সংক্ষিপ্ত বিশ্ব সংবাদ
৬ মে ২০২৬ ১৮:১১
ভারতের মহারাষ্ট্রের ইসলামপুর এখন ঈশ্বরপুর
গত ২৯ এপ্রিল মহারাষ্ট্রের সাঙ্গলি জেলায় একটি জোরালো প্রতীকী প্রতিবাদে ডানপন্থী সংগঠন ‘শিবপ্রতিষ্ঠান হিন্দুস্থান’-এর কর্মীরা ‘ইসলামপুর’ লেখা সাইনবোর্ডগুলো ছিঁড়ে ফেলেন। তারা দাবি করেন যে, শহরটির নাম সরকারিভাবে পরিবর্তন করে ‘ঈশ্বরপুর’ রাখা হয়েছে। এ ঘটনাটি তরুণ ভারত ব্যায়াম মণ্ডলের প্রধান চত্বরে ঘটে। সংগঠনটির অফিসিয়াল ইনস্টাগ্রাম অ্যাকাউন্টে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা যায়, তিন-চারজন ব্যক্তি একটি কাঠামোর ওপর চড়ে বসছেন এবং ছুরি দিয়ে সবুজ রঙের প্লাস্টিকের ‘ইসলামপুর’ লেখাটি কেটে ফেলছেন। এরপর তারা সেটি মাটিতে ফেলে বারবার পদদলিত করেন। সংগঠনটি এই কাজটিকে একটি ‘মুসলিম-ঘেঁষা’ নামের প্রত্যাখ্যান হিসেবে বর্ণনা করেছে। চরমপন্থী সংগঠনটির দাবি অনুযায়ী, তারা মহারাষ্ট্র রাজ্য সরকারের ৩ নভেম্বর, ২০২৫-এর অধ্যাদেশকে সমর্থন জানিয়ে এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, ওই অধ্যাদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে ইসলামপুরের নাম পরিবর্তন করে ঈশ্বরপুর রাখা হয়েছিল। তাদের অভিযোগ, কোলহাপুরের এক ব্যক্তি পরিকল্পিতভাবে সাঙ্গলির বিভিন্ন স্থানে নতুন করে ‘ইসলামপুর’ লেখা দিকনির্দেশক সাইনবোর্ড বসিয়েছেন। তাদের মতে, এটি নবনিযুক্ত জেলা কালেক্টর, পুলিশ সুপার এবং কমিশনারের মর্যাদা ক্ষত্নু করার একটি ‘পরিকল্পিত চাল’। স্বেচ্ছাসেবকরা জানিয়েছেন, তারা আইনশৃঙ্খলার অবনতি এড়াতে প্রথমে পুলিশ ও কমিশনারকে এই অননুমোদিত বোর্ডগুলো সম্পর্কে জানিয়েছিলেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো পদক্ষেপ না পেয়ে, তারা নিজেরাই বিতর্কিত সাইনবোর্ডগুলো অপসারণ করেন এবং পরে তা কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করেন। তারা অন্যান্য স্থান থেকেও একই ধরনের বোর্ড সরিয়ে ফেলেছেন এবং সতর্কবাণী দিয়েছেন যে, প্রশাসন পদক্ষেপ না নিলে তারা এভাবেই বোর্ডগুলো সরাতে থাকবেন। উগ্র হিন্দুদের দাবির প্রেক্ষিতে রাজ্য রাজস্ব মন্ত্রী চন্দ্রশেখর বাওয়ানকুলে ইসলামপুরের নাম পরিবর্তন করে ঈশ্বরপুর করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতৃত্বাধীন মহায়ুতি সরকারের বৃহত্তর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। এ উদ্যোগের লক্ষ্য হলো মুঘল আমলের বলে মনে করা নামগুলোকে পরিবর্তন করে দেশীয় বা ঐতিহাসিক ভারতীয় নাম রাখা। এর আগের নাম পরিবর্তনের তালিকায় রয়েছে ২০২৩ সালে ঔরঙ্গাবাদ থেকে ছত্রপতি সম্ভাজি নগর ও ওসমানাবাদ থেকে ধারাশিব এবং ২০২৪ সালে আহমেদনগর থেকে অহল্যানগর। সিয়াসত ডেইলি।
আরাকান আর্মির সশস্ত্র লড়াই চলতেই থাকবে
মিয়ানমারের জাতিগত বিদ্রোহী সংগঠন আরাকান আর্মি সাম্প্রতিক দুটি গুরুত্বপূর্ণ অনুষ্ঠানে তাদের রাজনৈতিক ও সামরিক এই দ্বিমুখী লক্ষ্য স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছে। এতে বোঝা যায়, রাষ্ট্র গঠন এবং কেন্দ্রীয় সামরিক জান্তার বিরুদ্ধে লড়াই এ দুটি বিষয় একসঙ্গেই চলবে। ১০ এপ্রিল সংগঠনের ১৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে এক বার্তায় প্রধান কমান্ডার তুন মিয়াত নাইং তাদের স্লোগান পুনর্ব্যক্ত করেন। তা হলো- ‘লড়াই করতে করতে গড়ে তোলা, আর গড়তে গড়তেই লড়াই।’ তিনি বলেন, মুক্ত এলাকায় প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ শক্তিশালী করার পাশাপাশি সামরিক নিয়ন্ত্রণ বিস্তার- এই দ্বৈত কৌশলই তাদের পথ। তিনি আন্তর্জাতিক বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করার সতর্কবার্তা দিয়ে বলেন, সামরিক জান্তার অপরাধের বিচার নিজেদের শক্তিতেই নিশ্চিত করতে হবে। তিনি ২০২৭ সালের মধ্যে রাখাইন রাজ্যের বাকি অংশ দখলের মাধ্যমে ‘চূড়ান্ত বিজয়ের’ প্রতিশ্রুতি দেন। তবে প্রয়োজনে এরপরও লড়াই চালিয়ে যাওয়ার কথা বলেন। বর্তমানে ১৭টি টাউনশিপের মধ্যে ১৪টির নিয়ন্ত্রণ তাদের হাতে। তারা রাজ্যের রাজধানী সিত্তের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। তিন দিন পর সংগঠনের উপপ্রধান কমান্ডার নিও তুন আউং পার্শ্ববর্তী রাজ্যে মিত্র সংগঠন ইন্টারিম চিন ন্যাশনাল কনসালটেটিভ কাউন্সিলের (আইসিএনসিসি) পঞ্চম বার্ষিকীতে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, জনগণের মুক্তির জন্য শক্তিশালী সেনাবাহিনী গড়ে তোলা অপরিহার্য। যদিও আরাকান আর্মি এখনো ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্সের অংশ, তাদের অবস্থান ধীরে ধীরে উত্তর শান রাজ্যের মিত্রদের থেকে আলাদা হয়ে যাচ্ছে। এই মিত্রদের মধ্যে রয়েছে এমএনডিএএ এবং টিএনএলএ। চীনের প্রবল চাপের মুখে এই দুই সংগঠন যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়েছে। তারা লাশিও ও মোগোকের মতো শহর ফেরত দিয়েছে। এতে জান্তার সেনাদের অন্যত্র যুদ্ধ করার সুযোগ তৈরি হয়েছে, যা সামগ্রিক প্রতিরোধ আন্দোলনকে দুর্বল করেছে। আরাকান আর্মি এর আগে স্থানীয় জনগণের ওপর চাপ বাড়লে যুদ্ধবিরতিতে সম্মত হয়। তবে তারা নতুন গঠিত স্টিয়ারিং কাউন্সিল ফর এস্টাবলিশিং এ ফেডারেল ডেমোক্রেটিক ইউনিয়নের অংশ নয়। এটি চারটি বড় জাতিগত বিদ্রোহী সংগঠন ও ন্যাশনাল ইউনিটি গভর্নমেন্ট’কে