সাওদা সুমিকে আটকের নেপথ্যে আধিপত্যবাদের ছায়া


১৬ এপ্রিল ২০২৬ ১৫:০৪

সোনার বাংলা ডেস্ক : আলোচিত বিবি সাওদা সুমিকে আটক ও জিজ্ঞাসাবাদের বিষয়ে সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট দেয়াকে সামনে আনা হলেও এর নেপথ্যে যে বড় ধরনের ষড়যন্ত্র ও শক্তি সক্রিয় ছিল, তা তার জবানবন্দিতে উঠে এসেছে। বিবি সাওদা সুমি মুক্ত হওয়ার পর সেগুলো কোনো প্রকার রাখঢাক না রেখেই সোজাসাপ্টা বলেছেন গণমাধ্যমে।
বিবি সাওদা সুমির কথায় ফুটে উঠেছে তার প্রতিবাদী চরিত্রের। প্রকাশ পেয়েছে তীব্র স্বাধীনচেতা মানসিকতা এবং বাংলাদেশর গণতন্ত্রকে ধারণ করার দৃঢ়তা। নারী সমাজকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে কীভাবে পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে তাও ব্যক্ত করেছেন হয়রানির শিকার সাওদা সুমি। ভারতীয় আধিপত্যবাদী শক্তির যে নানা প্রভাব তাকে ভুগিয়েছে, তা ব্যক্ত করেছেন তিনি।
নির্ভীক এই নারী সম্প্রতি ফেস দ্য পিপলসে এক সাক্ষাৎকার দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, তাকে পুলিশ জিজ্ঞাসাবাদের সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া পোস্ট নিয়ে সতর্ক করেছে। তাকে বলেছেন, এ ধরনের পোস্ট আর দেবেন না। আপনারা কি দিল্লির সাথে পারবেন? ভারতের সাথে পারবেন? ভারতের বিরুদ্ধে কেন কথা বলেন? কেন লেখেন?
সাওদা বলেন, পুলিশ তার কাছে জানতে চেয়েছেন আপনারা ‘দিল্লি না ঢাকা, ঢাকা, ঢাকা’ স্লোগান দিয়ে কী বোঝাতে চান। কী করতে চান।
তিনি উল্লেখ করেন, পুলিশ সাওদার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় ছাত্রী সংস্থার সাথে তার সম্পৃক্ততার সূত্র ধরে বড় একটি মামলা দেয়ার চেষ্টা ও চিন্তাভাবনা করেছিল। তিনি বলেন, আটকের সময় আমাকে কোনো খাবার নিতে দেয়নি, এমনকি পানিও নিতে দেয়নি। এমনকি আমার বোরকার হিজাব খুলে রেখেছে। তাকে বলা হয়েছিল এগুলো নেয়া যাবে না। আটক অবস্থায় শুয়ে থাকার জন্য কোনো প্রকার ব্যবস্থা ছিল না। বসে থাকাও সম্ভব না হওয়ায় তিনি পুলিশকে অনুরোধ করে একটি জায়নামাজ নিয়েছিলেন। সেখানে তিনি ইবাদত-বন্দেগি করে রাতের সময় কাটিয়েছেন এবং ভোরে পানি খেয়ে রোজা রেখেছেন।
সাওদা বলেন, আটক অবস্থায় তাকে এক থেকে দেড় ঘণ্টা বোঝানো হয়েছে যে এ ধরনের পোস্ট আর দেবেন না। তবে তাকে আটকের বিষয়ে পুলিশ জানিয়েছে ওপর থেকে নির্দেশ রয়েছে। তবে ওপর থেকে নির্দেশদাতা কারা সেই পরিচয় প্রকাশ করেনি প্রশাসনের লোকজন, যা রহস্যে আজও ঢাকা। এক প্রশ্নের জবাবে সাওদা জানান, সামাজিকমাধ্যমে দেয়া তার পোস্ট নিয়ে তার বিরুদ্ধে কোনো ব্যক্তি অভিযোগ ও কিংবা কোনো প্রকার জিডি করেনি। আটকের সময়ের বর্ণনায় তিনি বলেন, পুলিশ তার ফেসবুক চেক করে গ্রেফতার কিংবা আটক করার মতো কোনো প্রকার অপরাধ বা অভিযোগ পুলিশ পায়নি বলে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানিয়েছিল অভিযানে যাওয়া কর্মকর্তারা। তারপরও তাকে আটকের নির্দেশ দেয়া হয়, যা তিনি পুলিশ কর্মকর্তাদের কথোপকথনে শুনেছেন। পরে ডিবি পুলিশের সদস্যরা তাকে রাত সাড়ে ১০টা থেকে রাত সোয়া ১১টার মধ্যে বাসা থেকে আটক করে নিয়ে যায়।
