ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষাসফর
১৫ জুলাই ২০২৬ ২১:১০
॥ মতিউর রহমান আকন্দ ॥
॥ এক ॥
যুক্তরাজ্যে অনেকবার সফর করেছি। সে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়াও করেছি। তবে এবারের সফরটি বিশেষ কারণে স্মরণীয়। কারণ এটি ছিল শিক্ষাসফর, বিশ্বের অন্যতম সেরা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামব্রিজে।
শিক্ষাজীবনের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রোগ্রাম হচ্ছে শিক্ষাসফর। একদা বনভোজনের নামে আমরা বিনোদনমূলক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করেছি। সময়ের ব্যবধানে প্রযুক্তির উৎকর্ষতার যুগে শিক্ষা, সংস্কৃতি বিনোদন সবকিছুরই পরিবর্তন ঘটেছে। শিক্ষাসফরেও কিছু বৈশিষ্ট্যগত পরিবর্তন হয়েছে। ব্রিটিশ ক্যারিকুলামে পরিচালিত ইংলিশ মিডিয়াম ছাত্রদের জন্য যুক্তরাজ্যে স্টাডি ট্যুর একটি ব্যতিক্রমধর্মী অনুষ্ঠান। বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামব্রিজের নৈসর্গিক পরিবেশে গত ২৮ জুন থেকে ৫ জুলাই ৮ দিনের শিক্ষাসফর অনুষ্ঠিত হলো। এটি মূলত CATS Cambridge Summer program হিসেবে পরিচিত। প্রোগ্রামে সুনির্দিষ্ট বিষয়ে ক্লাস, পরীক্ষা, মূল্যায়ন ও সার্টিফিকেট বিতরণ, আন্তর্জাতিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, খেলাধুলা, গুরুত্বপূর্ণ স্থান দর্শন, অভিজ্ঞতা বিনিময় অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রতিটি ইভেন্টে শেখার ছিল অনেক কিছু। শিক্ষার্থীদের জন্য প্রোগ্রামটি স্মরণীয় হয়ে থাকবে, তাদের চিন্তা, জ্ঞান ও উপলব্ধিকে আরো সমৃদ্ধ করবে।
শিক্ষা মানুষের শরীর, আত্মা ও মনের উন্নয়ন, বিকাশ এবং সমৃদ্ধি ঘটায়।
মহান রাব্বুল আলামিন মানবজাতির পথের দিশা হিসেবে যে মহাগ্রন্থ আল কুরআন অবতীর্ণ করেছেন তার প্রথম নাজিল হওয়া আয়াতটি হচ্ছে ‘পড়’। সূরা ইকরায় বলা হয়েছে, ‘পড়ুন আপনার পালনকর্তার নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন মানুষকে জমাট রক্তপিণ্ড থেকে। পড়ুন এবং আপনার পালনকর্তা অত্যন্ত সম্মানিত, যিনি কলমের সাহায্যে শিক্ষা দিয়েছেন।’
শিক্ষা মানুষের জীবন গঠনের অন্যতম প্রধান ভিত্তি। এটি শুধু জ্ঞান অর্জনের মাধ্যম নয়, বরং মানুষের চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা, মূল্যবোধ, সৃজনশীলতা এবং ব্যক্তিত্বের বিকাশের প্রধান উপায়। একজন শিক্ষিত ব্যক্তি নিজেকে যেমন উন্নত করতে পারে, তেমনি পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষার মাধ্যমে মানুষ ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ, সঠিক-ভুলের পার্থক্য বুঝতে শেখে, যুক্তিবাদী ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি অর্জন করে এবং সামাজিক দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়। শিক্ষা কুসংস্কার, অজ্ঞতা ও সংকীর্ণতা দূর করে এবং সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, মমত্ববোধ ও ন্যায়বিচারের চেতনা গড়ে তোলে।
অর্থনৈতিক উন্নয়নের ক্ষেত্রেও শিক্ষার গুরুত্ব অপরিসীম। দক্ষ মানবসম্পদ তৈরির মাধ্যমে শিক্ষা কর্মসংস্থান সৃষ্টি, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি এবং দারিদ্র্য হ্রাসে সহায়তা করে। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্বে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে আধুনিক ও মানসম্মত শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই।
একটি দেশের টেকসই উন্নয়ন, সুশাসন, গণতন্ত্র এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার জন্যও শিক্ষা অপরিহার্য। শিক্ষিত নাগরিকরা সচেতনভাবে রাষ্ট্র পরিচালনায় অংশগ্রহণ করতে পারে, নিজেদের অধিকার ও কর্তব্য সম্পর্কে অবগত থাকে এবং জাতীয় উন্নয়নে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে।
