দুর্যোগ এলেই তাড়াহুড়া, স্থায়ী সমাধানের পরিকল্পনা দরকার


১৫ জুলাই ২০২৬ ২১:০৫

॥ একেএম রফিকুন্নবী ॥
আমাদের ১৮ কোটি মানুষের দেশে বিপদ-আপদ লেগেই আছে। এটা স্বাভাবিক কারণে এমনটা নয়। বরং আমাদের কর্মের ফল। ৫৫ বছরে আমাদের দেশে দুর্যোগ এসেছে; মোকাবিলা করা হয়েছে, জানমালের ক্ষতি হয়েছে। মেনে নিতেই হয়েছে, যেহেতু এই দীর্ঘসময়ে বাস্তবিক কোনো পরিকল্পনা নেই দুর্যোগ মোকাবিলার। ঝড়-বৃষ্টি আসে স্বাভাবিক কারণেই। এটাই প্রকৃতির নিয়ম। আমরা যেহেতু ভাটির দেশ, তাই ওপরের দেশের বৃষ্টিবাদলের পানি এদিক দিয়ে গড়াবেই। উজানের দেশ ভারতও আন্তর্জাতিক আইন মানলে হঠাৎ বন্যার আশঙ্কা থাকবে না।
দুর্যোগ এলেই তাড়াহুড়া করে আমরা সরকারের ও বিরোধীদলের লোকেরা দৌড়ে যাই কিছু খাবার নিয়ে। কিন্তু এতে তো আবার দুর্যোগকবলিত লোকদের খুব একটা উপকার হয় না। ঝড়-বৃষ্টি হলে উঁচু এলাকার পানি আমাদের নদীনালায় ঢুকলেই পাশের পাড় ভাঙতে শুরু করে। গ্রামের পর গ্রাম নদীতে ভেসে যায়। মানুষ অসহায় হয়ে তাকিয়ে থাকে সরকার ও বিরোধীদলের সাহায্য-সহযোগিতার জন্য। দীর্ঘদিন এ অবস্থা দেখে আসছি, কিন্তু কোনো স্থায়ী পরিকল্পনার মুখ আমরা দেখিনি। উঁচু এলাকার পানি ভাটি এলাকায় আসবেইÑ এটাই প্রকৃতির খেলা। তাই পানি গড়ানোর পথ বের করতে হবে। অপরিকল্পিত বাঁধ-সড়ক তৈরি করে আমরা স্বাভাবিক পানির গতি বাধাগ্রস্ত করছি। ফলে আশপাশ এলাকায় পানি ঢুকে পড়ছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে যাচ্ছে। মানুষ অসহায় অবস্থায় দিনাতিপাত করছে।
ইদানিং চট্টগ্রামের এলাকায় বেশ কয়েকটি জেলায় বৃষ্টির কারণে পাহাড় ধসে অনেক মানুষ মারা গেছে। ঘরবাড়ি তলিয়ে গেছে। নতুন নতুন এলাকাসহ সিলেটের কয়েকটি জেলায় বন্যায় ছড়িয়ে গেছে। সাময়িক সাহায্য-সহযোগিতায় তাদের খুব একটা উপকার হচ্ছে না। এবারে তো ঢাকা শহরের রাস্তাঘাট পানিতে ভরপুর হয়ে গেছে। গাড়ির চাকা ডুবে যাচ্ছে। রিকশাও ঠিকমতো চলতে পারছে না। সবই আমাদের অপরিকল্পিত পরিকল্পনার কারণে। ঢাকা শহরে সবগুলো খাল তার গতি রক্ষা করে চলতে পারছে না। কোথাও ভরাট, কোথাও গতিরোধক বাঁধ দেয়ার কারণে পানি শহর থেকে বের হতে পারছে না। কোটি কোটি টাকার বাজেট ব্যয় করলেও সঠিক পরিকল্পনার অভাবে কোনো কাজ হচ্ছে না।
আমি নিজেই দেখেছি ধানমন্ডি লেকের যোগসূত্র ছিল পূর্ব-পশ্চিমের খালের মাধ্যমে পানি গভীর নদীতে পড়ে যেত। এখন এসব খালের অস্তিত্ব নেই। ঘরবাড়ি-রাস্তা হয়ে সবই এখন পাকা বিল্ডিংয়ে রূপ নিয়েছে। খাল উদ্ধারের হাঁকডাক মাঝেমধ্যে দিলেও কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না। থাইল্যান্ডের শহরের মধ্যে খালে ছোট ছোট লঞ্চ চলতে দেখেছি। তাই অতিসত্বর নির্বাচিত সরকারের দায়িত্ব ঢাকাসহ ৬৪ জেলার শহরগুলোয় যত খাল ছিল, তা উদ্ধার করা। পানির স্বাভাবিক প্রবাহ চালু রাখা। আমরা জনগণের প্রত্যাশা পূরণ করতে চাই। শাসক নয়, সেবার মানসিকতা নিয়ে সরকার ও বিরোধীদল এগিয়ে এলে জনগণের ভোগান্তি দূর করা সম্ভব। জগণের টাকা শুধুই লুটপাট হচ্ছে কাজের কাজ তেমন হচ্ছে না।
