মূল্যস্ফীতির বিরুদ্ধে লড়াই নাকি প্রবৃদ্ধির সঙ্গে সমঝোতা?
৮ জুলাই ২০২৬ ২০:৫২
॥ কাওসার রহমান ॥
টানা চার বছর ধরে বাংলাদেশ ব্যাংক মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি অনুসরণ করছে। চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথমার্ধের (জুলাই-ডিসেম্বর) জন্য ঘোষিত নতুন মুদ্রানীতিও সেই ধারারই ধারাবাহিকতা। এতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশে অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে, ঋণপ্রবাহে সতর্ক অবস্থান বজায় রাখা হয়েছে এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানের পুনর্ব্যক্তি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, চার বছর ধরে একই ধরনের নীতি অনুসরণের পরও যখন মূল্যস্ফীতি এখনো ৯ শতাংশের ওপরে, তখন একই ওষুধে কি কাক্সিক্ষত ফল মিলবে? নাকি অর্থনীতির সামনে এখন প্রয়োজন আরও সমন্বিত ও সাহসী নীতিগত পদক্ষেপ?
বাংলাদেশ ব্যাংকের নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমানের ঘোষিত প্রথম মুদ্রানীতিতে বড় কোনো চমক নেই। বরং এতে পূর্ববর্তী গভর্নর আহসান এইচ মনসুরের সময় শুরু হওয়া কঠোর নীতিগত অবস্থানই বহাল রাখা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের যুক্তি স্পষ্ট, মূল্যস্ফীতি এখনো সরকারের লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় অনেক বেশি। ফলে সুদের হার কমানোর মতো পরিস্থিতি তৈরি হয়নি।
সংবাদ সম্মেলনে গভর্নর জানান, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে পয়েন্ট-টু-পয়েন্ট ভিত্তিতে সার্বিক মূল্যস্ফীতি ছিল ১১ দশমিক ৭ শতাংশ। তা কমে ২০২৬ সালের মে মাসে ৯ দশমিক ৪ শতাংশে এসেছে। অর্থাৎ মূল্যস্ফীতি নিম্নমুখী হলেও তা এখনো স্বস্তিদায়ক পর্যায়ে পৌঁছায়নি। নতুন অর্থবছরে মূল্যস্ফীতিকে ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। সেই লক্ষ্য অর্জনে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ, স্ট্যান্ডিং লেন্ডিং ফ্যাসিলিটি (এসএলএফ) ১১ দশমিক ৫ শতাংশ এবং স্ট্যান্ডিং ডিপোজিট ফ্যাসিলিটি (এসডিএফ) ৭ দশমিক ৫ শতাংশ অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে।
মুদ্রানীতি বিবৃতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতির বিরাজমান পরিস্থিতি ও আগামী দিনের ঝুঁকির বিষয়গুলো তুলে ধরা হয়।
এ প্রসঙ্গে মুদ্রানীতিতে বলা হয়েছে, আগামী সময়ে অর্থনীতির জন্য বেশ কয়েকটি বড় ঝুঁকি রয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানি সংকট, সরবরাহ ব্যবস্থাজনিত মূল্যস্ফীতি, মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থতা, ব্যাংক খাতের চাপ এবং বৈদেশিক খাতে ভারসাম্যহীনতা। এসব ঝুঁকি ও সংকট মোকাবিলায় সংকোচনমুখী মুদ্রানীতির ওপরই ভরসা রেখেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থান ধরে রাখার পাশাপাশি মুদ্রানীতিতে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ত্বরান্বিত করতে লক্ষ্যভিত্তিক ঋণ সহায়তা ও সংস্কার কার্যক্রমের ওপর জোর দেয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রত্যাশা, মূল্যস্ফীতি ধীরে ধীরে কমে এলে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধির গতি পুনরায় বাড়বে।
মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা
সদ্যঘোষিত মুদ্রানীতিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেই স্বীকার করেছে, মূল্যস্ফীতির বড় অংশই সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা, বাজারে প্রতিযোগিতার অভাব, জ্বালানি ও আমদানিনির্ভর ব্যয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। গভর্নরও বলেছেন, শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে এই ধরনের মূল্যস্ফীতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব নয়। এই স্বীকারোক্তিই মূলত বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু।
যদি মূল্যস্ফীতির প্রধান কারণ বাজারব্যবস্থার অদক্ষতা, সরবরাহ সংকট ও বৈশ্বিক অস্থিরতা হয়, তাহলে কেবল সুদের হার উঁচু রেখে কতটা ফল পাওয়া যাবে? অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশের মতে, এখানেই বর্তমান মুদ্রানীতির সীমাবদ্ধতা।
নতুন মুদ্রানীতিতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহের লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৬ দশমিক ৮ শতাংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। আগের লক্ষ্যমাত্রা ছিল সাড়ে ৮ শতাংশ। বাস্তবে সাম্প্রতিক সময়ে বেসরকারি ঋণের প্রবৃদ্ধি প্রায় ৪ শতাংশে নেমে এসেছে, যা গত এক দশকের মধ্যে নিম্নস্তর। বিনিয়োগে স্থবিরতা, উচ্চ সুদের হার, উদ্যোক্তাদের অনিশ্চয়তা এবং ব্যাংকগুলোর সতর্ক ঋণনীতি, সব মিলিয়ে ঋণের চাহিদাই কমে গেছে।
এই অবস্থায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক উৎপাদনমুখী শিল্পে গতি আনতে ৬০ হাজার কোটি টাকার বিশেষ প্রণোদনা কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ধারণাটি ইতিবাচক হলেও এর বাস্তবায়নই হবে সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, অনেক ক্ষেত্রেই প্রণোদনার অর্থ প্রকৃত উৎপাদনশীল খাতের পরিবর্তে প্রভাবশালী গোষ্ঠীর হাতে চলে গেছে। ফলে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং যথাযথ তদারকি ছাড়া এই উদ্যোগ প্রত্যাশিত সুফল নাও দিতে পারে।
মুদ্রানীতির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো প্রবৃদ্ধি নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক অবস্থান। সরকার যেখানে নতুন অর্থবছরে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, সেখানে বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রাক্কলন ৬ দশমিক ১ শতাংশ। এই পার্থক্য নিছক পরিসংখ্যানগত নয় বরং এটি অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতা সম্পর্কে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সতর্ক মূল্যায়নের প্রতিফলন।
প্রতিবেশী দেশগুলোয় কেমন মুদ্রানীতি
ভারত ও পাকিস্তানে বর্তমানে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় রাখা এবং মুদ্রাবিনিময় হারের স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো সংকোচনমূলক ও সতর্কতামূলক মুদ্রানীতি বাস্তবায়ন করছে।
ভারতের মুদ্রানীতি দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক রিজার্ভ ব্যাংক অব ইন্ডিয়া (আরবিআই) মুদ্রাস্ফীতিকে সহনীয় মাত্রায় রাখার জন্য সংকোচনমূলক কিন্তু নিরপেক্ষ নীতি অনুসরণ করছে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আরবিআই নীতিনির্ধারণী সুদহার বা রেপো রেট ৫.২৫ শতাংশে এ অপরিবর্তিত রেখেছে। এর প্রধান লক্ষ্য হলো ভোক্তা মূল্যসূচক (সিপিআই) ৪ শতাংশের কাছাকাছি রাখা এবং সেই অনুযায়ী তারা ব্যাংকিং ব্যবস্থায় তারল্য নিয়ন্ত্রণ করছে। মুদ্রাবিনিময় হারের অতিরিক্ত ওঠানামা ঠেকাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বৈদেশিক মুদ্রা বাজারে হস্তক্ষেপ করে, তবে টাকার অবমূল্যায়ন রোধে কোনো নির্দিষ্ট লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে না।
