আল্লাহর বিধান অনুযায়ী বিচার ফয়সালা না করার পরিণাম
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:০৫
॥ জাফর আহমাদ ॥
যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা করে না, তাদের সম্পর্কে কুরআন তিনটি বিধান দিয়েছে। এক. তারা কাফের। দুই. তারা জালিম। তিন. তারা ফাসিক। এর পরিষ্কার অর্থ হচ্ছে, যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুম ও তার নাজিল করা আইন ত্যাগ করে নিজের বা মানুষের মনগড়া আইনের ভিত্তিতে ফয়সালা করে, সে আসলে বড় ধরনের অপরাধ করে। প্রথমত, তার এ কাজটি আল্লাহর হুকুম অস্বীকার করার শামিল। কাজেই এটি কুফরী। দ্বিতীয়ত, তার এ কাজটি ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতির বিরোধী। কারণ আল্লাহ যথার্থ ইনসাফ ও ভারসাম্যনীতি অনুযায়ীই হুকুম দিয়েছিলেন। কাজেই আল্লাহর হুকুম থেকে সরে এসে যখন সে ফয়সালা করলো, তখন সে আসলে জুলুম করলো। তৃতীয়ত, বান্দা হওয়া সত্ত্বেও যখনই সে নিজের প্রভুর আইন অমান্য করে নিজের বা অন্যের মনগড়া আইন প্রবর্তন করলো, তখনই সে আসলে বন্দেগী ও আনুগত্যের গণ্ডির বাইরে পা রাখলো। আর এটি অবাধ্যতা বা ফাসেকী। বর্তমানে আমাদের দেশে যেই আইন চালু আছে, তা অবশ্যই আল্লাহর দেয়া আইন নয়। এটি মানুষের মস্তিষ্কপ্রসূত আইন। একই সাথে আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা হিসেবে নিজেদের পরিচয় দিই, কিন্তু আইন-আদালতে মানুষের প্রবর্তিত মনগড়া আইন দিয়ে বিচার-ফয়সালা করি। সত্যিকার অর্থে আমরা আল্লাহর খাঁটি বান্দা নই। কাফের না হলেও জালিম ও ফাসেক হিসেবে চিহ্নিত হবো। এই অবস্থা থেকে নিষ্কৃতি পাওয়ার জন্য আমাদের অবশ্যই এই আইন পরিবর্তন করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
এ কুফরী, জুলুম ও ফাসেকী তার নিজের ধরন ও প্রকৃতির দিক দিয়ে অনিবার্যভাবেই পুরোপুরি আল্লাহর হুকুম অমান্যেরই বাস্তব রূপ। যেখানে আল্লাহর হুকুম অমান্য করা হবে, সেখানে এ তিনটি বিষয় থাকবে না— এটা কোনো ক্রমেই সম্ভব নয়। তবে আল্লাহর হুকুম অমান্য করার যেমন পর্যায়ভেদ আছে, তেমনি এ তিনটি বিষয়েরও পর্যায়েরও পর্যায়ভেদ আছে। যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে ভুল এবং নিজের বা অন্য কোনো মানুষের হুকুমকে সঠিক মনে করে আল্লাহর হুকুমবিরোধী ফয়সালা করে, সে পুরোপুরি কাফের, জালেম ও ফাসেক। আর যে ব্যক্তি আল্লাহর হুকুমকে সত্য বলে বিশ্বাস করে, কিন্তু কার্যত তার বিরুদ্ধে ফয়সালা করে সে ইসলামী মিল্লাতবহির্ভূত না হলেও নিজের ঈমানকে কুফরী, জুলুম ও ফাসেকীর সাথে মিশিয়ে ফেলেছে। অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সমস্ত ব্যাপারে আল্লাহর হুকুম অমান্য করে সে সকল ব্যাপারেই কাফের, জালেম ও ফাসেক। আর যে ব্যক্তি কিছু ব্যাপারে আল্লাহর অনুগত এবং কিছু ব্যাপারে অবাধ্য তার জীবন ঈমান ও ইসলাম এবং কুফরী, জুলুম ও ফাসেকীর মিশ্রণ, ঠিক তেমনি হারে অবস্থান করছে যে হারে সে আনুগত্য ও অবাধ্যতাকে এক সাথে মিশিয়ে রেখেছে। তাফসীরে ইবনে কাসীর একই কথা বলেছেন।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “এবং সামান্য তুচ্ছ মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াত বিক্রি করা পরিহার করো। আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী যারা ফয়সালা করে না, তারাই কাফের।” (সূরা মায়েদা : ৪৪)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই জালেম।” (সূরা মায়েদা : ৪৫)।
আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর যারা আল্লাহর নাজিল করা আইন অনুযায়ী ফয়সালা করে না, তারাই ফাসেক।” (সূরা মায়েদা : ৪৭)।
কেউ কেউ এ আয়াতগুলোকে আহলে কিতাবদের সাথে বিশেষভাবে সম্পর্কিত বলে গণ্য করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু অধিকাংশ তাফসীর গ্রন্থে বলা হয়েছে যে, আল্লাহর কালামের শব্দের মধ্যে এ ধরনের ব্যাখ্যা করার কোনো অবকাশ নেই। তাফসীরে ইবনে কাসীরে উল্লেখ করা হয়েছে যে, এ আয়াতগুলো শানে নুযুল হিসেবে আহলে কিতাবের ব্যাপারে অবতীর্ণ হলেও হুকুমের দিক দিয়ে এটি সমস্ত লোকের ব্যাপারেই প্রযোজ্য। এগুলো বনী ইসরাইল সম্পর্কে নাজিল হয়েছে বটে; কিন্তু এ উম্মতেরও এটাই হুকুম। ইবনে মাসউদ রা. বলেন, ঘুষ খেয়ে কোনো শরয়ী মাসআলার ব্যাপারে উল্টো রায় দেয়া কুফরী। সুদ্দি রহ. বলেন যে, যদি ইচ্ছাকৃত আল্লাহর অহির বিপরিত ফতোয়া দেয়, জানা সত্ত্বেও তার উল্টো করে তবে সে কাফের। ইবনে আব্বাস রা. বলেন, যে ব্যক্তি আল্লাহর ফরমানকে অস্বীকার করবে তার হুকুম এটাই। আর যে ব্যক্তি অস্বীকার করলা না বটে, কিন্তু সে মোতাবেক বললো না, সে জালিম ও ফাসেক। সে আহলে কিতাবই হোক আর কেউ হোক। আতা রহ. বলেন, কুফরীর মধ্যে যেমন কমবেশি আছে, তেমনি জুলুম ও ফাসেকীর মধ্যে কমবেশি আছে।
আল কুরআনে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠীর ধ্বংসের ইতিহাস বর্ণিত হয়েছে। যে সমস্ত আয়াতে তাদের হঠকারী আচরণ উল্লেখ করা হয়েছে। সে সমস্ত হঠকারী কাজ যদি আমরা করি, তাহলে আমরাও ক্ষতিগ্রস্ত হবো। এই ইতিহাসের মাধ্যমে আমাদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, তোমাদের অবশ্যই হঠকারী আচরণ পরিত্যাগ করতে হবে। উল্লেখিত আয়াতগুলোর মাধ্যমেই আমাদের শিক্ষা দেয়া হয়েছে যে, তোমদের সামনে যে, কিতাব তথা আল কুরআন রয়েছে, তোমরা যদি সেই কুরআন অনুযায়ী বিচার-ফয়সালা না করো, তাহলে তোমরাও কাফের, জালিম ও ফাসিক হিসেবে চিহ্নিত হবে।
কাফের, জালেম ও ফাসিক
উল্লেখিত আয়াতসমূহে যারা আল্লাহর কিতাব অনযায়ী বিচার ফয়সালা করে না, তাদের কাফের, জালিম ও ফাসেক বলা হয়েছে। ইহুদিদের হঠকারী কাজের ফাঁকে কথাগুলো বলা হলেও এই বাক্যগুলো সকল মুসলমানদের জন্য প্রযোজ্য। অর্থাৎ বর্তমান আমাদের কাছে আল্লাহর বড় নিয়ামত হলো, আল কুরআন। আল কুরআনের দাবি হচ্ছে এটিকে পড়তে হবে, এটিকে হৃদয়াঙ্গম করতে হবে এবং এই কুরআন অনুযায়ী আমাদের পরিবার, সমাজ, অর্থনীতি, আইন-আদালত ও রাষ্ট্র পরিচালনা করতে হবে। অন্যথায় আমরা কাফির, জালিম ও ফাসেকে পরিণত হবো। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “আর এরা তোমাকে কীভাবে বিচারক মানছে যখন এদের কাছে রয়ে গেছে, যাতে আল্লাহর হুকুম লিখিত আছে আর তারপরও এরা তা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে আসলে এরা ঈমানই আনে না।” (সূরা মায়েদা : ৪৩)।
