ক্ষোভে উত্তাল দিল্লি : পার্লামেন্ট অচল ও মোদির পদত্যাগ দাবি
২২ জুলাই ২০২৬ ২১:২১
আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের রাজধানী নয়াদিল্লি এখন এক উত্তাল অগ্নিগর্ভে পরিণত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির একচেটিয়া নীতি, ভিন্নমত দমনের চেষ্টা এবং দেশের শিক্ষাব্যবস্থার নজিরবিহীন কেলেঙ্কারির বিরুদ্ধে রাজপথে নেমে এসেছে লাখো শিক্ষার্থী। মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষা (ঘঊঊঞ-টএ)সহ জাতীয় স্তরের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং দুর্নীতির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া এই বিক্ষোভ এখন মোদি সরকারের কথিত ‘ফ্যাসিবাদী’ শাসন এবং তরুণদের কণ্ঠরোধ করার নীতির বিরুদ্ধে এক বিশাল গণপ্রতিরোধে রূপ নিয়েছে।
শিক্ষার্থীদের ওপর এই রাষ্ট্রীয় বর্বরতার প্রতিবাদে ভারতের পার্লামেন্টের বাদল অধিবেশন পরপর দুই দিন ধরে অচল হয়ে পড়েছে। লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধী এবং প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ভদ্রাসহ শীর্ষ কংগ্রেস নেতৃবৃন্দ প্রধানমন্ত্রী মোদির বাসভবন (লোক কল্যাণ মার্গ) অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করেন এবং সেখান থেকে পুলিশ তাদের আটক করে। পরবর্তীতে মুক্তি পেয়ে রাহুল গান্ধী সরাসরি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহের পদত্যাগ দাবি করে বলেন, ‘ভারতের যুবসমাজের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করার দায়ে প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীকে অবশ্যই পদত্যাগ করতে হবে। এই সরকার কোনো জবাবদিহি করতে চায় না এবং পার্লামেন্টে বিতর্ক থেকেও পালাচ্ছে।’ রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দ্রুত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির খতিয়ান দেখালেও কোটি কোটি ভারতীয় তরুণের জন্য মানসম্মত কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে না পারা এবং শিক্ষাবেষ্টনীতে এই মাফিয়াতন্ত্রের জন্ম দেওয়া মোদি সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় হ্যামিলনের বাঁশিওয়ালা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই ছাত্র আন্দোলন মোদি সরকারের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে দুর্বল করার স্বৈরতান্ত্রিক অভ্যাসের দেয়ালে তরুণ প্রজন্মের এক শক্ত আঘাত, যা আগামী দিনগুলোতে তার মসনদের ভিতকে অনেকটাই নাড়িয়ে দিতে পারে।
কারণ ককরোচ জনতা পার্টি’ (সিজেপি) প্রথমে শিক্ষার্থী ও বেকার যুবকদের সংগঠিত করলেও এখন আর আন্দোলন শুধু তাদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। সব দল মতের নির্যাতিত নিপীড়িত মানুষ দলে দলে মোদির ফ্যাসিবাদী অপশাসনের প্রতিবাদ জানাতে দলে দলে রাজপথে নেমে আসছে। তাদের লক্ষ্য দিল্লি। ইতোমধ্যে পাঞ্জাবের কৃষকরা ট্রাক্টর নিয়ে দিল্লির দিকে মার্চ করছে। পশ্চিমবঙ্গে মমতা ব্যানার্জিও মাঠে নেমেছেন। দ্রুত এ আন্দোলন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ছে এবং তীব্র থেকে তীব্র হচ্ছে। পুলিশ আন্দোলনের গাড়ির ওপর গুলি চালিয়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। কিন্তু এতে শিক্ষার্থীরা রাজপথ ছাড়েনি। ভারতের ইতিহাসে এমন তীব্র আন্দোলনের ঘটনা বিরল বলে মন্তব্য করেছেন অনেক বিশ্লেষক।
কবে থেকে জ¦লছে ক্ষোভের আগুন
