ডেনমার্কে মুসলমানদের অগ্রগতি থামাতে চলছে নির্যাতন


৮ জুলাই ২০২৬ ২০:৫০

বোরকা, নিকাব নিষিদ্ধের পর আজান বন্ধের অপচেষ্টা

॥ মুহাম্মদ আল্-হেলাল ॥
বিশ্বের অন্যতম ধনী রাষ্ট্র ডেনমার্ক ইউরোপের উত্তর-পশ্চিম অংশে অবস্থিত। যাকে অনেকেই কিংডম অব ডেনমার্ক বলে ডাকে। ডেনমার্ক সর্বপ্রথম জাতীয় পতাকার প্রচলন করেছিলো। বর্তমান সময়ে ডেনমার্কে যে জাতীয় পতাকা ব্যবহার করার প্রচলন আছে, সেই পতাকার নাম হলো ডেনব্রুগ। ডেনমার্কের বর্তমান জাতীয় পতাকা ১২১৯ সাল থেকে প্রচলিত। এই দেশের মধ্যে প্রায় ৫৭ লাখ মানুষ বসবাস করে। আর তারা সবাই ডেনীয় ভাষাকে রাষ্ট্রীয় ভাষা হিসেবে সমর্থন করে। বাবা অথবা মা কেউ যদি ডেনমার্কের নাগরিক হয়ে থাকেন, তাহলে তাদের সন্তান ডেনমার্কের নাগরিকত্ব নিতে পারবেন। এছাড়া কোনো পিতা-মাতা যদি ডেনমার্কে সন্তান দত্তক নেয়। তাহলে সেই সন্তানের বয়স ১২ বছর এর থেকেও কম হতে হবে। তবে দেশটির সরকারের বিরুদ্ধে ইসলাম ও মানবতাবিধ্বংসী জঘন্য অপরাধের অভিযোগ রয়েছে।
ভূপ্রকৃতি : সবুজ ভূমি, পাহাড়, নদী ও প্রাকৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ দেশটিতে সাংবিধানিক রাজতন্ত্র থাকলেও সংসদীয় গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় দেশ পরিচালিত হয়। অসংখ্য দ্বীপ ও দ্বীপভূমি নিয়ে গঠিত ডেনমার্কের মোট আয়তন ৪২ হাজার ৯৪৩ বর্গকিলোমিটার। এর মধ্যে মাত্র ৬৮ কিলোমিটার স্থলসীমান্ত, যা দেশটিকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করেছে। কোপেনহেগেন ডেনমার্কের রাজধানী ও প্রধান শহর। তবে এই দেশের মধ্যে থাকা অন্যান্য বৃহত্তম শহরগুলোর মধ্যে আরাফাস ও আলব্রোগা অন্যতম। সাগরবেষ্টিত হওয়ায় এবং ডেনমার্কের কোনো অংশ থেকেই সাগরের দূরত্ব ৬৪ কিলোমিটারের বেশি নয়, ফলে সমগ্র দেশেই উপকূলীয় আবহাওয়া বিরাজমান। নিত্যদিনের বর্ষা, কুয়াশা ও মেঘাচ্ছন্ন আকাশের সঙ্গে ডেনিস জনগণ অভ্যস্ত। স্বায়ত্তশাসিত ও নির্যাতিত ইনুইট জনগোষ্ঠীর গ্রিনল্যান্ড এবং ফারোজ আইসল্যান্ড ডেনমার্কের অধীন।
মুসলিম বিষয়ে গবেষণা : সম্প্রতি ডেনমার্কে আরহুশ ইউনিভার্সিটির (Aarhus University) একদল গবেষক দেশটিতে মসজিদের সংখ্যা ও মুসলিম অধিবাসীদের বৃদ্ধি সম্পর্কিত বিষয়ে গবেষণা করছে (ওয়ার্ল্ড বুলেটিন)। মূলত ইসলাম ও মুসলমানদের ব্যাপারে অন্য ধর্ম ও মতাবলম্বীদের আগ্রহ-উদ্দীপনার পাশাপাশি উদ্বেগ এবং পেরেশানিরও শেষ নেই। এই আগ্রহ মেটাতে ও পেরেশানি দূর করতেই গবেষকরা এই প্রকল্প হাতে নিয়েছেন। আরহুশ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর লিন কুহলে ও মালাল লার্সেনের তত্ত্বাবধানে এ জরিপ ও গবেষণা পরিচালিত হয়। স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশ ডেনমার্কের গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায়, গত দশকে ডেনমার্কে মসজিদ বৃদ্ধির হার ৪৮ শতাংশ। গবেষকরা আরো জানান, দেশটির সরকারে ইসলাম উপেক্ষিত, তবে মুসলিম জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও মসজিদের মতো বেশি।
