আলোকে তিমিরে

সংসদে গণতন্ত্র : বাইরে সহাবস্থান


১৫ জুলাই ২০২৬ ২১:২৮

॥ মাহবুবুল হক ॥
জুলাই মাস এলে জুলাই বিপ্লবের কথা আমরা মনে করব, স্মরণ করব, বক্তৃতা, বিবৃতি ইত্যাদিতে সক্রিয় হব, সে কথা অন্য কেউ ভাবলেও রাষ্ট্রের সুনাগরিকগণ কস্মিনকালেও ভাবছেন না। কারণ বিষয়টি শেষ হয়ে যায়নি, পাস্ট হয়ে যায়নি। বিষয়টি এখনো চলমান। গায়ের জোরে নির্বাচন করে এই বিপ্লব ও অভ্যুত্থানকে স্মৃতির দিকে ঠেলে দেয়া হয়েছে। যারা বিপ্লবের বিরোধী ছিল, শত্রু ছিল, বিপ্লব বা গণঅভ্যুত্থান অনুষ্ঠিত হোক বা কামিয়াব হোক- এটা যারা চায়নি, তারা এখন বিষয়টিকে একটি ছোট-খাটো আন্দোলন বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করছে। ফ্যাসিবাদের দোসররা এখন দেশময় বলে বেড়াচ্ছে, আরে রাখ ঐসব, দেশে তো হরহামেশাই কত আন্দোলন হয়। সব আন্দোলনের স্মৃতি কি সবাই মনে রাখে বা রেখেছে। যেমন- ১. ফকির-সন্নাসী আন্দোলন (১৭৬০-১৮০০), ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে প্রথম দিকের সশস্ত্র প্রতিরোধ, ২. ওহাবী আন্দোলন (১৯ শতকের প্রথম দিকে) ধর্মীয় সংস্কার ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন, ৩. ফরায়েজী আন্দোলন (১৮১৮-১৮৫৭) হাজী শরীয়তুল্লাহর নেতৃত্বে ধর্মীয় ও সামাজিক সংস্কার আন্দোলন, ৪. সাঁওতাল বিদ্রোহ (১৮৫৫-১৮৫৬) ব্রিটিশ শাসন ও জমিদারি ব্যবস্থার বিরুদ্ধে উপজাতিদের বিদ্রোহ, ৫. সিপাহী বিদ্রোহ (১৮৫৭) ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে স্বাধীনতা পুনরায় ছিনিয়ে নেয়ার আন্দোলন, ৬. নীল বিদ্রোহ (১৮৫৯-১৮৬০) নীলকরদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে কৃষকদের আন্দোলন, ৭. বঙ্গভঙ্গবিরোধী আন্দোলন (১৯০৫-১৯১১) বঙ্গভঙ্গের প্রতিবাদে সনাতনীদের তথাকথিত স্বদেশি আন্দোলন, ৮. খেলাফত আন্দোলন (১৯১৯-১৯২৪) ওসমানীয় খেলাফত রক্ষার দাবিতে মুসলিমদের আন্দোলন, ৯. অসহযোগ আন্দোলন (১৯২০-১৯২২) মোহনচাঁদ করমচাঁদ গান্ধীর নেতৃত্বে ব্রিটিশ সরকারবিরোধী আন্দোলন, ১০. ভারত ছাড়ো আন্দোলন (১৯৪২) ব্রিটিশদের ভারত ত্যাগের দাবিতে আন্দোলন, ১১. আজাদ হিন্দ আন্দোলন (১৯৪৩) নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসু ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র আন্দোলন, ১২. রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন (১৯৪৮) পাকিস্তানের স্বাধীনতা লাভের পর পূর্ব পাকিস্তান প্রদেশের ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে তমুদ্দুন মজলিসের নেতৃত্বে কেন্দ্রীয় ও প্রাদেশিক সরকারের বিরুদ্ধে প্রথম আন্দোলন, ১৩. ভাষা আন্দোলন (১৯৫২) পূর্ব পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনকে পরবর্তীতে সার্বিকভাবে দল-মত নির্বিশেষে তারা আন্দোলনে রূপ দেয়া হয়। এতে ছাত্র-জনতাসহ বেশ কয়েকজন শাহাদাতবরণ করেন। এই আন্দোলনের ফলে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার রাষ্ট্রভাষা হিসেবে প্রাদেশিকভাবে উর্দু ও বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে গ্রহণ করে নেন, ১৪. শিক্ষা কমিশন আন্দোলন (১৯৬২) শিক্ষা কমিশনবিরোধী পূর্ব পাকিস্তান ও পশ্চিম পাকিস্তান মিলে শিক্ষার্থীদের সর্ববৃহৎ আন্দোলন (১৯৬২), ১৫. ছয় দফা আন্দোলন (১৯৬৬) শেখ মুজিবুর রহমানের স্বায়ত্তশাসনের পক্ষে আন্দোলন, ১৬. গণঅভ্যুত্থান (১৯৬৯) ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খানের সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে পূর্ব পাকিস্তানব্যাপী গণআন্দোলন। এতে প্রধান নেতৃত্ব দেন মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, ১৭. মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রাম।
স্মৃতিহারা রোগে ভুগছি বলে ‘বালাকোটের আন্দোলনের’ কথা ভুলে গেছি। সেটা ছিল ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মহা আন্দোলন। নেতৃত্বে ছিলেন সৈয়দ আহমদ বেরলভী। গত প্রায় ৮০ বছর ধরে জামায়াতে ইসলামী ও তাদের ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্র সংঘ ও ইসলামী ছাত্রশিবির এই মহা দিবসটি পালন করে আসছে। কোথায় বালাকোট আর কোথায় বাংলাদেশ। এই উর্বর বদ্বীপ থেকে শত শত ইসলামপ্রেমী মানুষ ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার জন্য এতদূর গমন করেছিলেন। অনেকেই সেই জিহাদে শাহাদাতবরণ করেছিলেন। কেউ কেউ ফিরে এসেছিলেন। নোয়াখালীর সুধারাম থানার (বর্তমানে কবিরহাট উপজেলা) মাওলানা ইমামউদ্দীন ফিরে আসতে পেরেছিলেন (যার বাড়ির সন্নিকটেই আমাদের গরিবালয়)। পুরান ঢাকার ‘পাতলাখান লেনের’ নামকরণ করা হয়েছিল বালাকোটের অন্যতম শহীদ পাতলাখানের নামে, যিনি সম্ভবত আফগানী ছিলেন।
দৃশত বা বাস্তবে বালাকোটের জিহাদ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়েছিল, কিন্তু তাই বলে কী ইতিহাসের অমোঘ বাস্তবতায় ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার কালজয়ী আন্দোলন বা সংগ্রাম চিরতরে নিস্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল? না যায়নি। গেলে ১৯৪৭ সালে কী করে ইসলামী প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র পাকিস্তান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল? স্রষ্টার অভিপ্রায় ও মানুষের স্বপ্ন দুনিয়া থেকে বের হয়ে মহাশূন্যে চলে যায় না। সেসব দুনিয়ার চৌহদ্দিতে বিরাজমান থাকে, যেমন জিন্দা থাকে নবী-রাসূল-খলিফা-সাহাবী-মুজাদ্দেদ-ই-জামানদের স্মৃতিকথা।
