জনগণের বিবেচনাবোধকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারোর নেই –বিরোধীদলীয় নেতা


৮ জুলাই ২০২৬ ২১:০৪

স্টাফ রিপোর্টার : ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনা, গণভোটের রায় বাস্তবায়ন এবং জুলাই গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচার এবং আমাদের বাস্তবতা’ শীর্ষক সেমিনারে দেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিরোধীদলীয় নেতা ও বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ডা. শফিকুর রহমান বলেছেন, “যারা একসময় সংসদে দাঁড়িয়ে ‘জুলাই সনদ’কে ‘অন্তহীন প্রতারণার দলিল’ বলেছিলেন, তারা আজ জনগণের বিচারবোধকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। গণতন্ত্রে বিশ্বাস করলে জনগণের বিবেচনাবোধকে অবজ্ঞা করার অধিকার কারোর নেই।”
গত বুধবার (৮ জুলাই) রাজধানীর আইডিইবির মাল্টিপারপাস হলে ১১ দলীয় ঐক্যের উদ্যোগে আয়োজিত বিশেষ সেমিনারে এসব কথা বলেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘রাজনৈতিক দলের পক্ষ থেকে জাতির সাথে তামাশা ও প্রতারণা করা হলে ভবিষ্যতে জনগণ রাজনীতিবিদদের প্রতি আস্থা ও সম্মান হারাবে। জনগণ একসময় বিশ্বাস করবে যে রাজনীতিবিদদের কথার কোনো মূল্য নেই, সুবিধাজনক অবস্থানে পৌঁছেই তারা জনগণের সাথে করা প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়।’ তিনি অভিযোগ করেন, ‘অনেকের কাছে নিজেদের সহযোদ্ধাদের রক্তেরও মূল্য নেই। মূল্য থাকলে তারা আগে দেশের মানুষের পাশে দাঁড়াতেন।’
অন্তর্বর্তী সরকারের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে জামায়াত আমীর বলেন, ‘যাদের নিরপেক্ষ হিসেবে পরিচয় দেয়া হয়েছিল, তারাও ষড়যন্ত্রে জড়িত ছিলেন এবং পরবর্তীতে নিজেরাই তা স্বীকার করেছেন।’
তিনি বলেন, ‘ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে ১১ দলকে পরাজিত করা হয়েছে। তবে সম্ভাব্য বিশৃঙ্খলা এড়াতে ১১ দল দায়িত্বশীলতার পরিচয় দিয়ে নির্বাচনের ফল মেনে নিলেও গণভোটের রায়কে অবজ্ঞা করতে দেয়া হবে না।’
সংবিধান সংস্কারের জন্য নতুন কোনো কমিশনের প্রয়োজন নেই বলে মন্তব্য করে তিনি বলেন, ‘সংশোধনের প্রয়োজন হলে সরকার বা বিরোধীদল সংসদে বিল আনতে পারে। বিল সংসদীয় প্রক্রিয়ায় ভেটিং, আলোচনা ও ভোটের মাধ্যমে পাস হতে পারে; এজন্য আলাদা কমিশন গঠনের প্রয়োজন নেই।’
তিনি বলেন, ‘গণভোটের উদ্দেশ্য ছিল দেশের পচে যাওয়া রাজনৈতিক সংস্কৃতির আমূল পরিবর্তন এবং ফ্যাসিবাদের শিকড় উপড়ে ফেলা। জনগণের বিপুল সমর্থনের এই রায় বাস্তবায়ন হবে এবং তা ব্যর্থ হতে দেয়া হবে না।’
দীর্ঘ রাজনৈতিক সহযাত্রার কথা স্মরণ করে তিনি বলেন, ‘একসময় সবাই একসাথে আন্দোলন, সংগ্রাম, নির্বাচন ও রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন। কিন্তু বর্তমানে কিছু রাজনৈতিক মিত্রের বক্তব্যে মনে হয়, তারা যেন অতীতের সেই সম্পর্ক অস্বীকার করছেন।’
মান-অভিমান ভুলে জনগণের রায়কে সম্মান জানানোর আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘নতুন বা পুরোনো কোনো ধরনের ফ্যাসিবাদই গ্রহণযোগ্য নয়।’
