ফ্যাসিস্ট হাসিনাও ফিরতে পারবে না
১৫ জুলাই ২০২৬ ২১:২২
॥ ফেরদৌস আহমদ ভূইয়া ॥
জনগণের প্রয়োজনেই রাষ্ট্র তৈরি হয়েছে এবং জনগণের জন্যই রাষ্ট্র, রাষ্ট্র জনগণের কল্যাণেই সবকিছু করবে- এটাই হচ্ছে রাষ্ট্র তৈরির প্রধান মূলনীতি ও দর্শন। অবশ্য এ রাষ্ট্রটি পরিচালনার জন্য জনগণ সরকার নামক একটি সংস্থা বা রাষ্ট্রের অঙ্গকে দায়িত্ব পালনের জন্য মনোনয়ন বা নির্বাচিত করে। আর সরকার নামক সংস্থাটিতে দেশের মুষ্টিমেয় কয়েক ডজন বা বড়জোর শতাধিক লোককে দায়িত্ব প্রদান করা হয়ে থাকে। সরকার রাষ্ট্রের একটি বিভাগ বা অঙ্গ হলেও এটি সার্বভৌম ক্ষমতার অধিকারী দেশের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ। সরকার বিভিন্ন পদ্ধতিতে এ দায়িত্ব পেয়ে থাকে, হয় সরাসরি ভোট প্রদানের মাধ্যমে, না হয় পরোক্ষ ভোটের মাধ্যমে। অবশ্য কোনো কোনো রাষ্ট্রে মুষ্টিমেয় লোক শক্তি প্রয়োগ করে এ দায়িত্ব বা ক্ষমতা গ্রহণ করে থাকে। আদর্শিক দৃষ্টিভঙ্গিতে এটা রাষ্ট্র পরিচালনা করাটা একটা দায়িত্বই, কিন্তু সাম্প্রতিককালে এটাকে ক্ষমতা নামেই অভিহিত করছেন রাজনৈতিক ময়দান থেকে শুরু গণমাধ্যমসহ সবমহলেই। তাই বর্তমানকালে যখন কোনো দেশে একটি দল রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য সরকার গঠন করে, তখন ঐ দলকে ক্ষমতাসীন দল বলা হয়ে থাকে। এভাবে বর্তমানে রাষ্ট্র পরিচালনার কাজটাকে দায়িত্ব না বলেই অধিকাংশ সময়ই ক্ষমতা হিসেবেই অভিহিত করা হয়ে থাকে। শুধুমাত্র বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারই বলত তারা দেশের জনগণের জন্য দায়িত্ব পালন করতে এসেছে। অবশ্য বর্তমান সরকারের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তার মন্ত্রীদের কেউ কেউ দায়িত্ব পালন করা প্রত্যয় শব্দটিই ব্যবহার করছেন। তবে সারা বিশ্বেই রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালন করাটাকে ক্ষমতা নামক শব্দটিই বেশি ব্যবহৃত হয়ে আসছে। আর তাই গণতান্ত্রিক এবং অগণতান্ত্রিক সব দেশেই সরকারের দায়িত্ব পালন করা দলটিকে ক্ষমতাসীন দলই বলা হয়ে থাকে। কিন্তু এখানেও ক্ষমতাসীন দল না বলে সরকারি দল বললেই ভালো হতো। ক্ষমতাসীন দল বলতে বলতে একসময় সরকারি দলটি প্রকৃত অর্থেই বাস্তবে ক্ষমতা প্রয়োগ করা শুরু করে। রাষ্ট্র সরকার, প্রশাসন, বিচার বিভাগ, আইন বিভাগ থেকে শুরু করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনী, নিরাপত্তা বাহিনীসহ সবক্ষেত্রেই ক্ষমতা প্রয়োগ শুরু করে। একপর্যায়ে জনগণের ওপরও ক্ষমতাসীন দল রাষ্ট্রযন্ত্র ব্যবহার করে সাধারণ জনগণের ওপর এমনভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ শুরু করে, যা তাদের স্বৈরাচারে পরিণত করে।