গত সোমবার দৈনিক ‘আমার দেশ’সহ প্রায় সব পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় ধানমন্ডি, আরামবাগ, নিউমার্কেটের ছবি দেখলে মনে হবে নদীর মতো পানি। নিউমার্কেট তো বন্ধ করেই দেয়া হয়েছে। ঢাকায় ৫৫ বছরের জীবনে এভাবে পানি আমার চোখে পড়েনি। খাল-বিল রক্ষার নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে। কাজের কাজ হয়নি। আমার জেলা পাবনাতে ইছামতি নদী সংস্কার করতে গিয়ে ভূমি দখলদারদের কারণে সরকারি কাজ বন্ধ রয়েছে। আমাদের দাবি সরকারের উচ্চমহল থেকে শুধু পাবনা নয়, দেশের সব এলাকার খাল-বিল চালু রাখার ব্যবস্থা নিতে হবে। একদিকে পানি নামার জায়গা হবে; অন্যদিকে মাছ চাষেরও ব্যবস্থা হবে। দেশি মাছ তো বাজারে পাওয়াই যায় না। শিং, মাগুর, খলিসা, টেংরা মাছ আমরা ছোটবেলায় মজা করে খেয়েছি।
পূর্বের কথা চিন্তা করে লাভ নেই। পাহাড়-পর্বতঘেরা নদী-নালা, খাল-বিল, সবই চালু রেখে পরিকল্পনা করতে হবে। নদনদীর গতি কোনোভাবেই বাধা সৃষ্টি করা যাবে না। বরং সব নদীনালা সচল করতে হবে। পাহাড় কাটা বন্ধ করতে হবে। পাহাড়ের ওপর বসবাসের লোকদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে।
১১ দলীয় জোটের জোটের নেতা আমীরে জামায়াত ও জাতীয় সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান যেমন সাধারণ বেশে চট্টগ্রামের পানিতে ভাসা লোকদের সহযোগিতার জন্য পানির মধ্যেই নেমে পড়েছেন, এমনিভাবে দেশের সরকারের লোকসহ ধনী লোকদের বের হয়ে পড়তে হবে দুর্গত লোকদের সহযোগিতার জন্য।
সরকারের পক্ষ থেকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবেÑ ঝড়-বৃষ্টি আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময়ে কীভাবে তা মোকাবিলা করা যাবে, তার ব্যবস্থা করা। প্রয়োজনে আশ্রয়কেন্দ্র বানাতে হবে পরিকল্পিতভাবে। নিচু জায়গায় ঘর বানাতে হিসাব রাখতে হবে পানি বাড়লে যাতে পানি ঘরে না ওঠে। সেভাবেই ঘর বানাতে হবে। ইতোমধ্যেই পত্রিকায় দেখলাম, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ধানমন্ডি ও গুলশান লেকের উন্নতির জন্য পরিকল্পনা করছেন। ভালো উদ্যোগ। পৃথিবীতে পানির পরিমাণ ৭০ শতাংশ। তাই পানির ব্যবহার মানুষের উপকারের জন্য কাজে লাগাতে হবে। পানি কোনোভাবেই এক দেশ আটকে রাখতে পারবে না। পানি আল্লাহর দেয়া, তাই পানির গতি রোধ করে কাউকে বাঁধ বানাতে দেয়া যাবে না।