উপর্যুক্ত আলোচনায় যেসব আন্দোলন, সংগ্রাম, বিদ্রোহ, বিপ্লব, উত্থান, অভ্যুত্থান নিয়ে আমরা যৎকিঞ্চিত আলোচনা করেছি, তার সবটাই এখন অতীতের বিষয়, ইতিহাসের বিষয়, স্মৃতির বিষয়, কান্নার বিষয়, বেদনাবিধুর বিষয়। কিন্তু কোনোটাই বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। কোনোটাই ছেলেখেলার বিষয় নয়। সাময়িক আনন্দ বা বিষাদের বিষয় নয়। ব্যর্থতার বিষয় নয়। পরাজয়ের বিষয় নয়। সবটাই বিজয়ের বিষয়। লেগাসির বিষয়। ধারাবাহিকতার বিষয়। পরাম্পরার বিষয়।
আমরা দেশবাসী বা রাষ্ট্রবাসী এখন যে জায়গায় এসে নোঙর করেছি বা উপস্থিত হয়েছি, সেটার শুরু ও শেষটা বা বর্তমানটা আমরা তৈরি করিনি, করেছেন আমাদের পূর্বসূরিরা, আমাদের দাদারা, নানারা, পিতা-মাতা-চাচা-চাচিরা, ফুপু-ফুপা, খালা-খালুরা। সুতরাং আমাদের বিজয়-পরাজয় সবকিছুর মাঝে অতীতের অবদান রয়েছে। অতীত ছাড়া এবং ভবিষ্যতের জন্য স্বপ্ন তৈরি করা ছাড়া বর্তমান তৈরি হয় না। বর্তমানের মধ্যে অবশ্যই অতীত ও ভবিষ্যতের অবদান থাকে। তাহলে দেখা যাচ্ছে, ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লব শুধু সেই সময়ের শিক্ষার্থী-জনতার একক অবদান নয়। অবশ্যই তাদের জীবনবাজি রাখা ত্যাগ ও শাহাদাতের বৈশিষ্ট্যপূর্ণ অবদান, তবে একক বললে ভুল বলা হবে। ফেলে আসা পৃষ্ঠায় আমরা যেসব আন্দোলন ও সংগ্রামের দৃষ্টান্ত ও উদাহরণ পেশ করেছি, সেসব আন্দোলনের ত্যাগ-তিতিক্ষা, শাহাদাত, ছায়া যেমন ২০২৪-এর বিপ্লবে রয়েছে, ঠিক তেমনি রয়েছে এদেশে শিশু-কিশোর, যুবক-যুবতীর ও তাদের পিতা-মাতার স্বপ্নের ছোট-বড় নানা ক্যানভাসে আবহ।
স্বপ্ন বাস্তবায়নের জন্য মানুষ অগ্রসর হয়। স্বপ্ন দেখার জন্য পড়ে পড়ে ঘুমায় না। ঘুম থেকে পাওয়া স্বপ্ন দিয়েই দেশ-জাতি ও রাষ্ট্র গঠন করা যায়। দুই স্বপ্নের বানান এক হলেও দুটির গুরুত্ব ও তাৎপর্য একরকম নয়। এ কথাটি আমাদের বিশেষষভাবে ভাবতে হবে।
২০২৪-এর বিপ্লব বা জুলাই বিপ্লব এখন জ্যান্ত। এটা শেষ হয়ে যায়নি। এটা এখনো চলমান। মাঝে নির্বাচন না এলে আমরা বিপ্লবের স্বপক্ষে অনেক দূর অগ্রসর হতে পারতাম। ২০২৪-এর জানুয়ারিতেই তো পাঁচ বছরের জন্য জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