শিক্ষা মানুষের অন্তর্নিহিত সম্ভাবনার বিকাশ ঘটায় এবং তাকে একজন আদর্শ, দায়িত্বশীল ও মানবিক নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলে। তাই ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্য শিক্ষার প্রসার এবং মানোন্নয়ন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
শিক্ষা মানুষকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যায়, নেতৃত্বের আসনে সমাসীন করে। অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং সামাজিক ক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধনে মূল ভূমিকা পালন করে শিক্ষা।
আদর্শ ও নৈতিকতাবিবর্জিত শিক্ষা মানবজাতিকে উদ্দেশ্যহীন গন্তব্যের দিকে নিয়ে যায়। একটি দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে সে দেশের ভবিষ্যৎ নাগরিকগণ কীভাবে গড়ে উঠবে। আমরা এমন এক শিক্ষা ব্যবস্থা চাই যেখানে থাকবে-
১. মানবিক মূল্যবোধ : সততা, ন্যায়পরায়ণতা, সহমর্মিতা, সহনশীলতা ও মানবিক গুণাবলির বিকাশ।
২. নৈতিক শিক্ষা : চরিত্র গঠন, দায়িত্ববোধ, আত্মনিয়ন্ত্রণ এবং সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের চর্চা।
৩. জ্ঞান ও যুক্তিবাদ : কুসংস্কারমুক্ত, বিজ্ঞানমনস্ক, যুক্তিনির্ভর ও অনুসন্ধিৎসু মন গড়ে তোলা।
৪. দেশপ্রেম ও নাগরিকত্ব : দেশের ইতিহাস, সংস্কৃতি, সংবিধান ও জাতীয় ঐতিহ্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলা।
৫. গণতন্ত্র ও মানবাধিকার : মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের প্রতি সম্মান শেখানো।
৬. সামাজিক ন্যায় ও সমতা : ধর্ম, বর্ণ, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্যহীন শিক্ষা নিশ্চিত করা।
৭. সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবন : নতুন চিন্তা, গবেষণা, সমস্যা সমাধান ও উদ্ভাবনী ক্ষমতা বিকাশে উৎসাহ দেওয়া।
৮. বিশ্বজনীনতা ও শান্তি : বিভিন্ন সংস্কৃতির প্রতি শ্রদ্ধা, আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও শান্তিপূর্ণ সহাবস্থানের শিক্ষা।
শিক্ষার আদর্শিক ভিত্তি এমন হওয়া উচিত, যা জ্ঞান, নৈতিকতা, মানবিকতা, দেশপ্রেম, গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ এবং সৃজনশীলতার সমন্বয়ে একজন দক্ষ, দায়িত্বশীল ও আদর্শ নাগরিক গড়ে তোলে। এ ধরনের শিক্ষা শুধু কর্মসংস্থানের জন্য নয়, ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রের সার্বিক উন্নয়নের জন্যও অপরিহার্য।
শিক্ষার কোনো বয়স নেই। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানবজাতির শিক্ষার সময়। তবে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার একটি নির্দিষ্ট সময় আছে। শিক্ষাঙ্গনের বাইরেও রয়েছে শিখার অনেক উপাদান। তারই একটি হচ্ছে শিক্ষা সফর।
॥ দুই ॥
মানারাত ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল কলেজের ছাত্রদের স্টাডি ট্যুর উপলক্ষে যুক্তরাজ্যের ক্যামব্রিজ ইউনিভার্সিটি ভিজিটের কর্মসূচি ছিল। এটি প্রকৃতপক্ষে CATS Cambridge-এ আয়োজিত একটি Summer program. ১৮ সদস্যের টিমে প্রতিষ্ঠানের অধ্যক্ষ, তার মিসেস এবং ট্রাস্টি হিসেবে আমি অন্তর্ভুক্ত ছিলাম। বাকি ১৫ জন ছাত্র। ১৬-১৭ বছর বয়সে যুক্তরাজ্যে শিক্ষাসফর নিশ্চয়ই সৌভাগ্যের বিষয়। এটা নিছক কোনো ভ্রমণ ছিল না। ছাত্রদের ক্লাস, পরীক্ষা এবং সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে।
এ শিক্ষাসফরে আমার অনেক কিছুই শেখার সুযোগ হয়েছে। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদালয়ের দেয়ালে আলবার্ট আইনস্টাইনের একটি উক্তি লেখা আছে: ‘Education is what remains after one has forgotten what one has learned in school.’
