম কাদেরকে দিয়ে বলানো হচ্ছে, ভারতের সাথে বিরোধ করে বাংলাদেশ ক্ষতিগ্রস্ত হবে। অপরদিকে ভারতের কূটনীতিকদের দিয়ে বলানো হচ্ছে, শেখ হাসিনা ইস্যুতে বেশি বাড়াবাড়ি করলে বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবেÑ এতে করে দুই দেশই ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এভাবেই ভারত আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার বিগত ১৬ বছরের হত্যা, খুন, দুর্নীতি, লুটপাট, অর্থ পাচার; বিশেষ করে ২০২৪-এর গণহত্যার মতো আন্তর্জাতিক অপরাধকে স্বাভাবিক করতে চাইছে। ভারত ও আওয়ামী লীগ মাইন্ড গেমের বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করে বাংলাদেশের সাধারণ জনগণের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন করার পাশাপাশি বিশ্বজনমতকে নরমালাইজ করার অপচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। তাই বাংলাদেশ সরকার, বিরোধীদল, রাজনীতিক থেকে শুরু করে সাংবাদিক, শিক্ষক, আইনজীবী তথা সর্বস্তরের জনগণকে ভারত ও আওয়ামী লীগের মাইন্ড গেমের অপকৌশল সম্পর্কে সদা তৎপর থাকতে হবে।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com