মদীনায় ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম হওয়ার পর ইহুদি সম্প্রয়দায় সন্ধি ও চুক্তির ভিত্তিতে ইসলামী রাষ্ট্রের সাথে তাদের সম্পর্ক গড়ে উঠেছিল। এ চুক্তিগুলো প্রেক্ষিতে ইহুদিরা তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়সমূহ স্বাধীনতা ভোগ করতো এবং তাদের মামলার ফয়সালা তাদের আইন অনুযায়ীই তাদের নিজেদের বিচাপতিরাই করতো। নবী সা. বা তাঁর নিযুক্ত বিচারপতিদের কাছে নিজেদের মামলা-মোকাদ্দমা আনার ব্যাপারে আইনের দিক দিয়ে তারা বাধ্য ছিল না। কিন্তু মুসলমানগণ নবী সা.-এর আইন মানতে বাধ্য। নবী সা.-এর ওপর যেই কুরআন নাযিল হয়েছিল, যেই কুরআন অনুযায়ী তিনি বিচার ফয়সালা করেছেন হুবহু সেই কুরআন আজও আমাদের মাঝে সম্পূর্ণ অবিকৃত অবস্থায় আছে। একজন ঈমানদার ও একজন মুসলিম হিসাবে সেই কুরআনের হুকুম মানা এবং সেই কুরআন অনুযায়ী বিচার ও রাষ্ট্র ব্যবস্থা পরিচালনা করা আমাদের জন্য বাধ্যতামূলক। যদি আমরা সেই বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্ত হয়ে খৃষ্টানদের রেখে যাওয়া আইন আদালত অনুযায়ী বিচার ফয়সালায় সন্তুষ্ট থাকি তাহলে আমাদের ইহুদি-খৃষ্টানই গণ্য করতে বাধা কোথায়।
কাফের, জালিম, ফাসেক ও ইহুদি-খৃষ্টানদের থেকে বেরিয়ে আসার একটি মাত্রই উপায়, তা হলো এই ব্যবস্থাকে উচ্ছেদ করে সেখানে ইসলামী বিচার ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে নিজেকে সম্পৃক্ত করতে হবে। অন্যথায় মহান আল্লাহর আদালতে জবাব দেয়ার মতো কোনো উপলক্ষ্যই খোঁজে পাওয়া যাবে না। আল্লাহর যমীনে আল্লাহর দীন প্রষ্ঠিার আন্দোলনে শুধুমাত্র চেষ্টা চালিয়ে যাওয়াই আমার কাজ। দীন প্রতিষ্ঠা হলো, কি হলো না সে ব্যাপারে আপনাকে কখনো প্রশ্ন করা হবে না। কিন্তু নিজের চেষ্টা-সাধনা ও জীবনের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবশ্যই প্রশ্ন করা হবে।
আইন-আদালত ও বিচার ব্যবস্থা ছাড়াও মানবতার সার্বিক কলাণের জন্য ইসলামী পবিবেশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও বিশেষভাবে তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি সমাজ ব্যবস্থাকে সুস্থ সবল করে সে গুলোর প্রচলন (আমরে বিল মারুফ) এবং সমাজ ব্যবস্থাকে কুলুষিত করে এবং সমাজকে অস্থির করে তুলে সেগুলোর নিষিদ্ধ করণের (নাহি আনিল মুনকার) জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সালাত ও সওমের মতোই বাধ্যতামূলক। কেউ যদি শুধু সালাত ও সাওম পালনকেই যথেষ্ট মনে করেন, তবে অবশ্যই তিনি মহাক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, “তোমরাই দুনিয়ার সর্বোত্তম দল। তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা ভালো কাজের হুকুম দিবে এবং দুষ্কৃতি থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” (সূরা আলে ইমরান : ১১০)। কুরআন অনুযায়ী জীবন ব্যবস্থা পরিচালনা করলেই কেবল জীবন কল্যাণকর হয়। এই কিতাবের মধ্যেই মানুষের সার্বিক কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এই কিতাব শুধু তেলাওয়াতের জন্য নাযিল হয়নি বরং এই কুরআন অনুযায়ী সার্বিক জীবন গড়ে তুলতে হবে।