ইসলাম ও মুসলিমদের আগমনের ইতিহাস : ডেনিস ইতিহাসবেত্তা জরগেন সিমনসেনের মতে, জেরুসালেমের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে মুসলিম ও সম্মিলিত খ্রিস্টান বাহিনীর মধ্যে সংঘটিত ক্রুসেড যুদ্ধে অংশ নিয়েছিল ডেনমার্কের সামরিক বাহিনী। তখন থেকেই ডেনমার্ক ইসলামের সঙ্গে পরিচিত হয়। আর ১৮৮০ সালে অনুষ্ঠিত জরিপে আটজন মুসলিমের বিবরণ পাওয়া যায়। ধারণা করা হয়, সেসময় থেকেই দেশটিতে ইসলামের যাত্রা শুরু হয়। তথ্যমতে, খ্যাতিমান ডেনিস নাগরিকদের মধ্যে ১৯২৯ সালে লেখক ও সাংবাদিক নুড হলম্বো প্রথম ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং মুসলিমরা দেশটির দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্মীয় জনগোষ্ঠী।
ডেনমার্কে ইসলামের বিকাশ : দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ও শিল্পায়নের কারণে যুগোস্লাভিয়া, তুরস্ক, পাকিস্তান ও উত্তর আফ্রিকার মুসলিমপ্রধান দেশগুলো থেকে বিপুলসংখ্যক মুসলিম ডেনমার্কে আসে। এটাকে মুসলিম অভিবাসনের প্রথম ঢেউ বলা হয়। এ সময় দেশটিতে ইসলামের প্রসার ঘটে এবং ১৯৬৭ সালে এখানে প্রথমবারের মতো মসজিদ নির্মাণ হয়। কিন্তু ১৯৭৩ সালে অভিবাসী আইনে পরিবর্তন এনে মুসলিম অভিবাসন একেবারে বন্ধ করে দেয় মানবতাবিরোধী ডেনিস সরকার। এরপর ১৯৮০-এর দশকে আবারও মুসলিম অভিবাসন শুরু হয়। যাকে মুসলিম অভিবাসনের দ্বিতীয় ঢেউ বলে উল্লেখ করা হয়। মূলত মধ্যপ্রাচ্য ও আফ্রিকার দেশগুলো থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ে ডেনমার্কে আসে বহু মুসলিম। বেশিরভাগ মুসলিম অভিবাসী হলেও ধর্মান্তরিত স্থানীয় ডেনিস মুসলিমদের সংখ্যাও কম নয়। ডেনমার্কের প্রথম ইসলামিক স্কুল প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭৮ সালে। বর্তমানে দেশটিতে বেশকিছু মুসলিম প্রাইমারি স্কুল রয়েছে। ১৯৮০ সালে দেশটিতে মুসলমানের সংখ্যা ছিল ৩০ হাজার, যা ছিল মোট জনসংখ্যার মাত্র ০.