আর এভাবে বাংলাদেশসহ তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোয় স্বৈরাচারী শাসক তৈরি হয়ে থাকে। যেমন বাংলাদেশের সর্বশেষ স্বৈরাচারী শাসক হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল শেখ হাসিনা। শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্বের অনেক দেশেই শেখ হাসিনার মতো অনেক স্বৈরাচারী শাসক তৈরি হয়েছিল। আর তাদের কমন পরিণতি হয়েছিল জনগণের প্রতিবাদ, ধিক্কার ও ঘৃণার মুখে দেশ থেকে পলায়ন।
বিগত একশত বছরের রাজনৈতিক ইতিহাস পর্যালোচনা করলে আমরা ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, রেজা শাহ পাহলভী, মার্কোস থেকে শুরু করে কিউবার বাতিস্তা, উগান্ডার ইদি আমিন ও সিরিয়ার বাশার আল আসাদরা স্বৈরাচারী শাসনের কারণে দেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছে। পলাতক স্বৈরাচারদের তালিকাটি অনেক দীর্ঘ। তাদের সবাইকে বিদেশের মাটিতেই শেষ জীবন কাটাতে হয়েছে।
বিশ্বের যেসব স্বৈরাচার পালিয়েছে
তাদের মধ্যে উল্লেখযোগ্যরা হচ্ছেন বাতিস্তা, রেজা শাহ পাহলভী, মার্কোস, ইদি আমিন, বাশার আল আসাদ ও শেখ হাসিনা।
১. এশিয়া মহাদেশের বাংলাদেশের ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা, ২০২৪, ইতোপূর্বে তার পিতা শেখ মুজিবুর রহমান রক্তাক্ত অভ্যুত্থানে নিহত হয়েছিলেন, ১৯৭৫; সিরিয়ার বাশার আল-আসাদ, ২০২৪; শ্রীলঙ্কার গোতাবায়া রাজাপাকসে, ২০২২; আফগানিস্তানের আশরাফ ঘানি, ২০২১ ও হামিদ কারজাই; ইরানের মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী, ১৯৭৯; ফিলিপাইনের ফার্দিনান্দ মার্কোস, ১৯৮৬; দক্ষিণ কোরিয়ার সিঙম্যান রি, ১৯৬০।
২. আফ্রিকা মহাদেশ : উগান্ডার ইদি আমিন, ১৯৭৯; তিউনিসিয়ার জিনে এল-আবিদিন বেন আলী, ২০১১; চাদের হিসেন হাবরে, ১৯৯০; মৌরিতানিয়ার মোস্তফা ওল্ড সালেক, ১৯৭৯; সোমালিয়ার মুহাম্মদ সিয়াদ্ বার্রে, ১৯৯১; মধ্য আফ্রিকান প্রজাতন্ত্রের জ্যঁ-বেডেল বোকাস, ১৯৭৯; হাইতির জ্যঁ-ক্লদ দুভালিয়ের, ১৯৮৬; জায়ারে/কঙ্গোর স্বৈরাচার মুবুতু সেসে সেকো, ১৯৯৭; হাইতির জঁ-বার্ট্রান্ড অ্যারিস্টিড, ২০০৪।
৩. লাতিন আমেরিকা : কিউচার ফুলগেন্সিও বাতিস্তা, ১৯৫৯; ভেনেজুয়েলার মার্কোস পেরেজ জিমিনেজ, ১৯৫৮; গুয়েতেমালার হোর্হে সেরানো এলিয়াস, ১৯৯৩; নিকারাগুয়ার আনাস্তাসিও সোমোজার, ১৯৭৯; পেরুর আলবার্তো ফুহিমোরি, ২০০০ এবং চিলির অগাস্তো পিনোচে, ১৯৯০।
৪. ইউরোপ মহাদেশ : জার্মানির দ্বিতীয় উইলিয়াম (কাইজার দ্বিতীয় উইলিয়াম), ১৯১৮; ইউক্রেনের ভিক্টর ইয়ানুকোভিচ, ২০১৪: রুমানিয়ার কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কু ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরের এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। উল্লেখিত স্বৈরশাসকদের বাইরেও বিশ্বের আরো অনেক ফ্যাসিস্ট শাসক অগণতান্ত্রিক কার্যকলাপের কারণে দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়েছেন।
ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচারদের পতনের কারণ
স্বৈরাচারের পতন কেবল একটি নির্দিষ্ট সরকারের অবসান নয়, বরং এটি রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান, অর্থনৈতিক সংকট এবং জনঅসন্তোষের সম্মিলিত বিস্ফোরণের ফল। রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, পৃথিবীর সব স্বৈরাচারী বা কর্তৃত্ববাদী শাসকের পতনের পেছনে কিছু সুনির্দিষ্ট এবং সাধারণ সামাজিক ও রাজনৈতিক নিয়ামক কাজ করে।
জবাবদিহির অভাব ও প্রাতিষ্ঠানিক পতন : রাষ্ট্রবিজ্ঞানী হ্যারল্ড লাস্কির তত্ত্ব অনুযায়ী, সরকার হলো রাষ্ট্রের চালিকাশক্তি ও মুখপাত্র। স্বৈরাচারী ব্যবস্থায় যখন বিচার বিভাগ, আইনসভা এবং আমলাতন্ত্রের মতো মৌলিক স্তম্ভগুলো সম্পূর্ণ ধ্বংস করে শাসকের অনুগত করা হয়, তখন রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ ভারসাম্য নষ্ট হয়ে শাসনব্যবস্থা ভেঙে পড়ে।
অর্থনৈতিক লুণ্ঠন ও বঞ্চনা : বিশ্লেষকদের মতে, স্বৈরাচারী শাসনে অর্থনৈতিক ক্ষমতা গুটিকয়েক সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর (Oligarchs) হাতে কেন্দ্রীভূত হয়। তীব্র অর্থনৈতিক বৈষম্য, দুর্নীতি, মুদ্রাস্ফীতি এবং তরুণদের কর্মসংস্থানের অভাব জনগণকে দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অনুভূতি দেয়, যা তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করে।
পদ্ধতিগত দমন-নিপীড়ন : রাজনৈতিক দার্শনিক হানা আরেন্ট তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন, স্বৈরাচারী বা সর্বগ্রাসী শাসকেরা ভয় ও ত্রাস সৃষ্টি করে সমাজকে বিচ্ছিন্ন (Atomized) করে রাখে। কিন্তু দমনের মাত্রা যখন চরম সীমায় পৌঁছায়, তখন মানুষের মন থেকে ভয়ের প্রাচীর ভেঙে যায় এবং গণঅভ্যুত্থানের সূচনা হয়।
ভুল তথ্যের ফাঁদ (Information Bubble) : আধুনিক রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, স্বৈরশাসকরা প্রায়ই নিজস্ব গোয়েন্দা সংস্থা ও চাটুকার পরিবেষ্টিত থাকেন। ফলে তারা মাঠপর্যায়ের প্রকৃত জনঅসন্তোষ ও ক্ষোভের মাত্রা আঁচ করতে পারেন না। প্রদীপ নিভে যাওয়ার আগে যেমন ধপ করে জ্বলে ওঠে, স্বৈরাচারও পতনের ঠিক আগ মুহূর্ত পর্যন্ত নিজেদের অপরাজেয় মনে করে দমন-পীড়ন বাড়িয়ে দেয়।
বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের প্রতিটি দেশেই ফ্যাসিস্ট ও স্বৈরাচাররা ক্ষমতাকে কুক্ষিগত করতে দেশের সব অঙ্গ ও প্রতিষ্ঠানগুলো ধ্বংস করে দেয়। একপর্যায়ে ক্ষমতাকে নিজেদের ভোগবিলাসের উপায় হিসেবে ব্যবহার শুরু করে। তখনই সাধারণ জনগণ ফুঁসে উঠে রাস্তায় নেমে আসে, আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়। তারপর হয় গণঅভ্যুত্থান ঘটে না হয় রক্তাক্ত অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটে।
