ক্ষমতাসীনদের চাঁদাবাজি, দেশজুড়ে ক্ষোভ-বিক্ষোভ মানববন্ধন
৮ জুলাই ২০২৬ ২০:৪০
স্টাফ রিপোর্টার : যে কেউ চাঁদাবাজ বা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কোনো কথা বললেই ক্ষেপে যায় বিএনপি নেতাকর্মীরা। চায়ের আড্ডায় বা অন্য কোনো জলসায় মানুষ কথাবার্তা বলার সময় বা গল্প করার সময় চাঁদাবাজি ও টেন্ডারবাজি নিয়ে কোনো আলোচনা করলে বিএনপির নেতাকর্মীরা ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তারা মনে করেন, এসব আলোচনা তাদের নিয়েই হচ্ছে। দেশের বিভিন্ন এলাকায় হাটবাজার, ঘাট, বাসস্ট্যান্ড দখল এবং সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পের টেন্ডারবাজিকে কেন্দ্র করে স্থানীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রায়ই দ্বন্দ্ব সংঘাত সৃষ্টি হয়। প্রতিপক্ষকে ঘায়েল করতে খুনের ঘটনাও ঘটছে। চাঁদাবাজি বন্ধে দেশের বিভিন্ন এলাকায় প্রায়ই বিক্ষোভ ও মানববন্ধন করছেন ভুক্তভোগীরা। রাজধানীর গুলিস্তানে চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিল করতে গিয়ে বিএনপির নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হন জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি এই হামলায় জামায়াতের বেশ কয়েকজন নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।
সাধারণ মানুষের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ক্ষমতার বাইরে থাকার পর হঠাৎ শাসনভার আসায় বিএনপির তৃণমূলের একটি অংশ বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ এবং নানা অজুহাতে চাঁদাবাজির যে সংস্কৃতি শুরু হয়েছে, তা বিগত সরকারের আমলের নেতিবাচক স্মৃতিকেই মনে করিয়ে দিচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে এক ধরনের নীরব অসন্তোষ দানা বাঁধছে, যা আগামী সেপ্টেম্বর-অক্টোবরে সম্ভাব্য স্থানীয় নির্বাচনে বিএনপির জন্য বড় খেসারতের কারণ হতে পারে। ক্ষমতার চার মাসের মাথায় এসে বিএনপি এখন এক মনস্তাত্ত্বিক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে। দলটির তৃণমূলের চাঁদাবাজি রুখে সাধারণ মানুষের আস্থা ধরে রাখার কঠিন লড়াইয়ে বিএনপি।
গুলিস্তানে চাঁদাবাজি বন্ধে জামায়াতের মিছিলে হামলা
রাজধানীর গুলিস্তানে চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ মিছিলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার অভিযোগ উঠেছে। গত ৪ জুলাই ফুলবাড়িয়া ফ্লাইওভারের নিচে আয়োজিত বিক্ষোভে হামলা হলে ব্যবসায়ীসহ ১৫-২০ জন আহত হয়েছেন। জামায়াতের ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের সহকারী প্রচার সম্পাদক আবদুস সাত্তার সুমন জানিয়েছেন, ‘আমাদের নেতাকর্মী ও ব্যবসায়ীরা যখন বিক্ষোভের জন্য জড়ো হচ্ছিলেন, তখন স্থানীয় বিএনপি কর্মী এবং কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীরা মিলে ছুরি, লোহার রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে হামলা চালায়।’ ‘বিএনপি কর্মীরা দীর্ঘদিন ধরে গুলিস্তান এলাকায় চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের সঙ্গে জড়িত এবং সম্প্রতি তারা সিসিটিভি ক্যামেরা ভাঙচুর করে ও কম্পিউটার সরিয়ে নগর প্লাজা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নিয়েছে,’ বলেন তিনি। জামায়াতের দাবি, ব্যবসায়ীদের অনুরোধে স্থানীয় জামায়াত নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি ও অবৈধ দখলের প্রতিবাদে এই মিছিলের আয়োজন করেছিলেন। আবদুস সাত্তার সুমন ৪ জুলাই শনিবার গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ‘হামলায় ১৫-২০ জন ব্যবসায়ী ও জামায়াত কর্মী আহত হয়েছেন। ছুরিকাঘাতে গুরুতর আহত ৩ জনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে এবং তাদের অবস্থা আশঙ্কাজনক।’
বিএনপি নেতার চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে লক্ষ্মীপুরে বিক্ষোভ-মানববন্ধন