একত্র করেছে। তারা ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি নেতৃত্বাধীন রাজনৈতিক কাঠামোতেও সক্রিয় নয়, যা চীনের হস্তক্ষেপে দুর্বল হয়ে পড়েছে। আরাকান আর্মির কার্যক্রম চীন সীমান্ত থেকে অনেক দূরে হওয়ায় বেইজিংয়ের প্রভাব সীমিত। চীন তাদের ওপর সরাসরি সামরিক চাপ বা অবরোধ দিতে পারে না। বরং বঙ্গোপসাগর, বাংলাদেশ সীমান্ত এবং আংশিকভাবে ভারতের প্রবেশপথ নিয়ন্ত্রণ করে আরাকান আর্মি নিজেই একটি কৌশলগত শক্তি হয়ে উঠেছে। আরাকান আর্মির প্রধান লক্ষ্য এখনো পূর্ণ হয়নি। গুরুত্বপূর্ণ শহর সিত্তে, কিয়াউকফিউ ও মানাউং দ্বীপ এখনো সামরিক জান্তার নিয়ন্ত্রণে। চীনের অনুরোধে আরাকান আর্মি আলোচনায় বসতে পারে। তবে তারা ২০০৮ সালের সংবিধানের অধীনে নিরস্ত্রীকরণ বা অধীনস্থ হওয়া মেনে নেবে না। বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা কম। বর্তমানে আরাকান আর্মি শুধু ব্রাদারহুড অ্যালায়েন্স নয়, পুরো মিয়ানমারের জাতিগত বিদ্রোহী সংগঠনগুলোর মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী বাহিনী। তাদের যোদ্ধা সংখ্যা ৫০ হাজারের বেশি। তাদের জনসমর্থনও ব্যাপক। যেখানে কোকাং বা তা’আং জনগোষ্ঠীর সংখ্যা তুলনামূলক কম, সেখানে রাখাইনের জনসংখ্যা ২৫ থেকে ৩০ লাখ, যা আরাকান আর্মিকে শক্তিশালী ভিত্তি দিয়েছে। আরাকান আর্মির এলাকা সমুদ্রপথে সংযুক্ত এবং ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে সীমান্ত রয়েছে, যা তাদের বড় সুবিধা দেয়। অন্যদিকে এমএনডিএএ ও টিএনএলএ ভূমিবেষ্টিত এবং চীনের ওপর নির্ভরশীল। আরাকান আর্মি বিভিন্ন জাতি ও ধর্মের মানুষের জন্য অন্তর্ভুক্তিমূলক নীতি গ্রহণ করেছে, যা তাদের রাজনৈতিক ভিত্তিকে আরও শক্তিশালী করেছে। ফলে তারা দীর্ঘসময় ধরে একাধিক ফ্রন্টে যুদ্ধ চালিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে। আরাকান আর্মিসহ অন্যান্য জাতিগত সশস্ত্র সংগঠনগুলোর লক্ষ্য মূলত নিজ নিজ অঞ্চল ও জনগণকে কেন্দ্র করে। তারা এখনো পুরো মিয়ানমারের জন্য একটি জাতীয় রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করেনি। সম্প্রতি দ্য ইরাবতীকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে তুন মিয়াত নাইং স্বীকার করেন, আরাকান আর্মি এখনো জাতীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব দেয়ার জন্য প্রস্তুত নয়। এজন্য তাদের আরও সময় প্রয়োজন। ইরাবতী।
গাজা বিক্ষোভ নিয়ে ব্রিটিশ সরকারের ‘মিথ্যা বয়ান’, তীব্র নিন্দা মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের
গাজা যুদ্ধের প্রতিবাদে আয়োজিত বিক্ষোভ মিছিলগুলো ইহুদিবিদ্বেষ বা অ্যান্টিসেমিটিজম উসকে দিচ্ছে- ব্রিটিশ সরকারের এমন দাবিকে ‘ভুল এবং হিতে বিপরীত’ বলে কঠোর সমালোচনা করেছে দেশটির বৃহত্তম মুসলিম সংগঠন মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন (এমসিবি)। সম্প্রতি উত্তর-পশ্চিম লন্ডনে দুইজন ইহুদি ব্যক্তির ওপর হামলার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে এমসিবি এক বিবৃতিতে বলে, তারা ঘৃণা ও ইহুদিবিদ্বেষের বিরুদ্ধে ইহুদি সম্প্রদায়ের পাশে আছে। তবে এই হামলাকে কেন্দ্র করে ব্রিটিশ মুসলিম বা ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভকারীদের ঢালাওভাবে দায়ী করার যে চেষ্টা সরকার করছে, তা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। এমসিবির মতে, প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমারের সরকার ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভের সঙ্গে ইহুদিবিদ্বেষী হামলাকে মিলিয়ে ফেলে একটি বিভ্রান্তিকর বয়ান তৈরি করছে। সংগঠনটি আরও উল্লেখ করে যে, ২৯ এপ্রিল যে ব্যক্তি ইহুদি ব্যক্তিদের ওপর হামলা চালিয়েছিল, সে একই সকালে ইসমাইল হোসেন নামে এক মুসলিম ব্যক্তিকেও লক্ষ্যবস্তু করেছিল। অথচ মূলধারার গণমাধ্যম এবং সরকার মুসলিম ভুক্তভোগীর বিষয়টি এড়িয়ে গিয়ে কেবল একতরফা বয়ান প্রচার করছে। বার্মিংহামের এমপি আইয়ুব খান এবং সাংবাদিক ওয়েন জোন্সও গণমাধ্যমের এই বৈষম্যমূলক আচরণের সমালোচনা করেছেন। তাদের মতে, যখন একই অপরাধী মুসলিম ও ইহুদি উভয়কেই আক্রমণ করল, তখন কেন কেবল একটি দিককে বড় করে দেখিয়ে ফিলিস্তিনপন্থি বিক্ষোভ নিষিদ্ধ করার অজুহাত খোঁজা হচ্ছে? মুসলিম অ্যাসোসিয়েশন অব ব্রিটেন (এমএবি) এক পৃথক বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ধরনের ঘটনাকে মুসলিম সম্প্রদায় এবং ফিলিস্তিন সংহতি আন্দোলনের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। তারা একে নাগরিক স্বাধীনতার ওপর এক বিশেষ ধরনের আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে। আল-জাজিরা।
ট্রাম্প প্রশাসনের নতুন অভিবাসননীতি বাতিল করল আদালত
যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞাপ্রাপ্ত দেশের নাগরিকদের জন্য গ্রিনকার্ড ও ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া কঠিন করে দিয়ে যে নীতিমালা ঘোষণা করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প, তাকে বৈষম্যমূলক ও বেআইনি বলে রায় দিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের একটি ফেডারেল আদালত। বোস্টনের যুক্তরাষ্ট্র জেলা বিচারক জুলিয়া কোবিক এ রায় দেন। একইসঙ্গে সংশ্লিষ্ট নীতির বিরুদ্ধে একটি প্রাথমিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেন আদালত। ২০টি দেশের প্রায় ২০০ জন অভিবাসন আবেদনকারীর করা একটি মামলার প্রেক্ষিতে এ রায় এসেছে। আবেদনকারীদের মধ্যে ইরান, হাইতি, ভেনেজুয়েলা ও সিরিয়ার নাগরিকরা রয়েছেন। তারা অভিযোগ করেন, ইউএস সিটিজেনশিপ অ্যান্ড ইমিগ্রেশন সার্ভিস ২০২৫ সালের নভেম্বর থেকে তাদের আশ্রয়, গ্রিনকার্ড ও কাজের অনুমতির আবেদন প্রক্রিয়াকরণ বন্ধ করে দেয়। বিচারক জুলিয়া কোবিক বলেন, ভ্রমণ নিষেধাজ্ঞার তালিকাভুক্ত দেশগুলোর নাগরিকদের আবেদন আটকে রাখা এবং তাদের জাতীয়তাকে নেতিবাচক ফ্যাক্টর হিসেবে বিবেচনা করা আইনবিরোধী। তিনি বলেন, এ ধরনের নীতি যুক্তরাষ্ট্রের ‘ইমিগ্রেশন অ্যান্ড ন্যাশনালিটি অ্যাক্ট’ এর সঙ্গে সাংঘর্ষিক, যেখানে জাতীয়তার ভিত্তিতে বৈষম্য নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আবেদন প্রক্রিয়া সম্পূর্ণভাবে স্থগিত রাখা কংগ্রেসের নির্দেশনারও লঙ্ঘন, কারণ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে এসব আবেদন নিয়ে সিদ্ধান্ত দিতে বাধ্য করা হয়েছে। রায়ের অংশ হিসেবে আদালত অন্তত ২২ জন আবেদনকারীর ক্ষেত্রে এ নীতির প্রয়োগ স্থগিত করেছে এবং বাকিদের ক্ষেত্রেও এটি প্রযোজ্য হবে কিনা, সে বিষয়ে পক্ষগুলোকে আলোচনার নির্দেশ দিয়েছে। এদিকে এ রায়কে গুরুত্বপূর্ণ নজির হিসেবে দেখছেন বাদীপক্ষের আইনজীবীরা। তাদের মতে, এটি প্রমাণ করে যে কংগ্রেস অনুমোদন না দিলে প্রশাসন একতরফাভাবে এমন বৈষম্যমূলক নীতি কার্যকর করতে পারে না। রয়টার্স।
হিজবুল্লাহর ড্রোনে নাকাল ইসরাইলকে সমরাস্ত্র দিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র
লেবাননের প্রতিরোধযোদ্ধা হিজবুল্লাহর ড্রোন শক্তির সামনে ইসরাইলি বাহিনীর অসহায় আত্মসমর্পণ আর একের পর এক প্রাণহানির ঘটনায় রীতিমতো ঘাম ছুটছে ওয়াশিংটনের। হিজবুল্লাহর এই প্রাণঘাতী প্রযুক্তির কাছে ইসরাইলি প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা পুরোপুরি নাকানি-চুবানি খাওয়ার পর এখন দখলদারদের রক্ষায় নতুন সমরাস্ত্র দেয়ার তোড়জোড় শুরু করেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। ইরানের বার্তা সংস্থা তাসনিম নিউজ অ্যাজেন্সি জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ড্রোন মোকাবিলায় ইসরাইলের কাছে প্রায় ১০০ কোটি ডলারের (৯৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার) অত্যাধুনিক সামরিক সরঞ্জাম বিক্রির বিষয়ে সম্মতি দিয়েছে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট। মূলত হিজবুল্লাহর ড্রোনের মুখে ইসরাইলি সেনাদের অসহায়ত্ব দেখে যুক্তরাষ্ট্র এই তড়িঘড়ি সিদ্ধান্ত নিয়েছে। হিব্রু দৈনিক হারেৎজ তাদের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ করেছে যে, এই চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র তেল আবিবকে ১০ হাজার সেট ‘অ্যাডভান্সড প্রিসিশন ওয়েপন সিস্টেম’ বা এপিকেডব্লিউএস সরবরাহ করবে। এ ব্যবস্থার বিশেষত্ব হলো, এটি ‘আকাশ থেকে ভূমিতে’ নিক্ষেপযোগ্য সাধারণ মিসাইলকে সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যে আঘাত হানতে সক্ষম এমন অস্ত্রে রূপান্তর করতে পারে। এর প্রধান লক্ষ্যই হলো আকাশপথে আসা ড্রোনগুলোকে মাঝপথে আটকে দেয়া বা ধ্বংস করা। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যমটি জানাচ্ছে, এই সিস্টেমে পুরনো ‘হাইড্রা ৭০’ মিসাইলের সাথে লেজার গাইডেড সিস্টেম এবং ছোট ডানা যুক্ত করা হয়, যা ইনফ্রারেড রশ্মির মাধ্যমে লক্ষ্যবস্তুকে নিখুঁতভাবে শনাক্ত করতে পারে। যদিও অতীতে এটি মাটিতে থাকা লক্ষ্যবস্তুর জন্য ব্যবহৃত হতো, তবে গত পাঁচ বছর ধরে একে ড্রোন বা হেলিকপ্টার ধ্বংসের উপযোগী করে গড়ে তোলা হয়েছে। তবে আসল দুশ্চিন্তা অন্য জায়গায়। হারেৎজ স্বীকার করেছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের এই দামি সিস্টেম দিয়েও হিজবুল্লাহর বিশেষ প্রযুক্তির ‘ফাইবার অপটিক ড্রোন’ বা তার দিয়ে নিয়ন্ত্রিত ড্রোনগুলো ঠেকানো সম্ভব নয়। এমনকি ইসরাইলি সেনাবাহিনী দক্ষিণ লেবাননে যে ছোট ছোট ‘কোয়াডকপ্টার’ ড্রোনের মাধ্যমে নিয়মিত নাজেহাল হচ্ছে, সেগুলো রুখতেও এই মার্কিন প্রযুক্তি কার্যকর হবে না। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এর আগে ইউক্রেনকে এই সিস্টেম দিয়েছিল রাশিয়ার ড্রোন ঠেকানোর জন্য এবং মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধেও তারা এটি ব্যবহার করেছে। তবে হিজবুল্লাহর ড্রোনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো এর অবিশ্বাস্য কম খরচ। যেখানে একটি ‘এআইএম-৯ সাইডউইন্ডার’ মিসাইল ছুড়তে ৫ লাখ ডলার বা ‘এআইএম-১২০ আমরাম’ মিসাইলে ১০ লাখ ডলার খরচ হয়, সেখানে এই নতুন গাইডেড অস্ত্রের খরচ মাত্র ৩০ হাজার ডলার। এমনকি ইসরাইলের নিজস্ব আয়রন ডোম মিসাইলের চেয়েও এটি সস্তা। হিজবুল্লাহর এই ড্রোনগুলো কেন এতো ভয়ংকর, তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে হারেৎজ বলছে, এগুলো খুব সরু আর সূক্ষ্ম ফাইবার অপটিক তারের মাধ্যমে নিয়ন্ত্রিত হয়। এর ফলে কোনো ধরনের জ্যামিং বা সিগন্যাল বাধা দিয়ে একে পথভ্রষ্ট করা যায় না। গত কয়েক সপ্তাহে ইসরাইলি কোম্পানিগুলো