রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শে বাংলাদেশে কল্যাণরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উপায়
২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ১১:১১
॥ প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী ॥
মানুষ আল্লাহপাকের দাস হওয়ার সাথে সাথে তাঁর খলিফা বা প্রতিনিধি। একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলার মাধ্যমেই কেবল প্রতিনিধিত্ব করা সম্ভব। আল্লাহপাক তাঁর গুণাবলী থেকে অতি সীমিত পরিমাণ মানুষকে দান করেছেন— যাতে মানুষ তার রবের প্রতিনিধিত্ব করতে পারে, অর্থাৎ তাঁর গুণে গুণান্বিত এবং তাঁর রঙে রঞ্জিত হতে পারে। আল্লাহপাক মালেক (শাসক) এবং মানুষ আব্দুল মালেক হয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রে সুশাসন কায়েম করবে। আল্লাহপাক হাকিম (বিচারক) এবং মানুষ আব্দুল হাকিম হয়ে সমাজে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করবে। মানুষ যেহেতু প্রতিনিধি সেহেতু তার নিজস্ব বিধান রচনার কোনো অধিকার নেই। সে আল্লাহপাক প্রদত্ত হেদায়াত (বিধান) অনুসারে চলবে। এর ব্যতিক্রম যারা করবে, তারা কাফির বা অমান্যকারী।
আল্লাহপাক প্রথম মানুষ আদম আ.-কে সৃষ্টি করার পর তাঁকে জান্নাতেই রেখেছিলেন এবং সেটিই তাঁর আদিবাস। ফেরেশতামণ্ডলী দ্বারা আদম আ.-কে সেজদা করার মধ্য দিয়ে মূলত সকল সৃষ্টির মাঝে মানুষের শ্রেষ্ঠত্বই ঘোষণা করা হয়। সকলে সেজদা করলেও ইবলিস অস্বীকার করে অভিশপ্ত হয়। আদম আ. থেকে বিবি হাওয়াকে সৃষ্টি করে আল্লাহপাক জানিয়ে দেন জান্নাতে তোমরা স্বাধীনভাবে চলাফেরা করো, কিন্তু একটি গাছ নির্দিষ্ট করে বলে দেন, সেই গাছের ধারেকাছেও যাবে না। আদম আ. ও ইবলিস উভয়কেই জান্নাতে থাকতে দেয়া হয় এবং বলা হয় তোমরা পরস্পরের শত্রু। ইবলিসের প্রলোভনে আদম আ. আল্লাহপাকের দেয়া নির্দেশ ভুলে যান এবং ফল খাওয়ার সাথে সাথে তাঁরা নগ্ন হয়ে পড়েন। সমাজে নগ্নতা-অশ্লীলতা ছড়িয়ে দেয়া শয়তানের কাজ। আদম আ. তাৎক্ষণিক ভুল উপলব্ধি করেন এবং তিনি বড় অসহায়বোধ করেন। আল্লাহপাক দয়া করে তাঁকে ক্ষমা চাওয়ার ভাষা শিখিয়ে দেন এবং বিনয়ী ও ক্ষমাপ্রার্থী হওয়ার কারণে আল্লাহপাক জান্নাতেই তাঁকে ক্ষমা করে নবী হিসেবে দুনিয়ায় প্রেরণ করেন। তখন তাঁকে বলা হয়, ‘এখান থেকে তোমরা চলে যাও এবং দুনিয়ায় একটি নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের অবস্থান করতে হবে। সেসময়ে আমার পক্ষ থেকে যে হেদায়াত যাবে— যারা তা অনুসরণ করবে, তাদের কোনো ভয় নেই।’ (সূরা বাকারা : ৩৮)।
