স্পিকার হাফিজ উদ্দিন এবং ভারতের প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর বক্তব্য বিশ্লেষণ

স্বাধীনতা নয়, মুজিবের লক্ষ্য ছিল ক্ষমতা


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:২৮

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
সত্য উদীয়মান সূর্যের মতো, মেঘ কিছুক্ষণের জন্য আড়াল করতে পারলেও চিরদিনের জন্য ঢেকে রাখতে পারে না। অতি সম্প্রতি বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং ভারতের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর পৃথক দুটি বক্তব্য বিশ্লেষণ করে এমন মন্তব্য করছেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা। দুই দেশের দুজন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে এমন কথা বলেছেন, যার প্রতিফলন জুলাই বিপ্লবের চেতনার মুকুটে আরেকটি সোনার পালক গেঁথে দিলো বললে ভুল বলা হবে না। কারণ ১৯৭২ সাল থেকে নিয়ে ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে সন্ত্রাসবাদ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে বর্তমানে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ যতবার ক্ষমতায় এসেছে, প্রত্যেকবারই এদেশের মানুষের ওপর চেপে বসেছে ভারতীয় আধিপত্যবাদ। নিষিদ্ধ এ দলটি বারবার নাগরিকদের মৌলিক অধিকার হরণ করেছে ১৯৭১-এর চেতনার নামে। বিরোধীদলে থাকলেও এর ব্যতিক্রম করেনি আ’লীগ। জনগণ তাদের অত্যাচার-নির্যাতনের বিরুদ্ধে মুখ খুললেই হায়েনার মতো তাদের বিরুদ্ধে লেলিয়ে দিয়েছে দলীয় সন্ত্রাসী ও রাষ্ট্রীয় বাহিনীর দলান্ধদের।
সেই ক্ষোভের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ ঘটে ৩৬ জুলাই অভ্যুত্থানের সময়। ২০২৪ এ ছাত্র-জনতার গণআন্দোলনের তীব্রতর সময়, ‘তুমি কে আমি কে, রাজাকার রাজাকার, কে বলেছে কে বলেছে স্বৈরাচার স্বৈরাচার’- স্লোগানে সেই চেতনার ফানুস উড়ে গেছে। আওয়ামী লীগ, শেখ মুজিব, হাসিনা এবং তার পরিবার আধিপত্যবাদী অপশক্তি ভারতের সেবাদাস-দাসী হলেও ভাব দেখাতো তারাই ‘স্বাীধনতা এনেছে এবং তারাই তা রক্ষার একমাত্র এজেন্ট’। তাদের সেই দাবির মিথ ভেঙে দিয়েছেন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম। তিনি ‘মুক্তিযুদ্ধে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট : ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং বাংলাদেশের অভ্যুদয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় রাওয়া কনভেনশন হলে গত ১১ জুলাই যে বক্তব্য দিয়েছেন, তার সারকথা হলো, মুজিব অখণ্ড পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছেন। তিনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা চাননি। তাই স্বাধীনতার কোনো ঘোষণাও দেননি।
অন্যদিকে ভারতের লোকসভায় সাম্প্রতিক এক সামরিক অভিযানের কৃতিত্ব নিয়ে মোদি সরকারের ভূমিকার সমালোচনা করতে গিয়ে ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের প্রসঙ্গ তুলেছেন কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী। ভারতের লোকসভায় বক্তব্যে তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশের জন্য নয়, বরং ভারতের নিজস্ব স্বার্থে ইন্দিরা গান্ধী পাকিস্তান ভেঙেছিলেন। ১৯৭১ সালে ভারতের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক চাপ; বিশেষ করে মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের অবস্থান সত্ত্বেও বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও সামরিক সহায়তা দিয়েছিলেন।’