প্রয়োজনে প্রতিবেশী দেশের পানি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে সবার প্রয়োজন নিশ্চিত করতে হবে। কাউকে দাদাগিরি করতে দেয়া যাবে না। হরমুজ প্রণালী থেকে শুরু করে নদী-সমুদ্র সবই মহান আল্লাহর সৃষ্টি। তাই আল্লাহর সৃষ্টির সর্বোত্তম ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্যই দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিতে হবে।
আমাদের দুর্যোগ মন্ত্রণালয়কে সাময়িক ব্যবস্থার চেয়ে দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিতে হবেÑ যাতে দুর্যোগ আসার আগেই আমরা সজাগ থাকতে পারি। বিভিন্ন দুর্যোগ হঠাৎ করেই আসে না। বিভিন্ন সিজনে বিভিন্নভাবে দেশে দুর্যোগ আসে। তাই বৃষ্টিবাদল আসে। পানি বৃদ্ধি পায়। তাই বিভিন্ন সময়ের উপযোগী পরিকল্পনা নিয়েই দেশ চালাতে হবে। মানুষসহ অন্যান্য জীবজন্তু যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে তাদের চলাফেরা করতে পারে, তার দীর্ঘস্থায়ী পরিকল্পনা নিতে হবে।
প্রকৃতির ওপর খারাপ ব্যবহার করলে প্রকৃতিও তার বদলা নেবে। তাই প্রকৃতির ধারাবাহিকতা মেনেই আমরা প্রস্তুতি নেব। বৃষ্টির দিন একটি ছাতা হাতে নিয়ে চলতে হবে, বৃষ্টি রোদ থাকুক আর না থাকুক। চেষ্টা করতে হবে অন্যকে প্রাধান্য দিয়ে চলা। কারো ক্ষতি হয় এমন পরিকল্পনা করা যাবে না। মুক্ত-স্বাধীন দেশে ২০২৪-এর জুলাই বিপ্লবকে ধামাচাপা দেয়ার সুযোগ নেই। হাসিনা সরকারের গুম, খুন, আয়নাঘর, জেল-জুলুম সহ্য করেই ছাত্র-জনতা মাঠে নেমেছিল গুলির তোয়াক্কা না করে। শহীদ আবু সাঈদ প্রকাশ্যে হাত উঁচিয়ে পুলিশকে বার্তা দিয়ে গেছে। তোমাদের গুলির ভয় তরুণরা করে না। প্রায় ১৪০০ শহীদ আর ৩০ হাজারের অধিক পঙ্গু, হাত-পাহারা আহতদের কান্নার প্রতি দরদভরা দৃষ্টি রেখেই আমাদের নেতাদের চলতে হবে। সরকারি বা বিরোধীদলের নেতাই হোক, অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনে এগুতে হবে। দলবাজি, চাঁদাবাজি, দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গড়ে তুলেই আমাদের দুর্যোগ মোকাবিলা করতে হবে। আমরা সুস্থ মনে এগোলে আল্লাহর সাহায্য আসতে সময় লাগবে না। আল্লাহ বলেছেন, ‘তোমরা আগালে আমিও আগাবো, তোমাদের সাহায্য করার জন্য।’ আবার যারা আল্লাহর বিরোধিতা করবে, তাদের আল্লাহ ফেরাউন-নমরূদ-হামান-আব্রাহাদের মতো নাস্তানাবুদ করে দেবেন।
আমরা এক আল্লাহ বিশ্বাসী হয়ে সমাজ চালাতে এগিয়ে এলে আল্লাহও আমাদের দিকে এগিয়ে আসবেন, আমাদের সাহায্য করবেন। কোনো সন্দেহ নেই।
মনে রাখতে হবে প্রতারণার সব জাল আল্লাহর কাছে উন্মুক্ত। কোনো ফাঁকি দেয়া যাবে না। অণুপরিমাণ ভালো কাজ ও অণুপরিমাণ খারাপ কাজের হিসাব আল্লাহ নেবেন তার পরিকল্পনায়ই। আমরা দুনিয়ার কাছে ফাঁকি দিতে পারবো। কিন্তু আল্লাহর কাছে বিশ্বাসী বা অবিশ্বাসী কেউই ফাঁকি দিতে পারবে না।
