সরকারের প্রথম একশ’ দিনে ৬০৫ হত্যাকাণ্ড ২০৯ ধর্ষণ


১০ জুন ২০২৬ ২২:০৬

স্টাফ রিপোর্টার : খুন করার জন্য এখন আর দিন-রাত, প্রকাশ্যে বা গোপন কোনো বিষয় নয়, মন চাইলেই সন্ত্রাসীরা খুন করছে। প্রকাশ্যে দিবালোকে গুলি চালিয়ে অথবা ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হচ্ছে। গত ৮ জুন সোমবার রাজধানীর রমনার মৌচাক মার্কেট এলাকায় স্বেচ্ছাসেবক দলের এক নেতাকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহত বিল্লাল হোসেন তালুকদার (৪৫) স্বেচ্ছাসেবক দলের রমনা থানার সাবেক আহ্বায়ক বলে পুলিশ জানিয়েছে। এ ঘটনার পর রাতেই যুবদলের রমনা থানার আহ্বায়ক দিদারুল ইসলাম বাবুকে সংগঠন থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসঙ্গে যুবদলের রমনা থানা কমিটি বিলুপ্ত ঘোষণা করেছে সংগঠনের কেন্দ্রীয় কমিটি। নিহত বিল্লালের পরিবারের দাবি, যুবদল নেতা দিদারুল ইসলাম ও তাঁর অনুসারীরা বিল্লালকে হত্যা করেছেন। এ ঘটনার একদিন আগে গত ৭ জুন রোববার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ২০৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। পুলিশ অবশ্য বলছে, একশ’ দিনে ৬০৫ খুনের বেশিরভাগই ব্যক্তিগত ও সামাজিক কারণে হয়েছে।
সরকারের প্রথম ১০০ দিনে ৬০৫ হত্যাকাণ্ড, ২০৯ ধর্ষণ
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড এবং ২০৯টি ধর্ষণের ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি করছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। গত ৭ জুন রোববার রাজধানীতে আয়োজিত ‘নির্বাচন-পরবর্তী সরকারের ১০০ দিন: সুশাসন প্রতিষ্ঠা ও দুর্নীতিবিরোধী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন’ শীর্ষক সংবাদ সম্মেলনে প্রকাশিত পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে এসব তথ্য তুলে ধরে সংস্থাটি। প্রতিবেদনে বলা হয়, জুলাই অভ্যুত্থানের পর গঠিত নতুন সরকারের কাছে জনগণ সুশাসন, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রত্যাশা করেছিল। তবে সরকারের প্রথম ১০০ দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উদ্বেগজনক ছিল বলে পর্যবেক্ষণ করেছে টিআইবি।
সংস্থাটির তথ্যানুযায়ী, এ সময়ে দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি ২০৯ নারী ও শিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। একই সময়ে ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি, ১৯৬টি অপহরণ এবং পুলিশের ওপর ১২৯টি হামলার ঘটনা ঘটেছে। সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ইফতেখারুজ্জামান বলেন, সরকারের ১০০ দিনে খুন, ডাকাতি, চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, নারী ও শিশু নির্যাতনসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধ অব্যাহত রয়েছে, যা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির নাজুক অবস্থার ইঙ্গিত দেয়।
সংসদে রুমিন ফারহানার ক্ষোভ
দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতিতে তীব্র উদ্বেগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন রুমিন ফারহানা। সরকারের প্রথম ১০০ দিনের বিভিন্ন অপরাধের পরিসংখ্যান তুলে ধরে তিনি জাতীয় সংসদে কঠোর সমালোচনা করেন। গত ৮ জুন সোমবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় অধিবেশনে ৭১ বিধিতে বক্তব্য রাখতে গিয়ে রুমিন ফারহানা বলেন, সরকারের প্রথম ১০০ দিনে দেশে হত্যা, অপহরণ, ছিনতাই, ডাকাতি ও নারী নির্যাতনের ঘটনা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। টিআইবির প্রতিবেদনের তথ্য উল্লেখ করে তিনি দাবি করেন, চলতি সরকারের প্রথম ১০০ দিনে শুধু মার্চ ও এপ্রিল মাসেই দেশে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ড, ২৯৪টি ছিনতাই, ৯০টি ডাকাতি এবং ১৯৬টি অপহরণের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া পুলিশের ওপর হামলার ঘটনা ঘটেছে ১২৯টি এবং চুরির ঘটনা ঘটেছে ২ হাজার ২১৪টি। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেন তিনি। সংসদে দেওয়া বক্তব্যে তিনি জানান, আলোচিত সময়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা ঘটেছে ৩ হাজার ৪৯৬টি। এর মধ্যে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৭৮ থেকে ১০২ জন, গণধর্ষণের শিকার হয়েছেন ৩০ থেকে ৩৬ জন এবং ধর্ষণের শিকার শিশুর সংখ্যা ৪৯ থেকে ৭১ জন।