৩৬ জুলাই অর্থাৎ ৫ আগস্ট সেই সরকারের পতন হলো। ৬ মাসের মধ্যেই আর একটি স্বচ্ছ নির্বাচন দেয়ার দাবি উত্থাপন করা হয়েছিল। যেটা ছিল সম্পূর্ণভাবে অযৌক্তিক। একটি দল ছাড়া অন্য কোনো দল এই অযৌক্তিক দাবিকে সমর্থন করেনি। যেই দল দাবি উত্থাপন করেছিল, তারা ততদিনে নিজেদের সরকার হিসেবে প্রতিপন্ন করেছিল। পতিত সরকারের সরকারি-বেসরকারি সকল আঁটঘাট ও বাজারে তাদের দখল প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিল। অন্তর্বর্তী সরকার এই দখলি স্বত্ত্বকে সমর্থন না করলেও কার্যত এ বিষয়ে তেমন কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করেনি। তাদের প্রাথমিক প্রায়োরিটি ছিল গৃহযুদ্ধ বন্ধ করা অথবা গৃহযুদ্ধের কোনো উদ্ভব না হয় সেদিকে নজর রাখা। সেনাবাহিনী, বর্ডার রক্ষাকারী বাহিনী ছাড়া তদানীন্তন সরকারের কাছে পুলিশ ও আনসার বলতে তেমন কিছুই ছিল না। দুর্বল আনসার বাহিনী পর্যন্ত সচিবালয়কেন্দ্রিক বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিল। দেশের প্রায় অধিকাংশ থানা ‘শূন্য’ভাবে পড়েছিল। এ ধরনের একটা শূন্য অবস্থার মধ্যে পতিত সরকার ও তাদের চ্যালা-চামুণ্ডার সাথে দেশের সর্ববৃহৎ বিরোধীদল আঁতাত করে বসে। একটা অবৈধ লেনদেনের মাধ্যমে ভার্চুয়ালি তদানীন্তন সর্ববৃহৎ বিরোধীদল একটা ডিফেক্টো সররকারে পরিণত হয়ে গেল। এতে ক্ষতি যা হলো, তা তো হলোই, লাভ হলো আল্লাহর রহমতে গৃহযুদ্ধ হলো না। দেশের মহানগর, শহর, বন্দর থেকে শুরু করে প্রত্যন্ত অঞ্চলে কিছু খুনোখুনি, আত্মসাৎ, মারামারি, ছিনতাইসহ নানা অমানবিক দুর্ঘটনা কিছুটা তো অবশ্যই হয়েছে। কিন্তু গৃহযুদ্ধ না হওয়ায় সরকার ও দেশবাসী এসবকে সামান্য ক্ষতি হিসেবে অনিচ্ছাকৃত হলেও গ্রহণ করে নিয়েছিল।
অন্তর্বর্তী সরকার এত তাড়াতাড়ি জাতীয় নির্বাচন চায়নি। তারা চেয়েছিল অন্তত ৩-৪ বছর অবস্থান করে দেশের খোলনলচে পাল্টে বিশ্বনন্দিত একটি গণতান্ত্রিক জাতীয় নির্বাচন দেশবাসীকে উপহার দেবেন। অন্তর্বর্তী সরকার ধারণা করেছিল, ডিপস্টেট ও সেক্যুলার স্টেটদের মাধ্যমে পতিত সরকার, দখলকারী সরকার ও প্রতিবেশী সরকারের মাধ্যমে যেকোনোভাবেই হোক, তারা একটু সময় নেয়ার ব্যবস্থা করতে পারবে। সে কারণেই অন্তর্বর্তী সরকার সংবিধান, নির্বাচনসহ দেশের মূল কাঠামোগুলোর সংস্কারে উঠেপড়ে লেগেছিল। কিন্তু যারা অদৃশ্যভাবে ক্ষমতায় ছিলেন, তারা বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে গ্রহণ করতে পারেননি। তারা নানা কারণে ভেবেছিলেন যে, সময়ক্ষেপণ করা হলে দেশ-বিদেশের মৌলবাদীরা সামনে এসে যাবে। বিষয়টি সামনে না এনে তারা বরং দেশ-বিদেশের সর্বত্র মেসেজ দিলেন যে, সময়ের ব্যাপারে ঢিলেঢালা থাকলে পতিত সরকার যেকোনো মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করার প্রয়াসে এগিয়ে আসবে। জাতীয় সংকট বাড়বে, অর্থনৈতিক