লক্ষ্মীপুরের রায়পুর উপজেলার উত্তর চরবংশী ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডে বিএনপি নেতা শাহজাহান কবিরাজের বিরুদ্ধে চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, দখল, হামলা, মামলা ও ভূমিদস্যুতার অভিযোগ তুলে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ করেছেন এলাকাবাসী। গত ২ জুলাই বৃহস্পতিবার দুপুরে ইউনিয়নের স্টিলব্রিজ থেকে উদমারা সড়কে আয়োজিত কর্মসূচিতে নারী-পুরুষসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শতাধিক মানুষ অংশ নেন। মানববন্ধন কর্মসূচিতে তারা বিভিন্ন স্লোগান দেন এবং প্রতিবাদী প্লাকার্ড প্রদর্শন করেন। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয় বিএনপির প্রভাবশালী নেতা শাহজাহান কবিরাজের নেতৃত্বে তার সহযোগীরা এলাকায় চাঁদাবাজি, মাদক ব্যবসা, ভয়ভীতি প্রদর্শন, দখলবাজি, হামলা ও মিথ্যা মামলার মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে আসছেন। এসব কারণে এলাকার মানুষ চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন বলেও তারা দাবি করেন। মানববন্ধন থেকে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানানো হয়। নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষায় প্রশাসনের হস্তক্ষেপও কামনা করেন বক্তারা। সৌদি আরব প্রবাসী মো. হুমায়ুন কবির বলেন, ‘আমি প্রবাসে কষ্ট করে টাকা উপার্জন করে এলাকায় একটি ভবন নির্মাণ করছি। চাঁদা না দেওয়ায় গত ১৫ দিন ধরে আমার ভবনের নির্মাণকাজ করতে দেওয়া হচ্ছে না। এতে আমি আর্থিকভাবে ব্যাপক ক্ষতির মুখে পড়েছি। বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানাই প্রশাসনের কাছে।’ মানববন্ধন শেষে হুমায়ুন কবির, জাকির, তফাজ্জল হোসেন, মুরাদ হোসেন, বৃদ্ধ জাহের মাঝি, বোরহান কবিরাজ ও শামছুন্নাহার বেগমসহ বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীরা এলাকার প্রধান প্রধান সড়ক প্রদক্ষিণ করে একটি বিক্ষোভ মিছিল করেন।
নদীপথে চাঁদাবাজি বন্ধে ভোলায় নৌ-শ্রমিকদের মানববন্ধন
‘দুনিয়ার মজদুর এক হও, নৌপথে জাহাজী শ্রমিক এক হও’- এই স্লোগান সামনে রেখে ভোলায় নৌপথে চলাচলকারী বাল্কহেড জাহাজী শ্রমিকদের ওপর জুলুম, নির্যাতন, চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাস বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন ও শ্রমিক সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গত ৮ জুন সকালে ভোলা প্রেস ক্লাবের সামনে ‘বাংলাদেশ জাহাজী শ্রমিক ফেডারেশন’, ভোলা জেলা শাখার আয়োজনে এই কর্মসূচি পালিত হয়। মানববন্ধনে বক্তারা অভিযোগ করেন, ভোলা জেলা অতিক্রম করে সী-বিচ চরপাড়া ও চট্টগ্রাম বন্দরসহ দেশের বিভিন্ন নৌপথে চলাচলকারী বাল্কহেড জাহাজ ও নৌ-শ্রমিকরা প্রতিনিয়ত জুলুম ও চাঁদাবাজির শিকার হচ্ছেন। বিশেষ করে ভোলার ইলিশা ও তুলাতলী ঘাট এলাকায় ‘কথিত পাইলট’ নামধারী একদল দুর্বৃত্ত বাল্কহেড শ্রমিকদের আটকে রেখে মোটা অঙ্কের চাঁদা আদায় করছে। চাঁদা দিতে অস্বীকার করলে শ্রমিকদের ওপর চালানো হচ্ছে অমানবিক নির্যাতন। বক্তারা বলেন, এই সন্ত্রাসের মূল হোতা ‘চর খেকো’ ও জলদস্যু চকলেট জামাল। তার নেতৃত্বে সন্ত্রাসী মফিজ ও সবুজ বাহিনী এই চাঁদাবাজি, নির্যাতন করে আসছে। আমরা এই সন্ত্রাসীদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার দাবি করছি। মানববন্ধনে শ্রমিক নেতারা হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, আমাদের ন্যায্য দাবি অবিলম্বে মানতে হবে। ইলিশা ও তুলাতলীতে পাইলটের নামে চাঁদাবাজি ও হয়রানি বন্ধ না হলে সারা দেশে জাহাজ চলাচল বন্ধ করে দেওয়া হবে। একইসঙ্গে তারা সাধারণ জেলেদের অবাধে মৎস্য শিকার নিশ্চিত করা এবং নদীর পয়স্তি জমির মালিকদের জানমালের নিরাপত্তা প্রদানের জন্য প্রশাসনের নিকট জোর দাবি জানান।
চট্টগ্রামে চাঁদাবাজির প্রতিবাদে সড়কে মাছ ছিটিয়ে বিক্ষোভ