পুলিশ বলছে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড ব্যক্তিগত ও সামাজিক
একশ’ দিনে ৬০৫ খুনের বেশিরভাগই ব্যক্তিগত ও সামাজিক কারণে হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। গত ৮ জুন সোমবার এ বিষয়ে পুলিশ সদর দফতরের পক্ষ থেকে ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এ তথ্য জানানো হয়। ব্যাখ্যায় বলা হয়, সম্প্রতি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত ‘১০০ দিনে দেশে ৬০৫টি খুন’ শিরোনামের প্রতিবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বিস্তারিত ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে পুলিশ দাবি করছে, কেবল মোট হত্যাকাণ্ডের সংখ্যা তুলে ধরে পরিস্থিতিকে অস্বাভাবিক হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ ঘটনার প্রকৃতি, ঐতিহাসিক প্রবণতা এবং জনসংখ্যার অনুপাতে অপরাধের হার বিবেচনায় নেওয়া হয়নি।
পুলিশের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এপ্রিলÑ এই দুই মাসে মোট ৬০৫টি হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। এর মধ্যে ৩৩৬টি বা ৫৫ দশমিক ৫ শতাংশ হত্যাকাণ্ড ঘটেছে পূর্বশত্রুতার জেরে। পারিবারিক কলহ থেকে ঘটেছে ১৪৬টি (২৪ দশমিক ১ শতাংশ), সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধে ৬৯টি (১১ দশমিক ৪ শতাংশ) এবং আকস্মিক আঘাতে ১৯টি (৩ দশমিক ১ শতাংশ) হত্যাকাণ্ড। রাজনৈতিক কারণে হত্যার সংখ্যা মাত্র ৩টি, যা মোট ঘটনার শূন্য দশমিক ৫ শতাংশ। পুলিশ বলছে, এসব তথ্য থেকে স্পষ্ট যে অধিকাংশ হত্যাকাণ্ড ব্যক্তিগত, পারিবারিক কিংবা সামাজিক বিরোধের ফল। ফলে কেবল মোট সংখ্যা উল্লেখ করে সামগ্রিক আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সম্পর্কে সিদ্ধান্তে পৌঁছানো বাস্তব চিত্রকে আড়াল করে। পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে দেশে বছরে সাধারণত ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৪ হাজার হত্যা মামলা নথিভুক্ত হয়েছে। সেই হিসাবে দুই মাসে ৬০৫টি হত্যাকাণ্ডকে বার্ষিক হিসেবে রূপান্তর করলে সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৩ হাজার ৬৩০, যা গত এক দশকের গড় প্রবণতার মধ্যেই রয়েছে। তাই একে ‘অস্বাভাবিক বৃদ্ধি’ হিসেবে আখ্যায়িত করার মতো তথ্যভিত্তিক কারণ নেই বলে মনে করছে পুলিশ সদর দফতর।
জনসংখ্যার অনুপাতে অপরাধের হার নিয়েও বক্তব্য দিয়েছে পুলিশ। তাদের হিসাবে, প্রায় ১৮ কোটি মানুষের দেশে দুই মাসে প্রতি লাখ জনসংখ্যায় হত্যার হার দাঁড়ায় শূন্য দশমিক ৩৪, যা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উচ্চহার হিসেবে বিবেচিত হয় না। পুলিশের মতে, এই প্রেক্ষাপট উল্লেখ না করে শুধুমাত্র সংখ্যাগত বিশ্লেষণ জনমনে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে। এছাড়া প্রকাশিত প্রতিবেদনে পূর্ববর্তী সময়ের সঙ্গে তুলনামূলক তথ্য উপস্থাপন না করাকেও সীমাবদ্ধতা হিসেবে দেখছে পুলিশ। তাদের দাবি, আগের সরকারগুলোর আমলে একই সময়ে কত হত্যাকাণ্ড ঘটেছিল, সেই তুলনা ছাড়া বর্তমান পরিস্থিতিকে ‘উদ্বেগজনক’ বলা পদ্ধতিগতভাবে অসম্পূর্ণ। পুলিশ আরও বলেছে, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে মামলা নথিভুক্তকরণ আরও সক্রিয় ও উন্মুক্ত হয়েছে। তাদের মতে, মামলা রেকর্ড বৃদ্ধিকে দুর্বলতা হিসেবে নয়, বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির প্রতিফলন হিসেবে দেখা উচিত।