৬ শতাংশ। ডেনিস সরকার এখন নাগরিকদের ধর্মের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করে না। ফলে মুসলিমদের সঠিক সংখ্যা জানা সম্ভব নয়। তবে বেসরকারিভাবে একটা হিসাব রাখা হয়। ইউনিভার্সিটি অব কোপেনহেগেনের গবেষক ব্রায়ান জ্যাকবসেন অভিবাসীদের দেশ ও জাতির ওপর ভিত্তি করে নিয়মিত একটা হিসাব রাখেন। ২০১৭ সালে প্রায় তিন হাজার আটশ’ ডেনিস নাগরিক মুসলিম হন। ব্রায়ান জ্যাকবসেনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২০ সালে মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ২ লাখ ৫৬ হাজার। তবে এর এক বছর আগে তথা ২০১৯ সালে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড পপুলেশন রিভিউ’-এর প্রতিবেদন মতে, ডেনমার্কে বসবাসরত মুসলিমদের সংখ্যা ৩ লাখ ১৩ হাজার ৭১৩ জন, যা ডেনিস জনগণের ৫.৪০ শতাংশ।
মুসলিম যুব সংগঠন : ডেনমার্কে মুসলিম সম্প্রদায়ের পাশাপাশি পুরো ডেনিস সমাজে আন্তঃধর্মীয় সম্পর্ক জোরালো করতে কাজ করছে বেশ কয়েকটি মুসলিম যুব সংগঠন। এছাড়া ১৯৯৬ সালে মুসলিম ও খ্রিস্টানদের সমন্বয়ে একটি সংগঠন গড়ে ওঠে, যা আন্তঃধর্মীয় সম্পর্কের অনন্য দৃষ্টান্ত। দ্য ইসলামিক-ক্রিশ্চিয়ান স্টাডি সেন্টার নামের ওই সংগঠনে মুসলিম ও খ্রিস্টান সদস্যের সংখ্যা সমান সমান। উভয় ধর্মের মধ্যে একটা ইতিবাচক সম্পর্ক গড়ে তুলতে কাজ করছে সংগঠনটি, তবে এক্ষেত্রে সরকারের সহযোগিতার অভাব লক্ষণীয়।
বোরকা ও নিকাব নিষিদ্ধ : ডেনমার্ক গণতান্ত্রিক দেশ নামে পরিচিত হলেও দেশটির রাজনীতিতে উগ্র জাতীয়তাবাদ, শরণার্থীবিরোধী মনোভাব ও ইসলামবিদ্বেষ বাড়ছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালসহ একাধিক মানবাধিকার সংগঠনের সমালোচনা উপেক্ষা করে ৩১ মে ২০১৮ দেশটিতে ইসলামবিদ্বেষ থেকে মুসলিম নারীদের বোরকা ও নিকাব ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়, যাতে আইন অমান্য করলে এক হাজার ডেনিস ক্রোন জরিমানা করার বিধান রাখা হয়। আর ২০১৪ সালে আইন করে পশু জবেহ নিষিদ্ধ করা হয়েছে দেশটিতে, ফলে মুসলিমদের ধর্মমতে পশু কুরবানি বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
ডেনমার্কে ইসলামিক আজানের নিষেধাজ্ঞার পরিকল্পনা : ডেনমার্কে সম্প্রতি আজানের আওয়াজ বা ইসলামিক ‘কল টু প্রেয়ার’ নিষিদ্ধ করার পরিকল্পনা ঘোষণা করেছেন দেশটির অভিবাসনমন্ত্রী মর্টেন বডসকভ। ডেনমার্কের কিছু এলাকা ঘুরলে মনে হয় যেন ‘ইসলামাবাদের কোনো শহরতলি’- এমন মন্তব্য করে তিনি এই উদ্যোগের কথা জানান। দেশটির কেন্দ্রীয়-বামপন্থী সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটস পার্টির সদস্য বডসকভ জানান, নতুন সরকার এই নিষেধাজ্ঞা আরোপের আইনি বৈধতা যাচাই করতে পুনরায় তদন্ত শুরু করবে। বার্তা সংস্থা ‘রিটজৌ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে মন্ত্রী বলেন, ‘ডেনমার্কের ছাদগুলোর ওপর দিয়ে আজানের সুর ভেসে আসা উচিত নয়। ডেনমার্কে এর কোনো স্থান নেই। ইতোমধ্যেই ডেনমার্কের রাজধানী কোপেনহেগেনসহ বেশকিছু এলাকায় শব্দদূষণ নীতির অভিযোগে মাইকে বা মিনারের লাউডস্পিকারে আজান