আসছে স্থানীয় সরকার নির্বাচনে ক্ষমতার সমীকরণ

নির্ধারিত হবে ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতি


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:৩২

॥ ফারাহ মাসুম ॥
২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থান এবং ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যে অভূতপূর্ব রূপান্তর ঘটেছে, তার পরবর্তী প্রধান পরীক্ষাস্থল হিসেবে আবির্ভূত হতে যাচ্ছে আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দীর্ঘসময় ধরে প্রশাসনিক কর্মকর্তাদের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত সিটি করপোরেশন, জেলা পরিষদ, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদগুলোয় নতুন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি বসানোর এই প্রক্রিয়া কেবল স্থানীয় পরিষেবা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নয়; এটি জাতীয় রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য ও দলীয় কৌশল নির্ধারণের এক নতুন ময়দান।
জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করার পর থেকেই স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে রাজনীতিতে তৈরি হয়েছে বহুমুখী মেরুকরণ। প্রধান রাজনৈতিক দলসমূহ- ক্ষমতাসীন বিএনপি, সংসদে বিরোধীদলের ভূমিকায় থাকা জামায়াতে ইসলামী, গণঅভ্যুত্থানের তারুণ্যের প্রতিনিধিত্বকারী জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এবং রাজনীতিতে কার্যত কোণঠাসা কিন্তু তৃণমূল ভিত্তি ধরে রাখতে মরিয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এই নির্বাচনকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ভিন্ন উদ্দেশ্যে এবং ভিন্ন কৌশলে গ্রহণ করছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচনের গুরুত্ব ও প্রভাব : বাংলাদেশের রাজনীতিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সবসময়ই জাতীয় রাজনীতির ছায়া হিসেবে কাজ করেছে, তবে বর্তমান পটভূমিতে এর প্রভাব বহুমাত্রিক।
তৃণমূল শক্তিমত্তা ও নিয়ন্ত্রণের প্রশ্ন : ক্ষমতা হস্তান্তরের পর কেন্দ্রীয় রাজনীতি বদলে গেলেও গ্রামের প্রান্তিক অঞ্চল পর্যন্ত ক্ষমতার চেইন অব কমান্ড কার্যকর করতে ক্ষমতাসীন দলের জন্য স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সহায়তা অপরিহার্য। বিএনপি স্থানীয় সরকার দখল করে তাদের রাজনৈতিক মূল ভিত্তি ও স্থানীয় প্রভাব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে চাচ্ছে।
ক্ষমতার ভারসাম্য ও চেকস অ্যান্ড ব্যালেন্স : জাতীয় সংসদে বিএনপির একক আধিপত্য বা নিরঙ্কুশ নিয়ন্ত্রণের পটভূমিতে স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিরোধী শক্তিগুলোর জন্য ক্ষমতার একটি বিকল্প কেন্দ্র তৈরির পথ উন্মুক্ত করে। জামায়াত ও এনসিপির জন্য এই নির্বাচন জাতীয় পর্যায়ের শক্তিশালী বিরোধী ভূমিকা প্রকাশের সুযোগ তৈরি করবে।
তৃণমূল নেটওয়ার্ক ও সম্পদ বণ্টন : গ্রামীণ ও নগর উন্নয়ন, সামাজিক নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং সরকারি সম্পদ বণ্টনে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ভূমিকা অপরিসীম। এই নির্বাচন নির্ধারণ করবে স্থানীয় পর্যায়ে উন্নয়নমূলক সম্পদ কার হাত ধরে বণ্টন হবে এবং তা আগামী দিনের স্থানীয় নির্বাচনী সমীকরণকে কীভাবে প্রভাবিত করবে।
প্রধান দলগুলোর রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও কৌশল
স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে প্রধান রাজনৈতিক দলগুলো ভিন্ন ভিন্ন কৌশল গ্রহণ করছে। বিএনপি জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যকে তৃণমূল পর্যায়ে সম্প্রসারণ করে স্থানীয় সরকারে সাংগঠনিক ও জনপ্রতিনিধিত্বমূলক ভিত্তি শক্তিশালী করতে চায়। বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী নির্দলীয়, অবাধ ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, প্রশাসনিক নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচনী বিধিমালার সংস্কারের ওপর জোর দিচ্ছে। অন্যদিকে জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ও অন্যান্য বিরোধীদল স্থানীয় সরকারে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রশাসনের রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছে। সামগ্রিকভাবে স্থানীয় সরকার নির্বাচন এখন শুধু জনপ্রতিনিধি