যেভাবে পালিয়েছিল ফ্যাসিস্ট হাসিনা
৬ আগস্ট ২০২৬ ১০:০০
সোনার বাংলা ডেস্ক : দেশব্যাপী ছাত্র-জনতার উত্তাল আন্দোলনের মুখে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ক্ষমতা ছেড়ে পালিয়ে যান ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা। বিশ্বের কোনো দেশ তাকে আশ্রয় দিতে রাজি না হওয়ায় শেষ পর্যন্ত আশ্রয় নেন ভারতের দিল্লিতে। তবে তার পদত্যাগ ও পালানোর সিদ্ধান্তটি কোনো হঠাৎ করেই আসেনি। গণআন্দোলনের মুখে ৫ আগস্টের আগে কয়েকদিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতরে দ্রুত বদলে যেতে থাকে পরিস্থিতি।
নিরাপত্তা বাহিনীর অবস্থান পরিবর্তন, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ আলোচনা এবং শেষ মুহূর্তে সামরিক নেতৃত্বের পরিস্থিতি মূল্যায়ন সব মিলিয়ে ঘণ্টায় ঘণ্টায় পাল্টেছে সিদ্ধান্তের হিসেব। চব্বিশের ৩ আগস্ট সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান সেনা সদরে দরবারে মিলিত হন। সেখানে সেনাবাহিনীর অবস্থান স্পষ্ট হয়। এরপরও ৪ আগস্ট গভীর রাত পর্যন্ত গণভবনে একের পর এক বৈঠক হয়। একই সময়ে চলতে থাকে পদত্যাগ, জরুরি অবস্থা জারি এবং আন্দোলন দমনের বিভিন্ন বিকল্প নিয়ে আলোচনা। কিন্তু প্রতিটি ঘণ্টার সাথে মাঠের পরিস্থিতি আরও দ্রুত সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। শেষ পর্যন্ত ৫ আগস্ট সকালে সামরিক কর্মকর্তাদের বার্তা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে বাস্তব মূল্যায়ন এবং ঢাকামুখী জনস্রোতের প্রেক্ষাপটে শেখ হাসিনা পালিয়ে দেশ ছাড়েন।
এর আগে গণভবন, সেনা সদর ও বিভিন্ন নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে কী আলোচনা হয়েছে, কোন সিদ্ধান্ত কেন বদলেছে এবং কীভাবে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার দেশত্যাগের পথ তৈরি হয়; সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের সাথে কথা বলে সেসব ঘটনাপ্রবাহের একটা চিত্র পাওয়া গেছে।
২০২৪ সালের ১ জুলাই থেকে শান্তিপূর্ণভাবে ছাত্রদের আন্দোলন বেগবান হতে থাকে। কিন্তু সরকারের বলপ্রয়োগ, নির্বিচার গুলি ও মানুষ হত্যার কারণে দিন দিন পরিস্থিতি উত্তাল হতে থাকে। যুক্ত হতে থাকে নানা শ্রেণি-পেশাসহ সাধারণ মানুষ। এমন পরিস্থিতিতে সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ে ৩ আগস্ট দরবার ডেকেছিলেন সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান। ওই বৈঠকের পরই শেখ হাসিনার পায়ের নিচের মাটি আলগা হতে থাকে। পরের দুই দিনের ঘটনাবলি কেবল তাঁর বিদায়টা কেমন হবে, তা নির্ধারণ করে দেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৩ আগস্ট সেনা সদরের বৈঠকে কর্মকর্তাদের বক্তব্যে এমন অবস্থান প্রকাশ পায় যে তারা জনগণের বুকে গুলি চালাবে না। কারণ সেনাবাহিনীর অস্ত্র এতটাই প্রাণঘাতী যে তা বেসামরিক জনগণের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা যায় না। সেনাবাহিনীর এপিসিগুলোয় ১৪ দশমিক ৫ ক্যালিবারের গুলি থাকে। একটি গুলিতেই পাঁচ থেকে সাতজনের প্রাণ চলে যেতে পারে।