যার বাংলা অর্থ বিদ্যালয়ে যা শেখানো হয়, তা ভুলে যাওয়ার পর যতটুকু ধারণ করা যায় বা স্মৃতিতে থাকে, তাই শিক্ষা।
এর অর্থ হলো, শিক্ষা শুধু বইয়ের তথ্য মুখস্থ করা নয়। স্কুলে শেখা নির্দিষ্ট তথ্য বা সূত্র সময়ের সঙ্গে ভুলে যেতে পারি, কিন্তু শেখার মাধ্যমে যে চিন্তাশক্তি, বিচারবোধ, সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, মূল্যবোধ, শৃঙ্খলা ও শেখার অভ্যাস গড়ে ওঠেÑ সেটিই প্রকৃত শিক্ষা। অর্থাৎ জ্ঞান মুখস্থ করা নয়, বরং মানুষ হিসেবে বিকশিত হওয়াই শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য।
University of Cambridge হচ্ছে বিশ্বের অন্যতম প্রাচীন, মর্যাদাপূর্ণ ও গবেষণাভিত্তিক বিশ্ববিদ্যালয়। এটি ইংল্যান্ডের ক্যামব্রিজ শহরে ১২০৯ সালে প্রতিষ্ঠিত হয়। বিজ্ঞান, প্রকৌশল, চিকিৎসাবিজ্ঞান, আইন, অর্থনীতি, রাষ্ট্রবিজ্ঞান, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞানসহ প্রায় সব প্রধান বিষয়ে বিশ্বমানের শিক্ষা ও গবেষণা পরিচালিত হয় এ বিশ্ববিদ্যালয়।
বিশ্ববিদ্যালয়টির সঙ্গে যুক্ত ১২৬ জন নোবেল বিজয়ী, বহু রাষ্ট্রপ্রধান এবং অলিম্পিক পদকজয়ী রয়েছেন।
অত্যন্ত সুন্দর, দৃষ্টিনন্দন, নৈসর্গিক পরিবেশে বিশ্বিদ্যালয়টির অবস্থান। সুদীর্ঘ লেক, লেকের দুপাশে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ভবন, ছাত্রদের থাকার জন্য আবাসিক ব্যবস্থা ক্যাম্পাসকে আরো আকর্ষনীয় করেছে। বিশাল বিস্তীর্ণ সবুজ মাঠ, সুসজ্জিত গাছ বৃক্ষ তরুলতা পরিচ্ছন্ন রাস্তা মাঝে মাঝে বসার বেঞ্চ সব মিলিয়ে এক মনোমুগ্ধকর পরিবেশ বিশ্ববিদ্যালয়কে দৃষ্টিনন্দন করে রেখেছে। কত জ্ঞানী-গুণী, গবেষক, বৈজ্ঞানিক, সাহিত্যিক, দার্শনিক, কবি, অর্থনীতিবিদ, রাষ্ট্রবিজ্ঞানী, এ ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে পদচারণা করেছেন তার ইয়ত্তা নেই। এখানে জ্ঞান চর্চা গবেষণা আবিষ্কার উদ্ভাবনে মত্ত থাকেন একদল মানুষ।
যাদের উদ্ভাবিত তত্ত্ব মুখস্থ করেছি তাদের পদচারণায় মুখরিত ক্যাম্পাস পরিদর্শন অনেক আবেগ ও অনুভূতির।
এই Cambridge University-এর Trinity College Cambridge এ ১৬৬১ সালে ভর্তি হন নিউটন।
এখানেই তিনি গণিত, পদার্থবিজ্ঞান ও দর্শন নিয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন এবং পরবর্তীতে অধ্যাপকও হন।
নিউটনের বৈজ্ঞানিক চিন্তা ধারা ও গবেষণার বড় অংশই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে থাকাকালীন বিকশিত হয়েছিল। ৪৬৫ বছর পরও আমরা তার সূত্র শিখে যাচ্ছি।
এ বিশ্ববিদ্যালয়ে বিশ্বের সেরা অর্থনীতিবিদগণ অর্থনীতির বিভিন্ন বিষয় নিয়ে গবেষণা করেছেন এবং নতুন নতুন তত্ত্ব উদ্ভাবন করেছেন।
বিশেষ করে Marshall, Pigou I Keynes ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে প্রভাবশালী অর্থনীতিবিদ। অর্থনীতিতে কেইনসীয় (Keynesian) তত্ব গুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত। কেইনসীয় অর্থনীতিবিদরা হলেন সেসব অর্থনীতিবিদ যারা John Maynard Keynes এর অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুসরণ করেন। ১৯৩৬ সালে তার বিখ্যাত গ্রন্থ The General Theory of Employment, Interest and Money প্রকাশের মাধ্যমে এই চিন্তাধারার ভিত্তি গড়ে ওঠে। কেইনসীয় অর্থনীতির মূল কথা হলোÑ অর্থনৈতিক মন্দা ও বেকারত্ব মোকাবিলায় রাষ্ট্রের সক্রিয় হস্তক্ষেপ এবং সামষ্টিক চাহিদা বৃদ্ধি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সামষ্টিক অর্থনীতি নিয়ে তাদের চিন্তা ও গবেষণা সারা বিশ্বে ব্যাপকভাবে সমাদৃত।
ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, শিক্ষক, গবেষকদের মধ্য থেকে পদার্থবিজ্ঞান, রসায়ন, অর্থনীতি, চিকিৎসা, সাহিত্য, শান্তিতে নোবেলজয়ী ব্যক্তিগণ সারা দুনিয়ায় অনন্য উদাহরণ তৈরি করেছেন।
