চুরি-ডাকাতির কিসসা


৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৫২

॥ তাহমিদুল্লাহ সারাসিনী ॥
আসরের সালাতের পর মসজিদের দরজার সামনে এসে দেখি- এ যে ভারি মুশকিল! এই বর্ষার মৌসুমে ছাতা ছাড়া ঘর থেকে বের হওয়া আর শীতের রাতে খালি গায়ে বের হওয়া একই কথা। পাশে তাকিয়ে দেখি ওমর আর আব্দুর রহমানও এসে দাঁড়িয়েছে। কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলাম, কিন্তু বৃষ্টি থামার কোনো লক্ষণই নেই। সে তার কুকুর-বিড়াল খেলা খেলছেই। ওদের দুজনের দিকে ফিরে বললাম, ‘কী করা যায় বল তো?’
‘আমার মেসটা তো কাছেই আছে। চল এক দৌড়ে’ ওমর বলল।
আব্দুর রহমান বলল, ‘হ্যাঁ, এছাড়া তো এখন আর কোনো পথ নেই’
আমি সম্মতি জানিয়ে বললাম, ‘চল তাহলে, কী আর করার!’
তিনজনে প্যান্ট গুটিয়ে দিলাম ভোঁদৌড়। ওমরের মেসে ঢুকে গামছা দিয়ে ভালোভাবে গা-টা মুছে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। আব্দুর রহমান বলল, ‘মামা, এক কাপ চা হলে ভালো হতো না এই বৃষ্টির দিনে।’
‘কীরে! বন্ধুর রুমে মামা কীসের?! দাঁড়া চা বানিয়ে আনছি। তোরা বরং খাটে গিয়ে বস’, ওমর বলল।
আমি আর আব্দুর রহমান মিলে ভাবতে লাগলাম এখন কী করা যায়। এরই মধ্যে ওমর চা নিয়ে হাজির।
চায়ে চুমুক দিয়ে ওমর বলল, ‘তো কী ভাবছিস তোরা?’
আব্দুর রহমান জানালার দিকে তাকিয়ে দার্শনিক ভঙ্গিতে বলল, “ভাবছি, এভাবে বৃষ্টি চলতে থাকলে তো চোরদের মহাবিপদ। অন্ধকার রাতে কিছু দেখতে না পেয়ে পুরো ‘রেলগাড়ি ঝমাঝম; পা পিছলে আলুর দম’ অবস্থা হয়ে যাবে।”
ওমর চটে গিয়ে বলল, ‘এই তোর সমস্যাটা কী! চুরি করিস নাকি রে তলেতলে?!’
আমি বললাম, ‘আরে জানিস নাÑ চুরিবিদ্যা মহাবিদ্যা, যদি না পড়ো ধরা। তো চোর মহাশয়! আমাদের আপনার একটা দুর্ধর্ষ চুরির গল্প শোনান আজকে’, গা ঝাড়া দিয়ে বললাম, ‘চায়ের সাথে বেশ জমবে।’
আব্দুর রহমান মহাবিরক্ত হয়ে বলল, ‘এই তোরা কী শুরু করেছিস হ্যাঁ?!’, এরপর একটু ভেবে বলল, ‘আচ্ছা, দাঁড়া একটা ঘটনা বলি, তাহলেই সব ক্লিয়ার হয়ে যাবে।’
আমরা দুজন সম্মতিসূচক মাথা ঝাঁকালাম।