নির্বাচনের বিষয় নয়; বরং তৃণমূলে রাজনৈতিক প্রভাব, সাংগঠনিক শক্তি এবং ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির ভিত্তি তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিএনপি : আধিপত্য ধরে রাখা ও তৃণমূল দখলের সমীকরণ: জাতীয় নির্বাচনে বড় সাফল্যের পর বিএনপির সামনে এখন সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ স্থানীয় সরকার নির্বাচন। দলটি ইউনিয়ন পরিষদ, উপজেলা, পৌরসভা, সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদসহ স্থানীয় সরকারের প্রতিটি স্তরে নিজেদের সাংগঠনিক প্রভাবকে জনপ্রতিনিধিত্বে রূপ দিতে চায়। বিএনপির কৌশল হলো সংসদীয় নির্বাচনের সাফল্যের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে তৃণমূলের শক্তিশালী সংগঠনকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্বের মাধ্যমে আরও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দেওয়া।
তবে এই লক্ষ্য বাস্তবায়নের পথে রাজনৈতিক বিতর্কও রয়েছে। সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে ১১টি সিটি করপোরেশন ও ৪২টি জেলা পরিষদে প্রশাসক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বিরোধীদলগুলো সমালোচনা করেছে। তাদের অভিযোগ, এসব নিয়োগের মাধ্যমে স্থানীয় সরকারে দলীয় প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা হচ্ছে। অন্যদিকে বিএনপি বলছে, প্রশাসক নিয়োগের পরিবর্তে দ্রুত নির্বাচন আয়োজন করে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত করাই গণতান্ত্রিক ও গ্রহণযোগ্য সমাধান।
একইসঙ্গে বিএনপির সামনে রয়েছে অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জও। দীর্ঘদিন আন্দোলন-সংগ্রামে সক্রিয় থাকা তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে মনোনয়ন প্রত্যাশা ব্যাপক। ফলে প্রার্থী বাছাইকে ঘিরে স্থানীয় পর্যায়ে প্রতিযোগিতা, অসন্তোষ ও কোন্দল সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সময়মতো এসব বিরোধ নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে বিদ্রোহী বা স্বতন্ত্র প্রার্থীর সংখ্যা বাড়তে পারে, যা দলের নির্বাচনী ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সাংগঠনিক ঐক্য বজায় রাখা এবং গ্রহণযোগ্য প্রার্থী নির্বাচন বিএনপির জন্য গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
জামায়াতে ইসলামী : প্রধান বিরোধী শক্তি হিসেবে উত্থানের ভিত্তিপ্রস্তর: আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচনের জন্য প্রস্তাবিত বিধিমালায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনী চেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। নির্বাচন কমিশনের কাছে দেওয়া প্রস্তাবে দলটি ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) সংরক্ষিত নারী সদস্যপদ বিলুপ্ত করে প্রতিটি ওয়ার্ডে নারীদের সরাসরি ভোটের মাধ্যমে প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে। একইসঙ্গে সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ বা কার্যক্রম স্থগিত হওয়া রাজনৈতিক দলের পদধারী ও সক্রিয় নেতা-কর্মীদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের অযোগ্য ঘোষণার বিধান সংযোজনের দাবি জানিয়েছে।
জামায়াতের অন্যান্য প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে নির্বাচনী প্রচারণায় টেলিভিশন, ভিসিআর, এলইডি ডিসপ্লে, প্রজেক্টর ও ল্যাপটপসহ ডিজিটাল উপকরণ ব্যবহারের বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন। এছাড়া মন্ত্রী ও সংসদ সদস্যদের নির্বাচনী প্রচারণায় অংশগ্রহণ স্পষ্টভাবে নিষিদ্ধ করা, গণমাধ্যমকর্মীদের ভোটকেন্দ্রে অবাধ প্রবেশ নিশ্চিত করা এবং নির্বাচন কমিশন কর্তৃক প্রার্থিতা বাতিল হলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীর আপিলের সুযোগ রাখার দাবিও জানিয়েছে দলটি।
প্রস্তাবে আরও বলা হয়েছে, স্থানীয় সরকার বা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী কোনো ব্যক্তি সংশ্লিষ্ট নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারবেন না- এমন বিধান যুক্ত করা প্রয়োজন।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, স্থানীয় সরকার নির্বাচন আয়োজন সম্পূর্ণ সরকারের সদিচ্ছার ওপর নির্ভর করছে। তার বক্তব্য, গত কয়েক মাসে সরকারের বক্তব্য ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে মিল পাওয়া যায়নি। তবে দলটি একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন চায়, যা দেশের জনগণেরও প্রত্যাশা।