আদম আ. ও ইবলিস উভয়ই আল্লাহপাকের নাফরমানি করে। উভয়ের মধ্যে পার্থক্য হলো আদম আ. ভুল করে অনুতপ্ত হন এবং তওবা করেন অর্থাৎ ফিরে আসেন। মানুষের দ্বারা ভুল হবে এবং ভুল হলে তাৎক্ষণিক ফিরে আসাটা মানবপ্রকৃতি। আর ভুলের ওপর অনঢ় হয়ে থাকা শয়তানের প্রকৃতি। এটি ছিল আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে একটি পরীক্ষা। প্রাথমিকভাবে পরীক্ষায় আদম আ. ও ইবলিস উভয়ই অকৃতকার্য হয় অর্থাৎ আল্লাহপাকের নাফরমানি করে। কিন্তু শেষ পর্যায়ে তওবা করে (ফিরে আসায়) আদম আ. কৃতকার্য হন। আল্লাহপাক তাঁর সেরা সৃষ্টি মানবজাতিকে এই মেসেজই দেন যে দুনিয়ার জীবনে চলতে গিয়ে ভুল-ভ্রান্তি হলে সঠিক পথে ফিরে আসলে (তওবা) আল্লাহপাক তার পূর্বে কৃত অপরাধের জন্য শাস্তি দেবেন না এবং তাঁর দাস ও প্রতিনিধি হিসেবে জীবনযাপন করলে আদি পিতা-মাতার হারানো জান্নাতে পুনরায় দাখিল করাবেন।
আল্লাহপাকের পক্ষ থেকে প্রেরিত সকল নবী-রাসূলের আদর্শ এক ও অভিন্ন। সকলেরই দাওয়াত ছিল ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’-র দিকে। ভিন্নভাবে বলা যায়, ‘তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো এবং তাগুতকে অস্বীকার করো’। (সূরা নহল : ৩৬)। এটি একটি বিপ্লবাত্মক ঘোষণা বা পলিটিক্যাল স্লোগান। ইসলাম আল্লাহর পক্ষ থেকে একমাত্র মনোনীত দীন এবং এর বাইরে যাওয়ার কোনো সুযোগ মুসলিম দাবিদারদের নেই। ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু যারা প্রতিষ্ঠা করতে চায় তারা সবাই তাগুত এবং যারা সেটা সমর্থন করে ও প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে সহযোগিতা করে তারা কাফির ও মুশরিক। আল্লাহপাক ঈমান ও কুফরের মাঝে পার্থক্য টেনেছেন এভাবে, ‘যারা ঈমানের পথ অবলম্বন করে তারা লড়াই করে আল্লাহর পথে। আর যারা কুফরির পথ অবলম্বন করে তারা লড়াই করে তাগুতের পথে। কাজেই তোমরা শয়তানের সঙ্গী-সাথীদের সাথে লড়াই করো আর বিশ্বাস রেখো, শয়তানের ষড়যন্ত্র আসলেই দুর্বল’। (সূরা নিসা : ৭৬)।
আল্লাহ তায়ালাকে একমাত্র ইলাহ এবং ইসলামকে দীন হিসেবে মানতে হলে প্রথমেই দরকার দীনকে রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা। আল্লাহপাক সকল নবী-রাসূলকে দীন কায়েমের দায়িত্ব দিয়েই দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। আল্লাহপাকের বাণী, ‘তিনি তোমাদের জন্য দীনের সেসব নিয়মকানুন নির্ধারিত করেছেন যার নির্দেশ তিনি নুহকে দিয়েছিলেন এবং (হে মুহাম্মদ) যা এখন আমি তোমার কাছে অহির মাধ্যমে পাঠিয়েছি। আর যার আদেশ দিয়েছিলাম ইব্রাহিম, মূসা ও ইসাকে। তার সাথে তাগিদ করেছিলাম এই বলে যে, ‘দীন কায়েম করো এবং এ ব্যাপারে মতপার্থক্য সৃষ্টি করো না’। (সূরা শুরা : ১৩)। দীন কায়েমের প্রক্রিয়া-পন্থায় ভিন্নতা থাকতে পারে কিন্তু দীন কায়েম করা মুমিন মাত্রই অপরিহার্য (ফরজ) কর্তব্য এবং দীন কায়েমে তাকে কোনো না কোনো পন্থায় সক্রিয় থাকতে হবে এমন প্রশ্নে কোনো মতপার্থক্য করার সুযোগ নেই। আল্লাহপাক তাঁর শেষনবি মুহাম্মদ সা.