বদলাতে হলে দরকার চিন্তা বিশ্বাস ও দর্শনের পরিবর্তন


৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:৪২

॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
বর্তমান সরকারের ক্ষমতা গ্রহণ বলি আর দায়িত্ব গ্রহণ করা- যেটাই বলি, তা পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হয়েছে। চলতি বছরের ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার তথা তারেক রহমান প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। পাঁচ মাস একটি সরকারের খুব বেশি সময় না, তবে কমও নয়। বাংলাদেশের সংবিধান অনুযায়ী একটি নির্বাচিত সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর তথা ৬০ মাস। এ পাঁচ মাস হচ্ছে পুরো মেয়াদের এক-দ্বাদশাংশ। অবশ্য বিশ্বের অনেক দেশেই এখন সরকারের মেয়াদ চার বছর; যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে একটি সরকারের মেয়াদকাল হচ্ছে চার বছর। সেদিক থেকে বাংলাদেশের একটি সরকারের মেয়াদ পাঁচ বছর যথাযথ। বর্তমান বিএনপি সরকারের পাঁচ মাস অতিক্রান্ত হলেও কোনো থিঙ্কট্যাঙ্ক বা গণমাধ্যমের পক্ষ থেকে সফলতা বা ব্যর্থতার কোনো সমীক্ষা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। না করার কারণ হচ্ছে পাঁচ বছর মেয়াদে পাঁচ মাস সময়টা খুব বেশি না।
গণমাধ্যম বা থিঙ্কট্যাঙ্ক থেকে কোনো সমীক্ষা প্রকাশ করা না হলেও সরকারের একজন গুরুত্বপুর্ণ মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক বক্তব্যে সরকার তথা প্রশাসন নিয়ে চরম হতাশা ব্যক্ত করেছেন। ফখরুল ইসলাম শুধু মন্ত্রীই নন, তিনি ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মহাসচিব এবং দলের দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নেতা। মির্জা ফখরুল ইসলাম বলেছেন, বিগত ৫ মাসে কিছুই বদলায়নি, ঘুষখোর আগের মতোই ঘুষ খাচ্ছে। মাত্র চার থেকে পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্রযন্ত্রে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন দেখতে পাননি বলে কঠিন মন্তব্য করেছেন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী ও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার এ বক্তব্য দেশের সবকটি জাতীয় দৈনিকে গুরুত্ব সহকারে ছাপা হয়েছে। কোনো পত্রিকায় তার এ বক্তব্য প্রথম পাতায় সেকেন্ড লিডও করা হয়েছে। এতো গুরুত্ব দেয়ার কারণ হচ্ছে মির্জা ফখরুলের কাছ থেকে এ ধরনের বক্তব্য আসা খুবই এলারমিং তথা সতর্ক সংকেত। কারণ ইংরেজিতে একটা প্রবাদ আছে- মর্নিং শোজ দ্য ডে অর্থাৎ সকাল দেখলেই দিন চেনা যায়। এটার মূল ভাব হচ্ছে কোনো কাজের শুরু দেখেই বোঝা যায়, তার শেষ বা পরিণতি কেমন হবে।
মাত্র পাঁচ মাসের মন্ত্রিত্বের অভিজ্ঞতায় রাষ্ট্রযন্ত্রে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন দেখতে পাননি বলে মন্তব্য করেছেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। গত ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনের মধ্য দিয়ে সরকার গঠনের পর নিজের আক্ষেপ প্রকাশ করে তিনি বলেন, আগে যারা ঘুষ খেত, তারা এখনো একইভাবে ঘুষ খাওয়ার ফন্দিফিকির করছে। একইভাবে ভালো একটা কাজ আটকে দিচ্ছে। একইভাবে ভোল পাল্টাচ্ছে। ওরাই এখন অনেক বেশি ‘জুলাইযোদ্ধা’ হয়ে গেছে।
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন মির্জা ফখরুল। গত ৩০ জুলাই বৃহস্পতিবার সকালে রাজধানীর সার্কিট হাউস এলাকার তথ্য ভবন মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়। এই আয়োজনে তথ্য অধিদপ্তরের প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়; উদ্বোধন করা হয় আলোকচিত্র প্রদর্শনীর। আলোচনা সভার শুরুতে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদদের স্মরণে এক মিনিট নীরবতা পালনের পাশাপাশি দোয়া ও মোনাজাত করা হয়।