হিজবুল্লাহর এই ড্রোন ঠেকানোর অনেক চেষ্টা করেও ব্যর্থ হয়েছে। যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পরও ইসরাইল যখন বারবার লেবাননে বোমাবর্ষণ করে চুক্তি লঙ্ঘন করছে, তখন হিজবুল্লাহর এই সস্তা কিন্তু মারণঘাতী ড্রোনের আঘাতে ইসরাইলি সেনাদের মৃত্যুর মিছিল দখলদারদের কপালে চিন্তার ভাঁজ আরও চওড়া করেছে। ইসরাইলি টিভি চ্যানেল থার্টিন জানিয়েছে, হিজবুল্লাহর ড্রোনের কোনো সমাধান খুঁজে না পেয়ে ইসরাইলি সেনাবাহিনীর মধ্যে চরম হতাশা ছড়িয়ে পড়েছে। ইসরাইলি সামরিক বিশ্লেষক অর হেলার জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহর এই সহজ প্রযুক্তি গত এক সপ্তাহে ৩ জন ইসরাইলিকে হত্যা এবং ২০ জনের বেশি সেনাকে আহত করেছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, ইসরাইলি কর্মকর্তারা এখন বলছেন শুধু প্রতিরক্ষা দিয়ে কাজ হবে না, হিজবুল্লাহর এই ড্রোন থামাতে হলে লিটানি নদীর ২০ কিলোমিটার ওপার পর্যন্ত গিয়ে হামলা চালাতে হবে। তাসনিম নিউজ।
মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করতে রাশিয়ার নতুন উদ্যোগের ইঙ্গিত
মধ্যপ্রাচ্যকে পারমাণবিক ও অন্যান্য গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল হিসেবে গড়ে তুলতে নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের ইঙ্গিত দিয়েছে রাশিয়া। ভিয়েনায় আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোয় নিযুক্ত রাশিয়ার স্থায়ী প্রতিনিধি মিখাইল উলিয়ানভ এই বিষয়ে নতুন প্রস্তাব আনার সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা এই প্রক্রিয়াকে আবার সক্রিয় করার চেষ্টা চলছে। রুশ কূটনীতিক ইসরাইলের নীতির কড়া সমালোচনা করেন। তার মতে, ইসরাইল পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে স্বাক্ষর না করেও অন্য দেশগুলোর ওপর এই চুক্তি মানার চাপ সৃষ্টি করছে, যা সমতা ও ন্যায্যতার পরিপন্থী। তিনি এটিকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার ক্ষেত্রে বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করেন। রাশিয়া দীর্ঘদিন ধরেই মধ্যপ্রাচ্যকে গণবিধ্বংসী অস্ত্রমুক্ত অঞ্চল করার প্রস্তাব দিয়ে আসছে। ১৯৯৫ সাল থেকে এই ধারণা আন্তর্জাতিক আলোচনায় থাকলেও এখনো কার্যকর কোনো অগ্রগতি হয়নি। মস্কো মনে করে, নতুন কূটনৈতিক উদ্যোগের মাধ্যমে এই জট কাটানো সম্ভব। মিখাইল উলিয়ানভ জানিয়েছেন, রাশিয়া আলোচনার মাধ্যমে সব পক্ষকে এক টেবিলে আনার চেষ্টা চালাতে প্রস্তুত। তবে তিনি স্বীকার করেন, ইসরাইলের অবস্থান এবং পশ্চিমা দেশগুলোর ভূমিকা এই প্রক্রিয়াকে জটিল করে তুলেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান উত্তেজনার প্রেক্ষাপটে পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণ উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে ইরান ও ইসরাইলের মধ্যে বিরোধ বাড়তে থাকায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। রাশিয়ার এই সম্ভাব্য উদ্যোগ সফল হলে তা মধ্যপ্রাচ্যের দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতায় ভূমিকা রাখতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে এর জন্য আন্তর্জাতিক সহযোগিতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছা অত্যন্ত জরুরি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। বর্তমানে এই প্রস্তাব কেবল আলোচনার পর্যায়ে থাকলেও, রাশিয়ার সক্রিয় ভূমিকা ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক কূটনীতিতে নতুন গতিপথ তৈরি করতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তাস।
চীনের সহায়তায় নাইজেরিয়ায় নির্মিত হলো আফ্রিকার বৃহত্তম তেল শোধনাগার
আফ্রিকার শিল্পায়নের ইতিহাসে এক নতুন মাইলফলক স্পর্শ করল নাইজেরিয়ার ডাঙ্গোটে তেল শোধনাগার। মহাদেশটির জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্মিত এই বিশাল প্রকল্পটি চীনের উন্নত প্রকৌশল দক্ষতা এবং প্রযুক্তির এক অনন্য নিদর্শন হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেছে। সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টের এক প্রতিবেদনে এই মেগা প্রজেক্টে চীনের ভূমিকার বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছে। প্রতিবেদনে জানানো হয়, বিশ্বের অন্যতম বৃহত্তম এই একক-ট্রেন শোধনাগারটি নির্মাণে চীনের শীর্ষস্থানীয় প্রকৌশল প্রতিষ্ঠানগুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। বিশেষ করে শোধনাগারের বিশালাকার রিঅ্যাক্টর, রিজেনারেটর এবং অন্যান্য ভারী যন্ত্রপাতি তৈরিতে চীনের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানগুলোর অবদান অপরিসীম। প্রকৌশলীরা জানিয়েছেন, অত্যন্ত জটিল কারিগরি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করে এই অবকাঠামোটি দাঁড় করানো হয়েছে, যা আফ্রিকার তেল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে স্বনির্ভরতার পথে নিয়ে যাবে। ডাঙ্গোটে শোধনাগারটি প্রতিদিন প্রায় ৬ লাখ ৫০ হাজার ব্যারেল অপরিশোধিত তেল পরিশোধন করার ক্ষমতা রাখে। চীনের ‘বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ’ এর আওতায় আফ্রিকায় তাদের ক্রমবর্ধমান বিনিয়োগ এবং প্রভাবের এটি একটি বড় উদাহরণ। বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, চীনের এই প্রযুক্তিগত সহায়তা কেবল নাইজেরিয়া নয়, বরং সমগ্র আফ্রিকার অর্থনীতিতে এক বিশাল পরিবর্তন আনবে। জ্বালানি সংকটে থাকা দেশগুলোর জন্য এটি আশীর্বাদ হয়ে দেখা দেবে। এই প্রকল্পের সফল বাস্তবায়ন বিশ্ববাজারে চীনের প্রকৌশল সক্ষমতার অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করল। চীনের কোম্পানিগুলো তাদের নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এবং অত্যন্ত নিখুঁতভাবে এই কাজ সম্পন্ন করার মাধ্যমে প্রমাণ করেছে যে, বিশ্বমানের মেগা প্রজেক্টে তারা এখন অপ্রতিদ্বন্দ্বী। সাউথ চায়না মনিং পোস্ট।