সংকট বাড়বে, গৃহযুদ্ধজনিত নানাবিধ সংকট ও শঙ্কা দেশ, রাষ্ট্র ও জাতিকে ছারখার করে ফেলবে। অন্তর্বর্তী সরকার শিক্ষা ছাড়া প্রায় সকল মৌল বিষয়ে সংস্কারের বিষয়ে নানা বিপত্তি সত্ত্বেও এগিয়ে ছিলেন। কিন্তু প্রতিবেশী ও বৈদেশিক চাপে অন্তর্বর্তী সরকার বিরক্ত হয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে জাতীয় নির্বাচনের বিষয়ে দুই বছরের মাথায় সম্মতি প্রদান করতে বাধ্য হয়।
নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি, অব্যবস্থাপনা, চাপ প্রয়োগসহ ঋণখেলাপিদের সহযোগিতায় ন্যায়-অন্যায় মিলিয়ে একটা নির্বাচন অনেক বড় ঝঞ্ঝাট ছাড়া সম্পন্ন হয়ে গেল। নির্বাচনে যারা দ্বিতীয় পক্ষ হলেন, তারা বিষয়টিকে নানা যুক্তির বিবেচনায় নমনীয়ভাবে গ্রহণ করে নিলেন।
বিএনপি খুব সহজে ক্ষমতার আসনে আসীন হয়ে গেল। বিএনপির প্রধানমন্ত্রী বাবা-মায়ের অনুকরণ ও অনুসরণে এক ধরনের চলা শুরু করলেন। যার অনেকটাই তুল্যমূল্য করা চলে বিরোধীদলের প্রধান জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমানের সাথে। দুজনেরই লাস্ট নেইম ‘রহমান’। বিজ্ঞ আলেমগণ বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিমের অর্থ করেন ‘পরম করুণাময় ও দয়াময় আল্লাহর নামে’। প্রথমটি ‘আর রহমান’- যার অর্থ পরম করুণাময়। দ্বিতীয় শব্দটি হলো ‘রাহিম’- যার বাংলা অর্থ হলো দয়াময়। আমরা প্রথম শব্দটি নিয়ে এখানে আলোচনা করছি। এই শব্দটিতে বিশ্লেষকগণ বলেছেন, এটা হলো- তাৎক্ষণিক কোনো চাহিদা, অভাব, তৃষ্ণা, সঙ্গে সঙ্গে পূরণ করা। দ্বিতীয় শব্দটি এই মুহূর্তে আমাদের এই বিষয়ে সামঞ্জস্য হলেও এর একটা চিরস্থায়ী ব্যঞ্জনা, গুরুত্ব ও তাৎপর্য রয়েছে। প্রথমটি যদি ইহকালীন হয়, এই মুহূর্তের বিষয় হয়, তাহলে পরবর্তী শব্দটি হলো- পরকালের জন্য তাৎপর্যপূর্ণ শব্দ। এই মুহূর্তের কোনো চাহিদার বিষয় নয়। পরকালীন অনন্ত জীবনের চাহিদা। পরলোকের সুখ-শান্তি ও স্বস্তির অভিপ্রায়। রহমানের অর্থ এভাবে বোঝানো যায় গরমের চোটে আপনার তীব্র তৃষ্ণা পেয়েছে।
আপনি সঙ্গে সঙ্গে আল্লাহর রহমতে এক গ্লাস পানি পেলেন, আপনি বিসমিল্লাহ বলে পানিটি পান করে নিলেন। আপনার তৃষ্ণা নিবারণ হয়ে গেল। প্রয়োজনের সঙ্গে সঙ্গে প্রয়োজন পূরণ হয়ে যাওয়া, এর নামই হলো রহমত। এই রহমত যিনি প্রদান করেন, তিনি হলেন রহমান। রহমানের বাংলা অর্থ হলো- ‘পরম করুণাময়’। আল্লাহ ছাড়া আর কেউ ‘পরম করুণাময়’ হতে পারেন না।