গত ১৫ মে ২০২৬ (শুক্রবার) সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত এবং বিচারপতি জয়মাল্য বাগচীর সমন্বয়ে গঠিত একটি দ্বিপাক্ষিক বেঞ্চে মামলার শুনানি চলছিল। এ সময় আদালতে আইনজীবীদের আচরণ এবং সোশ্যাল মিডিয়ার ভূমিকা নিয়ে কথা বলার এক পর্যায়ে প্রধান বিচারপতি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ‘ঞযবৎব ধৎব ুড়ঁহমংঃবৎং ষরশব পড়পশৎড়ধপযবং, যিড় ফড়হ’ঃ মবঃ ধহু বসঢ়ষড়ুসবহঃ ড়ৎ যধাব ধহু ঢ়ষধপব রহ ঃযব ঢ়ৎড়ভবংংরড়হ. ঝড়সব ড়ভ ঃযবস নবপড়সব সবফরধ, ংড়সব ড়ভ ঃযবস নবপড়সব ংড়পরধষ সবফরধ, জঞও ধপঃরারংঃং ধহফ ড়ঃযবৎ ধপঃরারংঃং, ধহফ ঃযবু ংঃধৎঃ ধঃঃধপশরহম বাবৎুড়হব. (কিছু তরুণ আছে যারা তেলাপোকার মতো, যারা কোনো চাকরি পায় না বা কোনো পেশায় জায়গা পায় না। তাদের কেউ কেউ গণমাধ্যম, কেউ সোশ্যাল মিডিয়া, আরটিআই (তথ্য অধিকার) কর্মী বা অন্যান্য অ্যাক্টিভিস্ট হয়ে ওঠে এবং সব ব্যবস্থার (সবার) ওপর আক্রমণ করা শুরু করে।) এ মন্তব্যকে বিচারবিভাগে মোদির ফ্যাসিবাদের ছায়া পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন। ভারতের প্রধান বিচারপতির বিতর্কিত মন্তব্যের পর ক্ষুব্ধ তরুণ ও ‘তেলাপোকারা’ সংগঠিত হয়েছে অভিজিৎ দিপকে নামক ৩০ বছর বয়সী এক তরুণ রাজনৈতিক যোগাযোগ কৌশলবিদ এবং সোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্টের ডাকে। জেন-জি (এবহ ত) তরুণদের ব্যঙ্গাত্মক প্ল্যাটফর্ম ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ এখন এই আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ভারতের তরুণরা টাকার বিনিময়ে মোদির কাছে বিক্রি হওয়া রাজনৈতিক দলের নেতা ও সংসদ সদস্যদের ওপর ভরসা করতে পারছেন না। তাদের যেকে নো সমস্যার সমাধানে এখন ‘ককরোচ জনতা পার্টি’কে প্ল্যাটফরম হিসেবে ব্যবহার করা শুরু করেছে।
কেন এবারের ক্ষোভের আগুন : মেডিকেল প্রবেশিকা পরীক্ষা (ঘঊঊঞ-টএ) এর প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনায় ২০ লাখেরও বেশি শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। একটি সূত্র জানিয়েছে নরেন্দ্র মোদি সরকার ফ্যাসিবাদী শাসনের অংশ হিসেবে প্রশ্নপত্র ফাঁসের মাধ্যমে তার পছন্দের শিক্ষার্থীর ভর্তির ব্যবস্থা ষড়যন্ত্র করেছিলেন, এ তথ্য ফাঁস হওয়ার পরই ক্ষোভের আগুন সারা ভারতে ছড়িয়ে পড়ে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক) পাবলিক ব্রডকাস্টিং সার্ভিস (পিবিএস) সূত্রে প্রকাশ, বছরের পর বছর কঠোর পরিশ্রমের পর প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনায় মেধাবী হাজার হাজার শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়ে বাদ পড়েন। এই হতাশা শিক্ষার্থীদের মধ্য থেকে প্রায় এক ডজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন।
শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি : প্রশ্ন ফাঁসের নৈতিক দায় স্বীকার করে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের অবিলম্বে পদত্যাগ দাবিতে অনড় আন্দোলনকারীরা।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলন দমনে বর্বরতা : পার্লামেন্ট অভিমুখে শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ পদযাত্রায় দিল্লি পুলিশের নজিরবিহীন দমন-পীড়নের চিত্র দেখে আন্তর্জাতিক রাজনীতি বিশ্লেষকরা মোদি সরকারের এমন আচরণকে স্বৈরাচারী বলে আখ্যা দিয়েছেন। শিক্ষার্থীদের মিছিলে জলকামান, টিয়ার শেল এবং বেধড়ক লাঠিচার্জ করা হয়েছে, যাতে শতাধিক শিক্ষার্থী রক্তাক্ত ও গুরুতর আহত হয়েছেন। যন্তর মন্তরে দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান নেওয়া শিক্ষার্থীদের অস্থায়ী তাঁবু পুলিশ গুঁড়িয়ে দেয় এবং ব্যারিকেড ভেঙে এগিয়ে যাওয়া শিক্ষার্থীদের ওপর চড়াও হয়।