অপরদিকে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তানও (এসবিপি) মূল্যস্ফীতি কমানো ও ম্যাক্রো-ইকোনমিক স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনার জন্য সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করেছে। মূল্যস্ফীতি ও আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার প্রভাব মোকাবিলায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পলিসি রেট ১০.৫০ শতাংশে অপরিবর্তিত রেখেছে। এর প্রধান উদ্দেশ্য হলো মধ্যমেয়াদি মূল্যস্ফীতি ৫ থেকে ৭ শতাংশের মধ্যে সীমিত রাখা।
রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির বিরোধ
এখানেই রাজস্বনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে এক ধরনের অসামঞ্জস্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। একদিকে জাতীয় বাজেটে বিনিয়োগ, শিল্পায়ন ও কর্মসংস্থান বাড়াতে কর ও শুল্ক-সুবিধা দেওয়া হয়েছে; অন্যদিকে উচ্চ সুদের হার ও সংকুচিত ঋণপ্রবাহ সেই উদ্যোগের গতি কমিয়ে দিতে পারে। অর্থনীতিতে যখন রাজস্বনীতি একদিকে এগোয় আর মুদ্রানীতি অন্যদিকে টানে, তখন কাক্সিক্ষত প্রবৃদ্ধি অর্জন কঠিন হয়ে পড়ে।
ঢাকা চেম্বারের সভাপতি তাসকীন আহমেদের বক্তব্যে সেই উদ্বেগই প্রতিফলিত হয়েছে। তাঁর মতে, চার বছর ধরে কঠোর মুদ্রানীতি অনুসরণ করেও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। ফলে নীতি সুদহার অপরিবর্তিত রাখা ব্যবসায়ীদের জন্য হতাশাজনক। বাজেটে ঘোষিত প্রণোদনার সুফলও পর্যাপ্ত ও সাশ্রয়ী অর্থায়ন ছাড়া বাস্তবায়িত হবে না।
অন্যদিকে সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক সেলিম রায়হানের পর্যবেক্ষণ আরও গভীর। তাঁর মতে, বর্তমান অর্থনৈতিক সংকটের মূল উৎস শুধু মূল্যস্ফীতি নয়; আর্থিক খাতের দুর্বলতা, খেলাপি ঋণের বিস্তার, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং বাজারব্যবস্থার অদক্ষতা। এসব মিলিয়েই অর্থনীতির এই সংকট তৈরি হয়েছে। তাই শুধু মুদ্রানীতি দিয়ে সমাধান সম্ভব নয়; প্রয়োজন আর্থিক খাত, করব্যবস্থা ও বাজার ব্যবস্থাপনায় কাঠামোগত সংস্কার।
তিনি বলেন, ‘অর্থনীতির পুনরুদ্ধারের জন্য ব্যক্তি খাতে বিনিয়োগ বৃদ্ধি জরুরি; কিন্তু এখনো বিনিয়োগে গতি আসেনি। নির্বাচনের পর কিছুটা আস্থা তৈরি হলেও জ্বালানিসংকট, লোডশেডিং ও অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতার কারণে বিনিয়োগকারীদের আস্থা পুরোপুরি ফিরে আসেনি। উল্টো রপ্তানি খাতেও চাপ বাড়ছে। মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতা, ইউরোপের চাহিদা কমে যাওয়া ও বৈশ্বিক বাণিজ্যযুদ্ধ অর্থনীতির ওপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।’
সেলিম রায়হান আরও বলেন, ‘বর্তমান অর্থনৈতিক বাস্তবতায় শুধু নিয়ম মেনে মুদ্রানীতি দেওয়াই যথেষ্ট নয়; এটি কতটা কার্যকর হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন। কেননা আর্থিক খাতের গভীর সংকট, ব্যাংকিং খাতের খেলাপি ঋণের বিস্তার ও কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলার স্পষ্ট উদ্যোগ এখনো দেখা যাচ্ছে না।’
গবেষণা প্রতিষ্ঠান চেঞ্জ ইনিশিয়েটিভের রিসার্চ ফেলো ব্যাংক খাত গবেষক হেলাল আহমেদ জনি বলেন, ‘মুদ্রানীতির কার্যকর করার পাশাপাশি শক্তিশালী আর্থিক খাত, সুশাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারলেই মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মধ্যে ভারসাম্য আনা সম্ভব হবে।’
অর্থনীতিতে মুদ্রানীতির প্রভাব