গাজার ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়ে আছে ৮ হাজার লাশ
ইসরাইলের দুই বছরব্যাপী ভয়াবহ আগ্রাসনের ক্ষত বয়ে বেড়াচ্ছে গাজা উপত্যকা। উপত্যকাজুড়ে থাকা ধ্বংসস্তূপের নিচে এখনো প্রায় ৮ হাজার ফিলিস্তিনি নাগরিকের লাশ চাপা পড়ে আছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। তবে ধ্বংসস্তূপ অপসারণের গতি এতটাই ধীর যে, এই প্রক্রিয়া শেষ করতে আরও অন্তত সাত বছর সময় লেগে যেতে পারে। ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম ‘হারেৎজ’ জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির (ইউএনডিপি) একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য জানিয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, গাজায় ইসরাইলি হামলায় সৃষ্ট ধ্বংসস্তূপের মাত্র এক শতাংশ এখন পর্যন্ত পরিষ্কার করা সম্ভব হয়েছে। ফিলিস্তিনি সিভিল ডিফেন্স কর্তৃপক্ষের তথ্যের ভিত্তিতে এই মূল্যায়ন করা হয়েছে। তারা জানিয়েছে, ভারী যন্ত্রপাতির তীব্র সংকটের কারণে বিশাল এই ধ্বংসস্তূপ সরানোর কাজ ব্যাহত হচ্ছে। ফলে শত শত পরিবার তাদের প্রিয়জনদের লাশ উদ্ধার করে দাফন করার অপেক্ষায় দিন গুনছে। গত অক্টোবর মাসে একটি ‘যুদ্ধবিরতি’ চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও ইসরাইল প্রতিদিন তা লঙ্ঘন করে চলেছে। গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুযায়ী, চুক্তির পর থেকে ইসরাইলি হামলায় আরও ৮২৮ জন ফিলিস্তিনি নিহত এবং ২ হাজার ৩৪২ জন আহত হয়েছেন। উল্লেখ্য, দুই বছরের এই দীর্ঘ যুদ্ধে গাজায় এখন পর্যন্ত ৭২ হাজারেরও বেশি মানুষ নিহত এবং ১ লাখ ৭২ হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। এছাড়া বেসামরিক অবকাঠামোর প্রায় ৯০ শতাংশই ধ্বংস হয়ে গেছে। জাতিসংঘ ধারণা করছে, বিধ্বস্ত গাজা পুনর্গঠনে প্রায় ৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের প্রয়োজন হবে। হারেৎজ।
ভারতে করপোরেট চাকরি ও ব্যবসা-বাণিজ্য থেকে মুসলিম উৎখাতে হিন্দুত্ববাদীদের নতুন ছক
ভারতের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ কাঠামোর ভেতরে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ এখন আর কেবল রাজপথ বা ধর্মীয় উপাসনালয়ে সীমাবদ্ধ নেই; তা এবার হানা দিয়েছে করপোরেট অফিস এবং আধুনিক ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্দরে। গত কয়েক বছরে ‘লাভ জিহাদ’, ‘ল্যান্ড জিহাদ’ কিংবা ‘হালাল জিহাদ’-এর মতো অদ্ভুত সব তকমা ব্যবহার করে মুসলিমদের অর্থনৈতিকভাবে পঙ্গু করার যে প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে তা ‘করপোরেট জিহাদ’ নামক এক ভয়াবহ ও নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলোর লক্ষ্য এখন সুস্পষ্ট- সরকারি চাকরিতে নগণ্য উপস্থিতির পর এবার বেসরকারি খাত এবং করপোরেট দুনিয়া থেকেও মুসলিমদের বিতাড়িত করা। সাম্প্রতিক সময়ে ভারতের আইটি খাতের অন্যতম জায়ান্ট ‘টাটা কনসালটেন্সি সার্ভিসেস’ (টিসিএস)-কে কেন্দ্র করে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি করপোরেটজগতে মুসলিমবিদ্বেষের এক নগ্ন বহিঃপ্রকাশ। অভিযোগ ওঠে যে, প্রতিষ্ঠানের ভেতর উচ্চপদস্থ কিছু মুসলিম কর্মকর্তা হিন্দু কর্মীদের টার্গেট করে ধর্মান্তরের চেষ্টা চালাচ্ছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সুপরিকল্পিতভাবে ‘টিসিএস কনভার্সন রো’ বা ‘টিসিএস ধর্মান্তর বিতর্ক’ ছড়িয়ে দেওয়া হয়। তদন্তে কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ না পাওয়া গেলেও, চরমপন্থী হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর চাপের মুখে বেশ কয়েকজন দক্ষ মুসলিম কর্মীকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করা হয় অথবা দীর্ঘমেয়াদি ছুটিতে পাঠানো হয়। এটি কেবল একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি করপোরেট সেক্টরে কর্মরত মুসলিম তরুণদের মনে একটি বার্তা পৌঁছে দেওয়ার চেষ্টা যে যতই মেধাবী হওয়া যাক না কেন, ধর্মীয় পরিচয় এখানে অন্তরায় হতে পারে। বিশ্লেষকরা একে ‘করপোরেট লিঞ্চিং’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। ভারতে মুসলিমদের ব্যবসায়িকভাবে কোণঠাসা করতে একের পর এক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব বা কনস্পিরেসি থিওরি সাজানো হচ্ছে। গত কয়েক বছরে এর বিবর্তন লক্ষ্য করার মতো। অদ্ভুত ‘থুক জিহাদের’ অপবাদ দিয়ে রাস্তার ধারের ছোট খাবার দোকান বা রেস্তোরাঁ বন্ধ করতে ‘খাবারে থুতু মেশানোর’ মিথ্যা ভিডিও