-কে পাঠিয়েছেন দীন কায়েমের মিশন দিয়ে। এ প্রসঙ্গে আল্লাহপাকের বাণী, ‘তিনি আপন রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য-সঠিক জীবনব্যবস্থা (দীনে হক) দিয়ে পাঠিয়েছেন যাতে সকল জীবনব্যবস্থার ওপর একে বিজয়ী করে দিতে পারেন, মুশরিকদের কাছে তা যতই অসহনীয় হোক’। (সূরা সফ : ৯)। কুরআন মজিদে একটু ভিন্নভাবে একই কথার পুনরাবৃত্তি করেছেন। (সূরা তওবা : ৩৩, সূরা ফাতাহ্ : ২৮)। মুশরিকরা যে বিরোধিতা করবে এটিই স্বাভাবিক এবং মুশরিক তারাই যারা আল্লাহপাকের বিধান ইসলাম ছাড়া অন্য কিছু চায়।
বাংলাদেশে সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও একটি কল্যাণরাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা সকল নাগরিকের চাওয়া। বিশেষ করে জুলাই বিপ্লবের পর জনআকাঙ্ক্ষা প্রবল হয়েছে। আন্দোলনকারীদের স্লোগান ছিল We want Justice. ফ্যাসিবাদের বিদায়ের পরে জুলাই বিপ্লবের অংশীদার সকলে ঐকমত্যের ভিত্তিতে প্রণয়ন করে জুলাই সনদ। জুলাই সনদ বাস্তবায়নের মাধ্যমে বৈষম্যহীন এক ইনসাফপূর্ণ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখেছিল জাতি। আমরা রাষ্ট্র সরকারের পরিবর্তন দেখছি কিন্তু সেই পরিবর্তনে জনগণের ভাগ্যের কোনো পরিবর্তন লক্ষ করছি না। আমাদের দেশে শতকরা নব্বই ভাগ মুসলিম। আমরা জানি পৃথিবীর সকল জনগোষ্ঠীর মাঝে আমরা সেরা এবং আমাদের জন্য আল্লাহপাকের জান্নাতের ওয়াদা রয়েছে। তাঁর বাণী, ‘তোমরা শ্রেষ্ঠতম জাতি, তোমাদের সৃষ্টিই করা হয়েছে মানবজাতির কল্যাণের জন্য, তোমরা মানুষকে সৎ কাজের আদেশ দেবে ও অসৎ কাজ থেকে বিরত রাখবে’। (সূরা আলে ইমরান ১১০)। ভালো কাজের আদেশ এবং মন্দ কাজের নিষেধের সাথে রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সম্পর্ক রয়েছে এবং যাদের হাতে কর্তৃত্ব তারাই মূলত আদেশ দানের ক্ষমতা রাখে। আল্লাহপাক চান সমগ্র বিশ্বের নেতৃত্ব তাঁর অনুগত (মুসলিম) বান্দাদের হাতে আসুক।
রাসূলুল্লাহ সা.-এর আগমনকালে মক্কার সামাজিক অবস্থা ছিল বড়ো করুণ। মানুষে মানুষে ছিল সীমাহীন বৈষম্য এবং সমাজে চালু ছিল দাসপ্রথা। হাটে-বাজারে পশুর মতো মানুষ কেনাবেচা হতো। আর সেই সমাজে এমন কোনো অপকর্ম নেই (চুরি-ডাকাতি-ছিনতাই, জেনা-ব্যভিচার, হত্যা-রাহাজানি) যা চালু ছিল না। পারস্য ও রোমে রাজতান্ত্রিক স্বৈরশাসন ছিল কিন্তু আরবে তখন কোনো সুসংগঠিত রাষ্ট্র বা সরকারব্যবস্থা ছিল না। তারা ছিল নানা গোত্র ও বংশে বিভক্ত। এমন একটি পরিবেশে আল্লাহপাক মুহাম্মদ সা.-কে নবী হিসেবে মক্কায় প্রেরণ করেন। ছোটকাল থেকেই মুহাম্মদ সা. ছিলেন অন্যদের থেকে ব্যতিক্রম। ৪০ বছর বয়সে তিনি নবুয়্যত লাভ করেন। সূরা আলাকের প্রথম পাঁচটি আয়াত নাজিল হওয়ার পর কিছুদিন বিরতি শেষে সূরা মুদ্দাচ্ছিরের প্রথম সাতটি আয়াত নাজিল হয় এবং সেখানে তাঁকে করণীয় বলে দেয়া হয়। মুহাম্মদ সা.-এর মৌলিক কাজ ছিল মানুষকে সতর্ক করা এবং আল্লাহপাকের বড়ত্ব ঘোষণা করা।