বাংলাদেশ ব্যাংক অবশ্য খেলাপি ঋণ কমাতে ১৮ মাসের কর্মপরিকল্পনা ঘোষণা করেছে। অর্থঋণ আদালতের বিচার দ্রুত শেষ করা, সম্পদ ব্যবস্থাপনা কোম্পানি গঠন এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা ইতিবাচক। ব্যাংক খাতে ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতির কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ইতিহাস বলছে, ঘোষণা নয়, বাস্তবায়নই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক প্রভাব, দুর্বল তদারকি এবং দীর্ঘ বিচারপ্রক্রিয়া অতীতে বহু উদ্যোগকে ব্যর্থ করেছে।
বিদেশি ঋণ গ্রহণ সহজ করার ইঙ্গিতও নতুন মুদ্রানীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। যদি দেশীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠান ৫-৬ শতাংশ সুদে বিদেশি ঋণ পেতে পারে, তাহলে তাদের অর্থায়ন ব্যয় কমবে। তবে এর সঙ্গে বৈদেশিক মুদ্রার ঝুঁকি, বিনিময় হার এবং ঋণ ব্যবস্থাপনার সক্ষমতাও বিবেচনায় রাখতে হবে।
বর্তমান বৈশ্বিক পরিস্থিতিও বাংলাদেশের জন্য বড় অনিশ্চয়তা তৈরি করছে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা, ইউরোপে চাহিদা কমে যাওয়া এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে নতুন অনিশ্চয়তা আমদানিনির্ভর অর্থনীতির জন্য অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করতে পারে। ফলে অভ্যন্তরীণ নীতির পাশাপাশি বৈশ্বিক ঝুঁকি ব্যবস্থাপনাও সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য, আর তা হলো বাংলাদেশ ব্যাংক এবার প্রথমবারের মতো প্রকাশ্যে স্বীকার করেছে যে বাজারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সরবরাহব্যবস্থার সংকট মূল্যস্ফীতির অন্যতম কারণ। এই স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এতে স্পষ্ট হয় যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব শুধু কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নয়; বাণিজ্য, কৃষি, জ্বালানি, রাজস্ব প্রশাসন এবং প্রতিযোগিতা কমিশনসহ সরকারের বিভিন্ন সংস্থার সমন্বিত ভূমিকা অপরিহার্য।
মুদ্রানীতি মূলত অর্থের জোগান, ঋণের ব্যয় ও আর্থিক পরিবেশ নিয়ন্ত্রণের একটি নীতি। কিন্তু খাদ্যপণ্যের বাজারে সিন্ডিকেট, সরবরাহ শৃঙ্খলের দুর্বলতা, পরিবহন ব্যয়, জ্বালানির মূল্য কিংবা বৈদেশিক বাজারের ধাক্কা, এসব সমস্যার সমাধান একা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পক্ষে সম্ভব নয়। ফলে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আর্থিক ও রাজস্বনীতির পাশাপাশি বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর সংস্কার এখন সময়ের দাবি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, সরকারের সম্প্রসারণমুখী জাতীয় বাজেট এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ঘোষিত সংকোচনমূলক মুদ্রানীতির মধ্যে বিদ্যমান অসামঞ্জস্য দেশের অর্থনীতিকে আরও গভীর সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। কারণ একদিকে বিপুল ঋণনির্ভর বাজেট বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, অন্যদিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের নামে কঠোর মুদ্রানীতি গ্রহণ করা হয়েছে। এই দুই নীতির মধ্যে সাংঘর্ষিক অবস্থান অর্থনীতি পুনরুদ্ধারে সহায়ক না হয়ে বরং নতুন সংকট তৈরি করবে।
সরকার যদি সম্প্রসারণমূলক রাজস্বনীতি অনুসরণ করে এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংক সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি গ্রহণ করে, তাহলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সাধারণ মানুষের ওপর। এমনিতেই গত কয়েক বছর ধরে দেশের মানুষ উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপ সহ্য করছে। কিন্তু উৎপাদন ব্যয় কমানো, বাজারের সিন্ডিকেট ভাঙা, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ এবং সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করার মতো মৌলিক উদ্যোগ না নিয়ে সরকার ঋণনির্ভর বাজেটের ওপর নির্ভর করছে। এতে মূল্যস্ফীতি কমার পরিবর্তে অর্থনীতির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
