কিশোরগঞ্জে হাওরে পানির নিচে ধান

চোখে সর্ষেফুল দেখছেন হাজার হাজার কৃষক


৭ মে ২০২৬ ০৯:৪১

আহসানুল হক জুয়েল, কিশোরগঞ্জ : উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল এবং গত কয়েকদিনের প্রবল বর্ষণে কিশোরগঞ্জ জেলার হাওর অঞ্চলের কয়েক হাজার একর জমির বোরো ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। এতে প্রায় দুইশত কোটি টাকার ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। যখন মাঠভরা সোনালি ধান ঘরে তোলার স্বপ্নে বিভোর হওয়ার কথা কৃষকের, ঠিক তখনই উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢল ও প্রবল বর্ষণে ভেঙে গেল কৃষকের স্বপ্ন। ধান-খড় সব পানির নিচে। চোখে সর্ষেফুল দেখছেন হাজারো কৃষক।
দেশের অন্যতম খাদ্যভাণ্ডার হিসেবে পরিচিত কিশোরগঞ্জের হাওরাঞ্চল। যে বোরো ধানের ওপর দেশের ১৮ শতাংশ খাদ্য চাহিদা নির্ভর করে, সেই সোনালি ধান আজ পানির নিচে। হাওরের কৃষক যে হাতে ধান গোলা ভরায় ব্যস্ত থাকার কথা সেই হাতে বুক চাপড়াচ্ছে। একদিকে দিগন্তজোড়া থৈ থৈ পানি; অন্যদিকে শ্রমিক সংকট সব মিলিয়ে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন এ অঞ্চলের কৃষকরা।
এখন ত্রিমুখী সংকটের মুখে পড়েছে হাওর অঞ্চলের কৃষকরা আগাম বৃষ্টি, শ্রমিক সংকট ও বেশি মজুরি, ধান কাটার হারভেস্টার যন্ত্রের ঘাটতি- এই তিন সমস্যা নিয়ে হাওর অঞ্চলের কৃষকদের মাঝে দুশ্চিন্তার শেষ নেই। মাঠভরা বোরো পাকা ধান ঘরে তোলার আগেই দেখা দিয়েছে জলাবদ্ধতা। জমিতে জলাবদ্ধতার কারণে হারভেস্ট মেশিন এখন হাওড় অঞ্চলে অকেজো। তবে ধানের শুকনো জমিতে হারভেস্ট মেশিন চালাতে পারে। কৃষকরা কোমর সমান পানিতে নেমে পাকা, আদা কাঁচা, ধান কাটতে শুরু করেছে। শ্রমিকের বর্তমান মজুরি প্রতিদিন ১২০০ থেকে ১৬০০ টাকা। পানিতে তলিয়ে থাকা ধান কাটতে গিয়ে কৃষককে গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত টাকা। বৃষ্টির পানি এবং কৃষকের চোখের পানি মিলে একাকার। ইতোমধ্যে যেসব ধান কাটা হয়েছে, বৃষ্টির কারণে আর রোদ না থাকায় সেগুলোও সংগ্রহ করা যাচ্ছে না। অনেক ধান পচে যাচ্ছে। আবার অনেকের ধান থেকে চারা গাছ গজিয়েছে।
কিশোরগঞ্জের কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, গত ৩ মে রোববার সন্ধ্যা পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার ৫০ হেক্টর জমির ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এতে চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছেন জেলার প্রায় ৩৬ হাজার কৃষক। এর মধ্যে ইটনা উপজেলাতেই প্রায় ৩ হাজার হেক্টর বোরো ধানের জমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ইটনা ও অষ্টগ্রাম উপজেলা।
নিকলী আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ২৮ এপ্রিল বৃষ্টিপাত ছিল ১৬০ মিলিমিটার, যা বাংলাদেশে গত কয়েক দিনের সর্বোচ্চ বৃষ্টিপাতের রেকর্ড। গত শনিবার ও রোববার অল্প সময়ের জন্য হালকা রোদ উঠলেও ৪ মে সোমবার ভোর থেকে জেলার বিভিন্ন অঞ্চলে মুষলধারে বৃষ্টিপাত হয়। পরে রোদের দেখা মিললেও বেশিরভাগ সময়ে আকাশ মেঘলা রয়েছে। এতে ধান কাটতে গিয়ে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন কৃষকরা। একই সঙ্গে অতিবৃষ্টিতে জেলার অন্যান্য উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় সবজির ক্ষেতেও ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বৃষ্টির কারণে কিশোরগঞ্জের হাটবাজারগুলোয় বেড়েছে সবজির দাম।
কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চল ঘুরে দেখা গেছে, ধান উৎপাদনে ব্যয় বাড়লেও, মিলছে না ধানের ন্যায্য দাম। কৃষকরা জানান, ধানের ন্যায্য দাম না পাওয়ায় প্রতি বছর তারা বোরো আবাদে লোকসান দিয়ে যাচ্ছেন। এবার ভালো ফলন হলে সে ধকল কিছুটা কাটিয়ে ওঠার আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু তাদের সে আশায় গুড়েবালি। ব্রিধান-৮৮ এর বীজে মিশ্রণের ফলে ঘটেছে ফলন বিপর্যয়। এছাড়া ন্যায্য দাম না পাওয়ার কারণে এবারও লোকসান গুনতে হচ্ছে তাদের। এছাড়া দ্বিগুণ-তিনগুণ পারিশ্রমিক দিয়েও মিলছে না ধান কাটার শ্রমিক।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, হাওরের ক্ষুদ্র ও মাঝারি কৃষকরা মূলত ধারদেনা ও মহাজনের কাছ থেকে সুদের ওপর ঋণ নিয়ে জমি চাষ করে থাকেন। ধান তোলার সাথে সাথেই তাদের ঋণের টাকা পরিশোধ করতে হয়। কিন্তু ধানের দাম কম থাকায় কৃষকদের ভাবিয়ে তুলেছে। এ কারণে তারা মহাজনের ঋণ শোধ করা নিয়ে বিপাকে পড়েছেন।
কৃষকরা আরো জানান, সারের চড়ামূল্য, সেচ খরচ, শ্রমিকের চড়া মজুরিতে তাদের নাভিশ্বাস অবস্থা। কিন্তু ফসলের ন্যায্য দাম নেই। মূল্য কম-বেশি যাই হোক, মহাজনের ঋণ পরিশোধ করতেই হয়।
বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান বোরো ধান উৎপাদনকারী জেলা কিশোরগঞ্জ। এই জেলাটি ১৩টি উপজেলা নিয়ে গঠিত। এর মধ্যে চারটি উপজেলাকে হাওর উপজেলা বলা হয়। হাওর উপজেলাগুলো হলো নিকলী, ইটনা, মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম।
ইটনা উপজেলার মৃধাহাটি গ্রামের জাকির হোসেন জানান, তিনি ৩ খের (৭৫ শতাংশ) জমিতে ব্রিধান-১০২ করেছিলেন। এইটুকু জমি করতে তার খরচ হয়েছে ৫৭ হাজার টাকা। অথচ ৮০০ টাকা মণ ধরে ধান বিক্রি করে পেয়েছেন মাত্র ৪২ হাজার টাকা। ১৫ হাজার টাকা তার লোকসান হয়েছে।
জয়সিদ্ধি বড়হাটি গ্রামের কৃষক মান্নান ঠাকুর জানান, চার একর জমিতে তিনি বোরো আবাদ করেছিলেন। মহাজনের ঋণ শোধ করার জন্য ধান কাটার পর খলা থেকেই বিক্রি করে দিয়েছেন। প্রতি মণ ধান মাত্র ৭০০ টাকা করে বিক্রি করেছেন। ‘মহাজনের ঋণ শোধ করে যে সারাটা বছর কীভাবে চলবো, তা একমাত্র আল্লাহই জানে!’ বলতে গিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন মান্নান ঠাকুর।
কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সাজ্জাদ হোসেন বলেন, গত ৩ মে শনিবার থেকে কিশোরগঞ্জে আবারো বৃষ্টি এবং উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে বেড়েছে নদনদীর পানি।
গত ৩ মে রোববার ইটনা পয়েন্টে ধনু-বৌলাই নদীর পানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩.৬ মিটার, যা আগের দিনের তুলনায় ৫ সেন্টিমিটার বেশি বলে জানিয়েছিল কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, চামড়াঘাটে মেঘনা নদীর পানি ২.৭৩ মিটার, বেড়েছিল ১০ সেন্টিমিটার। অন্যদিকে অষ্টগ্রামে কালনী নদীর পানি ২.৪৫ মিটার, যা আগের চেয়ে ১৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। ভৈরব বাজারে মেঘনা নদীর পানি কমে ১.