সম্প্রচারের ওপর স্থানীয় আইনি নিষেধাজ্ঞা করেছে কর্তৃপক্ষ। মন্ত্রী বডসকভের দাবি, ডেনমার্কে ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকা এক ধরনের ‘ইসলামীকরণ’ সাধারণ জনগণের উন্মুক্ত স্থানগুলোকে গ্রাস করে নিচ্ছে। ডেনমার্কে আজান নিষিদ্ধ করার জন্য একটি আইনি কাঠামো তৈরির ক্ষেত্রে কোনো অভিবাসন মন্ত্রীর এটি তৃতীয় দফার প্রচেষ্টা। এর আগে ২০২০ এবং ২০২৫ সালেও সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটদের পক্ষ থেকে একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। যদিও ডেনমার্কের সংবিধানে জনসমক্ষে ধর্মীয় উপাসনার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। ডেনমার্কের বামপন্থী প্রধানমন্ত্রী মেটে ফ্রেডেরিকসেনের নেতৃত্বে ইউরোপের মধ্যে সবচেয়ে কঠোর অভিবাসন নীতি বজায় রাখা হয়েছে দেশটিতে, যিনি ৩ জুন ২০২৬ তারিখে তৃতীয় মেয়াদে দেশটির প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। গত মার্চ মাসের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা না পাওয়ায় দীর্ঘ কয়েক মাসের জটিল জোট আলোচনার পর পুনরায় ক্ষমতায় বসেন মেটে ফ্রেডেরিকসেন। জার্মানির সংবাদ সংস্থা উডের রিপোর্ট অনুযায়ী, ‘শাসকদল ১৯০৩ সালের পর থেকে তাদের সবচেয়ে দুর্বল ফলাফল নিয়ে উদীয়মান হলো, ৩৮টি আসন পেয়েছে কিন্তু এখনো বৃহত্তম দল হিসেবেই রয়ে গেছে।’ সামাজিক ডেমোক্র্যাটরা, বর্তমানে বৃহত্তম জোটবদ্ধ দল, ডেনিস পার্লামেন্টে ৩৮টি আসন জিতেছে, যা সংখ্যাগরিষ্ঠতা পাওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ৯০টি আসনের চেয়ে অনেক কম। তিনি মধ্যপন্থী মডারেটস, বামপন্থী সোশ্যাল লিবারেলস এবং গ্রিন লেফটের সঙ্গে মিলে একটি চারদলীয় জোট সরকার গঠন করেছেন, যা রাজনৈতিক অঙ্গনে ‘ফোর-লিফ ক্লোভার’ জোট নামে পরিচিতি পেয়েছে। এই জোটটি রেড-গ্রিন অ্যালায়েন্স নামক একটি পরিবেশ-সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের সমর্থনের ওপরও নির্ভরশীল। তবে ডেনমার্কে আজান পুরোপুরি নিষিদ্ধ করার যেকোনো প্রচেষ্টা বড় ধরনের আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। কারণ সরকারের এই তদন্ত কমিটিকে একদিকে যেমন ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে; অন্যদিকে মসজিদের আশপাশের বাসিন্দাদের অধিকারের বিষয়টিও বিবেচনা করতে হবে। দেশটিতে কোপেনহেগেনের গ্র্যান্ড মস্ক অন্যতম। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের কারণে এই মসজিদটি থেকেও বাইরে লাউডস্পিকারে আজান সম্প্রচার করা হয় না।
