আলোকিত জীবন
৬ মে ২০২৬ ১৮:০৫
॥ মুফতি মুহাম্মদ বাহ্রুল্লাহ নদভী ॥
আমাদের জীবনকে ইসলামের আলোয় আলোকিত করতে মহান রাব্বুল আলামিনের সাহায্যের বিকল্প নেই। তাই তাঁর কাছে দোয়া ও মোনাজাতের মাধ্যমে একজন মুমিনের সাহায্য প্রার্থনা করা উচিত। এ সংক্রান্ত কিছু নির্দেশনা তুলে ধরা হলো।
দু’আ কবুল হওয়ার সময়
১. আবু উমামা (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা)-কে প্রশ্ন করা হলো: কোন সময়ের দু’আ সবচেয়ে বেশি কবুল করা হয়। তিনি উত্তরে বলেন, ‘রাতের শেষ অংশ ও পাঁচ ওয়াক্ত ফরয সালাতের পর।’ (তিরমিযী: ৫/৪৯২)।
২. হযরত আনাস (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আযান ও ইকামাতের মধ্যবর্তী সময়ের দু’আ ফেরত দেয়া হয় না। অতএব তোমরা এ সময়ে দু’আ করবে।’ (আবু দাউদ: ১/১৪১)।
৩. সাহল ইবনে সা’দ (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, ‘আল্লাহর রাস্তায় যুদ্ধের সময় অর্থাৎ জিহাদের ময়দানে দু’আ কবুল হয়।’ (আবু দাউদ: ৩/২১)।
৪. নিশ্চয়ই শুক্রবারে একটি সময় আছে, যে সময় কোনো মুসলিম দাঁড়িয়ে সালাতরত অবস্থায় আল্লাহর কাছে যে কোনো কল্যাণ প্রার্থনা করবে, আল্লাহ্ অবশ্যই তাকে তা প্রদান করবেন। (বুখারী: ১/৩১৬)।
৫. সালাতের মধ্যে, সেজদার মধ্যে ও সালামের পূর্বে দু’আ করলে আল্লাহ্ কবুল করেন বলে বিভিন্ন হাদীসে বার বার বলা হয়েছে।
৬. রমযান মাস, ইফতারের সময়, যমযম কূপের পানি পান করার সময় দু’আ কবুল হয়।
৭. যেসব স্থানে কুরআন ও হাদীসের আলোচনা করার পর দু’আ করা হয়।
যাদের দু’আ আল্লাহ্ বেশি কবুল করেন
১. সন্তানের জন্য পিতা-মাতার দু’আ।
২. মুসাফিরের দু’আ এবং জিহাদকারীর দু’আ।
৩. অত্যাচারীর বিরুদ্ধে নির্যাতিত/মজলুম ব্যক্তির দু’আ।
৪. হজ্ব ও ওমরা পালনকারীর দু’আ।
৫. রমযান মাসে রোযাদারের দু’আ ও ক্বদরের রাতের দু’আ।
৬. অসুস্থ, বিপদগ্রস্ত ও নিরুপায় ব্যক্তির দু’আ।
৭. ন্যায়পরায়ণ শাসকের দু’আ।
৮. অসহায় ও বৃদ্ধ মানুষের দু’আ।
আল্লাহ যেভাবে তার বান্দাদের দু’আ কবুল করেন
আবু সাঈদ খুদরী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (সা) বলেছেন, যখনই কোনো মুসলিম পাপ ও আত্মীয়তার সম্পর্ক নষ্ট করা ছাড়া অন্য যেকোনো বিষয়ে আল্লাহর কাছে দু’আ করে তখনই আল্লাহ্ তাঁর দু’আ করে তাকে ৩টি বিষয়ের একটি দান করেন।
১. হয় তার প্রার্থিত বস্তুই তাকে সঙ্গে সঙ্গে প্রদান করেন, অথবা
২. তার দু’আর সওয়াবকে আখেরাতের জন্য সঞ্চয় করে রাখেন, অথবা
৩. দু’আর সওয়াবের পরিমাণে তার অন্য কোনো বিপদ-আপদ আল্লাহ্ দূর করে দেন। (মুসনাদে আহমাদ: ১১১৩৩)।
যিকির ও দু’আ কেন্দ্রিক শিরক ও বিদ’আত