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে মানুষের আত্মত্যাগ এবং পরবর্তী নির্বাচনের মাধ্যমে রাষ্ট্র ও প্রশাসনে কাক্সিক্ষত পরিবর্তন না হওয়ায় আক্ষেপ প্রকাশ করে বিএনপি মহাসচিব বলেন, এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপে বলছি এজন্য, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে। প্রশাসনের পুরোনো সংস্কৃতি বহাল রয়েছে। শুধু সরকার বা রাজনৈতিক নেতৃত্ব নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের মন-মানসিকতার পরিবর্তন প্রয়োজন, অন্যথায় জুলাইয়ের আত্মত্যাগ কাক্সিক্ষত ফলাফল বয়ে আনবে না।
হতাশা ভর করলেও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের প্রচেষ্টায় পরিবর্তন দেখছেন বলে উল্লেখ করেন মির্জা ফখরুল। বিএনপি মহাসচিব বলেন, তিনি আশাবাদী এ কারণে যে, তিনি পরিবর্তন দেখছেন একজন মানুষের মধ্যে, তিনি তারেক রহমান। তিনি চেষ্টা করছেন। তিনি নতুন নতুন নজির স্থাপন করছেন। সেই নজিরকে যদি সবাই মিলে সামনে নিয়ে যাওয়া যায়, তাহলে হয়তো পরিবর্তনটা হবে। সেজন্য সবাই মিলে প্রধানমন্ত্রীকে সমর্থন দেওয়া দরকার।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, প্রধানমন্ত্রী ক্লিন সিটি গড়তে নিজে ডাস্টবিনে ময়লা ফেলতে বলেন। তিনি সিটি করপোরেশনকে পরিচ্ছন্ন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার নির্দেশনা দিয়েছেন। তিনি তরুণদের মধ্যে পরিবর্তনের আশা জাগিয়ে তুলছেন। মন-মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে না পারলে দেশকে এগিয়ে নেওয়া কষ্টকর বলেও মন্তব্য করেন মন্ত্রী। জুলাই অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নে গত ৫ মাসে দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন হয়নি। শুধু প্রধানমন্ত্রী দেশ ও সমাজ গড়তে পরিবর্তনকে ধারণ করে চলছেন।
তিনি আরও বলেন, অনেকেই যারা ঘুষ খেতেন, দুর্নীতি করতেন ও সুযোগের ব্যবহার করতেন, তারা ফ্যাসিস্ট থেকে ভোল পাল্টে জুলাইয়ের পরিবর্তনে এসে সুবিধা নিচ্ছেন। এসবই দুঃখজনক। এসব সংস্কৃতি বদলের চেষ্টা করছেন প্রধানমন্ত্রী।
মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের ইতিহাস মূলত পরিবর্তনের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ থেকে শুরু করে ২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান- প্রতিটি পরিবর্তনের জন্যই মানুষকে প্রাণ দিতে হয়েছে। তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা জুলাই গণঅভ্যুত্থান প্রথমে একটি নির্দিষ্ট দাবিকে কেন্দ্র করে শুরু হয়েছিল। পরে তা রাষ্ট্র ও সমাজ পরিবর্তনের আন্দোলনে রূপ নেয়। সে অভ্যুত্থানে বহু তরুণ প্রাণ হারিয়েছেন। অসংখ্য পরিবার সন্তান হারানোর বেদনা বয়ে বেড়াচ্ছে। এই আত্মত্যাগের মূল্য তখনই সার্থক হবে, যখন রাষ্ট্র ও সমাজে প্রকৃত পরিবর্তন প্রতিষ্ঠিত হবে।
রাজনৈতিক নেতৃত্বের মাধ্যমে পরিবর্তনের কিছু উদ্যোগ দেখা যাচ্ছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, সেই প্রচেষ্টাকে সফল করতে সবাইকে সহযোগিতা করতে হবে।
মির্জা ফখরুল একটি গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক, মেধাভিত্তিক ও তরুণবান্ধব বাংলাদেশ গড়ে তোলার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, জুলাইয়ের চেতনার প্রতি প্রকৃত শ্রদ্ধা হবে এমন একটি রাষ্ট্র গঠন করা, যেখানে মানুষের আত্মত্যাগ বৃথা যাবে না। কাক্সিক্ষত পরিবর্তন বাস্তবে রূপ নেবে।