‘ঘেটো’ (ghetto) আইন : ডেনমার্কের ঘৃণিত ‘ঘেটো’ (ghetto) আইন অনুযায়ী, কোনো এলাকায় যদি বিদেশি নাগরিকের সংখ্যা অতিরিক্ত বেশি হয়ে যায়, তবে কর্তৃপক্ষ চাইলে অভিবাসীদের সেখান থেকে জোরপূর্বক অন্য এলাকায় সরিয়ে দিতে পারে। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে আশ্রয়প্রার্থীদের আবাসন খরচ মেটানোর জন্য তাদের সোনা-গহনা এবং মূল্যবান জিনিসপত্র জমা দিতে বাধ্য করা হয়। পাশাপাশি আবেদন খারিজ হয়ে গেলে তাদের কোনো ধরনের আর্থিক সাহায্যও দেওয়া হয় না। ইউরোস্ট্যাট অনুযায়ী ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্য থেকে যখন ১০ লক্ষাধিক মানুষ ইউরোপের সীমান্তের দিকে পাড়ি জমিয়েছিল, তখনো মানবতাবিরোধী ডেনমার্ক তার প্রতিবেশী দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম সংখ্যক আশ্রয়প্রার্থীকে গ্রহণ করেছিল।
গ্রিনল্যান্ড : আয়তনের দিক থেকে ২১ লাখ ৬৬ হাজার ৮৬ বর্গকিলোমিটার বিস্তৃত গ্রিনল্যান্ড বিশ্বের বৃহত্তম দ্বীপ। উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের মাঝামাঝি অবস্থিত গ্রিনল্যান্ড যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোর নিরাপত্তা পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ। অঞ্চলটি ১৯৭৯ সাল থেকে স্বায়ত্তশাসিত। প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্রনীতি ডেনমার্কের হাতে যদিও আয়তনে ডেনমার্কের থেকে ৫০ গুণেরও বেশি বড়। ট্রাম্প তার প্রথম রাষ্ট্রপতিত্বের সময় গ্রিনল্যান্ড দ্বীপটি কেনার চেষ্টা করেছিলেন। ২০২০ সালে বাইডেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলে গ্রিনল্যান্ড কেনার পরিকল্পনা থেকে সরে আসে যুক্তরাষ্ট্র। ২০২৪ সালের পুনর্নির্বাচনের পর ট্রাম্প আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি অবজ্ঞা প্রকাশ করে ন্যাটো সংরক্ষণের চেয়ে গ্রিনল্যান্ড দখলে আবার অগ্রসর হয়েছেন। জনমত জরিপে দেখা গেছে, অধিকাংশ গ্রিনল্যান্ডবাসী ভবিষ্যতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুক্ত হতে নয় ডেনমার্ক থেকে স্বাধীনতা চায়, তবে ডেনমার্কের কর্তৃত্ববাদী সরকারের দমন-পীড়নে সেটি আলোর মুখ দেখছেনা। তথ্যমতে, ইনুইটরা সর্বপ্রথম ডেনমার্কের বর্তমান স্বায়ত্তশাসিত গ্রিনল্যান্ডে প্রবেশ করে ২৫০০ খ্রিস্টপূর্বে। এরিক দ্য রেড গ্রিনল্যান্ডের নামকরণ করেন। কথিত আছে তিনি আইসল্যান্ড থেকে খুনের অপরাধে গ্রিনল্যান্ডে নির্বাসিত হন এবং এর নাম গ্রিনল্যান্ড রাখেন। অনেকে মনে করেন এরিক দ্য রেড মার্কেটিং পার্সপেক্টিভ থেকে এরনাম গ্রিনল্যান্ড রাখেন যেন এর নাম শুনে মানুষ এখানে প্রত্যাবর্তন করতে আগ্রহী হয়। গ্রিনল্যান্ডবাসীরা এক শহর থেকে আরেক শহরে যাতায়াতে নিজেদের তৈরি যানবাহন স্লেজ, কায়াক এবং স্নো স্যু ব্যবহার করে। বিশ্বের