তখন সাধারণ মানুষ রাজপথে এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জাতির চরম সংকটে সেনাবাহিনীকে এগিয়ে আসার আহ্বানও জানাতে থাকে। অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তারাও আন্দোলনে সংহতি জানিয়ে রাস্তায় নামেন। এমন বাস্তবতায় সেনাবাহিনী জনগণের বিরুদ্ধে না দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, সামরিক নেতৃত্ব ৪ আগস্ট রাতেই বুঝতে পারেন, শেখ হাসিনার সরকার টিকছে না। এরপরও টিকে থাকার শেষ চেষ্টা চালিয়ে যান শেখ হাসিনা। অনেক রাত পর্যন্ত গণভবনে বৈঠক চলছিল। সেখানে দলীয় মন্ত্রী, নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অনেকে ছিলেন। একেকজন একেকটি পরামর্শ দিচ্ছিলেন কীভাবে আন্দোলন দমন করা যায়।
সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রমতে, ৪ আগস্ট রাতে একপর্যায়ে সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান শেখ হাসিনার সাথে আলাদা করে কথা বলেন, শেখ রেহানা ছিলেন তখন। সেনাপ্রধানের বক্তব্য ছিল অনেকটা এমন স্যার, আপনার হাতে আর সময় নেই।’ তিনি শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে বসে সমাধানের পথ খোঁজার পরামর্শও দিয়েছিলেন।
৫ আগস্ট সকাল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, শাহবাগ, সায়েন্সল্যাব, যাত্রাবাড়ী, উত্তরা, মিরপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় মানুষ জড়ো হতে শুরু করেন।
অপরদিকে নিরাপত্তা বাহিনী গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা; বিশেষ করে গণভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় ও সংসদ ভবনের আশপাশে অবস্থান নেয়।
৫ আগস্ট সকাল ১০টায় আবার সেনাপ্রধানকে ডাকেন শেখ হাসিনা। সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, সেনাপ্রধান যখন গণভবনে যান, তখন শেখ হাসিনা ছিলেন বিমর্ষ। তার হাতে ছিল নিজের লেখা পদত্যাগপত্র। শেখ হাসিনার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত জেনে সেনাপ্রধান সেনা সদরে ফিরে যান। সরকার পতনের পর দেশে বিরাট অরাজকতা হওয়ার আশঙ্কা ছিল। তিনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেন।
সেনা সদর-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট ভোরে ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক হামিদুল হককে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে যোগাযোগ করতে বলেছিলেন সেনাপ্রধানÑ যাতে সকালে সেনা সদরে বৈঠকে দলগুলোর নেতারা আসেন। যদিও সব নেতাকে নিয়ে ওই বৈঠক শুরু হয় দুপুরের পর।
বেলা ১১টা থেকে দুপুর ১টার দিকে খবর পরিস্থিতি সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে এমন মূল্যায়নের খবর বিভিন্ন সংবাদসূত্রে প্রকাশিত হয়। নিরাপত্তা বাহিনীর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা শেখ হাসিনাকে জানান যে, তাঁর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়ছে এবং পরিস্থিতি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। কিছু প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, অতিরিক্ত শক্তি প্রয়োগ করলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে। এসব তথ্য পরবর্তী সংবাদভিত্তিক বর্ণনা; এ বিষয়ে সব পক্ষের অভিন্ন বক্তব্য নেই।
গণভবনকেন্দ্রিক একাধিক সূত্র থেকে জানা যায়, পদত্যাগের পর কী করবেন, সেটি পরিষ্কার করেননি শেখ হাসিনা। এ বিষয়ে সেনাপ্রধানও তাঁর সাথে বিস্তারিত আলোচনা করেননি। সেনাপ্রধানের গণভবনে আসা ও চলে যাওয়ার আগে-পরে শেখ হাসিনা ভারত সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে ফোনে কথা বলেন।
