ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ কি আরও দীর্ঘ হচ্ছে?


২২ জুলাই ২০২৬ ২১:১৯

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের আগুন আপাতত থামার কোনো লক্ষণ নেই। একদিকে ইরানে টানা সামরিক অভিযান চালিয়ে কূটনৈতিক আলোচনার বার্তা দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র; অন্যদিকে পাল্টা প্রতিরোধ অব্যাহত রাখার ঘোষণা দিয়েছে তেহরান।
এরই মধ্যে জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলার দাবি করেছে ইরান, হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে বেড়েছে নতুন উত্তেজনা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। যুদ্ধের ব্যয়, কূটনৈতিক অচলাবস্থা ও বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাড়তে থাকা প্রভাব সব মিলিয়ে সংঘাত এখন শুধু মধ্যপ্রাচ্যের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নেই; এটি বিশ্ব রাজনীতি ও অর্থনীতির জন্যও এক গভীর অনিশ্চয়তার ইঙ্গিত দিচ্ছে।
যুক্তরাষ্ট্র আলোচনায় প্রস্তুত : মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে ওয়াশিংটন সংলাপ ও আলোচনায় প্রস্তুত। তবে ইরান এখনো আন্তরিকভাবে আলোচনায় আগ্রহী নয় বলে জানিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিও। গত ২২ জুলাই বুধবার ফিলিপাইনের রাজধানী ম্যানিলায় আসিয়ান (অ্যাসোসিয়েশন অব সাউথইস্ট এশিয়ান নেশনস) পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠকের ফাঁকে তিনি এ মন্তব্য করেন। রুবিও বলেন, ইরান যদি আন্তরিক হয়, আমরাও আন্তরিক। কিন্তু যদি তারা আন্তরিক না হয়, তাহলে নিজেদের স্বার্থ এবং আমাদের মিত্রদের স্বার্থ রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেবে যুক্তরাষ্ট্র। তিনি বলেন, হরমুজ প্রণালীর ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক নৌপথ বন্ধ করে দেওয়ার পদক্ষেপ অত্যন্ত বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করছে। তার মতে, আন্তর্জাতিক জলপথ বন্ধ হলে শুধু মধ্যপ্রাচ্য নয়, এশিয়াসহ বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। একইসঙ্গে বৈশ্বিক বাণিজ্যও মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়বে। রুবিওর এ বক্তব্য এমন একসময়ে এলো, যখন হরমুজ প্রণালী ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে এবং নৌপথে জাহাজ চলাচল নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। এদিকে বৈঠকে আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর পররাষ্ট্রমন্ত্রীরা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে শুরু হওয়া সংঘাত নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত উত্তেজনা প্রশমনে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদারের আহ্বান জানান।
ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে বাড়ছে বিতর্ক
ইরানের বিরুদ্ধে চলমান সামরিক অভিযানে এখন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩৭ দশমিক ৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ সিনেটের অ্যাপ্রোপ্রিয়েশনস কমিটির শুনানিতে এ তথ্য জানান। হেগসেথ বলেন, সর্বশেষ প্রকাশিত হিসাবের তুলনায় যুদ্ধের ব্যয় প্রায় ৮ বিলিয়ন ডলার বেড়েছে। তিনি জানান, এই হিসাবের মধ্যে চলতি অর্থবছরের ৩০ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত সম্ভাব্য ব্যয়ও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ইরানের বিরুদ্ধে চলতি মাসে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযান পুনরায় শুরু হওয়ার পর এই প্রথম কংগ্রেসের আইনপ্রণেতাদের সামনে হাজির হয়ে যুদ্ধের ব্যয় নিয়ে ব্যাখ্যা দেন প্রতিরক্ষামন্ত্রী। শুনানিতে তার সঙ্গে উপস্থিত ছিলেন জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন। শুনানিতে কয়েকজন সিনেটর যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান ব্যয়, এর অর্থনৈতিক প্রভাব এবং সামরিক কৌশল নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। সমালোচকদের মতে, ইরানের সঙ্গে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর আর্থিক চাপ আরও বাড়তে পারে। প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের দেওয়া সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, যুদ্ধ পরিচালনা ও আগামী কয়েক মাসের সম্ভাব্য সামরিক ব্যয় বিবেচনায় নিয়েই ৩৭.৫ বিলিয়ন ডলারের এই হিসাব নির্ধারণ করা হয়েছে। এত বিশাল ক্ষতির কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