হাজারো সমস্যা থেকে মুখ ফিরিয়ে আল্লাহপাকের নির্দেশক্রমে মুহাম্মদ সা. উদাত্তকণ্ঠে আহ্বান জানান, হে দুনিয়ার মানুষ! তোমরা বলো আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নেই। তাহলেই তোমরা সফলকাম হবে। কালিমা তাইয়্যেবার এই দাওয়াত ছিল সকল নবী-রাসূল ও ঈমানদার সকল মানুষের। এই পবিত্র বাক্যটি (কালিমা তাইয়্যেবা) অতীতে কোনো জালেম শাসক মেনে নেয়নি, এখনো নেয় না এবং ভবিষ্যতেও নেবে না। সকল নবী-রাসূলকে আল্লাহপাক সমসাময়িক রাজা-বাদশাহ বা শাসকের বিরুদ্ধে দাঁড় করিয়েছেন। ফেরাউনের বিরুদ্ধে মূসা আ. নমরূদের বিরুদ্ধে ইব্রাহিম আ. এবং আবু জেহেল-আবু লাহাবের বিরুদ্ধে মুহাম্মদ সা.-কে। সকল নবী-রাসূল ছিলেন তাঁর সমাজে সর্বোত্তম ব্যক্তি। নবী-রাসূলদের সাথে শাসক ও তার আমলাদের বিরোধিতার কারণ ছিল রাজনৈতিক। নমরূদ-ফেরাউন-শাদ্দাদ-আবু জেহেল-আবু লাহাব কেউই নাস্তিক ছিল না। তারা সবাই ধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিল। ইব্রাহিম আ.-এর পিতা ছিলেন নমরূদের প্রধান পুরোহিত। স্বৈরশাসকরা মনে করতো ধর্ম পবিত্র জিনিস। রাজনীতির সাথে মেশালে ধর্ম অপবিত্র হবে। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিকরা হয় জালেম এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তারা ধর্মীয় অনুশাসন মানে না। নমরূদ ছিল ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিক। শাসন করার পাশাপাশি সে উপাসনালয় ও বিভিন্ন পূজা-পার্বণে আর্থিক অনুদানে ছিল উদারহস্ত। পক্ষান্তরে ইব্রাহিম আ.-এর পিতা ছিলেন রাজনীতি নিরপেক্ষ ধর্মের অনুসারী। রাজনীতি নিরপেক্ষ ধর্ম মানুষের কল্যাণে আসে না, এ এক অথর্ব ধর্ম। সমাজে এমন ধার্মিক থাকা না থাকা সমান। ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতিক ও রাজনীতি নিরপেক্ষ ধার্মিকের মাঝে প্রায়ই সখ্য দেখা যায়।
অতীতে রাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা ছিল নিপীড়নের হাতিয়ার। মুহাম্মদ সা.-ই প্রথম কল্যাণধর্মী রাষ্ট্রের ধারণা দান করেন। এটি সম্ভব হয়েছিল সমাজ থেকে অসৎ নেতৃত্বকে অপসারণ করে সেখানে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে। মক্কা বিজয়ের পর সমাজের কর্তৃত্ব আবু জেহেল-আবু লাহাবদের হাত থেকে মুহাম্মদ সা. ও তাঁর সাহাবীদের হাতে চলে আসার সাথে সাথে সমাজ ও রাষ্ট্র থেকে জুলুম বিদায় নেয় এবং প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যায় ও ইনসাফ। রাসূলুল্লাহ সা.-এর প্রতিষ্ঠিত সেই রাষ্ট্র নাগরিকদের ওপর জুলুম করেনি, বরং জুলুম থেকে রাষ্ট্রের নাগরিকদের রক্ষা করেছে। সমাজে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা করার নামই দীন কায়েম করা এবং দীন কায়েমের চেষ্টা-প্রচেষ্টার নামই জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।