স্বৈরাচারদের শেষ পরিণতি
শুধু ফ্যাসিস্ট হাসিনাই নয়, কিউবার বাতিস্তা থেকে শুরু করে উগান্ডার ইদি আমিন, ফিলিপাইনের মার্কোস ও ইরানের রেজা শাহ পাহলভীদের কেউই দেশে ফিরতে পারেননি, বরং তাদের অনেকেরই মৃত্যু হয়েছে বিদেশের মাটিতে।
শেখ হাসিনা, বাংলাদেশ, ২০২৪ : তীব্র ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে ৫ আগস্ট ২০২৪ তারিখে প্রধানমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করে ভারতে পালিয়ে যান। ফ্যাসিস্ট হাসিনা এখন পর্যন্ত ভারত সরকারের তত্ত্বাবধানে নিরাপদেই দিল্লিতে অবস্থান করছেন।
বাশার আল আসাদ, সিরিয়া : ২০২৪ সালের ৮ ডিসেম্বর ইসলামপন্থী সশস্ত্র গোষ্ঠী হাইআতু তাহরির আল-শামের (এইচটিএস) নেতৃত্বে বিদ্রোহী যোদ্ধারা রাজধানী দামেস্ক দখল করলে বাশারের ২৪ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। এর মাধ্যমে সিরিয়ায় দীর্ঘ ৫৩ বছরের আসাদ পরিবারের একচ্ছত্র কর্তৃত্বের পতন হয়। ক্ষমতাচ্যুত একনায়ক বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে রাশিয়ার মস্কোতে রাজনৈতিক আশ্রয় নিয়েছেন। এখনো তিনি রাশিয়ায় অবস্থান করছেন।
গোতাবায়া রাজাপাকসে, শ্রীলঙ্কা, ২০২২ : চরম অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের তীব্র বিক্ষোভের মুখে প্রেসিডেন্ট প্যালেস ছেড়ে প্রথমে মালদ্বীপ এবং পরে সিঙ্গাপুরে পালিয়ে যান।
আশরাফ ঘানি, আফগানিস্তান, ২০২১ : তালেবান বাহিনী রাজধানী কাবুল দখল করার মুহূর্তে তিনি দেশ ছেড়ে পালিয়ে সংযুক্ত আরব আমিরাতে আশ্রয় নেন। বর্তমানে তিনি রাজধানী আবুধাবিতে নির্বাসিত আছেন।
ফার্দিনান্দ মার্কোস, ফিলিপাইন : ১৯৮৬ সালে এক রক্তক্ষয়ী ‘পিপলস পাওয়ার’ গণঅভ্যুত্থানের মুখে ফিলিপাইনের তৎকালীন স্বৈরশাসক ফার্দিনান্দ মার্কোসের পতন ঘটে। জনরোষের কারণে তিনি ক্ষমতা হারিয়ে সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াইতে নির্বাসনে যেতে বাধ্য হন। পরবর্তীতে ১৯৮৯ সালে নির্বাসিত অবস্থায় সেখানেই তার মৃত্যু হয়।
মোহাম্মদ রেজা শাহ পাহলভী, ইরান, ১৯৭৯ : ইসলামী বিপ্লবের চূড়ান্ত পর্যায়ে তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে পরিবারসহ ইরান ছেড়ে পালিয়ে যান এবং মিশরে আশ্রয় নেন। পরবর্তীতে ক্যান্সারে আক্রান্ত হয়ে ১৯৮০ সালে মিশরের কায়রোতে নির্বাসিত অবস্থায় মৃত্যু হয় এ স্বৈরশাসকের শ্রীলঙ্কার প্রেসিডেন্ট গোতবায়া রাজাপাকসে।
জিনে এল আবেদিন বেন আলী, তিউনিসিয়া, ২০১১ : ‘আরব বসন্ত’ এ অঞ্চলে গণবিক্ষোভের প্রতীকী নাম তীব্র গণবিক্ষোভের মুখে মাত্র কয়েকদিনের মাথায় সৌদি আরবে পালিয়ে যান।