বান্দা মহান আল্লাহর একনিষ্ট দাস হিসেবে এবং খলিফা বা প্রতিনিধি হিসেবে সৃষ্টির যেকোনো প্রয়োজন পূরণ করার জন্য সঙ্গে সঙ্গে উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেন। তখন তিনি হন আবদুর রহমান, শফিকুর রহমান, জিয়াউর রহমান, তারেক রহমান ইত্যাদি। তিনি নিজে নিজে রহমান হতে পারেন না।
আমরা গভীর অভিনিবেশেষের সঙ্গে লক্ষ করছি, সরকারপ্রধান ও বিরোধীদলীয় প্রধান সৃষ্টির না হলেও, মানুষের একাংশের তাৎক্ষণিক প্রয়োজন বা চাহিদা মেটানোর জন্য আন্তরিকভাবে চেষ্টা করছেন। দেশবাসীর দুঃখ-দুর্দশা সামনে পড়লেই তা নিরসনের চেষ্টা করছেন। এই বিশেষ জায়গাটিতে তাঁরা দুজনই এক ধরনের মনোভাব প্রকাশ করছেন। এটি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় নেয়ামত, রহমত ও বরকত। দেশ এখন বন্যায় ভাসছে। বিরোধীদলের নেতাকে আমরা দেখছি, তিনি ত্রাণসামগ্রী নিয়ে দুর্গত মানুষের উদ্ধারে ও সেবায় ঝাঁপিয়ে পড়েছেন।
তিনি ইতোমধ্যেই ঘোষণা দিয়েছেন, বন্যায় আক্রান্ত প্রতিটি পরিবারকে জামায়াতে ইসলামী পঞ্চাশ হাজার টাকা করে অনুদান প্রদান করবে। সরকার বা সরকারপ্রধানও এ বিষয়ে পিছিয়ে থাকবেন বলে মনে হয় না। পৃথক পৃথকভাবেই হয়তো ত্রাণকাজ চলবে। দেশে পারস্পরিক বিশ্বাস ও আস্থার ঘাটতি রয়েছে। তারপরও সরকার ও বিরোধীদল যদি একসাথে ত্রাণকাজের উদ্যোগ নিতে পারেন, সেটা হবে দেশ ও বিদেশের জন্য একটা বড় ধরনের উদাহরণ বা দৃষ্টান্ত। বাংলাদেশের এই ক্রান্তিকালে এ ধরনের উদ্যোগ অনেক বেশি প্রয়োজন। বিশেষ করে ভারত নির্বাচনের পর থেকে যে ধরনের পশুত্ব প্রদর্শন করছে, মসজিদ, মাদরাসা, এতিমখানাসহ মুসলিমদের সকল স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে চিরতরে ধ্বংস করছে, মুসলিমদের ওপর অন্যায়ভাবে বা অকারণে হত্যালীলা সংঘটিত করছে, নারীদের প্রকাশ্যে শালীনতা হরণ করছে, অপমানিত ও লাঞ্চিত করছে, তার বিপরীতে বাংলাদেশ চরম ধৈর্য ও সহ্য বজায় রেখে জননিরাপত্তা ও জান-মাল রক্ষায় বিপুল মানবিকতা প্রদর্শন করে ইতোমধ্যেই দেশ-বিদেশে অনেক প্রশংসা অর্জন করেছে। ভারত যদি বাংলাদেশের সকল নৈতিক ও মানবিক প্রচেষ্টাকে দুর্বল মনে করে আরো নৃশংস হয়, আরো অমানবিক হয়, তাহলে তো বাংলাদেশকে জবাব দিতেই হবে। সেক্ষেত্রে জাতীয় ঐক্য থেকে শুরু করে কোয়ালিশন সরকারও হয়তো গঠন করার চিন্তাভাবনা এগিয়ে যেতে পারে। দল থেকে দেশ বড়, সে বিষয়টি সামনে এসে যেতে পারে। সংসদে স্পিকারগণ যে গণতান্ত্রিক পরিবেশ তৈরি করার মহান ঐতিহাসিক উদ্যোগ গ্রহণ করেছেন, তাদের পাশাপাশি বিরোধীদলের সংসদ সদস্যবৃন্দসহ তাদের নেতা ডা. শফিকুর রহমান যেভাবে শোকর ও দুর্বার অবস্থান অবলম্বন করছেন, তা এ যুগে অচিন্তনীয়, অভাবনীয় ও অভূতপূর্ব। এমন সুন্দর সহাবস্থান হতভাগা দেশবাসীকে কিছু না কিছু দান করবে, ইনশাআল্লাহ।