॥ তিন ॥
গত দুই যুগের মধ্যে অনেকবার যুক্তরাজ্যে আমি যাওয়া-আসা করেছি। ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়েও গিয়েছি অনেকবার। যুক্তরাজ্যের Wolverhampton university থেকে ২০০৮ সালে ‘আইন’ বিষয়ে অনার্স ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে আইন অঙ্গনে আমার যাত্রা শুরু হয়। আমি মূলত অর্থনীতির ছাত্র। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তপ্ত চ্যালেঞ্জিং পরিবেশে অর্থনীতির ওপর মনোযোগ দিয়ে পড়াশোনার চেষ্টা করেছি। কেন্দ্রীয় লাইব্রেরির সাময়িকী বিভাগে আমি বিশ্বের বিভিন্ন জার্নালে প্রকাশিত অর্থনীতির ওপর প্রবন্ধ, নিবন্ধ পড়ার চেষ্টা করতাম। মাঝে মাঝে পত্রিকায় লিখতাম। ডিপার্টমেন্টের সেমিনারে আলোচনায় অংশগ্রহণ করতাম। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষকগণ বাংলাদেশের সেরা অর্থনীতিবিদ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। প্রফেসর আব্দুল হামিদ, ড. সনৎ কুমার সাহা, ড. সোলাইমান, প্রফেসর আযহার উদ্দীন, প্রফেসর শাহ হাবীবুর রহমান, ড. দীলিপ কুমার নাথ, ড. তারিক সাইফুল ইসলাম, প্রফেসর রফিকুল ইসলাম প্রমুখ শিক্ষকগণ খুবই আলোচিত অর্থনীতিবিদ ছিলেন। আমি তাদের সরাসরি ছাত্র। অর্থনীতির সাথে গণিতের সংশ্লিষ্টতা আছে। আমি ইন্টারমিডিয়েট পর্যন্ত বিজ্ঞানের ছাত্র ছিলাম। গণিত আমার প্রিয় সাবজেক্ট ছিল। অর্থনীতির ম্যাথমেটিক্যাল টার্ম বোঝার ক্ষেত্রে আমার কোনো সমস্যা হয়নি।
ক্লাসে অনেক সময় অর্থনীতির আদর্শিক মডেল নিয়ে স্যারদের সাথে যুক্তিপূর্বক ভাষায় তর্ক হতো। স্যারেরাও যুক্তি মেনে নিতেন। আমার সৌভাগ্য আমি সেরা শিক্ষকদের নিকট থেকে অর্থনীতির শিক্ষা নিয়েছি। ক্লাস রুমের বাইরে আমাদের সাথে শিক্ষকদের সম্পর্ক ছিল বন্ধুত্বের।
১৯৯০ সালের রাকসু নির্বাচনে আমরা জোহা হল ছাত্র সংসদে পূর্ণ প্যানেলে বিজয়ী হয়েছিলাম। আমি সংসদের ভিপি, বর্তমান জাতীয় সংসদ সদস্য নূরুল ইসলাম বুলবুল ভাই জিএস নির্বাচিত হন। স্বৈরাচার এরশাদের পতনের পর ১৯৯১ সালে আমরা নির্বাচিত ছাত্র প্রতিনিধিগণ ভারত সফরের সুযোগ লাভ করি। এখানে ছাত্রলীগ, ছাত্রদল, ছাত্র শিবির, ছাত্রমৈত্রী, জাসদসহ বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিগণ ছিলেন। নেতৃত্বে ছিলেন অর্থনীতি বিভাগের প্রফেসর রফিকুল ইসলাম। একটানা ২১ দিন ভারত সফরে ছাত্র শিক্ষকের সে সুসম্পর্ক আজও আমাকে প্রেরণা জোগায়।
আমার শিক্ষকগণ আমাকে খুবই ভালোবাসতেন। ১৯৯৫ সালে পরীক্ষার হল থেকে আমাকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। মাস্টার্স পরীক্ষা দিতে সবেমাত্র হলে ঢুকেছি, নিজের আসনে বসার মুহূর্তে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে। আমার শিক্ষকগণ প্রতিবাদ করেন। অর্থনীতি বিভাগের তদানীন্তন সভাপতি প্রফেসর আব্দুর রহমান স্যার পরীক্ষা গ্রহণ স্থগিত করে দিয়েছিলেন। আমার শিক্ষকগণ ঘটনার নিন্দা জানান।
প্রতিবাদের মুখে ঐ দিনের পরীক্ষা আদালত প্রাঙ্গণে ম্যাজিস্ট্রেটের রুমে নেয়া হয়। অতঃপর আমাকে কারাগারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। কারাগার থেকে আমি অবশিষ্ট পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি।
ছাত্রজীবনের সেই সোনালি দিনগুলো আমার জীবনের শ্রেষ্ঠতম সময়। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের রক্তাক্ত ঘটনার একজন ভিকটিম হিসেবে ৩১ বছর পর মনে হচ্ছে সেদিনের সে রক্ত, জেল-জুলুম, শাহাদাত বৃথা যায়নি। সব কিছুর বিনিময়ে করুণাময়ের নিকট পরকালে মুক্তি চাই। জান্নাতে একটু স্থান চাই।