স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রম এবং ভারতের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর উক্তি দুটি বিপরীতমুখী মনে হলেও আসলে একই সূত্রে গাঁথা। সেই সূত্রটি হলো- মুজিব ও আওয়ামী লীগের ক্ষমতালোভী সর্বগ্রাসী রাজনীতি। সেই রাজনীতির নোংরামি ঢাকতে তারা রচনা করেছেন মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ইতিহাস। কারণ ১৯৭১-এ তারা সফল হয়েছে।
‘ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা’
‘ইতিহাস লেখে বিজয়ীরা’ (History is written by the victors) বহুল প্রচলিত উক্তি। এটি ব্রিটেনের সাবেক প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল (Winston Churchill) এর ‘History will be kind to me, for I intend to write it.’ (ইতিহাস আমার প্রতি সদয় হবে, কারণ আমি নিজেই সেই ইতিহাস লেখার ইচ্ছা রাখি বা আমার ইচ্ছে মতোই তা লেখা হয়)-এর সংক্ষিপ্ত রূপ। ১৯৪৬ সালের নুরেমবার্গ বিচারে নাৎসি নেতা হেরমান গ্যোয়ারিং (Hermann Göring) প্রায় একই রকম কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন, ‘বিজয়ীরা সর্বদা বিচারকরা হবে আর বিজিত বা পরাজিতরা সর্বদা অপরাধী’ (The victor will always be the judge and the vanquished the accused.)।
১৯৭১ সালের পর আওয়ামী লীগ নিজেদের চেতনার ফেরিওয়ালা প্রমাণ করতে তৈরি করেছিল মিথ্যা ইতিহাস। রাষ্ট্র ও সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহার করে আওয়ামী লীগ ভারতীয় আগ্রাসনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়া রাজনৈতিক ও মানবাধিকার কর্মী, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবীসহ সাধারণ নাগরিকদের রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নয়, শত্রুর কাতারে ফেলে নিশ্চিহ্ন করার মানবতাবিরোধী অ্যাকশনে নেমেছিল। বিশেষ করে ১৯৭১ থেকে ১৯৭৫ এবং ২০২৪-এ পালিয়ে যাওয়ার আগে হাসিনার দেড় দশক বাংলাদেশ পরিণত হয়েছিলো ভারতে করদরাজ্যে। তাদের এ অবস্থানের বিরুদ্ধে দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব এবং সমমর্যাদার কথা যারা বলতো, চেতনার নামে তাদেরই নির্মূল করতে মামলা-হামলা, জেল-জুলুম, রিমান্ড, খুন, গুমের মতো মানবতাবিরোধী পথ বেছে নিয়েছিল। ভারতের আজ্ঞাবহ দাস হয়ে যারা এতদিন বাংলাদেশের নাগরিকদের শাসনের নামে শোষণ করেছে, তাদের আসলে দেশটাকে নয় প্রয়োজন ক্ষমতা।
ক্ষমতার আয়নায় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, চতুর মানে ধূর্ত মুজিবের রাজনীতির ছক ছিল, ‘ঘর পোড়া আগুনে আলু পোড়া’ খাওয়ার মতো।
‘ঘর পোড়া আগুনে আলু পোড়া’
মীর জাফর ভেবেছিলো, নবাব সিরাজউদ্দৌলার পতন মানে তার নবাবী। কিন্তু শেষ পরিণতি কী হলো? শুধু বাংলা বিহার ঊড়িষ্যা নয়, একে একে গোটা ভারতবর্ষ প্রথমে ইস্ট ইন্ডিয়ার কব্জায়, তারপর ব্রিটিশ উপনিবেশে পরিণত হয়ে স্বাধীনতা হারায়। রাজনীতি বিশ্লেষকরা মনে করেন, তৎকালীন আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব ও ভারতের সাথে সম্পর্ক গড়ে পূর্ব পাকিস্তানের ক্ষমতা ছলে-বলে যে কোনোভাবে দখলের। আগরতলা ষড়যন্ত্র তার প্রমাণ। মুজিব কলকাঠি নেড়েছে দূর থেকে কারণ তার মনে