ডিবি কার্যালয়ে তাকে আবারও জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। সেখানেও সরকারের সমালোচনামূলক পোস্ট নিয়ে জেরা করা হয়। তাকে বলা হয়, এগুলো করে দেশের কিছু করতে পারবেন? সাওদা এসব পোস্ট দিয়ে শুধু শুধু ভেজালে পড়েছেন এবং পুলিশকেও ভেজালে ফেলেছেন বলে তাকে জানায় কর্তব্যরত ডিবি সদস্যরা।
সাওদা বলেন, বাচ্চার অসুস্থতার বিষয় উল্লেখ করে এসপিকে ফোন করেছিলেন তাকে আটককারী ডিবি কর্মকর্তা। এসপি বলেছিলেন যে তথ্য প্রমাণ রয়েছে, সেগুলো ঢাকাতে পাঠাতে হবে। ঢাকার সিদ্ধান্তের ওপর সব নির্ভর করবে। তাকে ছাড়া যাবে না।
বিবি সাওদা সুমি জিজ্ঞাসাবাদের সময় তার অবস্থান স্পষ্ট করে জানিয়েছিল আমার স্বাধীনতা আছে। তিনি যে সরকারের সমালোচনা করেছিলেন, তা সততার সাথে স্বীকার করেছিলেন। পুলিশ তার ফেসবুক আইডি ও মোবাইল চেক করে সেটির সত্যতা পেয়েছিল। তবে পুলিশ তাকে আটক করার মতো কোনো অপরাধ না পাওয়া সত্ত্বেও কেন এবং কার নির্দেশে আটক হয়েছিলেনÑ সেই প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি।
ফ্যাসিস্ট আমলের করা কালো আইন সাইবার সিকিউরিটি অ্যাক্টে জামায়াতের মহিলা বিভাগের কর্মী বিবি সাওদাকে গত ৫ এপ্রিল রাত ১০টা ৪৫ মিনিটে গ্রেফতার করে ভোলার ডিবি পুলিশ। গ্রেফতারের ঘটনাটিকে চব্বিশের অভ্যুত্থানের পর মতপ্রকাশের স্বাধীনতাকে খর্ব হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।
গ্রেফতারের এ ঘটনায় তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়ে নিঃশর্ত মুক্তি দাবি করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান, জামায়াতের সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ারসহ বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষ।
পরে গত ৭ এপ্রিল মঙ্গলবার দুপুরে ভোলা জেলা আদালত থেকে বিবি সাওদা সুমি জামিনে মুক্তিলাভ করেন। তার মুক্তির পর রাজধানীতে তার বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলা প্রত্যাহারের দাবিতে গত ৮ এপ্রিল মানববন্ধন কর্মসূচিও পালন করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর মহিলা বিভাগ। এতে বেশকিছু দাবি পেশ করা হয়। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে- বিবি সওদার বিরুদ্ধে মামলা তুলে নিতে হবে এবং তাকে গ্রেফতারের ইন্ধনদাতাকে গ্রেফতার করতে হবে; মধ্যরাতে কোনো ওয়ারেন্ট ছাড়া কোনো ব্যক্তিকে ঘর থেকে তুলে নেওয়ার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হবে; গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে নিয়ে অশালীন কুরুচিপূর্ণ মন্তব্যকারীদের সাইবার ক্রাইম মামলার আওতায় শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে; অটিস্টিক শিশুর মাকে মধ্যরাতে শিশু থেকে বিচ্ছিন্ন করে গ্রেফতারে মা ও শিশুর অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। গ্রেফতারের নির্দেশদাতাকে শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি বন্ধ করতে হবে।