ছড়িয়ে সাধারণ মুসলিম ব্যবসায়ীদের দেউলিয়া করা হয়েছে। মুসলিম মালিকানাধীন ওষুধের দোকানে এমন ওষুধ বিক্রি করা হয় যা হিন্দুদের প্রজনন ক্ষমতা কমিয়ে দেয়- এমন অবাস্তব অপবাদ দিয়ে অনেক ফার্মেসি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। হিউম্যান রিসোর্স বা করপোরেট জিহাদের ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হাজির করে নতুন এই ছক অনুযায়ী দাবি করা হচ্ছে, মুসলিম এইচআর ম্যানেজাররা কেবল মুসলিমদেরই চাকরিতে নিচ্ছেন এবং হিন্দুদের ওপর কর্মক্ষেত্রে মানসিক চাপ সৃষ্টি করছেন। উত্তরপ্রদেশ, উত্তরাখণ্ড এবং মধ্যপ্রদেশের মতো রাজ্যগুলোয় ফল বিক্রেতা থেকে শুরু করে ধাবার মালিকদের নিজেদের নাম প্রদর্শন বাধ্যতামূলক করার যে সরকারি নির্দেশ জারি করা হয়েছিল, তা ছিল মূলত মুসলিম ব্যবসায়ীদের চিহ্নিত করে বয়কট করার একটি প্রাতিষ্ঠানিক হাতিয়ার। এর ফলে হাজার হাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী তাদের রুটি-রুজি হারিয়েছেন। উগ্রবাদী গোষ্ঠীগুলো এখন বড় বড় শপিং মল এবং মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির সামনে লিফলেট বিলি করছে যাতে ‘হিন্দুরা কেবল হিন্দুদের থেকেই পণ্য কেনে’।
সাম্প্রতিক কিছু প্রতিবেদনে (যেমন: ২০২৬ সালের শুরুর দিকে এনএইচআরসি-র নোটিশ) দেখা গেছে, উত্তরপ্রদেশসহ বিভিন্ন রাজ্যে জিম বা ফিটনেস সেন্টারের আড়ালে ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলা হয়েছে। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় মানবাধিকার সংগঠনের প্রতিবেদন ভারতের এই অন্ধকার চিত্র তুলে ধরছে। ২০২৫ সালে ভারতে সংখ্যালঘুদের বিরুদ্ধে ঘৃণা ছড়ানো বক্তব্যের এক নতুন নজির স্থাপন করেছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক একটি গবেষণা সংস্থা। ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক ‘সেন্টার ফর দ্য স্টাডি অব অর্গানাইজড হেট’ পরিচালিত ‘ইন্ডিয়া হেট ল্যাব’ (আইএইচএল) এর এক নতুন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে- গত বছর জুড়ে ভারতে মুসলিম ও খ্রিষ্টান সম্প্রদায়কে লক্ষ করে ঘৃণাত্মক ভাষণ ও সমাবেশের সংখ্যা ভয়াবহভাবে বেড়েছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতে অন্তত ১ হাজার ৩১৮টি ঘৃণা ছড়ানো ভাষণ বা সমাবেশ নথিভুক্ত হয়েছে, যা দৈনিক গড়ে চারটির বেশি ঘটনা। এটি ২০২৪ সালের তুলনায় ১৩ শতাংশ বেশি এবং ২০২৩ সালের তুলনায় প্রায় দ্বিগুণ। ভারতে মুসলিমবিরোধী ঘৃণাভাষণের প্রায় ৪০ শতাংশই এখন ‘অর্থনৈতিক বয়কট’ এবং ‘কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য’ সংক্রান্ত বলে জানানো হয়েছে। অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের মতে, ভারতে মুসলিমদের আবাসন এবং কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে এক ধরনের ‘অঘোষিত বর্ণবাদ’ চলছে। ‘মুসলিমদের ঘর দেওয়া হবে না’ থেকে শুরু করে ‘মুসলিমদের চাকরি দেওয়া ঝুঁকিপূর্ণ’ এমন মানসিকতা করপোরেট কালচারে প্রোথিত করা হচ্ছে। বেসরকারি গবেষণা সংস্থাগুলোর মতে, ভারতের সরকারি চাকরিতে মুসলিমদের হার ৫ শতাংশের নিচে। এই বিশাল জনগোষ্ঠী যখন টিকে থাকার জন্য বেসরকারি খাত বা ছোট ব্যবসায় ঝুঁকেছে, তখন সেখানেও ‘জিহাদ’ তকমা দিয়ে তাদের পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। ভারতে যখন উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তুলে একটি বিশেষ মহল সাম্প্রদায়িক অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে, ঠিক তখনই মুসলিমদের মানবিক ও সহনশীল আচরণের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত তুলে ধরলেন এক হিন্দু নারী। সম্প্রতি ১০ বছর ধরে মুম্বাইয়ের ‘আঞ্জুমান-ই-ইসলাম’ প্রতিষ্ঠানে কর্মরত রামা সিং দুর্গবংশী মুসলিমদের মানবিক ও সহনশীল আচরণের এক বলিষ্ঠ সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি স্পষ্টভাবে জানান যে, দীর্ঘ এক দশকের কর্মজীবনে কোনো মুসলিম তাকে ধর্ম পরিবর্তন বা বোরকা পরার জন্য সামান্যতম চাপ দেননি; বরং তিনি নিজ ধর্মীয় রীতি অনুযায়ী কপালে টিপ পরেই নিয়মিত দাপ্তরিক কাজ সম্পাদন করছেন। ৪-৫টি রাজ্যের শতাধিক মাদরাসা পরিদর্শনের অভিজ্ঞতা থেকেও তিনি জানিয়েছেন যে, কোথাও তাকে কোনো প্রকার তিক্ত বা অসহিষ্ণু আচরণের সম্মুখীন হতে হয়নি।
সাম্প্রতিক সময়ে নাসিকের টিসিএস অফিসে মুসলিম কর্মীদের বিরুদ্ধে ওঠা ধর্মান্তরকরণের অভিযোগকে ভিত্তিহীন আখ্যা দিয়ে রামা সিং বলেন, জোরপূর্বক কাউকে ধর্মান্তরিত করা সম্ভব নয়। তিনি প্রতিষ্ঠানটির সেবামূলক কার্যক্রমের প্রশংসা করে জানান, আঞ্জুমান-ই-ইসলাম কোনো বৈষম্য ছাড়াই নিম্নবিত্ত কর্মীদের সন্তানদের উচ্চশিক্ষায় সহায়তা করছে। একতরফাভাবে কোনো সম্প্রদায়কে দোষারোপ না করে বাস্তবতাকে অনুধাবন এবং নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো খতিয়ে দেখার আহ্বান জানান তিনি। উগ্র হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলোর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়, তারা একটি সুসংগঠিত ডাটাবেজ তৈরি করছে যেখানে মুসলিম মালিকানাধীন বড় বড় স্টার্টআপ এবং কোম্পানির তালিকা রয়েছে। ‘হিন্দু আইটি সেল’ বা এই জাতীয় নামধারী গ্রুপগুলো