৮০ মিটার হয়েছিল। সব নদীর পানি এখনো বিপৎসীমার নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল এবং বৃষ্টিপাত ও উজানের পানির চাপ অব্যাহত থাকলে নদনদীর পানি আবারো বাড়তে পারে বলেও জানিয়েছিল পানি উন্নয়ন বোর্ড। পরিস্থিতি সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণে রাখা এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মোকাবিলায় স্থানীয় প্রশাসন ও কৃষকদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে বলেও জানিয়েছেন কিশোরগঞ্জ পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাজ্জাদ হোসেন।
এদিকে হাওর অঞ্চলের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করছেন জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতারা। গত ১ মে শুক্রবার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর নেতা বিশিষ্ট কার্ডিওলজিস্ট অধ্যাপক কর্নেল (অব.) জিহাদ খান করিমগঞ্জ উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। গত ৩ মে রোববার কিশোরগঞ্জ জেলা জামায়াতের আমীর অধ্যপক রমজান আলী নিকলী উপজেলার ঘোড়াদিঘা, সিংপুর এলাকা পরির্দশন করেছেন।
অপরদিকে জেলার বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সদ্য যোগদানকৃত কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক সোহানা নাসরিন এবং কৃষি বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা মিঠামইন ও অষ্টগ্রাম উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক ড. সাদিকুর রহমান জানান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা তৈরি করছেন।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জে গত ৩ মে রোববার থেকে শুরু হয়েছে সরকারিভাবে ধান সংগ্রহের অভিযান। সহকারী খাদ্য নিয়ন্ত্রক মো. মোশারফ হোসেন বলেন, চলতি মৌসুমে জেলার ১৩টি উপজেলা থেকে ৩৬ টাকা কেজি দরে (মণ প্রতি ১,৪৪০ টাকা) মোট ১৮ হাজার ৩৩০ টন ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আগামী ৩১ আগস্ট পর্যন্ত ধান সংগ্রহ করা হবে। তবে সরকারি গুদামে ধান বিক্রির ক্ষেত্রে মানসম্মত ও শুকনো ধান হওয়ার শর্ত থাকায় বিপাকে পড়েছেন চাষিরা। একজন কৃষক সরকারের নিকট সর্বোচ্চ ৭৫ মণ পর্যন্ত ধান বিক্রি করতে পারবেন। কৃষক কার্ডধারীদের পাশাপাশি কৃষি অফিসের তালিকাভুক্ত কৃষকদের কাছ থেকেও ধান সংগ্রহ করা হবে বলে জানা গেছে। এদিকে বৃষ্টির কারণে এবং ধান শুকাতে না পারায় জেলার কৃষকরা সরকারি গোডাউনে শর্তসাপেক্ষ বোরো ধান সরবরাহ করতে পারছে না।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানায়, এ বছর জেলায় ১ লাখ ৬৮ হাজার হেক্টর জমিতে বোরো চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওর অধ্যুষিত ইটনা, মিঠামইন, অষ্টগ্রাম ও নিকলীÑ এ চারটি উপজেলায় আবাদ হয়েছিল প্রায় এক লাখ হেক্টর। সেখানকার ১৮ হাজার ৫৬০ হেক্টর জমিতে এবার আবাদ করা হয়েছিলো ব্রি-ধান ৮৮। এই ব্রি-ধান ৮৮ এর বীজে মিশ্রণের কারণে হাওরের প্রায় এক পঞ্চমাংশ কৃষক ফলন বিপর্যয়ের শিকার হয়েছেন।
এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কিশোরগঞ্জে বৃষ্টিপাত অব্যাহত রয়েছে। পানির নিচে পাকা ধান থাকায় অনেক কৃষক চরম হতাশায় দিন কাটাচ্ছেন।