চট্টগ্রামে হালিশহরের রানী রাসমণি ঘাটে ‘চাঁদাবাজির’ প্রতিবাদে সড়কের ওপর মাছ ছিটিয়ে বিক্ষোভ করেছেন জেলেরা। গত ২৪ জুন সকালে ঘাটসংলগ্ন সড়কে চাঁদাবাজি ও খাস কালেকশনের প্রতিবাদে এ মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করা হয়। এ কর্মসূচিতে স্থানীয় আড়তদার ও জেলেরা অংশ নেন। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চাঁদাবাজির অভিযোগ তুলে শতাধিক জেলে ব্যানার ও ফেস্টুন হাতে বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে নানা স্লোগান দেন। একপর্যায়ে তারা সড়কে মাছ ছিটিয়ে এবং বরফ ও গ্যাস সিলিন্ডার রেখে বিক্ষোভ করেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, ক্ষমতাসীন দলের পরিচয়ে একটি গ্রুপ গত ২৩ এপ্রিল থেকে সিটি করপোরেশনের রাজস্ব আদায়ের নামে রাসমনি ঘাট এলাকায় চাঁদাবাজি করছে। ঘাটে প্রতি টুকরো বরফে ৫ টাকা, প্রতি কেজি মাছে ৫ টাকা ও প্রতি গ্যাস সিলিন্ডারের জন্য ১০০ টাকা করে চাঁদা নেওয়া হচ্ছে। একাধিকবার সংশ্লিষ্টদের কাছে অভিযোগ জানিয়েও কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় প্রতিবাদ কর্মসূচিতে নামেন তারা। এ সময় চাঁদাবাজি বন্ধ এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান জেলেরা। বিক্ষোভের সময় জেলেদের হাতে বিভিন্ন দাবিসংবলিত প্লাকার্ড দেখা যায়। রানী রাসমনি ঘাটের জেলে, ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসীর আয়োজনে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে অংশ নেওয়া জেলেরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে ঘাটে মাছ নামানো, নৌকা ভেড়ানো, জাল, রশি, বরফ, গ্যাস সিলিন্ডার ও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যবসার ক্ষেত্রে অবৈধভাবে চাঁদা আদায় করা হচ্ছে। বিক্ষোভে অংশ নেওয়া মাছ ব্যবসায়ী রাজিব জলদাস বলেন, ‘আমরা বৈধভাবে ব্যবসা করছি। তারপরও পথে পথে চাঁদা দিতে হচ্ছে। এ অবস্থায় ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। বাধ্য হয়ে রাস্তায় নেমেছি।’
মোংলায় নৌপথে ডাকাতি-চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে মানববন্ধন
নৌপথে অব্যাহত ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবিতে মোংলায় মানববন্ধন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। গত ১১ জুন বিকেলে পৌর শহরের মামার ঘাট এলাকায় বাংলাদেশ নৌযান শ্রমিক-কর্মচারী ইউনিয়ন মোংলা শাখার উদ্যোগে এ কর্মসূচি পালন করা হয়। মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, দ্রুত সময়ের মধ্যে নৌপথে ডাকাতি ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা না হলে নৌযান ধর্মঘট এবং কর্মবিরতিসহ আরও কঠোর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। মানববন্ধনে সংগঠনটির মোংলা শাখার সভাপতি গাজী মাইনুল ইসলাম মনু বলেন, সম্প্রতি সুন্দরবনের অভ্যন্তরে শিবসা নদীসংলগ্ন শিংয়ের নালা নৌপথে ‘এম.ভি আব্দুল হাকিম-০১’ নামক একটি কার্গো জাহাজে একদল সশস্ত্র দুর্বৃত্ত হামলা চালায়। ওই সময় হামলাকারীরা কার্গো জাহাজের স্টাফদের ব্যাপক মারধর করে মালামাল লুটে নেয়। একই সঙ্গে তারা আতঙ্ক সৃষ্টি করতে জাহাজের মাস্টার ব্রিজে কয়েক রাউন্ড গুলিবর্ষণ করে। নৌপথে এমন অনাকাক্সিক্ষত ও সশস্ত্র হামলার ঘটনার পরও প্রশাসন এখনো পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করতে না পারায় মানববন্ধনে অংশ নেওয়া নৌযান শ্রমিক-কর্মচারীরা তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেন। তারা অচিরেই এই চক্রটিকে আইনের আওতায় আনার দাবি জানান।
কাইয়ুমের জমি দখলে রাজধানীর সাতারকুলে মানববন্ধন
রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে রাজধানীর সাতারকুল এলাকায় আবারও ভূমিদস্যুতা ও অবৈধ দখলের অভিযোগ উঠেছে বিএনপির ক্ষুদ্রঋণ বিষয়ক সম্পাদক ও স্বদেশ প্রপার্টিজের এমডি ড. এম এ কাইয়ুমের বিরুদ্ধে। স্থানীয় ভূমি মালিক ও বাসিন্দারা অভিযোগ, তিনি বিএনপির প্রভাবকে কাজে লাগিয়ে পূর্বের মতোই জমি দখল, চাঁদাবাজি এবং সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন। এসব অভিযোগের প্রতিবাদে গত ১৪ মার্চ সাঁতারকুলের সাধারণ ভূমি মালিকরা শান্তিপূর্ণ মানববন্ধন করেন।