ভয় ছিল- বিচ্ছিন্নতাবাদী হিসেবে চিহ্নিত হলে তার মৃত্যুদণ্ড ঠেকানো কঠিন হবে। তাই দ্বিচারী ভূমিকায় রাজনীতির মাঠে নেমেছিলেন। এদেশের নিরীহ বাংলাভাষী মুসলমান ও উর্দুভাষীদের মধ্যে দ্বন্দ্ব সৃষ্টি করেছে। তার দলের সন্ত্রাসীদের দিয়ে অবাঙালিদের নির্মূলের নিষ্ঠুর নীলনকশা বাস্তবায়ন করে। কথিত আছে, তাদের সাথে এ অপকর্মে মাঠে নেমেছিল ভারতে প্রশিক্ষিত সন্ত্রাসীরা। এভাবে এমন এক অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করে যে, যুদ্ধ অনিবার্য করে তোলে। কিন্তু নিজে গ্রেফতার নাটক সাজিয়ে চলে যায় পশ্চিম পাকিস্তানের নিরাপত্তা হেফাজতে।
মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট তুলে ধরে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ১৯৭০ সালের নির্বাচন হয়েছিল ছয় দফার ভিত্তিতে এবং পাকিস্তানের রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানের ন্যায্য অধিকার প্রতিষ্ঠার দাবিতে। তখন স্বাধীনতা শব্দটি কখনোই উচ্চারিত হয়নি। ‘ক্র্যাকডাউনের অব্যবহিত পূর্বে (বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী) তাজউদ্দীন সাহেব শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে গিয়ে বলেন, পাকিস্তান আক্রমণ করতে যাচ্ছে। দেশের মানুষ স্বাধীনতা চায়, এখনো সময় আছে আপনি স্বাধীনতা ঘোষণা করুন। শেখ মুজিব সাহেব বললেন যে না, আমি বিচ্ছিন্নতাবাদী হতে পারি না। পাকিস্তান ভাঙতে আমার কোনো অবদান থাকুক, এটি আমি চাই না। সুতরাং স্বাধীনতার ঘোষণা আমি দেব না। স্বাধীনতার ঘোষণা (তিনি) দেননি। তখন প্রতিরোধ গড়ে তোলে ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট। তিনি বলেন, ‘এ সময় স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন (তৎকালীন) মেজর জিয়াউর রহমান, এটি হলো প্রকৃত সত্য।’
মুজিব স্বাধীনতা ঘোষণা দেননি- এ কথা যেমন সত্য ভারত বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য নয়, নিজেদের স্বার্থে পাকিস্তান ভাঙতে মুজিবকে ব্যবহার করেছে- এ কথাও সত্য। মুজিবকে ব্যবহার করে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানে এমন এক অস্থিতিশীল অবস্থার সৃষ্টি করেছিলো যে, স্বাধিকার আন্দোলন শেষ পর্যন্ত স্বাধীনতা যুদ্ধে পরিণত হয়েছিল।
ভারতের এ ষড়যন্ত্র বুঝতে পেরেছিলেন তৎকালীন ইসলামপন্থী রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মী, দেশের বিশিষ্ট আলেম সমাজ, চীনপন্থীখ্যাত বামধারার রাজনীতিবিদরা। তাই তারা শেষ পর্যন্ত আলোচনার টেবিলে দুই পাকিস্তানের সমস্যা এবং ভুল বোঝাবুঝির মীমাংসা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু ভারত ও আওয়ামীপন্থী মিডিয়ার অপপ্রচারে আসল সত্য ঢাকা পড়ে যায়। যারা আলোচনার টেবিলে সমস্যা সমাধনের পক্ষে ছিলেন, তাদের ‘খলনায়ক’ হিসেবে চিহ্নিত করে দেশের যুবসমাজের বড় অংশকে বিভ্রান্ত করার মিশনে নেমে সফল অপপ্রচারকারী মিডিয়াগুলো। তাদের বুঝতে দেয় না, ভারত তার নিজের স্বার্থে পাকিস্তানকে ভাঙতে এ ষড়যন্ত্র করছে। তারা আওয়ামী লীগ ও শেখ মুজিব ‘ঘর পোড়া আগুনে আলু পোড়া’র মজা নিতে নেতাদের একাংশকে দিয়ে তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের সাথে হাত মিলিয়েছে। নিজ দলের নিরীহ অখ্যাত কর্মীদের রাজাকার বাহিনীতে ব্যাপকভাবে ঢুুকিয়ে। আরেক দলকে পাঠিয়েছে ভারতে মুজিব বাহিনীর সদস্য হিসেবে সশস্ত্র