নিয়মিতভাবে করপোরেট বোর্ডগুলোর কাছে ইমেইল পাঠিয়ে মুসলিম কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ তুলছে। তাদের দাবি, সরকারি খাতের মতো বেসরকারি খাতেও মুসলিমদের প্রভাব ‘শূন্য’ করতে হবে। ভারতের করপোরেটজগৎ এতদিন মেধাতন্ত্র বা ‘মেরিটোক্রেসি’র ওপর ভিত্তি করে টিকে ছিল। কিন্তু ধর্মের নামে যে ঘৃণা এখন বোর্ডের সভা থেকে শুরু করে আইটি ডেস্ক পর্যন্ত পৌঁছেছে, তা ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য বড় হুমকি। মেধাবী মুসলিম তরুণদের করপোরেট সেক্টর থেকে বিতাড়িত করার এই ছক সফল হলে ভারত কেবল দক্ষ জনশক্তিই হারাবে না, বরং বিশ্ববাজারে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও ‘অসহিষ্ণু দেশ’ হিসেবে চিহ্নিত হবে। গণতন্ত্র ও মানবাধিকার রক্ষায় সোচ্চার সংগঠনগুলোর মতে, এখনই যদি এই ‘অর্থনৈতিক বর্ণবাদ’ রুখে দেওয়া না যায়, তবে ভারতের মুসলিমদের অবস্থা হবে ‘দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিক’-এর চেয়েও ভয়াবহ। আল-জাজিরা।
ন্যাটো জোটের ভবিষ্যৎ নিয়ে পোলিশ প্রধানমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি
মার্কিন-ইসরাইল ও ইরান যুদ্ধের জেরে উত্তর আটলান্টিক নিরাপত্তা জোট বা ন্যাটো-তে বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছে। জোটের এই অভ্যন্তরীণ কোন্দলকে ‘বিপর্যয়কর’ হিসেবে বর্ণনা করে সতর্কবার্তা দিয়েছেন পোল্যান্ডের প্রধানমন্ত্রী ডোনাল্ড টাস্ক। পোলিশ প্রধানমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেন, ‘আটলান্টিক মহাসাগরীয় অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য সবচেয়ে বড় হুমকি কোনো বহিঃশত্রু নয়, বরং আমাদের এই জোটের চলমান ভাঙন।’ তিনি এই নেতিবাচক পরিস্থিতি মোকাবিলায় জোটের সব সদস্যকে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার আহ্বান জানান। এদিকে ন্যাটোর এই সংকটের মূলে রয়েছে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক অবস্থান। ইরান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রকে সমর্থন না করায় ইতালি ও স্পেনের ওপর চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন তিনি। ট্রাম্প সরাসরি হুমকি দিয়ে বলেছেন, প্রয়োজনে এই দেশগুলো থেকে মার্কিন সেনা প্রত্যাহার করে নেওয়া হবে। ট্রাম্পের অভিযোগ, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের সময় যখন সহযোগিতার প্রয়োজন ছিল, তখন এই দেশগুলোকে পাশে পাওয়া যায়নি। উল্লেখ্য, ইরান লক্ষ করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের বোমাবর্ষণ সাময়িকভাবে বন্ধ থাকলেও গত চার সপ্তাহেও কোনো স্থায়ী সমাধান বা চুক্তি হয়নি। এই যুদ্ধের ফলে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় নজিরবিহীন বিপর্যয় নেমে এসেছে, যা ন্যাটো দেশগুলোর মধ্যে বিভেদকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। এপি।
দিল্লিতে মুসলিম কিশোরকে কুপিয়ে হত্যা
ভারতের রাজধানী দিল্লির পূর্ব ত্রিলোকপুরী এলাকায় গত ৩০ এপ্রিল বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় এক ১৬ বছর বয়সী মুসলিম কিশোরকে নির্মমভাবে ছুরিকাঘাতে হত্যা করা হয়েছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগ, পূর্বের একটি বিরোধের জেরে তাকে পরিকল্পিতভাবে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যদিও ওই বিরোধের সাথে তার কোনো সম্পর্ক ছিল না। নিহত কিশোরের নাম আয়ান সাইফি। পরিবারের সদস্যরা জানান, আয়ান তার বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান ছিল। সে পড়াশোনার পাশাপাশি তার মাকে প্রতিদিনের কাজে সাহায্য করত। প্রত্যক্ষদর্শী ও স্বজনদের দাবি, ত্রিলোকপুরীর একটি স্থানীয় পার্কের কাছে ৬ থেকে ৮ জন সশস্ত্র যুবক আয়ানকে ধাওয়া করে। একপর্যায়ে তারা তাকে ঘিরে ফেলে এবং ধারালো ছুরি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করতে থাকে। নিহতের এক আত্মীয় বলেন, ‘তারা তাকে ঘিরে ধরে পিঠ, পেট ও পায়ে বারবার ছুরিকাঘাত করে। এমনকি তার হাতও মারাত্মকভাবে জখম হয়েছিল।’ নিহতের পরিবারের দাবি, এই হামলাটি ছিল পূর্বপরিকল্পিত। ‘ভাকিল’ নামে পরিচিত এক স্থানীয় ব্যক্তির সঙ্গে অন্য কারোর বিরোধের জেরে আয়ানকে বলির পাঁঠা বানানো হয়েছে। স্বজনদের আহাজারি, ‘কারোর সাথেই তার কোনো শত্রুতা ছিল না। অন্যের সমস্যার কারণে তারা আমার ছেলেকে মেরে ফেলল।’ গুরুতর আহত অবস্থায় আয়ানকে লাল বাহাদুর শাস্ত্রী হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরিবারের দাবি, মৃত্যুর আগে কিছুক্ষণ জ্ঞান ফিরলে পুলিশ তার জবানবন্দি রেকর্ড করে। সেখানে সে কয়েকজন হামলাকারীর নামও উল্লেখ করেছে বলে জানা গেছে। তবে পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর মূল অভিযুক্তদের গ্রেফতার না করে উল্টো নিহতের পরিবারের সদস্যদেরই পুলিশ আটক করেছে। তারা আরও জানান, এর আগে প্রাণনাশের হুমকি পাওয়ার পর থানায় অভিযোগ দিলেও পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের পর ঘনবসতিপূর্ণ ত্রিলোকপুরী এলাকায় চরম উত্তেজনা ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। আয়ানের মা শোকে পাথর হয়ে গেছেন। তিনি বলেন, ‘সে-ই ছিল আমার একমাত্র ভরসা। আমি আমার সবকিছু হারিয়ে ফেলেছি।’ দিল্লি পুলিশ এ ঘটনায় একটি মামলা করেছে। তবে প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত হত্যার প্রকৃত কারণ বা কাউকে গ্রেফতারের বিষয়ে পুলিশের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি। নিহতের পরিবার অনতিবিলম্বে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছে। ডন।