অর্থনীতিবিদ প্রফেসর ড. মুহাম্মদ মাহবুব আলী বলেন, ‘সরকার ঘোষিত ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেটে ব্যবসা সম্প্রসারণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং শিল্পায়ন ত্বরান্বিত করতে বিভিন্ন কর ও শুল্কসুবিধা প্রদান করা হয়েছে। কিন্তু মুদ্রানীতিতে সেই প্রবৃদ্ধিমুখী দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন নেই।’
তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অবস্থান রাজনীতি ও মুদ্রানীতির মধ্যে একটি সুস্পষ্ট অসামঞ্জস্যের ইঙ্গিত। উচ্চ নীতি সুদহার বহাল থাকায় ঋণের ব্যয় কমানোর সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত ছিল রাজস্বনীতির সঙ্গে সমন্বয় করে মুদ্রানীতি ঘোষণা করা।’
অপরদিকে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমদ বলছেন, ‘অর্থনীতির বাস্তবতার আলোকেই অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি ঘোষণা করা হয়েছিল। সাপ্লাই সাইড পর্যাপ্ত বাড়াতে না পারা এবং বাজার শক্তভাবে মনিটর করতে না পরার কারণে ওই মুদ্রানীতির সুফল পুরোপুরি পাওয়া যায়নি। এবারের মুদ্রানীতিতেও দেখলাম নীতি সুদহার একই রাখা হয়েছে। এতে বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কমে গেলে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমে যাবে। তাই এক্ষেত্রে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কৌশলী হওয়া উচিত ছিল। ’
তিনি বলেন, ‘এবারের মুদ্রানীতিতে নীতি সুদহার ১০ শতাংশ না রেখে অন্তত ৫০ বেসিস পয়েন্ট কমিয়ে ৯.৫ শতাংশ করতে পারতো। এতে অন্তত স্টেকহোল্ডারদের কাছে একটি বার্তা যেতো। আর এর সঙ্গে ব্যাংক খাতের দক্ষতা বাড়িয়ে এটা নিশ্চিত করা উচিত ছিল, বাড়তি যে ঋণ যেতো তা যাতে উৎপাদন খাতে ব্যয় হয়। এটা করা গেলে নীতি সুদ হার কমানোর সুফল অর্থনীতিতে পাওয়া যেতো।’
পরিশেষ
সব মিলিয়ে নতুন মুদ্রানীতি সতর্ক, বাস্তববাদী এবং ধারাবাহিকতার বার্তা দিয়েছে। তবে এটি অর্থনীতিতে নতুন গতি সৃষ্টির কোনো নীতিপত্র নয়। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যুক্তি থাকলেও বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও শিল্পায়নের জন্য প্রয়োজনীয় আস্থার পরিবেশ কীভাবে তৈরি হবে, তার সুস্পষ্ট উত্তর এতে নেই। প্রণোদনা কর্মসূচি, খেলাপি ঋণ কমানোর পরিকল্পনা এবং ব্যাংকিং খাতে সুশাসনের অঙ্গীকার, এসব উদ্যোগের সফলতা নির্ভর করবে বাস্তবায়নের ওপর।
টানা চার বছর পরও যদি একই ধরনের সংকোচনমূলক মুদ্রানীতি বহাল রাখতে হয়, তবে সেটি কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নয়, সামগ্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনারও একটি বার্তা বহন করে। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ অবশ্যই জরুরি; কিন্তু সেই লড়াইয়ে প্রবৃদ্ধি, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান যেন অযথা ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও সমান নজর দিতে হবে। বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে শুধু সুদের হার নয়; নীতির সমন্বয়, আর্থিক খাতের সংস্কার এবং বাজারে সুশাসনই আগামী দিনের সাফল্য নির্ধারণ করবে।