বিএনপি মহাসচিব বলেন, ‘পরিবর্তনটা আসলে করতে হবে। দুর্ভাগ্য আমাদের যে, স্বাধীনতার ৫৫ বছর হয়ে গেছে, চীনের স্বাধীনতাও প্রায় একই কাছাকাছি সমযয়ে। কাছের যে সিঙ্গাপুর, তারও প্রায় একই সময়ে। তাদের অর্থনৈতিক উন্নয়ন, জীবন-জীবিকা কোথায় চলে গেছে; আর আমরা এখনো এখানে পড়ে আছি।’
মির্জা ফখরুল খুব আক্ষেপ করে মন থেকেই এসব কথা বলেছেন। বাংলার এ ভূমিতে ছাত্র-জনতা বারবার রক্ত দিচ্ছে, জীবন দিচ্ছে, সরকার পরিবর্তন হচ্ছে, নতুন নতুন নেতারা মন্ত্রী এমপি হচ্ছে, নতুন প্রধানমন্ত্রী হচ্ছেন, কিন্তু রাষ্ট্র সরকার প্রশাসনে কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসন আগের মতোই থাকছে, ঘুষ-দুর্নীতি আগের মতোই চলছে। সাধারণ জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না। তিনি আক্ষেপ করে কথা বলেছেন, কিন্তু কারণ বলেননি এবং সমস্যার সমাধান কীভাবে, তাও বলেননি। মনে হচ্ছে তিনি মনের গভীর থেকে অনেক কষ্টে খুবই খোলামেলাভাবে প্রকৃত চিত্র বলেছেন।
বাংলাদেশ একটি বৃহৎ রাষ্ট্র, যার জনসংখ্যা প্রায় ১৮ কোটি। ইউরোপের ৩৫টি দেশের চেয়েও বাংলাদেশের জনসংখ্যা বেশি। এত বড় একটি রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হলে অবাস্তব দর্শন ও চিন্তা এবং পুরোনো ও সেকেলে আইন ও বিধিবিধান দিয়ে সম্ভব হবে না। শুধু এটা নয়, বাংলাদেশের মতো এত বড় একটি রাষ্ট্র যার কোনো নির্দিষ্ট চিন্তা ও দর্শন নেই, গণমানুষের চিন্তা ও বিশ্বাসের সাথে সমন্বিত কোনো দর্শন বা আদর্শ নেই। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের শুরুতেই তার যথাযথ কোনো দর্শন নির্ধারণ করা হয়নি। শুরুতেই যে চার মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেগুলো একটির সাথে আরেকটি ছিল বিপরিতমুখী। বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের প্রথম যে চার মূলনীতি নির্ধারণ করা হয়েছিল, সেগুলো হচ্ছে জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা। এ চার মূলনীতি ছিল পরস্পরবিরোধী। যেমনÑ সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র হচ্ছে বিপরিতমুখী আদর্শ। যেসব দেশে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেসব দেশে গণতন্ত্রচর্চা ও প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব হয়নি। অপরদিকে বাংলাদেশ হচ্ছে ৯০ শতাংশ মুসলিমের দেশ, এমন একটি দেশে ধর্মনিরপেক্ষতা সাধারণ জনগণের চিন্তার সাথে সামঞ্জস্য নয়, তাই জনগণ তা মেনে নিতে পারেনি। তাই বিগত ৫৫ বছরে এ চার মূলনীতি বারবার পরিবর্তন হয়েছে। বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে সংবিধানের যেমন ষোলোবার সংশোধন করা হয়েছে, তেমনিভাবে চার মূলনীতিরও পরিবর্তন করে আবার আগের জায়গায় ফিরিয়ে নেয়া হয়েছে। যেমন, জাতীয়তাবাদ প্রথম করা হয়েছিল বাঙালি জাতীয়তাবাদ, তারপর পরিবর্তন করে করা হয়েছিল বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ। পুনরায় বাঙালি জাতীয়তাবাদ করা হয়। আওয়ামী লীগ ১৯৭২ সালে প্রথম মূলনীতিতে সমাজতন্ত্র সংযোজন করেছিল, কিন্তু তাদের মেনিফেস্টোতে কোনো সময়ই সমাজতন্ত্র ছিল না। কিন্তু পাকিস্তান ভেঙে যখন বাংলাদেশ নতুন রাষ্ট্র হলো আওয়ামী লীগ জনমতকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে সংবিধানের চার মূলনীতিতে সমাজতন্ত্র সংযোজন করে। ১৯৭৫ সালে এক রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের পর জিয়াউর রহমান ক্ষমতায় এসে ধর্মনিরপেক্ষ ধারাটি পুরো বাতিল করে দিয়ে ‘সর্বশক্তিমান আল্লাহর ওপর পূর্ণ আস্থা ও বিশ্বাস’ এটি সংযোজন করেন আর সমাজতন্ত্রের একটি নতুন ব্যাখ্যা সংযোজন করেন, তা হচ্ছে ‘সমাজতন্ত্র অর্থাৎ অর্র্থনৈতিক ও সামাজিক সুবিচার’।