আব্দুর রহমান শুরু করল, “সময়টা গত বছর রমজান মাস। সাহরি শেষ করে হেঁটে হেঁটে মিসওয়াক করছিলেন আমাদের গ্রামের মাসুদ ভাই। উনাদের পাশের বাড়িটা বেশ বড় এই জমিদারটাইপ। কিন্তু লোকজন কেউ তেমন থাকে না। এই এক বুড়িমতো থাকে আরকি! তো মাসুদ ভাই মিসওয়াক করতে করতে একটু ওদিকে চলে গেলেন। হঠাৎ কয়েকজন জোয়ান মরদের কণ্ঠ শোনা গেল। উনি তো ভারি আশ্চর্য। ওই বাড়িতে তো বুড়িমা ছাড়া আর কেউ থাকে না। তাহলে?! পা টিপে টিপে আরো কাছে যেতেই কণ্ঠটা স্পষ্ট হয়ে উঠলো। বেশ একটা বাজখাঁই গলায় কেউ বলছে, ‘এই শোন বেটি! একটুকু নড়াচড়া করবি তো মেরে তক্তা বানাইয়া ফেলমু একদম। চুপচাপ বইসা থাক দেহি। আর এই তোরা যা, সব নিয়ে আয়। তাড়াতাড়ি কর, কাইটা পড়তে হইবো না আবার।’
মাসুদ ভাই তো হতবাক। এগিয়ে গিয়ে আস্তে আস্তে গিয়ে দরজায় ঘা দিলেন। দরজায় শব্দ পেয়েই ভিতরে যেন হুলুস্থুল পড়ে গেল। তিনি ব্যাপারটা বুঝতে পেরে গলা চড়িয়ে বললেন, ‘কে রে ওখানে?!’ অমনি দেখা গেল বাড়ির পিছন দিয়ে সুর সুর করে কিছু লোক বেরিয়ে যাচ্ছে। তিনি হল্লা জুড়ে দিলেন, ‘এই চোর চোর চোর’ আর একাই ওদের পিছু নিলেন। ডাকাতরা তো পড়িমরি করে দৌড় লাগাল। তাদের হাতে দা-কাস্তেও দেখা যাচ্ছে।’
‘কী বলিস? মাসুদ ভাই একাই সকল ডাকাতের পিছু নিল?’, ওমর চোখ কপালে তুলে জানতে চাইল।
আব্দুর রহমান বলল, “হুম, জানিস না, চোরের মনে পুলিশ পুলিশ। ডাকাতদের হাতে অস্ত্র থাকলে কী হবে তখন তারা পালাতে ব্যস্ত। তারা সমানে এদিক-সেদিক ছুট লাগায়। বাবার চিৎকার শুনে মাসুদের ছেলে মামুনও বাবার পিছু নেয়। মাসুদ ছেলেকে বলে, ‘তুই যা; গ্রামের সবাইকে জানা। আর পুলিশ ডাকতে বলিস।”
মামুন তখন গ্রামে গিয়ে হৈচৈ বাধিয়ে দিল। আর এদিকে মাসুদের হাত ফসকে একে একে প্রায় সব ডাকাত পালিয়ে যেতে থাকল। এখন আর মাত্র একটা আছে। মুখটা কালো কাপড়ে বাঁধা। সে গিয়ে উঠলো একটা নেটওয়ার্ক টাওয়ারের ওপর আরাকি। মাসুদ ভাই গিয়ে বহু কসরত করে তাকে নামিয়ে গ্রামে নিয়ে আনল। গ্রামে ঢুকতে না ঢুকতেই সবাই এলোপাতাড়ি ডাকাতটাকে চড়-থাপ্পড় আর কিল-ঘুসি মারতে শুরু করলো। ডাকাতটা শুধু বলে যাচ্ছিল, ‘এগগো, আঁর কথাখান আগে হুনেন না…।’ কিন্তু কে শোনে কার কথা। অনেক মারধরের পর তার শরীর টকটকে লাল হয়ে গেছে, নাক দিয়ে কষ ও রক্ত পড়ছে। কিন্তু আশ্চর্যের ব্যাপার এত মারার পরেও ডাকাতটার চোখে কোনো পানি নেই।