ট্রেনিং নিতে। পাকিস্তান সরকারের সাথে আওয়ামী লীগের একাংশের আনুগত্যের বিষয়টি অবিশ্বাস্য মনে হলেও তৎকালীন সরকারের নথিপত্রে আওয়ামী লীগের ৮৮ জন এমএলএ’র নাম পাওয়া যায়। এছাড়া আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ২০১৯ সালের ১৫ ডিসেম্বর তৎকালীন মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয় ১০,৭৮৯ জন স্বাধীনতাবিরোধীর একটি আংশিক বা প্রথম পর্বের তালিকা প্রকাশ করেছিল। কিন্তু সেই তালিকায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান প্রসিকিউটর গোলাম আরিফ টিপুসহ বহু আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীর নাম প্রকাশ্যে আসে। পরে তড়িঘড়ি করে সরকার এ তালিকা প্রত্যাহার করে নেয়।
আসলে মুজিবের চালাকি ছিল, দেশ ভাগ হলে হবেন প্রেসিডেন্ট, অবিভক্ত থাকলে প্রধানমন্ত্রী। তাই স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের মন্তব্যের বিরোধিতা করার সুযোগ নেই, মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। কিন্তু পাকিস্তান ভাঙতে চেয়েছেন কি চাননি, তা নিয়ে বিস্তর গবেষণার দরকার। কারণ তার বিরেুদ্ধ তথ্য-প্রমাণ আছে, তিনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর চেয়ারে বসতে পারলে সিকিমের লেন্দুপ জর্দির ভূমিকায় অবতীর্ণ হতেন, তৎকালীন গোয়েন্দাদের কাছে এমন বিশ্বাসযোগ্য প্রতিবেদন ছিল বলেই নাকি ১৯৭০-এর নির্বাচনে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হওয়ার পর তার কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করার আগে সংবিধানের খসড়া চেয়েছিলেন- যাতে এমন গ্যারান্টি থাকবে, তিনি ভারতের কাছে দেশে স্বার্থ বিকিয়ে দেবেন না। কিন্তু মুজিব রাজি হননি।
মুজিব রাজি হননি তার তথ্য প্রমাণ
১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের সামরিক বাহিনী ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর (বিশেষ করে আইএসআই ও ডিআইবি) ধারণা ছিল যে, কোনো একক দল সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। কিন্তু নির্বাচনে আওয়ামী লীগ একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার পর প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খান ক্ষমতা হস্তান্তরের আগে আওয়ামী লীগের তৈরি করা ‘সংবিধানের খসড়া’ দেখতে চেয়েছিলেন, যাতে ছয় দফার ভিত্তিতে পাকিস্তান ভাঙার সুযোগ থাকবে না। কিন্তু মুজিব ও আ’লীগ সেই খসড়া দিতে অস্বীকার করে।
এ প্রসঙ্গে হাসান জহির, যিনি ১৯৭১ সালে পূর্ব পাকিস্তানে পাকিস্তান সরকারের একজন উচ্চপদস্থ সিভিল সারভেন্ট (আমলা) ছিলেন। তৎকালীন ডন পত্রিকার সূত্র উল্লেখ করে লিখেছেন, ‘১৯৭০ সালের নির্বাচনের আগে পাকিস্তানের জাতীয় নিরাপত্তা সেল (এনএসআই) এবং গোয়েন্দাপ্রধান মেজর জেনারেল গোলাম জিলানি খান প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়াকে প্রতিবেদন দিয়েছিলেন যে, আওয়ামী লীগ বড় দল হলেও সরকার গঠনের মতো একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাবে না। কিন্তু নির্বাচনের পর হিসাব উল্টে গেলে ১৯৭১ সালের জানুয়ারি মাসে ইয়াহিয়া খান ঢাকায় এসে শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তরের শর্ত হিসেবে সংবিধানের একটি অগ্রিম খসড়া দাবি করেন- যাতে পাকিস্তান একীভূত থাকে। (সূত্র : https://www.dawn.com/news/1359141)।