তিনি আরও বলেন, যেহেতু স্থানীয় সরকার নির্বাচন দলীয় প্রতীকে অনুষ্ঠিত হবে না এবং এ-সংক্রান্ত আইন ইতোমধ্যে পাস হয়েছে, তাই এটি ভিন্ন চরিত্রের নির্বাচন হবে। স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতার ভিত্তিতে একক প্রার্থী হতে পারেন, তবে কেন্দ্রীয়ভাবে কোনো রাজনৈতিক দলের প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকবে না বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
এনসিপি : তরুণ রাজনীতির প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি গড়ার পরীক্ষা: ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় আত্মপ্রকাশ করা জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) স্থানীয় সরকার নির্বাচনকে নিজেদের সাংগঠনিক ভিত্তি সম্প্রসারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ হিসেবে দেখছে। জাতীয় নির্বাচনে সীমিত আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং জামায়াতের সঙ্গে সমঝোতার অভিজ্ঞতা থাকলেও, স্থানীয় নির্বাচনে দলটি স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও নিজস্ব ব্র্যান্ড প্রতিষ্ঠার দিকেই বেশি গুরুত্ব দিতে পারে। এর লক্ষ্য হবে তৃণমূল পর্যায়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি রাজনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলা এবং তরুণ নেতৃত্বকে স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিত্বের সঙ্গে যুক্ত করা।
এনসিপির কৌশলের কেন্দ্রবিন্দু হতে পারে শিক্ষিত তরুণ, নাগরিক সমাজ, পেশাজীবী ও পরিবর্তনমুখী ভোটারদের একত্র করে পরিচ্ছন্ন ও সংস্কারভিত্তিক রাজনীতির বার্তা পৌঁছে দেওয়া। দলটি স্থানীয় সরকারকে জাতীয় রাজনীতির প্রস্তুতির ক্ষেত্র হিসেবে ব্যবহার করে ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তৈরি করতে চাইবে।
তবে বাস্তব রাজনীতির প্রয়োজনে সব ক্ষেত্রে এককভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা নাও হতে পারে। যেখানে সরকারবিরোধী ভোট বিভক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে বা বৃহত্তর রাজনৈতিক লক্ষ্য অর্জনের প্রয়োজন দেখা দেবে, সেখানে জামায়াত বা অন্যান্য সমমনা দলের সঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে সমঝোতা কিংবা নাগরিক প্যানেল গঠনের সম্ভাবনাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না। তবে এক্ষেত্রে এনসিপির জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে জোটগত সমন্বয় বজায় রেখেও নিজেদের স্বতন্ত্র রাজনৈতিক পরিচয় ও আদর্শিক অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখা।
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ : নিষিদ্ধের শঙ্কা ও অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার লড়াই : ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এবং রাজনৈতিক কার্যক্রমে নানা বিধিনিষেধ ও অনিশ্চয়তার মুখে থাকা আওয়ামী লীগের জন্য স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিছক একটি ভোটযুদ্ধ নয়; বরং এটি সাংগঠনিক অস্তিত্ব ও তৃণমূল ভিত্তি টিকিয়ে রাখার লড়াই। দীর্ঘদিন রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকার ফলে দলটির শক্তি মূলত স্থানীয় পর্যায়ের জনপ্রতিনিধি, সংগঠন ও সমর্থক নেটওয়ার্কের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এই স্তরে প্রভাব হারানো মানে ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়া।
বর্তমান বাস্তবতায় দলীয় প্রতীক বা আনুষ্ঠানিক ব্যানারে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ সীমিত। তাই আওয়ামী লীগ-ঘনিষ্ঠ নেতাকর্মীরা স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বা স্থানীয় সমঝোতার ভিত্তিতে নির্বাচনী মাঠে থাকার কৌশল নিতে পারেন। এর মাধ্যমে দলটি অন্তত তার সাংগঠনিক কাঠামো, ভোটব্যাঙ্ক ও সামাজিক প্রভাব ধরে রাখার চেষ্টা করবে।