‘কী?! চোখ দিয়ে কোনো পানিই পড়লো না?’ আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘তবে তো বলতে হবে ডাকাতটা বেশ শক্ত ধাতুতেই গড়া।’
জানালা দিয়ে তাকিয়ে দেখি কুকুর-বেড়াল খেলা নিস্তেজ হয়ে পড়ছে। কালো মেঘেদের হটিয়ে সাদা মেঘেরা ধেয়ে আসছে। আমাদের গল্পও বোধ হয় ফুরিয়ে আসছে।
আব্দুর রহমান আবার শুরু করল, “কিছুক্ষণ এভাবে চলার পর যখন ডাকাতটার প্রায় রূহ বেরিয়ে যাওয়ার অবস্থা তখন এলাকার মাতব্বর সাহেব বলল, ‘এই তোরা থাম এবার। আর বেশি বাড়াবাড়ি কইরলে শেষে হটল তুইলবো।’”
কয়েকজন মিলে তাকে একটা বড় গাছের সাথে বেঁধে রাখল। ডাকাতটার বয়স তেমন বেশি না। বড়জোর আটাশ-উনত্রিশ। গায়ে গেঞ্জি আর পরনে লুঙ্গি। সে মাতব্বরকে ডেকে বলল, ‘মাতবর সাব, বিশ্বাস করেন আই এই লাইনে নতুন। আর একখান ভাঙা সিএনজি আছিল। টায়ারের অভাবে সারাইতে হারি নাই। বাড়িত মা, বউ-পুলাপাইন খাইতো হায় না। এমন একদিন হেতাগো একজন আইয়া কইল, যদি হিগুনের লগে যোগ দিই, তয় আর সিএনজিখান ঠিক কইরা দিবো। বিশ্বাস করেন, আই হিগুনের কাউরে চিনিও না। বেগগুনের মুখ সবসময় বান্ধা থাইকতো।’
ওমর বলল, ‘মাতব্বর কী জবাব দিল রে?!’
আব্দুর রহমান বলল, “সে আর কী বলবে! কষে একটা ধমক দিয়ে বলে উঠলো, ‘চুপ রও বেটা! আইসছে ন্যাকা সাজতে। উনি এই লাইনে নতুন, কিছুই জানেন না! দাঁড়া পুলিশ আসুক, তবে রে তোর ন্যাকামো বের করছি’ কিন্তু পুলিশ আর কই?! তারা তো সর্বদা মহাব্যস্ত থাকে। এদিকে গ্রামের আবাল-বৃদ্ধ-বণিতা সবাই ডাকাতটাকে দেখতে যাচ্ছে। আমার আম্মাও গিয়েছিলেন। মাকে দেখে ডাকাতটা বলল, ‘এককানা হানি দেন না মা! ছাতি হাডি যায়’। আম্মা কী আর পানি দিবেন, ওর অবস্থা দেখে আম্মা নিজেই বেহুঁশ হওয়ার জোগাড়। ঘরে এসে বললেন, ‘হ রে! আঁর মন চায় হোলাগারে আনি ভালা করি খাবাই দিতাম। কী অবস্থা করেছে দেখছিস?!’”