ইসলামী ব্যাংক যখন বাংলাদেশে প্রথম প্রতিষ্ঠিত হয়, সে সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট ভবনে ইসলামী ব্যাংকিংয়ের ওপর একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয় ১৯৮৪ সালে।
ড. উমর চাপড়া ঐ সেমিনারে অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন। প্রফেসর আব্দুল হামিদ, প্রফেসর শাহ মোহাম্মদ হাবিবুর রহমান এ সেমিনারের উদ্যোক্তা ছিলেন। অর্থনীতি বিভাগের উদ্যোগে এ সেমিনারের আয়োজন করা হয়েছিল। তারা অর্থনীতির শিক্ষক ছিলেন। ডিপার্টমেন্টে তাদের অসাধারণ প্রভাব ছিল। কমিউনিস্টপন্থী শিক্ষকগণ সেখানে বাধার সৃষ্টি করেছিল। শাহ হাবিব স্যার আমাকে ইসলামী অর্থনীতির বৈশিষ্ট্যের ওপর ৫ মিনিটের একটি ইংরেজি বক্তব্য দেওয়ার ব্যবস্থা করেছিলেন। ডিপার্টমেন্টের ছাত্রদের মধ্য থেকে একমাত্র আমিই সেমিনারে বক্তব্য রাখার সুযোগ পেয়েছিলাম। ইসলামী অর্থনীতির ৮টি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে সুদবিহীন ব্যাংকিংয়ের উপকারিতা, প্রয়োজনীয়তা ও অপরিহার্যতা তুলে ধরে ছিলাম। আমার শিক্ষকগণ আমাকে দারুণভাবে উৎসাহিত করেছিলেন।
তাদের মধ্যে আমার প্রিয় হামিদ স্যার ও শাহ্ হাবিব স্যার আজ দুনিয়ায় নেই। হামিদ স্যার কানাডায় ইন্তেকাল করেন। হাবিব স্যার রাজশাহীতে অসুস্থ অবস্থায় ইন্তেকাল করেন। তাদের প্রচেষ্টায় সর্বপ্রথম রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ‘ইসলামী ব্যাংকিং’য়ের ওপর পার্ট/কোর্স চালু হয়। আমি সেই কোর্সের প্রথম ছাত্র। আজ সারা দেশে ইসলামী ব্যাংকিং পদ্ধতি সমাদৃত। ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে কোর্সটি চালুর সময় আমাদের স্যারেরা অপমানিত হয়েছিলেন। তাদের নিষ্ঠা, ত্যাগ, সাহসিকতা, দৃঢ়তার কারণে ইসলামী ব্যাংকিং কোর্সটি চালু হয়েছিল। তাদের নৈতিক প্রভাব বিজয়ী হয়েছিল। আমার জীবনের জন্য এটি একটি আবেগের বিষয় আমি ইসলামী ব্যাংকিং কোর্স চালুর সূচনায় স্যারদের সাথে সম্পৃক্ত ছিলাম। একাডেমিক পারফরম্যান্সে সেদিন শিক্ষকদের সঙ্গে থাকতে পারা আমার জন্য সৌভাগ্যের। মহান আল্লাহ আমার প্রিয় শিক্ষকদের জান্নাতবাসী করুন। এ ভালো কাজের বদলা তারা পেতে থাকবেন, ইনশাআল্লাহ।
সেমিনারে আমার বক্তব্যের সম্পাদিত কপি সোনার বাংলায় ছাপা হয়েছিল। লেখা দেখে পত্রিকার সম্পাদক শহীদ মুহাম্মদ কামারুজ্জামান আমার সম্পর্কে জানার জন্য আতাউর রহমান ভাইকে টেলিফোন করেছিলেন। আতাউর রহমান ভাই ঐ সময় রাজশাহী মহানগরী জামায়াতের সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। তিনি আমার সাংগঠনিক পরিচয় জানিয়েছিলেন। আমি তখন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ইসলামী ছাত্রশিবিরের সাথী। আমার নামের নিচে, আমি যে আবাসিক হলে থাকতাম সেই শহীদ শামসুজ্জোহা হলের নাম, কক্ষ নং উল্লেখ ছিল।
শহীদ কামারুজ্জামান ভাই নিজের হাতের দুই পৃষ্ঠা লেখা একটি চিঠি আমার নিকট পাঠিয়েছিলেন। তিনি অনেক উৎসাহ দিয়ে সোনার বাংলায় লেখা পাঠানোর জন্য তাগিদ দিয়েছিলেন। তার সেই লেখার প্রতিটি শব্দ, বাক্য আজও আমাকে অনুপ্রাণিত করে।
পরবর্তীতে শহীদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের উৎসাহ ও পরামর্শে সাংবাদিকতার ওপর কোর্স করে তার সম্পাদিত পত্রিকার Special Correspondent হিসেবে কাজ করার সুযোগ পেয়েছি। তিনি আমাকে অর্থনীতি ও সমসাময়িক বিষয়ের ওপর লেখার জন্য উৎসাহিত করতেন। আমি কোনো লেখক নই, গবেষকও নই। লেখক, গবেষক, সাংবাদিকতার প্রভাব আমার ওপর রয়েছে। আমি হয়তো লেখক বা সাংবাদিক হতে পারিনি, কিন্তু একজন মহান ব্যক্তির লোক তৈরির মনোভাব দেখে মুগ্ধ হয়েছি। সেদিন থেকেই কামারুজ্জামান ভাইকে আমার নেতা, আমার অভিভাবক মেনে নিয়েছি। শহীদ কামারুজ্জামান ভাইয়ের উৎসাহে কলমযুদ্ধ চালানোর চেষ্টা করেছি। আল্লাহ যেন তা কবুল করেন।