জর্ডান ও বাহরাইনে মার্কিন ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা ইরানের
জর্ডান ও বাহরাইনে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্রের দুটি সামরিক ঘাঁটিতে ড্রোন হামলা চালানোর দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী। গত ২২ জুলাই বুধবার মেহর নিউজ এজেন্সির প্রকাশিত এক বিবৃতিতে ইরানের সেনাবাহিনী জানিয়েছে, জর্ডানের আজরাক এলাকায় অবস্থিত মুওয়াফফাক সালতি বিমানঘাঁটি এবং বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটি লক্ষ করে এ হামলা চালানো হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, জর্ডানের মুওয়াফফাক সালতি ঘাঁটিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর আবাসন ও কল্যাণ ভবন এবং সরঞ্জাম সংরক্ষণাগার লক্ষ্য করে সকালে ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে। এছাড়া বাহরাইনের শেখ ইসা বিমানঘাঁটিতে মার্কিন সেনাবাহিনীর বড় সরঞ্জাম গুদাম, হ্যাঙ্গার এবং ভারী সামরিক উড়োজাহাজের রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতকেন্দ্র লক্ষ করেও ড্রোন হামলা চালানো হয়েছে বলে দাবি করেছে ইরানের সেনাবাহিনী।
উত্তেজনায় তেলের দাম আরও বাড়ল
আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত জ্বালানি তেলের দাম ঊর্ধ্বমুখী রয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের চলমান উত্তেজনার প্রভাবে ব্রেন্ট ক্রুডের দাম বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯২ ডলার ছাড়িয়েছে। গত ২২ জুলাই বাংলাদেশ সময় ৯টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচারের দাম ১ ডলার বা ১ দশমিক ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯২ দশমিক ০১ ডলারে পৌঁছেছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দাম ৮২ সেন্ট বা ১ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৫ দশমিক ১৬ ডলারে লেনদেন হচ্ছে।
গত সপ্তাহে হামলা-পাল্টা হামলা
গত ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র টানা সপ্তম রাতের মতো ইরানের সামরিক অবকাঠামো, ড্রোন সংরক্ষণাগার এবং সামরিক লজিস্টিকস সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় বিমান হামলা চালায়। পাল্টা জবাবে ইরান হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগর এলাকায় জাহাজ চলাচলে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে এবং উপসাগরীয় কয়েকটি দেশে থাকা মার্কিন সামরিক স্থাপনা ও মিত্রদের লক্ষ্য করে ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালায়। গত ১৮ জুলাই শনিবার যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্ররা হরমুজ প্রণালী এলাকায় সামরিক উপস্থিতি জোরদার করে ইরান এবং সমুদ্রপথে নিরাপত্তা অভিযান বাড়ায়। ইরান জানায়, তারা কৌশলগত সামরিক ও নৌ সক্ষমতা অক্ষুণ্ন রেখেছে এবং প্রয়োজনে আরও পাল্টা হামলা চালাবে।
গত ১৯ জুলাই রোববার ইসরাইল পশ্চিম ইরানে শতাধিক সামরিক লক্ষ্যবস্তুতে ব্যাপক বিমান হামলা চালায়। হামলার লক্ষ্য ছিল মূলত ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণ কেন্দ্র, ড্রোন ঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো। ইরানও ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করে পাল্টা হামলা অব্যাহত রাখে। গত ২০ জুলাইও যুক্তরাষ্ট্রের হামলা অব্যাহত থাকে। ওয়াশিংটনের দাবি, এসব হামলার উদ্দেশ্য ইরানের সামরিক সক্ষমতা কমিয়ে আনা এবং আন্তর্জাতিক নৌপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। একই সময়ে হরমুজ প্রণালী ও লোহিত সাগরে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি হয়। গত ২১ জুলাই মঙ্গলবার যুক্তরাষ্ট্র বিমান হামলা চালায়। হামলার লক্ষ্য ছিল ড্রোন গুদাম, বিমানঘাঁটি ও সামরিক অবকাঠামো। ইরান পাল্টা হামলায় উপসাগরীয় অঞ্চলে মার্কিন স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানার দাবি করে এবং হরমুজ প্রণালীতে চাপ অব্যাহত রাখে।
গত ২২ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র ঘোষণা দেয়, ইরানে তাদের টানা ১১ রাতের সামরিক অভিযানের সর্বশেষ ধাপ শেষ হয়েছে। ওয়াশিংটন জানিয়েছে, প্রয়োজনে আবারও সামরিক অভিযান চালানোর সক্ষমতা তাদের রয়েছে এবং একইসঙ্গে কূটনৈতিক পথ পুরোপুরি বন্ধ নয়। ইরানও জানিয়েছে, সামরিক চাপের মুখে তারা নতি স্বীকার করবে না এবং পাল্টা প্রতিরোধ অব্যাহত থাকবে।