সহাবস্থানের পরিবর্তে আক্রান্ত হচ্ছে বিরোধীদলের নেতাকর্মী


২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ ০৯:১৮

স্টাফ রিপোর্টার : ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে মাঠে সক্রিয় থাকা রাজনৈতিক দলগুলো জুলাই গণঅভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে রাজনৈতিক সহাবস্থান নিশ্চিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ থাকলেও বাস্তবে সেটি পরিলক্ষিত হচ্ছে না। ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন-পরবর্তী সময় জামায়াতে ইসলামী ও জাতীয় নাগরিক পার্টির নেতাকর্মীদের ওপর বিএনপির নেতাকর্মীরা দেশজুড়ে হামলা চালিয়েছে। শুধু দাঁড়িপাল্লা ও শাপলা কলি প্রতীকে ভোট দেওয়ার কারণে নিরীহ ভোটারদের ওপর নির্যাতন চালানো হয়। কোনো কোনো স্থানে ভোটারদের বাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। জামায়াতের প্রার্থীর পক্ষে প্রচার চালানোয় বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয়েছে এমন ঘটনাও রয়েছে। সহাবস্থানের নীতি বিদ্যমান থাকলে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতো না বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
নির্বাচনের দুদিন পর জামায়াতে ইসলামী দলীয় ফেসবুক পেজে দেওয়া এক পোস্টে ভোটগ্রহণের পর ১৬ জেলার ২১টি স্থানে ১১দলীয় নির্বাচনী ঐক্যভুক্ত দলগুলোর নেতাকর্মীদের ওপর হামলার তথ্য তুলে ধরে। এসব হামলায় অনেকে আহত হওয়ার পাশাপাশি বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট হওয়ার তথ্য উপস্থাপন করা হয় দলটির পক্ষ থেকে। এছাড়া নির্বাচন-পরবর্তী দেশের বিভিন্ন স্থানে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা ও নির্যাতন চালানো হয়। এমনকি স্বতন্ত্র প্রার্থী রুমিন ফারহানা ও তার নেতাকর্মী রক্ষা পায়নি বিএনপির হামলা থেকে।
জানা গেছে, খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুয়েট) ভিসির ওপর ছাত্রদল কর্মীরা হামলা চালান। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি রাতে কুয়েট ভিসি অধ্যাপক মো. মাকসুদ হেলালীকে ক্যাম্পাসে অবাঞ্ছিত ঘোষণা করেন একদল শিক্ষার্থী। তার বাসভবনের ফটকে তালা দেওয়ার চেষ্টাও হয়। খবর পেয়ে পুলিশ গিয়ে ভিসির বাসভবনের সামনে অবস্থানকারী ব্যক্তিদের সরিয়ে দেয়। জামায়াতের ফেসবুক পোস্টে বলা হয়েছে, খুলনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীর বাড়িতে আগুন দেওয়া এবং তাঁর মা-বোনকে পিটিয়ে আহত করার মতো ঘটনা ঘটেছে। ওই শিক্ষার্থীকে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়া হয়েছে।
এনসিপির নেতা সারজিস আলম এক ফেসবুক পোস্টে অভিযোগ করেন, নির্বাচনের ফলাফল ঘোষণার পর থেকে ৩০টির বেশি স্থানে তার দলের নেতাকর্মীদের বাড়িঘর ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে হামলা চালান বিএনপির নেতাকর্মীরা। দিনাজপুরে জামায়াতের পোলিং এজেন্ট হওয়ায় ছেলের ওপর ক্ষুব্ধ হয়ে বাবাকে মারধর ও বাড়ি পোড়ানোর হুমকি দেওয়া হয়। কুড়িগ্রামে ভোট নিয়ে তর্কের জেরে জামায়াত নেতাকে কুপিয়ে জখমের অভিযোগ করা হয়েছে। লালমনিরহাটের পাটগ্রামে বিএনপি নেতাদের নেতৃত্বে বাড়িতে ঢুকে মালামাল লুটপাটের অভিযোগ পাওয়া গেছে। বগুড়ার সারিয়াকান্দি উপজেলায় ছাত্রদল ও ছাত্রলীগের যৌথ হামলায় শিবিরের কর্মী আহত হয়েছেন। সুনামগঞ্জের দিরাই পৌর শহরে জামায়াত নেতার ওপর শারীরিক আক্রমণের অভিযোগ পাওয়া যায়। নোয়াখালীর সেনবাগে জামায়াত নেতার ওপর ছাত্রদল কর্মীদের অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটে। ভোটের পরদিন গত ১৩ ফেব্রুয়ারি সকালে সেনবাগ পৌরসভার বিন্নাগনি গ্রামের বাসিন্দা জামায়াতের কর্মী জসিম উদ্দিনকে (৬০) কিল-ঘুষি দিয়ে রক্তাক্ত করেন উপজেলা ছাত্রদলের নেতা সানাউল্যাহ। এছাড়া একটি স্থানে জামায়াতের কর্মীদের দুটি বাড়িতে ইটপাটকেল ছোড়া হয়। প্রায় একই সময় বীজবাগ ইউনিয়নের শ্যামেরগাঁও গ্রামে জামায়াতের কর্মী আবদুল্লাহর (৩০) নাক ফাটিয়ে দেন স্থানীয় ছাত্রদলের কর্মীরা। ফেনীর ফুলগাজীতে ছাত্রদল নেতার নেতৃত্বে জামায়াত নেতার দোকানে হামলা এবং মুন্সীরহাটে জামায়াতের কর্মীদের চারটি দোকান ভাঙচুর করা হয়েছে। চট্টগ্রামের