অন্যদিকে ভারত যে তার নিজ স্বার্থে পাকিস্তান ভেঙেছে- এ কথা বুঝতে কোনো গবেষণার প্রয়োজন নেই। সামান্যতম বিচারবুদ্ধি ও দেশপ্রেমই যথেষ্ট। স্বাধীনতার পর থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত ভারতের আচরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভারত এদেশকে দুর্বল করে শোষণ করতেই ১৯৪৭-এর পর থেকে ষড়যন্ত্র করেছে। ১৯৭১-এ সফল হয়েছে।
ভারত নিজের স্বার্থে পাকিস্তান ভেঙেছে
প্রিয়াঙ্কা গান্ধীর এ বক্তব্যের সাথে দ্বিমত করেননি, রণাঙ্গনের মুক্তিযোদ্ধা ও বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ‘আমাদের প্রতি কোনো ভালোবাসা বা সহানুভূতির কারণে ভারত এই যুদ্ধে জড়ায়নি। বরং তাদের মূল লক্ষ্য ছিল চিরশত্রু পাকিস্তানকে দুর্বল করা এবং ভেঙে দুই টুকরো করা। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের আধিপত্যবাদী মনোভাব এবং তাদের দেশীয় সহযোগীদের কারণে আমরা বিজয়ের পূর্ণ স্বাদ গ্রহণ করতে পারিনি এবং স্বাধীনতাও পুরোপুরি সুরক্ষিত হয়নি। সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো, পাক বাহিনী সেদিন আমাদের কাছে নয়, বরং ভারতীয় সেনা কর্মকর্তা জগজিৎ সিং আরোরার কাছে আত্মসমর্পণ করেছিল। মুক্তিযুদ্ধে সর্বাধিনায়ক জেনারেল এমএজি ওসমানী কেন সেদিন উপস্থিত ছিলেন না, সে প্রশ্নের আজও কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি। এ কারণেই ভারত ১৬ ডিসেম্বরকে নিজেদের বিজয় দিবস হিসেবে পালন করে, যা মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবমাননাকর।’
লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি (এলডিপি) সভাপতি কর্নেল (অব.) ড. অলি আহমদ বীরবিক্রম বলেন, ‘১৯৭১ সালের যুদ্ধে ভারত যে বাংলাদেশকে সহযোগিতা করেছে, তা কেবল নিঃস্বার্থ পরোপকার ছিল না; বরং এর পেছনে ভারতের নিজস্ব ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থও জড়িত ছিল। ভারত আমাদের স্বাধীনতা উপহার দেয়নি। দীর্ঘ ৯ মাস রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের মাধ্যমে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেয়েছি, আর তার বিনিময়ে ভারত পেয়েছে দ্বিখণ্ডিত পাকিস্তান। ভারত পাকিস্তানের মতো চিরপ্রতিদ্বন্দ্বীকে স্থায়ীভাবে দুর্বল করার ঐতিহাসিক সুযোগটি কাজে লাগিয়েছিল। পাকিস্তানিদের ফেলে যাওয়া প্রায় লক্ষাধিক সেনাসদস্যের অস্ত্র, গোলাবারুদ, সামরিক যানবাহন এবং বিভিন্ন কলকারখানার দামি মেশিনারি ভারত সেনাবাহিনী তাদের দেশে নিয়ে গেছে।’
প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী বলেন, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানিদের সঙ্গে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার যুদ্ধ। ৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে এবং ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমের বিনিময়ে আমরা একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। এই স্বাধীনতা যুদ্ধকে ভারত নিজেদের অর্জন হিসেবে দাবি করা মানে বাংলাদেশের স্বাধীনতা, সার্বভৌমত্ব ও অখণ্ডতাকে অস্বীকার করা। ৩০ লাখ শহীদ ও ২ লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করা। তিনি আরও বলেন, আমরা রক্ত দিয়ে পিন্ডির কাছ থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছি দিল্লির কাছে মাথানত করতে নয়।