জেল-জুলুমের ভয় দেখিয়ে জনগণকে দমিয়ে রাখা যাবে না উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘দেশের স্বার্থে, জাতির স্বার্থে এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য তারা প্রস্তুত আছেন।’
জুলাইযোদ্ধাদের নিয়ে ‘বাড়াবাড়ি’ না করার আহ্বান জানিয়ে তিনি সংশ্লিষ্টদের সংযত হওয়ার পরামর্শ দেন।
এ সময় তিনি বলেন, ‘আইন নিজের হাতে তুলে নেয়ার পক্ষে নই, তবে কেউ যদি শালীনতার সীমা লঙ্ঘন করে জুলাইকে অপমান করার চেষ্টা করে, তাহলে জনগণ ও যুবসমাজ তার জবাব দেবে।’
সেমিনারে এডভোকেট তাজুল ইসলাম উপস্থাপিত প্রবন্ধটিতে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানকে ফ্যাসিবাদের অবসান ঘটিয়ে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার ‘রাষ্ট্রের পুনর্জন্ম’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। দীর্ঘ ১৭ বছরের স্বৈরশাসনের নিপীড়ন থেকে মুক্তির এই মহাবিজয়কে বাস্তবে রূপ দিতে অন্তর্বর্তী সরকারের তিনটি মূল ম্যান্ডেট চিহ্নিত করা হয়।
প্রথমত, জুলাই গণহত্যাসহ বিগত সময়ে সংঘটিত সকল মানবতাবিরোধী অপরাধের সুষ্ঠু বিচার;
দ্বিতীয়ত, সংবিধানসহ রাষ্ট্র ব্যবস্থার মৌলিক সংস্কার এবং
তৃতীয়ত, ভেঙে পড়া নির্বাচন ব্যবস্থার পুনঃপ্রতিষ্ঠা।
প্রবন্ধে ২০২৬ সালের গণভোটে ৬৮.৫৯% মানুষের ‘হ্যাঁ’ ভোটের রায়কে জনগণের সার্বভৌম ইচ্ছার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করে তা অবিলম্বে বাস্তবায়নের তাগিদ দেয়া হয়। এর মধ্যে নির্বাচনকালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা, দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদকাঠামো এবং বিচার বিভাগের পূর্ণ স্বাধীনতা অন্যতম। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং কমিটির প্রতিবেদন অনুযায়ী জুলাই ম্যাসাকারকে ‘মানবতাবিরোধী অপরাধ’ উল্লেখ করে দ্রুত বিচার সম্পন্ন করার জোর দাবি জানানো হয়। পাশাপাশি এনটিএমসিসহ বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা ও নিরাপত্তা বাহিনীর আইনি সংস্কার, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যা প্রতিরোধে কঠোর আইনি কাঠামো তৈরি, গণমাধ্যমের জবাবদিহি এবং ভিকটিম ও শহীদ পরিবারগুলোর রাষ্ট্রীয় পুনর্বাসন নিশ্চিতের আহ্বান জানানো হয়েছে।
পরিশেষে প্রতিহিংসা নয়; বরং সত্য, জবাবদিহি এবং ‘নেভার এগেইন’ (আর কখনো নয়) নীতি প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি সুশাসিত ও ন্যায়ভিত্তিক রাষ্ট্র গঠনের অঙ্গীকার ব্যক্ত করা হয়।