বাংলাদেশের সংবিধানের এই যে চারটি মূলনীতি রয়েছে, তাকে বলা হচ্ছে বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রটির মূল দর্শন ও বিশ্বাস। কিন্তু এ চার মূলনীতির ভিত্তিতে যে দর্শন নির্ধারণ করা হয়েছে, তা বাংলাদেশের জনগণের চিন্তা ও বিশ্বাসের সাথে সমন্বিত নয়, বরং বিপরীত। অবশ্য তারপরও বিগত ৫৪ বছর ধরে এ চার মূলনীতির ভিত্তিতেই দেশ পরিচালিত হয়ে আসছে।
একটি রাষ্ট্রের নেতৃত্বস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ থেকে শুরু করে সরকার, প্রশাসন, আইন, বিচার, শিল্প, সাহিত্য, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বস্তরের জনগণের চিন্তা-বিশ্বাস গঠিত হয়ে থাকে একটি দর্শন থেকে। আর প্রতিটি দর্শন থেকেই একটি নৈতিক মূল্যবোধ তৈরি হয়ে থাকে। একটি দর্শনের ভিত্তিতে গঠিত নৈতিক মূল্যবোধ দিয়ে রাষ্ট্র, সরকার, প্রশাসন, আইন, বিচার, গণমাধ্যম থেকে শুরু করে সাধারণ জনগণ তৈরি হয় ও পরিচালিত হয়। বাংলাদেশের বর্তমানে চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে যে দর্শন তাকে অনুসরণ করেই সব আইনকানুন বিধিমালা তৈরি হচ্ছে। তার ওপর ভিত্তি করেই বিগত ৫৫ বছর রাষ্ট্র, সরকার, সংসদ, বিচার বিভাগ, প্রশাসন সবকিছুই চলছে।
কিন্তু পরিণামে আমরা কী পাচ্ছি, আমরা কি বর্তমান যে চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে চলছি, তাতে কি আমরা ভালো সুফল পাচ্ছি? মির্জা ফখরুল ইসলামের বক্তব্য অনুযায়ী আমরা তা পাচ্ছি না। তিনি বলেছেন, পাঁচ মাসে ঘুষ দুর্নীতির কিছুই বদলায়নি। তিনি বলেছেন, শুধু সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বই নয়, সমাজের প্রতিটি মানুষের মন-মানসিকতায় পরিবর্তন করতে হবে। এটা তিনি সঠিকই বলেছেন, রাজনৈতিক নেতৃত্ব থেকে শুরু করে সরকার ও সর্বস্তরের জনগণের মন-মানসিকতায় পরিবর্তন আনতে হবে। তাহলে এ পরিবর্তনটা কীভাবে এবং কোন দর্শনের ওপর ভিত্তি করে আনতে হবে তা কিন্তু তিনি বলেননি। অবশ্য তিনি বাংলাদেশের বর্তমান চার মূলনীতির ওপর ভিত্তি করে যে দর্শন, সেটার কথাই চিন্তা করনে এবং করাটাই স্বাভাবিক। কারণ উনি ও উনার দল বর্তমান সংবিধান ও রাষ্ট্রীয় দর্শনের পরিবর্তনের পক্ষে নয় বলে জানা গেছে।
তবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রটি যে দর্শন ও মূলনীতিতে বিশ্বাস করে চলছে, তার ওপর নির্ভর করে নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব ও প্রশাসক গড়ে তোলা সম্ভব নয়, তা বিগত সাড়ে পাঁচ দশকে প্রমাণিত হয়েছে।
ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক আদর্শ দিয়ে যে নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব ও প্রশাসক গড়ে তোলা যায় না, তার প্রমাণ পাওয়া গেছে বিগত শতকের সোভিয়েত ইউনিয়ন, রাশিয়া আর বর্তমান শতকের নয়া চীনে। রাশিয়া ধর্মকে বাদ দিয়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমাজ প্রতিষ্ঠার কোশেশ করেছিল, কিন্তু ব্যর্থ হয়েছে। সাত দশক ধরে চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়ে ধর্মহীন ও সমাজতান্ত্রিক দর্শন থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
অপরদিকে চীনও ধর্মহীন সমাজতান্ত্রিক আদর্শ ও দর্শন ধারণ করে চলছে। আর্থিক দিয়ে কিছুটা উন্নতি করলেও নৈতিক দিক থেকে পিছিয়ে পড়েছে। চীনেও রাষ্ট্র, সরকার ও পার্টি দুর্নীতিতে নিমজ্জিত।
গত ৯ জুলাই বিবিসি এক রিপোর্টে জানিয়েছে, চীনে ৩০ বছর ধরে ২২০ কোটি ইউয়ানের বেশি (৩২ কোটি ৫০ লাখ মার্কিন ডলার বা টাকার অঙ্কে ৩,৯৯৯ কোটি ৪৫ লাখ) ঘুষ নেওয়ার অপরাধে সাবেক এক নগর কর্মকর্তাকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছেন দেশটির একটি আদালত।