স্বৈরাচার হাসিনা দীর্ঘদিন কুশাসনে, দেশকে খালি করে দাদার দেশে পালিয়েছে তার দলবল, এমপি-মন্ত্রী, বিচারপতি, ইমাম, পিয়নসহ। দুনিয়ার ইতিহাসে বিরল ঘটনা। আবার মাঝেমধ্যে উঁকিঝুঁকি দিয়ে আবোল-তাবোল বলে দেশে ফিরবে। মানা করছে কে? আমরা চাই দেশে এসে ফাঁসির মামলা ফেস করুক। হয় ফাঁসিতে ঝুলবে অথবা ছাড়া পেয়ে টুঙ্গিপাড়ায় তার বাপের বাড়িতে থাকবে। কেউ বাধা দেবে না। তবে সে যে পাপ করেছে শতবার ফাঁসি দিলেও তার ক্ষমা নেই। দুনিয়ায়ও না আখিরাতে তো রয়েছে আগুনের মধ্যে সীমাহীন জীবন। আমরা কারো ব্যাপারে মন্দ কামনা করি না। তবে কেউ মন্দ করলে আমরা ঠেকাবো কীভাবে? দেশের লাখ লাখ কোটি টাকা লুট করে বিদেশে ঘরবাড়ি যারা করেছে দেশের মানুষ ঠকিয়ে তাদের কপালে সুখ বলে কিছু নেই। আমরা এ পৃথিবীতে মুসফিরের মতো চলতে চাই আর আখিরাতে রাজা-বাদশাহর মতো বাঁচতে চাইÑ এই আমাদের কামনা মহান আল্লাহর কাছে। যে আল্লাহ আমাদের সবকিছু দেখেন আর সব কিছুই জানেনÑ তা আমরা প্রকাশ করি আর নাই করি।
আমাদের সরকারকে বলতে চাই, আপনারা জুলাই বিপ্লবের ফসল। তাই টালবাহানা বা ছলচাতুরি না করে অতিসত্বর জুলাই সনদ ও গণভোটের দাবি মেনে নিয়ে দুনিয়ায় শান্তি ও আখিরাতের মুক্তির উদ্যোগ নিন। দুনিয়ায় কেউই চিরদিন বাঁচবে না। এই তো কর্মতৎপর ব্যারিস্টার জমির উদ্দিন সরকার ইন্তেকাল করেছেন। সরকারি ও বিরোধীদল চোখের পানিতে ও ভালোবাসায় বিদায় দিল। আমাদেরও মরতে হবে। প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানও শহীদ হয়েছেন, বেগম জিয়াও ইন্তেকাল করেছেন, আবার শেখ মুজিবও মারা গেছেন। তারা দুনিয়াতেই মানুষের ভালোবাসা ও কর্মের ফল পেয়ে গেছেন। প্রত্যেকেই তাদের কর্মফলের ফল পাবে আল্লাহর কাছে। আমরা ভালো মৃত্যু কামনা করি।
আমি ফিরে আসি দুর্যোগ নিয়ে কথায়। সরকারকে মনে করিয়ে দিতে চাই আপনাদের প্রত্যেক এমপি, মন্ত্রীদের বলে দিন, তারা যেন আল্লাহর ওয়াস্তে দুর্নীতি না করে জনগণের ভালোবাসা নিয়ে এলাকার উন্নয়নের পরিকল্পনা নেন। কোনো অবস্থায়ই অপচয় করা যাবে না। সংযোগ সড়ক ছাড়া ব্রিজ বানানো যাবে না। আবার আমার এলাকার মতো সরকারি মসজিদ করেছে, যেখানে মানুষজন নেই। আমি একদিন মসজিদ দেখার জন্য উপজেলায় গেলাম। দেখি মসজিদের নিচতলায় সব অফিস চলছে। জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, আমরা জনগণের চলাচলের জায়গায় মসজিদটি করতে বলেছিলাম, কিন্তু তখন সরকারি লোক টাকা-পয়সা লুট করার জন্য জনশূন্য স্থানে মসজিদে করে রেখেছে। এ জাতীয় পরিকল্পনা করা যাবে না।
আমাদের বিশ্বাস, সরকারি দল ও বিরোধীদল মিলে ৫৫ বছরের সব ঘাটতি মোকাবিলা করে ২০২৪-এর বিপ্লবোত্তর দেশে জনগণের জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করে বাড়তি খরচ বাদ দিয়ে প্রকৃত খরচে দেশে কাজ করি। দেশের উন্নতি হবে। আমরা জনদরদির মূল্যায়ন পাব। আল্লাহর কাছেও পাব সীমাহীন সুখী জীবন, যার শেষ নেই।
লেখক : সাবেক সিনেট সদস্য, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল : rnabi1954@gmail.com