জুলাই গণঅভ্যুত্থান

জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত লক্ষ্য বিপ্লব এখনো অধরা


৮ জুলাই ২০২৬ ২১:০২

॥ হারুন ইবনে শাহাদাত ॥
দেশের রাজনীতির ইতিহাসে বাঁকবদলের উল্লেখযোগ্য ঘটনা ২০২৪-এর জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থান, যার লক্ষ্য একটি চূড়ান্ত বিপ্লব। সমাজবিজ্ঞানী ও ইতিহাসবিদরা মনে করেন, ‘৩৬ জুলাই বিপ্লবখ্যাত’ এ অভ্যুত্থান এ উপমহাদেশের পাঁচশত বছরের ইতিহাসে উল্লেখযোগ্য একটি বড় ঘটনা। যার মধ্য দিয়ে দীর্ঘ দেড় দশক সিন্দাবাদের ভূতের মতো জাতির ঘাড়ে চেপে বসা হাসিনার আ’লীগ ও তার দোসর ১৪ দলের ফ্যাসিস্ট রাজত্বের অবসান হয়েছে। হাসিনা তার সাঙ্গ-পাঙ্গ নিয়ে পালিয়ে ভারতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছেন। হাসিনাকে ভারত ছাড়া আর কোনো দেশ গ্রহণ করতে রাজি হয়নি। কারণ তিনি ভারতের অনুগত থেকে বাংলাদেশকে দিল্লির করদরাজ্যের মতো শাসন করেছেন। জেল-জুলুম, খুন-গুম থেকে নিয়ে হেন মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা নেই, যা তিনি রাষ্ট্রক্ষমতা ব্যবহার করে করেননি। তার দুঃশাসনে দেশ থেকে নির্বাচন নির্বাসনে চলে গিয়েছিলো। দেশপ্রেমিক সকল রাজনৈতিক দল, নেতা, আমলা, সেনা কর্মকর্তা এবং সাধারণ নাগরিক রেহাই পায়নি। জামায়াতে ইসলামীর সাবেক আমীর, নায়েবে আমীর, সেক্রেটারি জেনারেল, সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, নির্বাহী পরিষদ সদস্যকে বিচারের নামে হত্যা করেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়াকে কারা নির্যাতনের মাধ্যমে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেশ থেকে বহিষ্কার করা হয়েছিলো। আয়নাঘরে বন্দি করা হয়েছিল ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মানের সামরিক কর্মকর্তা, ব্যারিস্টার, আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের। ক্রসফায়ার নাটক সাজিয়ে বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার করেছে হাজার হাজার নিরীহ মানুষ ও রাজনৈতিক নেতা-কর্মীকে। এমন এক দুঃসহ অবস্থা থেকে বৈষম্যমুক্ত দেশ গড়ার প্রত্যয়ে কোটা সংস্কার ছাত্র-জনতার আন্দোলন গণবিস্ফোরণে রূপ নিলে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় হাসিনার সরকার ও তার কুকর্মের দোসররা।
বাংলাদেশ প্রত্যক্ষ করে এক নতুন স্বাধীনতা, এক ঐতিহাসিক ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান। ২০২৪ সালের ৫ জুন যে আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটেছিল, তা রক্তক্ষয়ী ও নজিরবিহীন এক বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ৫ আগস্ট দেশের দীর্ঘকালীন স্বৈরাচারী সরকারের পতনের মাধ্যমে চূড়ান্ত রূপ লাভ করে। সরকারি চাকরিতে বৈষম্যমূলক কোটা সংস্কারের দাবিতে শুরু হওয়া শিক্ষার্থীদের একটি শান্তিপূর্ণ আন্দোলন কালক্রমে সাধারণ মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে একটি পূর্ণাঙ্গ গণবিপ্লবে পরিণত হয়। হাজারো শহীদের রক্ত এবং অগণিত ছাত্র-জনতার ত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত হয় এই নতুন বাংলাদেশ।
আন্দোলনের পটভূমি ও ক্রনোলজি (ঘটনাপ্রবাহ)
৫ জুন ২০২৪ : আন্দোলনের সূত্রপাত : হাইকোর্ট বিভাগ কর্তৃক ২০১৮ সালের সরকারি পরিপত্র অবৈধ ঘোষণার মাধ্যমে কোটা ব্যবস্থা পুনর্বহাল করা হলে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে ছাত্ররা রাজপথে নেমে আসে।
১-৭ জুলাই ২০২৪ : ‘বাংলা ব্লকেড’ ও আন্দোলন জোরদার : ‘বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন’-এর ব্যানারে শিক্ষার্থীরা দেশব্যাপী সড়ক ও রেলপথ অবরোধ বা ‘বাংলা ব্লকেড’ কর্মসূচি শুরু করে। ৭ জুলাই শিক্ষার্থীরা কোটা সংস্কারের এক দফা দাবি পেশ করে।
১৪ জুলাই ২০২৪ : কটূক্তি ও ক্ষোভের আগুন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ইঙ্গিত করে ‘রাজাকার’ শব্দ ব্যবহার করলে সাধারণ শিক্ষার্থীরা চরমভাবে অপমানিতবোধ করে। ওই রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন ক্যাম্পাসে হাজার হাজার শিক্ষার্থী স্লোগান তোলেÑ ‘তুমি কে? আমি কে? রাজাকার, রাজাকার; কে বলেছে? কে বলেছে? স্বৈরাচার, স্বৈরাচার!’