১. কবরে বা মাজারে কিংবা কোন বিশেষ ব্যক্তিকে সেজদা করা সুস্পষ্ট শিরক এবং কাউকে সম্মানের উদ্দেশ্যে কুর্ণিশ করাও শিরকী গুনাহ। কদমবুছী করা বিদ’আত।
২. কোন আওলিয়া-বুযুর্গ কারো উপকার বা ক্ষতি করতে পারে বা আয়-বরকত বাড়িয়ে দিতে পারে বা বিপদ-আপদে রক্ষা করতে পারে বলে বিশ্বাস করা সুস্পষ্ট শিরক।
৩. কোন আওলিয়া কিংবা পীর-ফকির কোন নিঃসন্তানকে সন্তান দান করতে পারে অথবা ছেলের স্থলে মেয়ে বা মেয়ের স্থলে ছেলে দিতে পারে বলে মনে করা একটি বড় শিরক।
৪. মনের নিয়ত পূর্ণ হওয়ার জন্য কোন আওলিয়া-বুযুর্গের মাজারে যিয়ারত করতে যাওয়া বা মাজারে দু’আ করে কোন কাজের শুরু করা, মানত মানা বা মাজারে টাকা, গরু, ছাগল ইত্যাদি দান করাও শিরক।
৫. আজমীর শরীফের উসিলায় মামলা-মোকদ্দমা জিতেছি, অমুক এর উসিলায় পরীক্ষায় ভালো হয়েছে, খাজা সাহেবের উসিলায় প্রতিপত্তি লাভ হয়েছে, আবদুল কাদের জিলানীর উসিলায় এমন হয়েছে তেমন হয়েছে- এ জাতীয় উসিলার কথা বলাও শিরক।
৬. তাবীজ-তুমার এবং কবজ বাঁধাও শিরক। শিশু সন্তানকে মানুষের কু-দৃষ্টি থেকে বা রোগ-ব্যাধি থেকে বাঁচানোর জন্য গলায় বা হাতে তাবীজ বাঁধা, সাদা-লাল সুতা বাঁধা অর্থাৎ এসব বস্তুর উপর নির্ভরশীল আকীদা বিশ্বাসই শিরক।
তবে ছহীহ হাদীসে বর্ণিত কুরআনের আয়াত দিয়ে অথবা শিরক মুক্ত কোন শব্দ বা বাক্যের মাধ্যমে আরোগ্য লাভের লক্ষ্যে আল্লাহ্ তা’আলার কাছে আশ্রয় চেয়ে সীমিত পর্যায়ে ঝাড়-ফুঁক করা বৈধ। (বুখারী, মুসলিম)।
৭. পীর সাজা ও পীর ধরা বা পীরের কাছে বায়’আত হওয়া, পীরকে সন্তুষ্ট করতে পারলে আল্লাহ্ সন্তুষ্ট হবেন বলে মনে করা বিদ’আত।
৮. আত্মার পরিশুদ্ধির জন্য কোন পীরের বানানো তাসবীহ ও তা’লীম পাঠ করা বিদ’আত।
৯. তাসবীহর ছড়া দিয়ে তাসবীহ গণনা করে না পড়াই ভালো। প্রকৃতপক্ষে তাসবীহ আঙ্গুলের গিরায় গণনা করা সুন্নাত। কারণ কিয়ামতের দিন আঙ্গুল সাক্ষী দিবে।
১০. ছেলে-মেয়ের পরীক্ষা, বিদেশ যাত্রীর সফরের প্রাক্কালে মৃত ব্যক্তির চারপাশে বরকত বা কল্যাণ লাভের উদ্দেশ্যে হুযূরের মাধ্যমে কুরআন খতম, মিলাদ পাঠ ইত্যাদি অনুষ্ঠান করা বিদ’আত। এক্ষেত্রে সুন্নাত হলো দান-খয়রাত তথা সদকা করা। (তিরমিযী)।
১১. অনেক মানুষকে দেখা যায় যারা শুধু “আল্লাহ” বা “ইল্লাল্লাহ” শব্দ দ্বারা যিকির করে। এর মাধ্যমে কি ক্বলব পরিষ্কার হয়।
প্রকৃতপক্ষে রাসূল (সা) বা তার সাহাবীরা শুধু “আল্লাহ” বা ইল্লাল্লাহ” বলে যিকির করেছেন এরকম কোন দলিল পাওয়া যায় না। যিকির হবে “আল্লাহু আকবার” বা “লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ”।
লেখক : প্রতিষ্ঠাতা পরিচালক, আল-মাহাদুল ইসলামী, উত্তর রায়েরবাগ, যাত্রাবাড়ী, ঢাকা।