ভাগ্যের নির্মম পরিহাস আমার প্রিয় নেতার বিরুদ্ধে যখন আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে ষড়যন্ত্রমূলক মামলা দায়ের করা হয়, তখন ডিফেন্স টিমের সদস্য হিসেবে মামলা পরিচালনায় ভূমিকা রেখেছি। অন্ধকার কারা প্রকোষ্ঠে নিঃসঙ্গ বন্দীজীবনের কঠিন মুহূর্তে আইনজীবী হিসেবে সাক্ষাৎকারের সুযোগ পেয়েছি। তিনি বন্দীজীবনে লেখালেখি করে সময় কাটিয়েছেন। তার প্রজ্ঞা দূরদর্শিতা রাজনীতি সম্পর্কে তার মূল্যায়ন এবং পরিস্থিতি পরিবর্তনের বিষয়ে তার যৌক্তিক বিশ্লেষণ আজ সবই যেন বাস্তবায়ন হচ্ছে। প্রাণ খুলে আমার নেতার জন্য দোয়া করি- মহান রাব্বুল আলামিন তার শাহাদাত কবুল করুন।
॥ চার ॥
যেসব আন্তর্জাতিক অর্থনীতিবিদের Theory অধ্যয়ন করে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সার্টিফিকেট নিয়েছি, তাদের স্মৃতিবিজড়িত ক্যামব্রিজ ক্যাম্পাসে এসে চলমান বিশ্বের অর্থনৈতিক পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে আবারো নতুন করে অর্থনীতির ওপর পড়াশোনার প্রেরণা পেলাম। অর্থনৈতিক কূটনীতি ব্যতীত বিশ্বে টিকে থাকা খুবই কঠিন।
অর্থনীতির দুটি ব্যবস্থা পুঁজিবাদী ও সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা নিয়ে বিশ্বব্যাপী অনেক বিতর্ক হয়েছে। আশি ও নব্বইয়ের দশকে কার্লমাক্সের অর্থনৈতিক তত্ত্ব নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছিল।
মূলত পুঁজিবাদী ব্যবস্থার কুফল থেকে সমাজতান্ত্রিক অর্থব্যবস্থার উদ্ভব ঘটেছিল। কিন্তু সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থাও আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। আজ পৃথিবীর কোথাও রাষ্ট্রীয়ভাবে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত নেই। সমাজতন্ত্রের বিপর্যয় ও সোভিয়েত ইউনিয়ন ভেঙে যাওয়ার পর বিশ্ব অর্থনীতি ও রাজনীতি একমুখী হয়ে পড়ে। সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যহীনতা, পুঁজির একক নিয়ন্ত্রণ ও বিশ্ব রাজনৈতিক ব্যবস্থা মূলত অর্থনীতিকে এককভাবে নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যাবার চেষ্টা চালানো হয়েছে গত কয়েক দশক যাবত। আজকের দুনিয়ায় জ্বালানি ও খনিজসম্পদের ওপর প্রাধান্য অর্জন, বাজার ব্যবস্থার ওপর একক নিয়ন্ত্রণ, বেসরকারি সংস্থার মাঝ্যমে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা, অর্থনীতিকে কন্ট্রোলের নানাবিধ পরিকল্পনা। নিয়ে বিশ্বের শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো কাজ করে যাচ্ছে।
কিন্তু অর্থনীতিতে শ্রম, উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান, বাজার, বণ্টন ব্যবস্থার ক্ষেত্রে ত্রুটির কারণে কোথাও স্থিতিশীলতা ও সামাজিক শান্তি-শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
এর একমাত্র বিকল্প হচ্ছে ইসলামী অর্থব্যবস্থা। ইসলামী অর্থনীতিতে মালিকানা, ভোগ, উৎপাদন, বিনিয়োগ ও বণ্টন সম্পর্কে যে তত্ত্ব বা ধারণা উপস্থাপন করা হয়েছে, তা বিশ্বব্যাপী ক্রমেই সমাদৃত হচ্ছে।
কয়েক দশক যাবত বিশ্বব্যপী নিয়ন্ত্রণ ও আধিপত্য বিস্তারের মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে অর্থনীতিকে নিয়ন্ত্রণে নেয়া; কিন্তু এককভাবে কেউ তা নিয়ন্ত্রণে নিতে পারেনি।
বিগত ১০০ বছর যাবত অর্থনীতির ওপর যেসব তত্ত্ব গড়ে উঠেছে, তার নেতৃত্ব দিয়েছে ক্যামব্রিজ বিশ্বিদ্যালয়।
॥ পাঁচ ॥
অতীতে Cambridge বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলাম ভিজিটর হিসেবে। দৃষ্টি ছিল ক্যাম্পাস পরিদর্শন। এবারের আসাটা সম্পূর্ণ ভিন্ন ক্যাটাগরিতে- Cambridge University ক্যাম্পাসে Summer Program-এ মানারাত ট্রাস্টি বোর্ডের প্রতিনিধি হিসেবে আমন্ত্রিত হয়ে। শিক্ষার্থীদের সংগে আমার ২য় সন্তান ‘O’ level পরীক্ষার্থী মুয়াজ সাওবান আকন্দও রয়েছে।
