গভীর সংকটে ভারতীয় মুসলিম সমাজ


৮ জুলাই ২০২৬ ২০:৪৭

মসজিদ-মাদরাসায় চালানো হচ্ছে ‘বুলডোজার সন্ত্রাস’

আন্তর্জাতিক ডেস্ক : ভারতের পশ্চিমবঙ্গে বিজেপি নেতা শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর রাজ্যে নির্বিচারে মুসলমানদের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙা হচ্ছে। হিজাব বা বোরকা পরা নারীরা নিরাপদে চলতে পারছেন না। দাড়ি-টুপি পরা লোকেরা প্রায়ই হেনস্তার শিকার হচ্ছেন। গত মে মাসের শুরুতে শুভেন্দু অধিকারী মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর থেকে মুসলিম নির্যাতনও বেড়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস ও মুসলিম মিররের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে এই তথ্য উঠে এসেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ৬ মে থেকে ১৮ জুনের মধ্যে দিল্লি, মহারাষ্ট্র, উত্তরপ্রদেশ, গুজরাট, রাজস্থান ও হরিয়ানায় এসব ঘটনা ঘটেছে এবং এর প্রায় সবগুলোই বিজেপি-শাসিত রাজ্যে সংঘটিত হয়েছে। প্রতিবেদনে দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ভারতের ছয়টি রাজ্যে গত দেড় মাসে ২৩টিরও বেশি মসজিদ, মাদরাসা, ঈদগাহ ও দরগাহ ভাঙা বা আংশিকভাবে অপসারণের ঘটনা ঘটেছে। বাংলাদেশে অনেক অমুসলিম বসবাস করছেন। এখানে সবাই শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করছে। অথচ প্রতিবেশী এই দেশটিতে শুধুমাত্র ধর্মীয় কারণে নির্যাতন ও হত্যার শিকার হচ্ছেন মুসলিমরা। বিভিন্ন সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোয় দেখা যায়, গণপরিবহনেই হয়রানির শিকার হচ্ছেন মুসলিম নারী-পুরুষরা।
কাশ্মীর মিডিয়া সার্ভিস ও মুসলিম মিররের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা তালিকার মধ্যে রয়েছে দিল্লির মাঙ্গোলপুরিতে দরগাহ পাঁচ পীরান ও একটি মাদরাসা, হরিয়ানার ফরিদাবাদে একটি মসজিদ, মুম্বাইয়ের বারান্দায় দুটি মসজিদ, গুজরাটে তিনটি দরগাহ ও একটি কবরস্থান, মুম্বাইয়ের গোরেগাঁওয়ে একটি দরগাহ, বারাণসীতে আজগাইব শহীদ মসজিদ, পুনের বোপোদিতে একটি দরগাহ, উত্তর প্রদেশের সম্ভলে একাধিক দরগাহ-মসজিদ-ঈদগাহ, রাজস্থানের জয়পুরে নুরানী মসজিদ, মহারাষ্ট্রের ভয়ান্দরে নুরি মসজিদ এবং বারানসিতে গঞ্জ শহীদা মসজিদ। সবচেয়ে সাম্প্রতিক ঘটনা ঘটে গত ১৮ জুন, যখন রাজস্থানের বারমের জেলার মালানা গ্রাম এলাকায় চারটি মসজিদ ভাঙা হয়। কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সুপ্রিম কোর্ট ও জাতীয় গ্রিন ট্রাইব্যুনালের নির্দেশ, রেলওয়ে ও সড়ক উন্নয়ন প্রকল্প এবং অনুমোদনহীন স্থাপনা অপসারণের অংশ হিসেবে এসব উচ্ছেদ অভিযান পরিচালিত হয়েছে। কর্তৃপক্ষ আরও বলেছে, এসব পদক্ষেপ কোনো নির্দিষ্ট ধর্মীয় গোষ্ঠীকে লক্ষ করে নেওয়া হয়নি এবং আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে নোটিশ দেওয়ার পর অভিযান চালানো হয়েছে।
স্থানীয় মুসলিম সম্প্রদায় ও অধিকারকর্মীরা ভিন্নমত প্রকাশ করেছেন। তাদের অভিযোগ, একাধিক ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে নোটিশ জারির পরপরই ভাঙার কাজ শুরু হয়েছে এবং একই এলাকায় অনুমোদনহীন হিন্দু ধর্মীয় স্থাপনাকে অভিযানের আওতার বাইরে রাখা হয়েছে। রাজস্থানে সিভিল রাইটস সংগঠন অ্যাসোসিয়েশন ফর প্রোটেকশন অব সিভিল রাইটসের রাজ্য সভাপতি সৈয়দ সাদাত আলী এই উচ্ছেদ কার্যক্রমের কড়া সমালোচনা করে বলেছেন, নোটিশ জারি ও ভাঙার মধ্যে সময়ের ব্যবধান ছিল অস্বাভাবিকভাবে কম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন জাস্টিস ফর অল এই ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংগঠনটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, পাঁচ দিনের মধ্যে তিনটি মসজিদ ভাঙার ঘটনা বিচ্ছিন্ন নয়, বরং দেশটিতে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের প্রতি বৈষম্যের একটি বৃহত্তর প্রবণতার অংশ।