এবার পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্ববাদের জয়
এবার পশ্চিমবঙ্গেও হিন্দুত্ববাদের বিজয়। ভরাডুবি হলো তৃণমূলের মমতার। পদ্ম ঝড়ে উড়ে গেছে ঘাসফুল। বাংলার রাজনীতির মানচিত্র ওলটপালট হয়ে গেল। দীর্ঘ ১৫ বছরের তৃণমূল শাসনের অবসান ঘটিয়ে নীল-সাদা প্রাসাদের দখল নিল গেরুয়া শিবির। পরিবর্তনের যে চোরাস্রোত গত কয়েক বছর ধরে বইছিল, গত সোমবার (৪ মে) তা কার্যত সুনামিতে পরিণত হয়েছে। পশ্চিমবঙ্গে ২৯৪ আসনের মধ্যে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) জয় পেয়েছে ২০৮ আসনে। আর রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেস ৭৯টি আসনে জয় পেয়েছে। এছাড়া কংগ্রেস ২টি আসনে জয় পেয়েছে। ভবানীপুর আসনে বিজেপির শুভেন্দু অধিকারীর কাছে হেরে গেছেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। দুইশোর বেশি আসন নিয়ে বিজেপির বাংলার মসনদে বসা নিশ্চিত করতেই দিল্লির মঞ্চে ধরা দিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। তবে কোনো চিরাচরিত সাজে নয়, ধুতি-পাঞ্জাবি পরে পুরোদস্তুর বাঙালি বেশে তিনি যখন মঞ্চে উঠলেন, তখন তার কণ্ঠে বারবার ফিরে এলো ‘সোনার বাংলা’ গড়ার অঙ্গীকার। মোদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, ২০২৬-এর এ নির্বাচন ভারতের ইতিহাসে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবে এবং এটি মূলত সুশাসনের রাজনীতির জয়। বাংলার এ ঐতিহাসিক রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পেছনে কোনো নির্দিষ্ট জাদুমন্ত্র কাজ করেনি, বরং ছিল সুপরিকল্পিত কৌশল এবং জনমানসের পুঞ্জীভূত ক্ষোভ। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, এবারের নির্বাচনে নির্ণায়ক ভূমিকা নিয়েছে ‘ধর্মীয় মেরুকরণ’। বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর কট্টর হিন্দুত্বের প্রচার এবং অমিত শাহর অভিন্ন দেওয়ানি বিধির প্রতিশ্রুতি হিন্দু ভোটারদের একজোট করতে বড় ভূমিকা রেখেছে। বিশেষ করে মধ্যবিত্ত বাঙালি হিন্দুদের মনে ‘অনুপ্রবেশকারী এবং রোহিঙ্গা’ ইস্যু নিয়ে যে আশঙ্কার বীজ বিজেপি বপন করতে পেরেছিল, তার প্রতিফলন ঘটেছে ব্যালট বাক্সে। যেখানে মুসলিম ভোট কিছুটা হলেও বিভক্ত হয়েছে, সেখানে হিন্দু ভোটব্যাঙ্ক প্রায় একাট্টা হয়ে তৃণমূলের বিরুদ্ধে রায় দিয়েছে। তাদের আসন ১০০ পার হয়নি। হেরেছেন প্রায় এক ডজন মন্ত্রী। নিজ আসনে জিততে পারেননি মমতাও। এবার বাংলা হয়তো আসামের মতো হতে চলেছে। মুসলমানদের চরম দুরবস্থা হবে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। শুধু মেরুকরণ নয়, তৃণমূলের শীর্ষ নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের দলের হারের পেছনে বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ‘প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা’। দীর্ঘ দেড় দশকের শাসনে কর্মসংস্থানের অভাব, বড় শিল্পের অনুপস্থিতি এবং সর্বোপরি নিয়োগ দুর্নীতির কালো দাগ সাধারণ মানুষের মনে গভীর ক্ষত তৈরি করেছিল। জেলাস্তরে তৃণমূল নেতাদের দাদাগিরি, তোলাবাজি এবং সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে যে ক্ষোভ ছিল, বিজেপি সেই ক্ষোভকে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবহার করেছে। ২০২১ সালের হারের শিক্ষা নিয়ে এবার বিজেপি তার রণকৌশল আমূল বদলে ফেলেছিল। কেন্দ্রীয় নেতারা এবার মমতাকে ব্যক্তিগত আক্রমণের বদলে জোর দিয়েছিলেন প্রশাসনিক ব্যর্থতায়। ‘দিদি ও দিদি’র মতো বিতর্কিত স্লোগান থেকে সরে এসে তারা স্থানীয় সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছে। এমনকি যে ‘বহিরাগত’ তকমা বিজেপিকে বারবার পিছিয়ে দিচ্ছিল, তা ঝেড়ে ফেলতে বাঙালি ‘ভদ্রলোক’ শমীক ভট্টাচার্যকে রাজ্য সভাপতি করা বা জয় শ্রীরামের পাশাপাশি জয় মা কালীর ডাক দেওয়ার মতো কৌশলী পদক্ষেপ তারা নিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর ঝালমুড়ি খাওয়া কিংবা প্রার্থীদের হাতে মাছ নিয়ে প্রচার করার ছবিগুলো মধ্যবিত্ত বাঙালির কাছে বিজেপির গ্রহণযোগ্যতা বাড়াতে সাহায্য করেছে। নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা নিয়েও এবারের নির্বাচনে জলঘোলা কম হয়নি। তৃণমূলের অভিযোগ, ভোটার তালিকা সংশোধনের নামে (এসআইআর) প্রায় ৯১ লাখ মানুষের ভোটাধিকার কেড়ে নিয়ে শাসক দলের ভোট মেশিনারিতে আঘাত করা হয়েছে। যদিও বিজেপি একে নিরপেক্ষতার জয় বলে বর্ণনা করেছে। ফল ঘোষণার পর কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ পশ্চিমবঙ্গবাসীকে কোটি কোটি প্রণাম জানিয়ে একে ‘ভয় ও তোষণের রাজনীতির বিরুদ্ধে জনাদেশ’ বলে উল্লেখ করেছেন। তার মতে, গঙ্গোত্রী থেকে গঙ্গাসাগর আজ সর্বত্র গেরুয়া পতাকা ওড়ার অর্থ হলো বিজেপির অগণিত কর্মীর আত্মবলিদান সার্থক হওয়া। ডন।
গ্রন্থনা ও সম্পাদনা : আবদুল কাইউম খান