সেমিনারে সভাপতির বক্তব্যে লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) সভাপতি ড. কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীকে বলব, আপনি এ যাবত অনেকগুলো পদক্ষেপ নিয়েছেন, যেগুলো আমরা সমর্থন দিয়েছি। বিশেষ করে আপনার ভিজিট চায়না বা মালয়েশিয়া; এগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়েছে। সর্বসম্মতিক্রমে আপনাকে সমর্থন দিয়েছে। আপনি চতুর্দিকে শত্রু রেখে দেশ পরিচালনা করতে পারবেন না। আপনার আশপাশে যারা আছে, তারা হলো অপ্রকাশ্য শত্রু। অনেকে আছে যারা বিদেশ থেকে টাকা পায়, বিদেশ থেকে তাদের পরামর্শ দেয়া হয় এবং আপনাকে বিপথগামী করে। আপনার প্রথম এবং প্রধান কাজ হচ্ছে বাংলাদেশে যারা বিদেশি গুপ্তচর আছে, তাদের বের করা। তাদের দ্বারা আপনি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, দেশ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আপনি ইতিহাসের একজন নেতা হয়ে থাকেন। এটাতে আপনার ক্ষতি হওয়ার কিছু নেই। আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে শেষ করাটা বাঞ্ছনীয়।’
তিনি বলেন, ‘আপনার দেশের আইনশৃঙ্খলা ভালো না। অবৈধ দখলদারি, চাঁদাবাজি হচ্ছে, মাদকের ব্যাপক বিস্তার লাভ করছে এবং অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো না। নতুন বিনিয়োগও আপনি পাচ্ছেন না। ১১ দল আপনার শত্রু না। ১১ দল আপনার বন্ধু, যার কারণে প্রকাশ্যে আপনাকে পরামর্শ দিচ্ছে। এ পরামর্শ জামায়াতের জন্য না, ১১ দলীয় ঐক্যজোটের জন্য না, এটা হলো দেশের মঙ্গলের জন্য।’
তিনি আরো বলেন, ‘অনেকেই ২০১৮ সালের নির্বাচনে হাসিনার কাছ থেকে টাকা নিয়েছে, তারা আপনার দলের লোক। আপনি যদি জানতে চান আমার সাথে কথা বলেন, আমি বলে দেবো কে কত কোটি টাকা নিয়েছে, কোন বাসা থেকে নিয়েছে। সুতরাং আপনি হলেন দ্বিতীয় স্বামী। তারা প্রথম স্বামীর সাথে বেঈমানি করবে না।’ আলোচনা সভায় বক্তারা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের চেতনাকে ধারণ করে জনগণের ভোটের অধিকার নিশ্চিত করা এবং জুলাই হত্যাকাণ্ডের সাথে জড়িতদের মানবতাবিরোধী অপরাধের আওতায় এনে দ্রুত বিচারের দাবি জানান। দেশের বর্তমান বাস্তবতায় রাজনৈতিক দলগুলোর ঐক্যবদ্ধ ভূমিকার ওপর জোর দেন নেতারা।
জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সেক্রেটারি ড. শফিকুল ইসলাম মাসুদের সঞ্চালনায় সেমিনারে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমীর মাওলানা মামুনুল হক, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার, এবি পার্টির সাধারণ সম্পাদক ব্যারিস্টার আসাদুজ্জামান ফুয়াদ, জাগপার মুখপাত্র রাশেদ প্রধান, দৈনিক মানবকণ্ঠের সম্পাদক ও ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি শহিদুল ইসলাম, বাংলাদেশ ডেভেলপমেন্ট পার্টির চেয়ারম্যান এডভোকেট আনোয়ারুল ইসলাম, ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির, বাংলাদেশ লেবার পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তাফিজুর রহমান ইরান, নেজামে ইসলাম পার্টির মহাসচিব মুসা বিন ইযাহার চৌধুরী, সাবেক রাষ্ট্রদূত সাকিব আলী, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব আখতার হোসেন এবং ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. হামিদুর রহমান আযাদ। এছাড়া ১১ দলীয় ঐক্যের শীর্ষস্থানীয় নেতৃবৃন্দ, রাজনীতিক ও সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।