ব্রিটিশরা কীভাবে Summer program Handling করে তার দিকে আমি বেশি নজর রাখার চেষ্টা করেছি। ইটালি, ইউক্রেন, জার্মানি, স্পেন, বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ ছাত্রদের নিয়ে Summer programটি ছিল কৌতূহলোদ্দীপক। সময় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষার্থীদের ক্লাসে মনোযোগী করে রাখা, খাবার, ঘুম, ভ্রমণ, খেলাধুলা, সংস্কৃতি সকল কিছুর মধ্যে সমন্বয় করে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ছিল চোখে পড়ার মতো। শিক্ষায় ব্রিটিশদের অগ্রণী অবস্থান অবশ্যই প্রশংসনীয়। সম্পূর্ণ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিয়ে
Cambridge University Campus-এ এক সপ্তাহের Summer program সাফল্যের সাথে সম্পন্ন হওয়াটা একটি প্রশংসনীয় বিষয়।
ছাত্রদের পরিচালনা ও স্বল্পসময়ের কোর্সটি সফলভাবে সম্পন্নের জন্য তারা একটি দিক নির্দেশনামূলক ক্লাসের আয়োজন করে।
প্রথমে গ্রুপ লিডারদের নিয়ে একটি ক্লাসের আয়োজন করা হয়। সেখানে গ্রুপ লিডারদের দায়িত্ব সম্পর্কে ব্রিফ করা হয়। ছাত্রদের ঠিকমতো ক্লাসে পাঠানো, যথাসময় কাজগুলো সম্পন্ন করার ব্যাপারে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়। তারা তাদের ২৪ ঘণ্টার একটি রুটিন উপস্থাপন করে এবং তা অনুসরণের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
সকাল ৭-৪৫ থেকে ৮-৪৫টার মধ্যে নাস্তা, ৯টা থেকে ক্লাস, ক্লাসে সময়মতো উপস্থিতির বিষয়ে করারোপ করা হতো। সামান্য বিলম্ব হলেই তলব করা হতো। গ্রুপ লিডারকে।
দুপুর ১২-৩০ থেকে ২-০০টার মধ্যে লাঞ্চ, ৬টা পর্যন্ত ভ্রমণ, ৬-৮টার মধ্যে ডিনার, ৮-১০টা পর্যন্ত ইভিনিং এক্টিভিটিজ, ১০টা থেকে পূর্ণ নীরবতা।
এ রুটিন অনুযায়ী পরিচালিত হয় ক্যামব্রিজের শিক্ষার্থীদের কার্যক্রম। ছুটির দিন সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম।
CATS Cambridge -এর আবাসিক ভবনে অবস্থান করে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তরুণ ছাত্রদের সপ্তাহব্যাপী Summer কোর্সের মাধ্যমে তাদের জ্ঞান, ভাষা, প্রযুক্তি, আধুনিক বিশ্বের জন্য উপযোগী শিক্ষা, সংস্কৃতি, মানবিকতা ও আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য নিজেকে যোগ্য হিসেবে গড়ে তোলার দিকনির্দেশনা অংশগ্রহণকারীদের জন্য প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
অল্প সময়ের মধ্যেই আয়োজক শিক্ষকগণ ছাত্রদের সাথে পরিচিত হয়ে ওঠেন। ছাত্রদের আচরণ সম্পর্কে অবহিত হন। তারা তাদের রিপোর্টে ছাত্রদের সম্পর্কে তাদের পর্যবেক্ষণ, মূল্যায়ন ও পরামর্শ প্রদান করেন।
সাফল্যের সাথে যারা কোর্স সম্পন্ন করেছে, তাদের আনুষ্ঠানিকভাবে সার্টিফিকেট প্রদান করা হয়েছে গত ৩ জুলাই সন্ধ্যায়। সার্টিফিকেট বিতরণের এ অনুষ্ঠানটি প্রত্যেকের জীবনে একটি স্মরণীয় মুহূর্ত। এ সার্টিফিকেট তাদের শিক্ষাজীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। বিশেষ করে ইংরেজি ভাষার ওপর কোর্স সম্পন্নের সনদ পরবর্তী শিক্ষাকার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে শিক্ষার্থীদের উপকারে আসবে। Cambridge University-এর সার্টিফিকেট তাদের জীবনে সাফল্য বয়ে আনুক ও ভবিষ্যৎ জীবন গঠনে তাদের অনুপ্রাণিত করুকÑ এই কামনা করি।
॥ ছয়॥
শিক্ষার্থীদের বাবা-মা অনেক কষ্ট করে তাদের সন্তানদের যুক্তরাজ্যে স্টাডি ট্যুরে পাঠিয়েছিলেন। তারা শুধু ভ্রমণ করেনি শিখেছে অনেক কিছু। যে ক্যামব্রিজ কারিকুলাম অনুসরণ করে তারা পড়াশোনা করেছে সেই ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয় ও তার ইতিহাস, জ্ঞানের রাজ্যে ক্যামব্রিজের অবস্থান এখানকার পরিবেশ সবকিছু সম্পর্কে জানার ও বোঝার সুযোগ পেয়েছে। এ অভিজ্ঞতার মূল্য অনেক বেশি।