কল্যাণরাষ্ট্রের ধারণা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী। জনগণের মৌলিক চাহিদা পূরণ (খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান-শিক্ষা-চিকিৎসা), বাকস্বাধীনতা, ভোটাধিকার প্রয়োগসহ নাগরিকের সকল অধিকারের নিশ্চয়তা প্রদান কল্যাণরাষ্ট্রের বৈশিষ্ট্য। কল্যাণরাষ্ট্রকে অবশ্যই গণতান্ত্রিক হতে হবে। গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের দেয়া সংজ্ঞা সর্বজনীনতা পেয়েছে- গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য সরকার (Government of the people, by the people, for the people)। প্রেসিডেন্ট আব্রাহিম লিংকনের এই ব্যাখ্যার সাথে ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। গণতন্ত্রের মূল বিষয় হলো সরকার স্বৈরাচার হবে না। সরকার গঠন ও পরিচালনায় জনমতের প্রতিফলন থাকতে হবে। ইসলামের বক্তব্যও তাই। শুধু পার্থক্য হলো পরামর্শের মাধ্যমে যে সিদ্ধান্ত হবে তা অবশ্যই আল্লাহপাকের বিধানকে ক্রস করতে পারবে না। অর্থাৎ সার্বভৌম ক্ষমতা আল্লাহর। মুসলিম প্রধান দেশে আইন প্রণয়ন ও শাসন আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সা.-এর বিধানের অধীনে হতে হবে। মুমিনদের পরিচয় দিতে গিয়ে আল্লাহপাক বলেছেন, তারা তাদের সামগ্রিক ব্যাপারসমূহ পারস্পরিক পরামর্শ-ভিত্তিতে সম্পন্ন করে। গণতন্ত্রের মূলকথা হলো সকল কাজে পরামর্শ। মুহাম্মদ সা. ছিলেন আল্লাহপাকের মনোনীত। তাঁর ইন্তেকালের পরে কে তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন, এ ব্যাপারে তিনি ছিলেন একেবারে নীরব। এখানেই পরামর্শ ও জনমতের প্রতিফলন হতে হবে।
সকল নবী-রাসূলের আদর্শ ইসলাম এবং এই ইসলাম (আদদীন) প্রতিষ্ঠার দায়িত্ব দিয়েই আল্লাহপাক তাঁদের দুনিয়ায় প্রেরণ করেছেন। নবী-রাসূলের যারা অনুসারী অর্থাৎ ঈমানদার জনগোষ্ঠীর দায়িত্বও একই। বাংলাদেশে শতকরা নব্বই ভাগ মানুষ মুসলিম। একজন মুসলিম সেই যে ইসলামে বিশ্বাস করে ও মেনে চলে এবং ইসলামকে বিজয়ী করার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা চালায়। আমাদের দুর্ভাগ্য হলো, আল্লাহপাক ও তাঁর রাসূল সা. একজন মুসলিমকে যে মানে দেখতে চান আমাদের মাঝে তার একটি ক্ষুদ্র অংশই হবে যথার্থ মুসলিম। আর একটি অংশ ইসলামকে শুধু মানেই না, বরং ইসলাম প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে চরম প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এর পেছনের কারণ তাদের অজ্ঞতা এবং আখিরাতের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাসের অভাব। ইসলাম প্রতিষ্ঠার মাধ্যমেই সম্ভব জনকল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়ে তোলা। এ ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা.-এর কর্মপন্থা ছিল প্রথমে দাওয়াত প্রদান এবং দাওয়াতে যারা সাড়া দিয়েছিলেন তাদের সংগঠিত ও পরিশুদ্ধ করা।