সোনম ওয়াংচুকের আন্দোলন : লাদাখের প্রখ্যাত পরিবেশ ও শিক্ষা আন্দোলনকর্মী সোনম ওয়াংচুক শিক্ষার্থীদের সমর্থনে অনশন শুরু করলে জটিল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়, যা আন্দোলনকে আরও বেগবান করে।
সুপ্রিম কোর্টের প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কারের নির্দেশ : প্রশ্ন ফাঁস ও পরীক্ষা বাতিল সংক্রান্ত এক শুনানিতে ভারতের সুপ্রিম কোর্ট সাফ জানিয়েছে যে, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (ঘঞঅ)-এর পরীক্ষা পরিচালনায় যদি ন্যূনতম গাফিলতিও থাকে, তবে তা কঠোরভাবে দমন করতে হবে। ইতোমধ্যে মে মাসে অনুষ্ঠিত প্রাথমিক পরীক্ষা বাতিল করে জুনে পুনরায় পরীক্ষা নেওয়া হলেও সুপ্রিম কোর্টে শিক্ষার্থীদের পক্ষে আবেদন করা হয়েছে যেন পুরো এনটিএ (ঘঞঅ) ব্যবস্থার আমূল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার (ওহংঃরঃঁঃরড়হধষ জবভড়ৎস) করা হয়। আদালত জানিয়েছে, পরীক্ষা পুনরায় অনুষ্ঠিত হলেও এই জাতীয় পরীক্ষা ব্যবস্থার কাঠামোগত ত্রুটি ও সংস্কারের বিষয়টি সর্বোচ্চ আদালত খতিয়ে দেখবে।
আদালত আন্দোলনরত সমাজকর্মী সোনম ওয়াংচুককে পুলিশি হেফাজত বা সরকারি হাসপাতালের পরিবর্তে বেসরকারি হাসপাতালে স্থানান্তরের অনুমতি দিয়েছেন।
দিল্লি পুলিশের কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টনী : আন্দোলন দমাতে এবং দিল্লির আইনশৃঙ্খলার রাশ টেনে ধরতে দিল্লি পুলিশ ও প্রশাসন সর্বাত্মক ও কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে।
ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (ইঘঝঝ) জারি : দিল্লির ডেপুটি কমিশনার অব পুলিশ (উঈচ) নয়াদিল্লি জেলাজুড়ে বিএনএসএস (ইঘঝঝ)-এর ১৬৩ ধারা (পূর্বতন ১৪৪ ধারা) জারি করেছেন, যার ফলে যেকোনো ধরনের সমাবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
ইন্টারনেট ব্ল্যাকআউট ও জ্যামার : আন্দোলনকারীদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করতে যন্তর মন্তর ও পার্লামেন্ট সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট পরিষেবা সাময়িকভাবে স্থগিত করা হয়েছে। ভিডিও বা ফুটেজ যাতে দ্রুত ছড়িয়ে না পড়ে, সেজন্য পার্লামেন্ট জোনে সিগন্যাল জ্যামার মোতায়েন করা হয়েছে।
কড়া নিরাপত্তা ও এফআইআর : পুরো উচ্চ-নিরাপত্তা বলয়জুড়ে কয়েক হাজার অতিরিক্ত দাঙ্গা পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং নিষেধাজ্ঞা অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ইউএপিএ (টঅচঅ) বা অন্যান্য জামিন অযোগ্য ধারায় মামলা করার হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে। মোদির সাফাই ও বিরোধীদের তীব্র ঝাঁকুনি-চলমান এই উত্তাল পরিস্থিতির মুখে অবশেষে মুখ খুলতে বাধ্য হয়েছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। বিজেপির নেতৃত্বাধীন এনডিএ (ঘউঅ) পার্লামেন্টারি কমিটির বৈঠকে তিনি দাবি করেন, সরকার প্রশ্ন ফাঁসের খবর পাওয়ার সাথে সাথেই দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছে এবং দোষীদের গ্রেপ্তার করেছে। তবে আন্দোলনকারীদের মূল দাবি: শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ কিংবা পুরো পরীক্ষা ব্যবস্থার আমূল সংস্কারের বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট আশ্বাস দিতে পারেননি।
এদিকে আম আদমি পার্টির (অঅচ) প্রধান অরবিন্দ কেজরিওয়াল এক সংবাদ সম্মেলনে মোদিকে কড়া হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেছেন, ‘মোদিজি, এই দেশ আপনার বাপের নয়; হুমকি দেওয়া বন্ধ করুন, অন্যথায় এ দেশের মানুষ স্বৈরশাসকদের ঐতিহাসিক শিক্ষা দেবে।