বিপুল অঙ্কের ঘুষ নিয়ে মৃত্যুদণ্ড পাওয়া এই ব্যক্তির নাম ইয়াং ইউলিন। তিনি ১৯৯৩ থেকে ২০২৩ সাল পর্যন্ত নানজিং শহরের বিভিন্ন সরকারি পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। দায়িত্বে থাকা অবস্থায় অর্থ আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার ও অর্থ পাচারের অপরাধে আদালত তাঁকে দোষী সাব্যস্ত করেছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোয় দেশটিতে তিনিই সবচেয়ে বেশি অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। তাঁর বয়স এখন ৬৯ বছর।
চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানিয়েছে, ইয়াং ইউলিন নিজের পদমর্যাদার অপব্যবহারের মাধ্যমে প্রকৌশল প্রকল্পের চুক্তি, জমি হস্তান্তর ও অর্থায়নের ব্যবস্থা করে দেওয়ার বিনিময়ে অর্থ ও মূল্যবান সামগ্রী গ্রহণ করতেন।
প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের অংশ হিসেবে ইয়াংয়ের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু হয়। চীনে সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যাংকিং খাতের শীর্ষ পর্যায়ে কাজ করা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধেও দুর্নীতিবিরোধী অভিযান চলছে। এরই ধারাবাহিকতায় দেশটির সর্বোচ্চ আইনসভা ‘ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেস’ (এনপিসি) থেকে পিপলস লিবারেশন আর্মির (পিএলএ) ৬ জন শীর্ষ জেনারেলসহ মোট ১৩ জন সদস্যকে বহিষ্কার করা হয়েছে। উপরোল্লিখিত রিপোর্টগুলো দিয়ে প্রমাণিত যে, বস্তুবাদী আদর্শ ও দর্শন দিয়ে দেশের আর্থিক উন্নয়ন হলেও নৈতিক চরিত্র শুদ্ধ হতে পারে না।
এককথায় বলতে হয়, রাষ্ট্র, সরকার ও প্রশাসনে পরিবর্তন আনতে চান, তাহলে চিন্তা, বিশ্বাস ও দর্শন বদলাতে হবে। ধর্মনিরপেক্ষতা ও সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও বিশ্বাস দিয়ে নৈতিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না। শুধু প্রচলিত পদ্ধতি ও বিধান দিয়ে পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। সরকার ও প্রশাসন চালাতে একটি রুলস অব বিজনেস আছে। বস্তুবাদী চিন্তা ও দর্শন দিয়ে প্রণীত সংবিধান, সংবিধানের মূলনীতি ও রুলস অব বিজনেস দিয়ে পরিচালিত সরকার ও প্রশাসন দিয়ে নৈতিকতাসম্পন্ন নেতৃত্ব ও প্রশাসক যেমন তৈরি হতে পারে না। তাই এ ধরনের সরকার ও প্রশাসন থাকলে ঘুষ-দুর্নীতিও বন্ধ করা যাবে না। তাই ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ করতে হলে বদলাতে হবে রাষ্ট্রের দর্শন ও মূলনীতি। বদল করে ইসলামী আদর্শ ও দর্শনের ভিত্তিতে সংবিধান ও রুলস বিধান প্রণয়ন করে সরকার ও প্রশাসন চালাতে পারলেই ঘুষ ও দুর্নীতি বন্ধ হতে পারে। বাংলাদেশের বর্তমান সরকার ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের শুভবুদ্ধির উদয় হোক- এ কামনা করি।

লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com

Your Guide to Online Casino Aussie Available in Australia
৭ আগস্ট ২০২৬ ০২:৫৪

Sports Betting Sites No ID Verification: Everything You Need to Know
৬ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৭

Top Visa Casino: Ein Expertenleitfaden
৬ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৭

Online Casino mit Paypal ohne Verifizierung
৬ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৭

Curacao Online Casinos Without Gamstop: A Comprehensive Guide
৬ আগস্ট ২০২৬ ২০:৫৭

The Real Deal on the Pokie Spin: What Every Aussie Punter Needs to Know
৬ আগস্ট ২০২৬ ১৭:৪৭