সবচেয়ে উত্তরের রাজধানী শহর গ্রিনল্যান্ডের নুক। গ্রিনল্যান্ডের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কাঙ্গারলুসুয়াক, যা রাজধানী নুক থেকে ৩০০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে। স্লেজ কুকুর গ্রিনল্যান্ডে পরিবহনের একটি প্রাসঙ্গিক এবং গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম; বিশেষ করে দূরবর্তী এবং দুর্গম এলাকায় যেখানে পরিবহন অবকাঠামো সীমিত। সারা বছর প্রায় বরফে ঢাকা থাকে গ্রিনল্যান্ড। ভৌগোলিক অবস্থান মেরু অঞ্চলে হওয়ায় সেখানে সূর্যের আলো দেখা পাওয়া যায় মাত্র ৩ ঘণ্টার মতো। জানা যায় অনেক ঔপনিবেশিক শক্তির মতো, ডেনমার্ক এই গ্রিনল্যান্ডে এক বর্বর নীতি বাস্তবায়ন করেছিল, যা আদিবাসী জনগোষ্ঠীর ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলেছিল। ডেনমার্কের গৃহীত নীতির মধ্যে রয়েছে জোরপূর্বক পুনর্বাসন, সাংস্কৃতিক একত্রীকরণের প্রচেষ্টা এবং অপর্যাপ্ত স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসেবা। এই নীতিগুলো ইনুইট জনগোষ্ঠীর জন্য ধ্বংসাত্মক পরিণতি ঘটিয়েছিল। এমনকি অনেক ইনুইট মহিলা সন্তান ধারণ করতে পারেননি কারণ ডেনিস ডাক্তাররা তাদের শরীরে হস্তক্ষেপ করে মহিলাদের অজ্ঞাতসারে স্পাইরাল বসিয়েছিলেন।
‘মুসলিমদের অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে মুসলিমদের ভোটাধিকার বাতিল করা প্রথম দেশ ডেনমার্ক’ বলে একটি পোস্ট সোশ্যাল মিডিয়ায় ভাইরাল হয় ২০২৫ সালে। যদিও বিষয়টি উপযুক্ত কীওয়ার্ড ব্যবহার করে ইন্টারনেটে খুঁজলে, ডেনমার্কে মুসলিমদের ভোটাধিকার বাতিল করেছে বা বাতিল করতে যাচ্ছে এমন কোনো বিশ্বাসযোগ্য রিপোর্ট পাওয়া যায়নি। প্রকৃতপক্ষে ডেনমার্ক মুসলিমদের ভোটাধিকার বাতিল করলে, নিশ্চয় অনেক আন্তর্জাতিক মিডিয়া সংস্থায় প্রকাশ পাওয়ার কথা। তবে ডেনমার্কে আজান নিষিদ্ধ ঘোষণা পরিকল্পনার ন্যায় মুসলিমদের ভোটাধিকার বাতিলের খবর সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশ করে মুসলিমদের মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি করা এবং সরকারের মুসলিম বিশ্বের প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা হতে পারে যেটি জনগণ তথা বিশ্বের সাথে প্রতারণার শামিল। সুতরাং ডেনমার্ক সরকারের সকল ধরনের ইসলামবিদ্বেষ, প্রতারণা, মানবতাবিরোধী কর্মকাণ্ডের ইতি টেনে প্রকৃতপক্ষে মানবতার কল্যাণে কাজ করতে হবে।
তথ্যসূত্র : ইসলামওয়েব লেবানন.ইউএম.ডিকে, উইকিপিডিয়া, দ্য ডেইলি টেলিগ্রাফ, ওয়ার্ল্ড বুলেটিন, DW।
লেখক : এমফিল গবেষক (এবিডি), আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
ই-মেইল: alhelaljudu@gmail.com