ইদি আমিন, উগান্ডা, ১৯৭৯ : তানজানিয়ান সেনাবাহিনীর সহায়তায় উগান্ডার বিদ্রোহীরা রাজধানী দখল করলে তিনি প্রথমে লিবিয়া ও পরে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। দীর্ঘদিন আড়ালে থাকার পর ২০০৩ সালের ১৬ আগস্ট কিডনি বিকলজনিত সমস্যার কারণে জেদ্দার কিং ফয়সাল স্পেশালাইজড হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
মেনগিস্টু হায়লে মারিয়াম, ইথিওপিয়া, ১৯৯১ : বিদ্রোহী বাহিনী রাজধানী এদ্দিস আবাবার কাছাকাছি চলে এলে তিনি জিম্বাবুয়েতে পালিয়ে যান।
মুবুতু সেসে সেকো, জাইর/গণতান্ত্রিক কঙ্গো প্রজাতন্ত্র, ১৯৯৭ : বিদ্রোহীদের অগ্রযাত্রার মুখে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে প্রথমে টোগো এবং পরে মরক্কোয় পালিয়ে যান।
রুমানিয়ার নিকোলাই চসেস্কু : রুমানিয়ার কমিউনিস্ট স্বৈরশাসক নিকোলাই চসেস্কু ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরের এক রক্তক্ষয়ী গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত হন। ২৪ বছর ধরে অগণতান্ত্রিকভাবে দেশ শাসনে সাধারণ জনগণ অতিষ্ঠ হয়ে আন্দোলন সংগ্রাম গড়ে তুলে। স্বৈরশাসক চসেস্কু এবং তার স্ত্রী এলিনা চসেস্কুকে ক্ষমতাচ্যুতির মাত্র তিন দিন পর, ১৯৮৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর সামরিক আদালতের সংক্ষিপ্ত বিচারে ফায়ারিং স্কোয়াডের মাধ্যমে তাদের মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়।
ফুলগেনসিও বাতিস্তা, কিউবা : ১৯৫৮ সালের শেষের দিকে ফিদেল কাস্ত্রো ও চে গুয়েভারার গেরিলা বাহিনীর কাছে বাতিস্তার সরকারি বাহিনী একের পর এক যুদ্ধে পরাজিত হতে থাকে। মধ্যরাতে পলায়ন: ১৯৫৯ সালের ১ জানুয়ারির ভোরে, পরাজয় নিশ্চিত জেনে বাতিস্তা তার পরিবার এবং ঘনিষ্ঠ সহযোগীদের নিয়ে উড়োজাহাজে করে কিউবা থেকে ডোমিনিকান রিপাবলিকে পালিয়ে যান। ১৯৭৩ সালে স্পেনে নির্বাসিত অবস্থায় মারা যান বাতিস্তা।
জিন-ক্লদ দুভালিয়ার, হাইতি, ১৯৮৬ : তীব্র গণবিক্ষোভ ও মার্কিন চাপের মুখে ক্ষমতা ছেড়ে ফ্রান্সে পালিয়ে যান।
আলবার্তো ফুজিমোরি, পেরু, ২০০০ : দুর্নীতির কেলেঙ্কারির মধ্যে একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলনে যোগ দিতে গিয়ে ব্রুনাই থেকে জাপানে পালিয়ে যান এবং সেখান থেকেই ফ্যাক্সের মাধ্যমে পদত্যাগপত্র পাঠান।
রয়টার্সের সাথে সাক্ষাৎকার হাসিনার দেশে ফেরার দুরাশা
ভারতে পালিয়ে যাওয়া বাংলাদেশের ক্ষমতাচ্যুত সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রয়টার্সের সাথে এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, আগামী ডিসেম্বরের দিকে দেশে ফেরার পরিকল্পনা করছেন। দেশে ফেরার পর তিনি এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের জ্যেষ্ঠ নেতারা আদালতে আত্মসমর্পণ করবেন বলে জানিয়েছেন।