একইসঙ্গে স্থানীয় পর্যায়ে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির মধ্যকার প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সৃষ্ট ভোট বিভাজনের সুযোগও আওয়ামী লীগপন্থী প্রার্থীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেখানে বিরোধী শক্তিগুলো একক প্রার্থী দিতে ব্যর্থ হবে, সেখানে ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা ও পুরোনো রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের ভিত্তিতে আওয়ামী-সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থীরা প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করতে পারেন।
তবে রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মামলা, সামাজিক চাপ এবং সাংগঠনিক দুর্বলতা দলটির জন্য বড় বাধা হয়ে থাকবে। ফলে এই নির্বাচন আওয়ামী লীগের জন্য জয়-পরাজয়ের চেয়ে বেশি, রাজনৈতিকভাবে টিকে থাকার সক্ষমতা যাচাইয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষায় পরিণত হতে পারে।
সম্ভাব্য সমীকরণ ও রাজনৈতিক বার্তা
আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন চারটি প্রধান রাজনৈতিক শক্তির জন্য ভিন্ন ভিন্ন রাজনৈতিক বার্তা বহন করছে। বিএনপির মূল লক্ষ্য জাতীয় নির্বাচনের সাফল্যকে তৃণমূলে সুসংহত করা এবং ইউনিয়ন থেকে জেলা পর্যন্ত সাংগঠনিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা। এজন্য তারা সরকারের উন্নয়ন কার্যক্রমের ইতিবাচক ভাবমূর্তি কাজে লাগানোর পাশাপাশি দলীয় শক্তি প্রদর্শনের কৌশল নিতে পারে। তবে দলীয় মনোনয়নকে ঘিরে অন্তর্দ্বন্দ্ব ও বিদ্রোহী প্রার্থীর ঝুঁকি বিএনপির জন্য বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে জামায়াতে ইসলামী নিজেকে দেশের প্রধান বিরোধী রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়। তৃণমূলভিত্তিক সামাজিক সেবা, সংগঠিত নেটওয়ার্ক এবং নীতিনির্ভর প্রচারণার মাধ্যমে তারা নিজেদের গ্রহণযোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করবে। তবে বিএনপির শক্তিশালী সাংগঠনিক উপস্থিতি এবং আওয়ামী লীগের অবশিষ্ট প্রভাব মোকাবিলা তাদের জন্য চ্যালেঞ্জ হবে।
নতুন রাজনৈতিক শক্তি এনসিপি তরুণ নেতৃত্বকে তৃণমূল পর্যায়ে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে একক নাগরিক প্যানেল ও সংস্কারমুখী রাজনীতির ওপর জোর দিতে পারে। কিন্তু সীমিত সাংগঠনিক কাঠামো, অভিজ্ঞতার ঘাটতি এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার অভাব তাদের অগ্রযাত্রাকে কঠিন করে তুলতে পারে।
অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রধান লক্ষ্য হবে তৃণমূলের সাংগঠনিক ভিত্তি ও সমর্থকগোষ্ঠী ধরে রাখা। দলীয় প্রতীক ছাড়া স্বতন্ত্র প্রার্থী বা পরোক্ষ রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণের সম্ভাবনা থাকলেও রাজনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, মামলা এবং সাংগঠনিক চাপ তাদের জন্য সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা হয়ে থাকবে। ফলে এই নির্বাচন শুধু স্থানীয় নেতৃত্ব বাছাই নয়, ভবিষ্যৎ জাতীয় রাজনীতির শক্তির ভারসাম্য নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হয়ে উঠতে পারে।
ভবিষ্যৎ রাজনীতিতে স্থানীয় নির্বাচনের প্রভাব
১. ত্রিমুখী নির্বাচনী লড়াইয়ের সূচনা : এককালের আওয়ামী লীগ-বিএনপিকেন্দ্রিক দ্বিমুখী রাজনীতির পরিবর্তে এই স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপি, জামায়াত ও এনসিপির ত্রিমুখী সংঘাতময় লড়াই দেখা যেতে পারে।
২. জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও গণভোট সংক্রান্ত বার্তা : স্থানীয় নির্বাচনে জয়-পরাজয়ের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে সাধারণ জনগণ নতুন সংস্কার ও জুলাই সনদের প্রতি কতটা আস্থাশীল।
৩. জাতীয় রাজনীতির মেরুকরণ : এই নির্বাচনের ফলাফল আগামী দিনে জাতীয় রাজনীতিতে বিরোধীদলীয় জোটের শক্তি ও সরকারের ওপর তাদের মনস্তাত্ত্বিক চাপ কেমন হবে তা চূড়ান্ত করে দেবে।
বাংলাদেশের রাজনীতি এক জটিল রূপান্তরের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করছে। আসন্ন স্থানীয় সরকার নির্বাচন কেবল নতুন প্রতিনিধি বাছাইয়ের মাধ্যম হবে না; বরং এটি হবে জাতীয় সংসদ পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক শক্তির প্রভাব যাচাইয়ের সবচেয়ে নিরপেক্ষ টেস্ট কেস। বিএনপি চাইবে নিজেদের একচ্ছত্র প্রাধান্য প্রতিষ্ঠা করতে; অপরপক্ষে জামায়াত ও এনসিপি চাইবে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে বিকল্প রাজনীতি তৈরি করতে। এই নির্বাচনের ধরন ও ফলাফলেই লুকিয়ে রয়েছে বাংলাদেশের আগামী বহু বছরের রাজনীতির গতিপথ।