ঘটনাগুলো নিয়ে ভারতের অভ্যন্তরেও মতবিভেদ দেখা গেছে। একপক্ষ একে আইন প্রয়োগ ও অবৈধ দখলমুক্তকরণের অংশ বলে সমর্থন করছে অন্যপক্ষ ধর্মীয় স্থাপনার সুরক্ষা ও সংখ্যালঘু অধিকারের প্রশ্ন তুলে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছে। সুপ্রিম কোর্ট ও বিভিন্ন হাইকোর্ট অতীতে যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে উচ্ছেদ চালানোর বিরুদ্ধে সতর্ক করেছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এদিকে ভারতে মুসলিমদের সামাজিক ও রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিকীকরণ এবং বিভিন্ন রাজ্যে মসজিদ ও মাদরাসা ভাঙার প্রতিবাদে এক তীব্র গণআন্দোলনের ডাক দিয়েছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড (এআইএমপিএলবি)। গত ২২ জুন বোর্ডের কার্যনির্বাহী কমিটির এক গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক শেষে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এই ঘোষণা দেওয়া হয়। একই সঙ্গে বিষয়টির সুষ্ঠু তদারকির জন্য একটি বিশেষ ‘অ্যাকশন কমিটি’ বা সংগ্রাম কমিটিও গঠন করেছে তারা। বোর্ডের মুখপাত্র ড. এস কিউ আর ইলিয়াস সাংবাদিকদের জানান, বিজেপি শাসিত রাজ্যগুলোয় মুসলিমদের ঘরবাড়ি, এলাকা, মসজিদ এবং মাদরাসা লক্ষ করে চালানো উচ্ছেদ অভিযান বা ‘বুলডোজার সন্ত্রাস’ চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। সেই সঙ্গে গণপিটুনি (লঞ্চিং), সরকারি অনুষ্ঠান ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জোরপূর্বক ‘বন্দে মাতরম’ গাওয়ানোর বাধ্যবাধকতা এবং অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (ইউসিসি) কার্যকরের মতো ইস্যুগুলোয় ভারতের মুসলিম সমাজ গভীর সংকটের মুখে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে মুসলিমদের জীবন, সম্পত্তি, সম্মান, ধর্মীয় অধিকার এবং বিশ্বাস ক্রমাগত আক্রমণের শিকার হচ্ছে। অথচ দেশের কোনো রাজনৈতিক দলই এমনকি কংগ্রেসও মুসলিমদের এই সংকট নিয়ে জোরালোভাবে সোচ্চার হচ্ছে না। রাজনৈতিক দলগুলোর এই উদাসীনতায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বোর্ড স্পষ্ট জানিয়েছে, দেশের গণতন্ত্রকামী, শান্তিপ্রিয় ও ন্যায়পরায়ণ নাগরিকদের সঙ্গে নিয়ে তারা এই আন্দোলনের রূপরেখা তৈরি করবে। এছাড়া মধ্যপ্রদেশের কামাল মওলা (ভোজশালা) মসজিদ নিয়ে হাইকোর্টের সাম্প্রতিক রায়টির ব্যাপারে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে অল ইন্ডিয়া মুসলিম পার্সোনাল ল বোর্ড। তাদের মতে, ঐতিহাসিক প্রমাণ ও ব্রিটিশ আমলের নথি উপেক্ষা করে এই রায় দেওয়া হয়েছে, যা ১৯৯১ সালের ধর্মীয় উপাসনালয় আইনের পরিপন্থী।
বোর্ড আরও হুঁশিয়ারি দিয়েছে যে, দেশের নাগরিকদের ওপর জোর করে ‘বন্দে মাতরম’ চাপিয়ে দেওয়া ভারতের সংবিধানের ২৫ নম্বর অনুচ্ছেদে বর্ণিত ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার লঙ্ঘন করে। যদি কেন্দ্রীয় সরকার এটি বাধ্যতামূলক করার কোনো চেষ্টা করে, তবে বোর্ড আদালতের দ্বারস্থ হবে। পাশাপাশি উত্তরাখণ্ড ও গুজরাটের পর আসাম, মধ্যপ্রদেশ ও মহারাষ্ট্রেও যেভাবে ইউনিফর্ম সিভিল কোড বা অভিন্ন দেওয়ানি বিধি কার্যকরের পাঁয়তারা চলছে, তার বিরুদ্ধে আইনি লড়াই চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ভারতের শীর্ষস্থানীয় এই মুসলিম সংগঠনটি। ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই মানবাধিকার ও আইনি লড়াইকে দেশবাসীর সামনে তুলে ধরতে শিগগিরই একটি বিস্তারিত ও শ্বেতপত্র বা তথ্যসমৃদ্ধ নথি প্রকাশ করা হবে বলেও সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়।