দুপুর ১টা থেকে ২টার দিকে বিভিন্ন সূত্র অনুযায়ী খবর পাওয়া যায়, শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন। তিনি তাঁর বোন শেখ রেহানাকে সাথে নিয়ে গণভবন ত্যাগ করেন।
বেলা ২টা ২৫ মিনিটের দিকে শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে গণভবনের পেছনের দিকে অবস্থিত পুরোনো বাণিজ্যমেলা মাঠে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ওঠেন। হেলিকপ্টারটি বিমানবাহিনীর কুর্মিটোলা ঘাঁটিতে যায়।
সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ একটি সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট (২০২৪) দুপুরের পর সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান গণভবন ত্যাগ করে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে সেনানিবাসে বৈঠক করছিলেন। এমন সময় সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের তৎকালীন মহাপরিচালক মেজর জেনারেল হামিদুল হক সেনাপ্রধানকে জানান যে, শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ছেন। ওই সময় তাকে বহনকারী বিমান রানওয়েতে ছিল। তখন সেনাপ্রধান শেখ হাসিনাকে ফোন করেন, কিন্তু কথা শোনা যায়নি। বিমান উড্ডয়ন করে ভারতের উদ্দেশে যাত্রা শুরু করে।
তবে আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্ট নেতারা মনে করেন, শেখ হাসিনা দেশ না ছাড়লে ক্ষুব্ধ জনতার হাতে তিনি মারা পড়তেন। এমনকি তিনি সেনানিবাসে অবস্থানও নিরাপদ মনে করেননি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ৫ আগস্ট সকাল থেকে উত্তরা, যাত্রাবাড়ী ও সাভার এলাকা থেকে ঢাকার অভিমুখে ছাত্র-জনতার ঢল নামে। সব মিছিলের লক্ষ্য গণভবন। সকালের দিকে শেখ হাসিনার দেশত্যাগের প্রস্তুতি শুরু হয়। তখন ব্যক্তিগত সামগ্রী নিয়ে দ্রুত বের হওয়ার প্রস্তুতি নেন শেখ হাসিনা। অবস্থা এমন ছিল যে রান্না করা খাবারও খেতে পারেননি। দুপুর ২টা ২৫ মিনিটে শেখ হাসিনা ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে গণভবনের পেছনের দিকে অবস্থিত পুরোনো বাণিজ্যমেলা মাঠে বিমানবাহিনীর একটি হেলিকপ্টারে করে ওঠেন। হেলিকপ্টারটি বিমানবাহিনীর কুর্মিটোলা ঘাঁটিতে যায়। সেখানে নেমে শেখ হাসিনা লাউঞ্জে এক ঘণ্টার বেশি অপেক্ষা করেন। এর মধ্যে বিমানবাহিনীর পরিবহন বিমান প্রস্তুত করা হয়। হেলিকপ্টার থেকে নেমে লাউঞ্জে যাওয়ার মুহূর্তের ছবি ও ভিডিও পরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।
বিকাল ৩টার পর শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি (সি-১৩০) আকাশে ওড়ে। তাঁর সাথে শেখ রেহানা ছাড়াও তাঁর প্রতিরক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা তারেক সিদ্দিকও ছিলেন। শেখ হাসিনার সামরিক সচিবও যান, তবে তিনি ওই বিমানে ফিরে আসেন। তারেক সিদ্দিকের মেয়ে এবং জামাতাও সঙ্গে ছিলেন বলে অসমর্থিত এক সূত্রে জানা গেছে।
শেখ হাসিনাকে বহনকারী বিমানটি নয়াদিল্লির কাছে গাজিয়াবাদে ভারতীয় বিমানবাহিনীর হিন্দন ঘাঁটিতে স্থানীয় সময় বিকেল ৫টা ৩৬ মিনিটে অবতরণ করে। সেখানে ভারতের জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা অজিত দোভাল শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানান বলে তখন দেশটির গণমাধ্যমে খবর প্রকাশিত হয়।