আমি বলে উঠলাম, ‘ঠিকই! আইনকে নিজের হাতে তুলে নিয়ে এই ভুলটা আমরা সবাই করে থাকি। আরে স্বয়ং খলিফা বা চিফ জাস্টিস সাহেবও যদি কাউকে কোনো অপরাধ করতে দেখেন, তবু সাক্ষী প্রমাণ ছাড়া ইসলামের দৃষ্টিতে তাকে কিচ্ছুটি করতে পারবেন না।’
আব্দুর রহমান ফের শুরু করল, ‘তো পরে প্রায় জোহরের সালাতের সময় পুলিশ এসে হাজির হয়। তাৎক্ষণিক জেরায় জানা যায় যে, ঐ ডাকাতরা কুমিল্লা থেকে এসেছিল ওখানে।’
ওমর চমকে বলে উঠলো, ‘কী হে ভাই! কুমিল্লা থেকে নোয়াখালী এসেছে? শুধু একটা ডাকাতি! আহারে তাহলে তো তাদের পুরো প্রজেক্টটাই লস খেয়ে গেল।’
আব্দুর রহমান সম্মতিসূচকভাবে বলল, ‘হুম, তবে ছেলেটা নোয়াখালীর। তার সিএনজিতে করে ওরা ঐ বাড়ি পৌঁছায়। বুড়িমা তখন ফজরের সালাত পড়ছিল। সালাত শেষ হতেই তাকে চুপ থাকতে বলে তারা তোলপাড় শুরু করে। ঠিক তখনই মাসুদ ভাই দরজায় ঘা দেয়, আর তাদের সবার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। সবাই পড়িমরি করে পালায়। তবে তার থেকে ডাকাতদের সম্পর্কে কিছুই জানা যায়নি রে। সে তাদের কাউকেই ভালোভাবে নাকি দেখতে পারেনি।’
আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘এরপর? পুলিশ তাকে বিশ্বাস করল?’
আব্দুর রহমান গগনবিদারী অট্টহাসি হেসে বলল, ‘হা হা কী যে বলিস! পুলিশ তো তাকে ধরেই নিয়ে গেল। আর ছাড়া টাড়া পেল কিনা তা জানি না আর।’
আমি বললাম, ‘আমার মনে হয় ছেলেটা ঠিকই বলেছিল রে!’
আব্দুর রহমান বলল, ‘আমারও তাই মনে হয়। জানিস, সেদিনের পর থেকেই চোরদের জন্য আমার মায়া লাগে।’
ওমর বিরক্ত কণ্ঠে বলল, ‘ধ্যাৎ! তোরা কী যে বলিস। গোয়েন্দা গল্পটল্প পড়িস নি নাকি?! এসব তো এদের হরদম মুখের কথা। জেলের খানা একদিন খেলেই হড়হড় করে সব উগড়ে দেবে।’
আমি বললাম, ‘তবে যাই বলিস, আমি হলে ডাকাতটাকে পুলিশেই নিয়োগ দিয়ে দিতাম। কারণ ওর হার্ট খুবই স্ট্রং। নইলে এতো মার খাওয়ার পরেও কেউ কি এভাবে কথা বলতে পারে? চোখের পানি না ফেলে?!’
ওমর কপালের রগ ফুলিয়ে বলল, ‘আমি তো এক কোপেই শালার হাতটা কেটে ফেলতাম।’
আব্দুর রহমান মাথা নেড়ে বলল, ‘উহু, এতো সোজা না। আগে সাক্ষী প্রমাণ দিয়ে আদালতে বিচার হবে তারপর শাস্তি।’
আমি বললাম, ‘আরে জানিস একবার আমাদের বাসায় কী হইছে?’ মাঝপথেই কথা থামিয়ে ওমর বলল, ‘জানি না, আর আজকে আর জানতে পারবোও না। কাল আবার আসিস, তখন বলিস।’
আব্দুর রহমান বলল, ‘কেন রে?! আজ কী সমস্যা?’
ওমর চোখ পাকিয়ে বলল, ‘কালা নাকি রে! মাগরিবের আযান দিচ্ছে শুনছিস না?’
আমি বললাম, ‘ঠিক আছে, কাল বলবো। কিন্তু আমার গল্পটা জোস হবে, দেখিস।’
ওমর হেসে উঠে বলল, ‘শুনি তো আগে, তারপর বেঝা যাবে কত কেজি জোস!’
আব্দুর রহমান মুখ টিপে হাসল। ওমর চায়ের কাপগুলো রান্নাঘরে রেখে আসল।
বাইরের কালো মেঘেরাও দেখছি লেজ গুটিয়ে পালিয়েছে। এরপর সবাই মিলে পা বাড়ালাম মসজিদের দিকে।
(চলবে)