১৫-১৬ জুলাই ২০২৪ : নৃশংস হামলা ও আবু সাঈদের শাহাদাত : ১৫ জুলাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্দোলনরত সাধারণ শিক্ষার্থীদের ওপর শাসকদলের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নৃশংস হামলা চালায়। ১৬ জুলাই রংপুরের বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী আবু সাঈদ বুক পেতে পুলিশের বুলেটের সামনে দাঁড়িয়ে শহীদ হন। এই ঘটনা আন্দোলনকে সারা দেশের আপামর জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দেয়।
১৮-২১ জুলাই ২০২৪ : ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ ও প্রথম দফার গণহত্যা শিক্ষার্থীদের ডাকা ‘কমপ্লিট শাটডাউন’ কর্মসূচিতে সাধারণ মানুষ, অভিভাবক ও শ্রমিকরা দলে দলে যোগ দেন। সরকার ইন্টারনেট সম্পূর্ণ ব্ল্যাকআউট করে দেয় এবং সেনা মোতায়েন ও কারফিউ জারি করে ক্র্যাকডাউন শুরু করে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর গুলিতে কয়েকশত মানুষ শহীদ হন।
২১ জুলাই সুপ্রিম কোর্ট কোটা সংস্কারের রায় দিলেও ততক্ষণে আন্দোলন কোটার গণ্ডি পেরিয়ে গণহত্যার বিচারের দাবিতে রূপ নেয়।
২৯ জুলাই-২ আগস্ট ২০২৪ : ‘রেড জুলাই’ ও গণবিক্ষোভ সরকারের পক্ষ থেকে শোক দিবস পালনের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে শিক্ষার্থীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লাল প্রোফাইল ছবি দেওয়ার (‘রেড জুলাই’) কর্মসূচি শুরু করে, যা দেশব্যাপী ব্যাপক সাড়া জাগায়। সর্বস্তরের জনতা শিক্ষার্থীদের পাশে এসে দাঁড়ায়।
৩ আগস্ট ২০২৪ : এক দফা দাবি (সরকারের পদত্যাগ) : শহীদ মিনারের বিশাল ছাত্র-জনতার সমুদ্র থেকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সমন্বয়করা তৎকালীন সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও তার মন্ত্রিসভার পদত্যাগের একমাত্র ঐতিহাসিক ‘এক দফা’ দাবি ঘোষণা করেন।
৪ আগস্ট ২০২৪ : অসহযোগ আন্দোলন ও নজিরবিহীন সহিংসতা : শিক্ষার্থীদের ডাকা সর্বাত্মক অসহযোগ আন্দোলনের প্রথম দিনেই দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক সংঘর্ষ ও সহিংসতা ঘটে। এক দিনেই শতাধিক মানুষ নিহত হন। শিক্ষার্থীরা পরদিন ৫ আগস্ট ‘লংমার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচির ডাক দেয়।
৫ আগস্ট ২০২৪ : ‘মার্চ টু ঢাকা’ ও ফ্যাসিবাদের পতন কারফিউ ভেঙে লাখ লাখ মানুষ ঢাকার রাস্তায় নেমে আসে। দুপুরের দিকে ছাত্র-জনতার বিশাল গণমিছিল প্রধানমন্ত্রীর সরকারি বাসভবন ‘গণভবন’ ও শাহবাগের দিকে অগ্রসর হয়। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে সেনাপ্রধানের হস্তক্ষেপে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পদত্যাগ করতে বাধ্য হন এবং সামরিক হেলিকপ্টারে করে বোন শেখ রেহানাসহ ভারতে পালিয়ে যান। এর মাধ্যমে অবসান ঘটে দীর্ঘ ১৬ বছরের ফ্যাসিবাদী অপশাসনের। মহান ত্যাগের খতিয়ান এই গণঅভ্যুত্থানে রক্তের বন্যা বইয়ে দেওয়া হয়েছিল। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন ও অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তথ্যানুযায়ী, আন্দোলন চলাকালীন প্রায় ১,০০০ থেকে ১,৪০০ জনেরও বেশি মানুষ শহীদ হন এবং ২০,০০০-এর বেশি মানুষ গুরুতর আহত বা পঙ্গুত্ববরণ করেন। শত শত শিক্ষার্থী তাদের চোখের দৃষ্টি হারান। এই অনন্য সাধারণ ত্যাগ ও বীরত্বের কারণে ৫ আগস্ট দিনটিকে পরবর্তীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
নতুন বাংলাদেশের সূচনা ৫ আগস্টের সফল বিপ্লবের পর ৮ আগস্ট নোবেলজয়ী ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠিত হয়। এই বিপ্লব শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন নয়, বরং দেশের বিচার বিভাগ, প্রশাসন, পুলিশ বাহিনী এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর আমূল সংস্কারের এক নতুন যুগের সূচনা করেছে। ছাত্র-জনতার এই রক্তলব্ধ বিজয় ধরে রাখা এবং একটি বৈষম্যহীন, গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ বিনির্মাণ করাই এখন এই নতুন প্রজন্মের প্রধান অঙ্গীকার। কিন্তু অভ্যুত্থানকে বিপ্লবে রূপ দিতে গণভোটের রায় বাস্তাবয়নই এখন জনতার দাবি। জুলাই-আগস্ট অভ্যুত্থানের চূড়ান্ত লক্ষ্য বিপ্লব এখনো অধরা। জুলাই সনদের আলোকে সংবিধান পরিবর্তন ছাড়া অভ্যুত্থান বিপ্লবে রূপ পাবে না বলে মনে করেন রাজনীতি বিশ্লেষকরা।