গত ৯ জুলাই বৃহস্পতিবার গভীর রাত থেকে শুক্রবার পর্যন্ত প্রায় এক ঘণ্টার টেলিফোন সাক্ষাৎকারে রয়টার্সকে এসব কথা বলেন শেখ হাসিনা।
রয়টার্স বলছে, ২০২৪ সালে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর এই প্রথম কোনো সংবাদমাধ্যমকে সরাসরি সাক্ষাৎকার দিলেন তিনি।
তবে তিনি বলেছেন, ‘দুই বছর আগে দেশ ছেড়ে তারা ভারতে আশ্রয় নিলেও এখন স্বেচ্ছায় ফিরে আদালতের মুখোমুখি হতে চান।’ হাসিনা বলেন, ‘দেশে ফেরার পর তারা আমাকে গ্রেপ্তার করতে পারে; এমনকি হত্যাও করতে পারে। তারপরও আমাকে যেতে হবে।’
শেখ হাসিনা কী ফিরতে পারবে?
অতীতে বিশ্বের কোনো স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিস্টদের দেশে ফেরার নজির নেই বললেই চলে। জার্মানির উইলিয়াম, কিউবার বাতিস্তা, ফিলিপাইনের মার্কোস, উগান্ডার ইদি আমিন থেকে শুরু করে নিকট অতীতের ইরানের রেজা শাহ পাহলভী, সিরিয়ার বাশার আল আসাদ ও আফগানিস্তানের আশরাফ গানিদের কেউই স্বদেশের মাটিতে ফিরতে পারেননি। বরং বাতিস্তা, মার্কোস, ইদি আমিন ও বাতিস্তাসহ অনেককেই বিদেশের মাটিতেই মৃত্যু হয়। সর্বোপরি স্বৈরাচারী শাসক ও ফ্যাসিস্টদের শেষ পরিণতি কারোরই ভালো হয়নি। এক-দুইজন দেশে ফিরলেও হয় কারাগারে, না হয় গৃহবন্দি অবস্থায় অত্যন্ত অমানবিকভাবে ঘৃণিত জীবনযাপন করতে হয়েছে।
কিন্তু ফ্যাসিস্ট হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার মাত্র দুই বছর পর দেশের ফেরার দুঃস্বপ্ন দেখছেন। আওয়ামী সমর্থক সাংবাদিক ও গণমাধ্যমগুলোর সাথে গোপন জায়গা থেকে সাক্ষাৎকার দিয়ে বলেছেন, তিনি ডিসেম্বরে দেশে ফিরবেন। কিন্তু স্বৈরশাসক ও ফ্যাসিস্টদের পলায়ন ও স্বদেশে ফিরার ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, অধিকাংশই দেশে ফিরতে পারেননি; বরং তাদের বিদেশের মাটিতেই মরতে হয়েছে। তাই শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার বিষয়টি খুবই ক্ষীণ দুরাশা আওয়ামী জনগোষ্ঠির জন্য।
সাক্ষাৎকারে শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে সাংবাদিকরা আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুনালের চিফ প্রসিকিউটরের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে আমিনুল ইসলাম বলেন, ‘সরকার তাকে ভারত সরকারের কাছে ফেরত দেওয়ার অনুরোধ জানিয়েছে। এখন প্রশ্নটা হচ্ছে যে তিনি যদি ভারত সরকারের নিয়ন্ত্রণে থাকেন, তাহলে তো নিজে নিজে তার আসার কোনো সুযোগ নাই। হয় প্রত্যর্পণ চুক্তির (এক্সট্রাডিশন) আওতায় তাকে বাংলাদেশ সরকারের কাছে হ্যান্ডওভার করা হবে অথবা তাকে পুশব্যাক করবে।’
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘দেশে ফিরে সরাসরি আত্মসমর্পণের কোনো আইনি সুযোগ নেই। প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ফিরলে তাঁকে গ্রেপ্তার হয়েই কারাগারে যেতে হবে।’ নেতাকর্মীদের দিয়ে দেশকে অস্থিতিশীল করার জন্য শেখ হাসিনা এমন বক্তব্য দিয়েছেন বলে মনে করেন আমিনুল ইসলাম।
ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সরকার তাকে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য দ্বিপক্ষীয় প্রত্যর্পণ চুক্তির আওতায় ভারতের কাছে হস্তান্তরের অনুরোধ জানিয়েছে। কিন্তু ভারত সরকার বাংলাদেশের অনুরোধের ব্যাপারে কোনো সদুত্তর দিচ্ছে না।
শেখ হাসিনার দেশে ফেরার বিষয়টির সাথে অনেক বিষয় জড়িত। প্রথমত, ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কূটনৈতিক বোঝাপড়া। সবচেয়ে বড় বিষয়টি হচ্ছে শেখ হাসিনা ও আওয়ামী লীগ নিয়ে বিএনপি সরকারের পলিসি। তবে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিএনপি ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও আওয়ামী লীগের ব্যাপারে কঠোর অবস্থানেই আছেন। তারেক রহমান তাদের ঘনিষ্ঠজনদের বলেছেন, শেখ হাসিনার কারণেই বর্তমান প্রধানমন্ত্রীকে দেশ ছাড়তে হয়েছে, লন্ডনে ১৬ বছর নির্বাসনে থাকতে হয়েছে, তার মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে নিজস্ব বাসভবন থেকে উচ্ছেদ করে কারাগারে বিনাচিকিৎসায় অসুস্থ হয়ে জীবন দিতে হয়েছে এবং বিএনপিকে বিগত ১৬ বছর রাজনীতি, নির্বাচন ও ভোট করতে দেয়া হয়নি। সেই ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও আওয়ামী লীগকে বর্তমান তারেক রহমানের সরকার সহজে মেনে নেবে বলে মনে করছেন না রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা। অপরদিকে গণঅভ্যুত্থানের প্রধান স্টেকহোল্ডার বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ও এনসিপিও শেখ হাসিনার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কারণ এ ফ্যাসিস্ট হাসিনাই বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দুজন সাবেক আমীর অধ্যাপক গোলাম আযম ও মাওলানা মতিউর রহমান নিজামীসহ পাঁচজনকে জুডিশিয়াল কিলিং করেছে এবং অপর পাঁচ নেতাকে জেলে বিনাচিকিৎসায় হত্যা করেছে। ক্ষমতাসীন দল বিএনপি, প্রধান বিরোধীদল জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি)সহ দেশপ্রেমিক প্রতিটি রাজনৈতিক দলই ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দল আওয়ামী লীগের প্রতি কঠোর অবস্থানে। তাই ফ্যাসিস্ট হাসিনা এমন পরিস্থিতিতে যেমন দেশে আসার সাহস করবে না, বরং দেশের ফেরার এ ধরনের ঘোষণা রাজনৈতিক স্ট্যান্টবাজি বলেই রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন। তাই খুব সহজে ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার বাংলাদেশে ফেরার সুযোগ নেই এবং হাসিনা ফেরার ঝুঁকি নেবে না।
লেখক : বার্তা সম্পাদক, সাপ্তাহিক সোনার বাংলা।
ই-মেইল : ferdous.ab@gmail.com