দীন কায়েম বা যেকোনো আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য দলগত প্রচেষ্টা ছাড়া সম্ভব নয়। আল্লাহপাকের দাবিও তাই, ‘হে ঈমানদারাগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো ভয় করার মতো এবং মুসলমান না হয়ে মরো না। তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রজ্জু শক্তভাবে ধারণ করো এবং পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না।’ (সূরা আলে ইমরান : ১০২-১০৩)।
জামাতবদ্ধ জীবনযাপনের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ সা. জোর তাগিদ দিয়েছেন। হজরত হারেস আল আশয়ারী রা. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সা. বলেছেন, ‘আমি তোমাদের পাঁচটি কাজের আদেশ করছি (অন্য রেওয়াতে আছে, আমার আল্লাহ আমাকে পাঁচটি বিষয়ে নির্দেশ দিয়েছেন) (১) জামাতবদ্ধ হবে, (২) নেতার আদেশ মন দিয়ে শুনবে, (৩) নেতার আদেশ মেনে চলবে, (৪) আল্লাহর পথে হিজরত করবে (আল্লাহর অপছন্দনীয় কাজ বর্জন করবে), (৫) আল্লাহর পথে জিহাদ করবে। আর তোমাদের মধ্য হতে যে ব্যক্তি সংগঠন থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে, সে নিজের গর্দান থেকে ইসলামের রশি খুলে ফেলবে, তবে যদি সংগঠনে প্রত্যাবর্তন করে তো স্বতন্ত্র কথা। আর যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের দিকে লোকদের আহ্বান জানাবে সে জাহান্নামে যাবে। সাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল সা! সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন করা সত্ত্বেও? আল্লাহর রাসূল সা. বললেন, সালাত কায়েম ও ছিয়াম পালন এবং নিজেকে মুসলিম দাবি করা সত্ত্বেও’। (আহমদ ও তিরমিযী)। তিনি আরো বলেছেন, ‘জামায়াতের ওপর রয়েছে আল্লাহর রহমত। যে ব্যক্তি জামাত ছাড়া একা চলে, সে তো একাকী দোযখের পথেই ধাবিত হয়’। (তিরমিযী)। রসূলুল্লাহ সা. বড়ো শক্ত কথা বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আনুগত্য পরিত্যাগ করে এবং জামাত থেকে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তার মৃত্যু হবে জাহেলিয়াতের মৃত্যু’। (মুসলিম)।
একটি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশ হওয়া সত্তেও বাংলাদেশের নাগরিকদের আচার-আচরণ, লেন-দেন কোথাও ইসলামের প্রতিফলন নেই। কল্যাণরাষ্ট্রের নাগরিকদের যেসব গুণাবলী (সততা, বিশ্বস্ততা, প্রতিশ্রুতি পালন, আমনতদারি) থাকা দরকার তার কোনটিই দৃষ্টিগোচর হয় না। রাসূলুল্লাহ সা. তাঁর সাথিদের এমন একটি রাষ্ট্রের স্বপ্ন দেখিয়েছিলেন যেখানে একজন ষোড়শী নারী স্বর্ণালঙ্কারসহ সানা থেকে হাজরা মাউত একাকী হেঁটে যাবে যাকে আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করতে হবে না। কল্যাণরাষ্ট্র সেই রাষ্ট্র যে রাষ্ট্র তার নাগরিকদের জান-মাল ও সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা দান করে। এমন রাষ্ট্র তখনই সম্ভব যখন সেই সমাজে একদল যোগ্য নেতা ও কর্মী জীবন উৎসর্গ করার জন্য তৈরি হবে এবং সেই রাষ্ট্রের নাগরিকদের মাঝে একটি কল্যাণরাষ্ট্রের আকাঙ্ক্ষা প্রবল হবে। জুলাই পরবর্তী সময়ে মানুষের মাঝে সৎ নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহ ও ভালোবাসা লক্ষ করা যাচ্ছে। বিশেষ করে পাঁচটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শিবিরের প্রতি সমর্থন ও শিবিরের ইতিবাচক তৎপরতা তরুণ প্রজন্মের দীন প্রতিষ্ঠার প্রতি আগ্রহ বাড়িয়ে দিয়েছে। ছাত্রশিবির প্রমাণ করেছে দেশে সৎ নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠা হলে সমাজ থেকে জুলুম-নির্যাতন ও নানাবিধ পাপাচার দূর হয়ে যাবে যেমনটি হয়েছে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়সমূহ থেকে।
দীন প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ সা.-এর হাতিয়ার ছিল আল্লাহর কিতাব আল কুরআন। তাঁর কাজই ছিল মানুষকে কুরআন পড়ে পড়ে শোনানো ও তাদের তাজকিয়া (পরিশুদ্ধ) করা এবং হিকমত শিক্ষা দেয়া। এই কুরআন মানুষের মাঝে আল্লাহ ও আখিরাতের ভয় জাগ্রত করে এবং সকল মন্দ কাজ থেকে দূরে সরিয়ে রাখে। রাসূলুল্লাহ সা.-এর ওপর অবতীর্ণ প্রাথমিক সূরাসমূহে বারংবার আখিরাতের কথা বলা হয়েছে এবং নেক আমলে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। আখিরাতের জবাবদিহি ও ভয়ই মানুষকে নেক আমলে উদ্বুদ্ধ করে। দীন কায়েমের কাজ মূলত মহান আল্লাহর। প্রয়োজন একদল সাচ্চা ঈমানদার জনগোষ্ঠী যারা নেক আমলে সমৃদ্ধ হবে। মানুষ তাদের নিকট থেকে কেবল কল্যাণকর কাজ ও কথা পাবে এবং মানুষের জন্য ক্ষতির সব ধরনের অন্যায় থেকে মুক্ত হবে। আল্লাহপাকের ওয়াদা, ‘আল্লাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন, তোমাদের মধ্য থেকে যারা ঈমান আনবে ও সৎকাজ করবে, তাদের তিনি পৃথিবীতে ঠিক তেমনিভাবে খিলাফত দান করবেন, যেমন তাদের পূর্বে অতিক্রান্ত লোকদের দান করেছিলেন, তাদের জন্য তাদের দীনকে মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে দেবেন, যে দীনটি আল্লাহ তাদের জন্য পছন্দ করেছেন এবং তাদের ভয়ভীতির অবস্থাকে নিরাপত্তায় পরিবর্তিত করে দেবেন। তারা যেন শুধু আমার ইবাদত করে এবং আমার সাথে কাউকে শরিক না করে। আর যারা এরপরও কুফরি করবে তারাই ফাসেক’। (সূরা নূর : ৫৫)। আল্লাহপাকের দাবি মোতাবেক জমিনে একদল নেতা-কর্মী প্রস্তুত থাকলে আশা করা যায় বাংলাদেশের মানুষ একটি কল্যাণরাষ্ট্র লাভে সক্ষম হবে।
লেখক : সাবেক উপাধ্যক্ষ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।