সন্দ্বীপে জামায়াতের কর্মীর বাড়িতে হামলা করা হয়, যাদের বাড়িঘরে হামলা হয়েছে, তারা ভোটের দিন দাঁড়িপাল্লার পক্ষে কাজ করেছিলেন। কক্সবাজারের চকরিয়া উপজেলায় গত ১৩ ফেব্রুয়ারি জামায়াতের নেতার বাড়িতে বিএনপির কর্মীরা দফায় দফায় হামলা চালায়। উপজেলার হারবাং ইউনিয়নের করমুহুরী পাড়া এলাকায় ছয়টি বসতঘরে ভাঙচুর চালানো হয়। এ সময় গিয়াসউদ্দিন (৫৫) নামে এক জামায়াতের কর্মীকে কুপিয়ে জখম করা হয়। মোহাম্মদ আতিক (২৭) নামে ইসলামী ছাত্রশিবিরের এক কর্মীকে ব্যাপক মারধর করা হয়। বাগেরহাট-৪ আসনে আল-আমিন নামে এক যুবককে পিটিয়ে গুরুতর আহতসহ জামায়াত-শিবিরের ২০ নেতা-কর্মী জখম হন। বাগেরহাট সদর উপজেলার মান্দা গ্রামে ভোটের রাতে পাঁচ থেকে ছয়টি বাড়িঘর ভাঙচুর করা হয়েছে। কুষ্টিয়ায় জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতার বাড়িতে হামলা করা হয়। সিরাজগঞ্জে জামায়াতের জেলা আমীরের বাড়িতে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটেছে। বরিশালে বাবার রাজনৈতিক (জামায়াত) পরিচয়ের জেরে ছেলের গাড়িতে হামলা হয়েছে।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) সদস্য সচিব ও রংপুর-৪ (কাউনিয়া-পীরগাছা) আসনে সংসদ সদস্য আখতার হোসেন গত ২২ ফেব্রুয়ারি বলেন, বিএনপি একদিকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার কথা বলে; অন্যদিকে বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর হামলা বাড়িঘর ভাঙচুর চালাচ্ছে। এ আসনের পরাজিত বিএনপির প্রার্থী ভোটের আগে কম্বল শাড়ি লুঙ্গি ভোটারদের দিয়েছে। ভোটে পরাজিত হয়ে তার সন্ত্রাসী বাহিনীরা শাপলা কলির নেতাকর্মী সমর্থকদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর ও লুটপাট করেছে।  বিরোধীদলের নেতাকর্মীদের ওপর আওয়ামী লীগের মতো আচরণ করছে বিএনপির পরাজিত প্রার্থী ভরসার সন্ত্রাসী বাহিনী। তিনি জানান, হারাগাছে শাপলা কলির নেতাকর্মীদের বাড়িতে হামলা চালিয়ে আসবাবপত্র ও দুটি মোটরসাইকেল, টেলিভিশন, ওয়াশিংমেশিন ভাঙচুর করেছে, ৪ ভরি স্বর্ণালংকার এবং দুটি মোটরসাইকেল নিয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, ভরসার সন্ত্রাসী বাহিনীর ভয়ে শাপলা কলির নেতাকর্মীরা দশ দিনেও তাদের নিজ বাড়িতে ফিরতে পারেনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-২ (সরাইল, আশুগঞ্জ ও বিজয়নগরের একাংশ) আসনের সংসদ সদস্য ব্যারিস্টার রুমিন ফারহানার নেতাকর্মীদের ওপর কয়েক দফায় হামলা করেছে বিএনপির নেতাকর্মীরা। গত ২০ ফেব্রুয়ারি দিবাগত রাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইল উপজেলার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে স্থানীয় বিএনপির একাংশের হামলার শিকার হন রুমিন ফারহানা ও তার সমর্থকরা। তার অভিযোগ, ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্স অনুযায়ী নির্বাচিত সংসদ সদস্য হিসেবে ১২টা ১ মিনিটে তারই সবার আগে ফুল দেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু বিএনপির কিছু নেতাকর্মী তার ও তার সমর্থকদের ওপর রীতিমতো হামলা চালায়। তিনি বলেন, আমাকে একপাশে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দেওয়ার মতো অবস্থা তৈরি করা হয়। বিএনপির সাবেক এই নেত্রী হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, আমি এটুকুই বলব যে, দীর্ঘ ১৭ বছর পর বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় এসেছে। বিএনপি যদি তার নেতাকর্মীদের স্থানীয় পর্যায়ে নিয়ন্ত্রণ না করে এখনই, এর পরিণতি ভয়াবহ রকমের হবে।
গত ১৯ ফেব্রুয়ারি ঢাকা-১৫ সংসদীয় আসনের উদ্যোগে এতিমদের সম্মানে আয়োজিত ইফতার মাহফিলে প্রধান অতিথির বক্তব্য রাখেন ‎বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সম্মানিত আমীর ও সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান। এ সময় তিনি বলেন, ‘শুধুমাত্র দলীয় পরিচয়ের কারণে কেউ যেন জুলুমের শিকার না হয়। আমরা এই দেশ ও দেশের নাগরিকদের ভালোবাসি। যদি কেউ জুলুমের শিকার হয়, তাহলে আমরা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ গড়ে তুলবো।’ তিনি আরও বলেন, ‘সরকারি ও বিরোধীদল মিলে যেন মানুষের অধিকার নিশ্চিত করতে পারি, সেই চেষ্টা অব্যাহত থাকবে।’