শিক্ষার্থীদের নিয়ে ক্যামব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লেকে নৌকাভ্রমণ একটি আনন্দময় ও অভিজ্ঞতা অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হবে। লেকের দুধারে বিশাল বিস্তীর্ণ ক্যাম্পাস দৃষ্টিনন্দন স্থাপনা শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিকে বিস্তীর্ণ ও বিকশিত করবে। লেখাপড়া, গবেষণার জন্য ক্যাম্পাসের পরিবেশও গুরুত্বপূর্ণ।
এ গার্ডেন পরিদর্শনের মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা ইতিহাস ও নয়নাভিরাম সৌন্দর্যের সাথে পরিচয় লাভ করে। বিশাল ফুলের বাগান, সুসজ্জিত বৃক্ষ, উপাসনালয়, কবরস্থান ও সুউচ্চ প্রাসাদ শিক্ষার্থীদের মাঝে উদ্দীপনা তৈরি করে।
ক্যামব্রিজ জাদুঘর পরিদর্শনের মাধ্যমে শত শত বছরের পুরোনো ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সাথে পরিচিত হয় শিক্ষার্থীরা।
লন্ডন শহরের প্রাণকেন্দ্র, পার্লামেন্ট ভবন, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, বাকিংহাম প্যালেস, শেকসপিয়ার চত্বর, গার্ডেন, টাওয়ার ব্রিজ ও টেমস নদীতে স্টিমার ভ্রমণের আনন্দ শিক্ষার্থীদের দৃষ্টিকে বিস্তৃত করার সহায়ক ভূমিকা রাখবে।
Cambridge University-এর কঠোর নিয়মশৃঙ্খলা ও তাদের Schedule অনুযায়ী এক সপ্তাহ পরিচালিত হয়ে যেসব শিক্ষার্থী কোর্স সম্পন্ন করেছে তাদের জীবন পরিচালনার জন্য এটি একটি দিকনির্দেশনা হয়ে থাকবে। আমরা যেন ভালো দিকগুলো গ্রহণ করি- এটাই হবে আমাদের শিক্ষা।
॥ সাত॥
এবারের স্টাডি ট্যুরের বিশেষ দিক ছিল প্রত্যাবর্তনের সময় কাতার ভিজিট।
কাতারের দোহা এয়ারপোর্টে আমাদের লম্বা সময়ের ট্রানজিট ছিল। দোহা এয়ারপোর্টে ট্রানজিট ভিসা নিয়ে কাতার শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থান ভ্রমণের সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা।
কাতার ছোট দেশ হলেও আধুনিক স্থাপত্য, ঐতিহ্য, মরুভূমি এবং সমুদ্রের অনন্য সমন্বয়ের জন্য বিখ্যাত। ভ্রমণের জন্য সবচেয়ে জনপ্রিয় দর্শনীয় অনেক স্থান থাকলেও সময়ের স্বল্পতায় আমরা গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি স্থান ভিজিট করি।
বিশ্বখ্যাত ইসলামিক শিল্পকলা জাদুঘর, যেখানে শতাব্দীজুড়ে ইসলামী সভ্যতার অসাধারণ নিদর্শন সংরক্ষিত আছে। কাতারের সংস্কৃতি, শিল্প, নাটক, সঙ্গীত এবং সমুদ্রসৈকতের এক অনন্য মিলনস্থল দেখার সুযোগ পায় শিক্ষার্থীরা।
কৃত্রিম দ্বীপ, সমুদ্রতীরবর্তী ইউনেস্কো স্বীকৃত ইনল্যান্ড সি, যেখানে মরুভূমি এসে সমুদ্রের সঙ্গে মিলিত হয়েছে।
ঐতিহাসিক দুর্গ ও প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকা, যা কাতারের ইতিহাস জানার অন্যতম সেরা স্থান।
দোহার ঐতিহ্যবাহী বাজার। এখানে মসলা, আতর, হস্তশিল্প, ঐতিহ্যবাহী পোশাক এবং স্থানীয় খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা এখানে পূর্ণ তৃপ্তির সাথে খাবারের স্বাদ গ্রহণ করেছে।
কাতার ভ্রমণ আমাদের সফরকে প্রাণবন্ত করেছে। ধন্যবাদ জানাই ডিস্কভারী কাতার কর্তৃপক্ষকে যারা দ্রুত ট্রানজিট ভিসা, ইমিগ্রেশন সহজ করে দেওয়া, গাড়ির ব্যবস্থা এবং একজন ভালো ভাষ্যকার দিয়ে সহযোগিতা করেছে। কাতারের আন্তরিক সহযোগিতায় আমরা কৃতজ্ঞ।
মহাগ্রন্থ আল কুরআনে ভ্রমণের কথা বলা হয়েছে। ভ্রমণ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে। এ সফর আমাদের শিক্ষার পরিধি, বিস্তৃতি, নিজেকে সমৃদ্ধ করার মাধ্যম হিসেবে কাজে লাগুক।
লেখক : আইনজীবী, জননেতা।